সবাই নাস্তিকের খাতায় নাম লেখালো, কিন্তু কবি ফররুখ আহমদ যিকির-ফিকিরের কারণে টিকে রইলেন


বর্তমান সময