সন্ত্রাসবাদের কারণ ও প্রতিকারের উপায় প্রসঙ্গ


পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আলোকে বিশ্ব, রাষ্ট্র বা সমাজে যতদিন সাম্য, সহিষ্ণুতা আর ন্যায় প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন সন্ত্রাসবাদ ফিরে ফিরে আসবে নতুন কোনো নামে নতুন কোনোখানে। সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে সবার আগে দরকার ইসলামী ঐক্য ও ভ্রতৃত্ববোধ। সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে সন্ত্রাসবাদীকে সঙ্গী করে রাজনৈতিক কাটাকাটি বা বাঘবন্দি ছলনা চাল না চেলে বিকারগ্রস্ত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে দেশের রাজনীতিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। এরই মাঝে বহু দেরি হয়ে গেছে। অথচ এখনো সন্ত্রাসবাদী নিধন বা নির্মূলের ভুল রূপকল্পের গালগল্প শোনাচ্ছে দেশের ধূর্ত সমাজপতি আর রাজনীতিবিদরা। তবে মনে রাখতে হবে- ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাস ঠেকানো, হত্যা দিয়ে গুপ্তহত্যা বন্ধ অসম্ভব। আর মাদরাসা ও দাড়ি-টুপি মানেই যে সন্ত্রাসবাদ নয়, এটি এখন বাস্তবতা।
মূলত, সন্ত্রাসবাদী নিধন নয়, পরিস্থিতির পরিবর্তনে বা উত্তরণে দরকার সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার আলোকে সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের। এ সন্ত্রাস প্রতিরোধে দরকার দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা আর রাষ্ট্র (সরকার), রাজনীতিক, গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজে এরাই মূল কালপ্রিট। যাকে বলে- যে সর্ষে ভূত তাড়ায়, সে সর্ষের মধ্যেই ভূত। তাহলে ভূত দূর হবে কি?
১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর এবং ২০০৮ ও ২০১৪ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল- ‘কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন পাস করা হবে না’। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যত ইসলামবিরোধী কর্মকা- ও আইন জারি হয়েছে ও হচ্ছে তা নজিরবিহীন। আর রাষ্ট্রীয় এসব কুকর্ম কোনো মুসলমান যেন প্রতিবাদ করতে না পারে বা কোনো প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে উঠতে না পারে তার জন্য সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসবাদী নাটক মঞ্চস্থ করছে। আর তাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী গুপ্ত সংস্থা- ‘র’ (জঅড)।
বিশ্বময় আধুনিক সন্ত্রাসবাদের জন্য অনেকে ‘রিলিজিয়াস ফ্যানাটিজম বা ধর্মীয় উন্মাদনার উগ্র উত্থান’ ঘটছে বলে প্রচারণা চালাচ্ছে। যার কারণে সন্ত্রাসী হামলা ঘটছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সন্ত্রাসবাদের এটি কারণ নয়। চলমান সন্ত্রাসবাদের স্বরূপ জানতে হলে সন্ত্রাসবাদী মানসিকতার সৃষ্টিস্থল থেকে শুরু করতে হবে। পবিত্র দ্বীন ইসলাম সবসময় সন্ত্রাসকে না বলছে। চরমপন্থার কথা পবিত্র কুরআন, পবিত্র হাদীছ শরীফ, পবিত্র ইজমা শরীফ ও পবিত্র ক্বিয়াস শরীফ উনাদের মধ্যে কখনোই বলা হয়নি।
মূলত, কিছু মানুষের মনোবিকার, বিশ্ব রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ, সন্ত্রাসবাদের প্রতি ক্ষমতাধরদের নেপথ্য আনুকূল্য আর বিভাজনের বৈষম্য পরিবেশ এবং পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন আঙ্গিক পায় সন্ত্রাসবাদ। আর এসব উপাদানগুলোকে একত্র করে গণতন্ত্রী সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদীরা পেশিশক্তি ও মারণাস্ত্র বাণিজ্য করে। ফলে দেশীয়-আন্তর্জাতিক মহলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক আধিপত্যবাদের মরণনেশায় চলে নরহত্যা ও লুণ্ঠনের মচ্ছব। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদের নাটক মঞ্চায়ন।
এদিকে বিজ্ঞানও সন্ত্রাসবাদের সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কার্যকারণ নির্ণয়ে অক্ষম। মূলত, সন্ত্রাসবাদ হলো- পুঁজিবাদী পশ্চিমাদের সামাজ্যবাদ ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের হাতিয়ার। আর পশ্চিমাসৃষ্ট সালাফী-ওহাবী মতবাদে বিশ্বাসী সউদী ওহাবী শাসক গং সুন্নী-হানাফী মাযহাবের বিরোধিতা করে সুন্নী-হানাফী মাযহাবের বিলুপ্তিকরণে পবিত্র দ্বীন ইসলামের নামে সন্ত্রাসবাদের বিষাক্ত বীজ বপন করেছে সারা মুসলিম বিশ্বে। এ বাস্তবতায় আমরা দেখি ইসলামের নাম ভাঙ্গানো সন্ত্রাসের প্রকৃতস্বরূপ। যেমন- আইএস সন্ত্রাসীরা সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, তুরস্ক, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বজুড়ে হামলা চালালেও তারা কেন ইসরাইল নিয়ে টু শব্দটিও করে না? কেন তারা জিহাদের নামে পাশের ইসরাইলে হামলা চালানোর সাহস করে না? কেন তাদের তেল ক্রয় করে পশ্চিমারা আর কেনইবা তাদের কাছে পশ্চিমারা অস্ত্র বিক্রি করে?
আমাদের দেশে সন্ত্রাসবাদীদের মূলশক্তি হলো ইসলামহীন ভঙ্গুর সমাজ। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো দেশে দেশে সন্ত্রাসবাদ পরিপুষ্ট হচ্ছে বিদেশী(কাফির গং) এবং তাদের দেশীয় দালালদের অর্থনৈতিক অভিপ্রায় থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের তাগিদে। ফলে রাষ্ট্রের মধ্যেই যেমন ছোট ছোট সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের জন্ম হচ্ছে, তেমনি বাইরের অপশক্তির রয়েছে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা। অন্তত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঢাকা, সিলেট বা মৌলভীবাজারে ঘটনায় বহিঃশক্তি (বিশেষতঃ ভারতীয় ‘র’) প্রবলভাবে জড়িত বলেই সচেতন দেশপ্রেমিক মহলের বিশ্বাস। কেননা সন্ত্রাসবাদ এখন আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের মোক্ষম অস্ত্র। যা ছায়াযুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিরক্ষার নামে সরাসরি সৈন্য নামিয়ে যুদ্ধ ঘোষণার পরিবর্তে। বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধŸতন কর্মকর্তারাও সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে- জেএমবি’র কাছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক আসে ভারত থেকে।
সন্ত্রাসবাদ যেমন আমাদের দেশের একার সমস্যা নয়, এটি বিশ্ব বাস্তবতা তথা সারা মুসলিম বিশ্বের ক্ষত। তারপরও আমাদের দেশ বেশি বিপদে, কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের কর্তারাই সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করছে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের কর্তাদের এ হিংস্রতা ও বর্বরতার নাটক মঞ্চায়ন ঠেকাতে দরকার ইসলামী মূল্যবোধের চর্চা। তবেই আশা করা যায়- দেশ থেকে সন্ত্রাসবাদ দূর হতে পারে।
এদিকে দেশ আর জাতি যখন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে, তখন দেশের তরুণ প্রজন্ম ও গণমাধ্যম ব্যস্ত হারাম ক্রিকেট খেলা নিয়ে। আর সে যাত্রায় উবে গেছে দেশ আর মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা। অর্থাৎ এদের অন্তর থেকে দেশপ্রেম বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর দায় যেমন অতি নাটুকে গুমরাহ গণতান্ত্রিক রাজনীতির, তেমনি রাজনীতিকদের প্রবঞ্চনার মূল্যবোধেরও। ফলে দেশ আজ মহাদুর্যোগে। তাই দেশবাসীকে জেগে উঠতে হবে। মূলত, পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার আলোকে সন্ত্রাসবিরোধী জনআন্দোলনই কেবল পারে এ বিভীষিকা রুখতে।

Views All Time
4
Views Today
4
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে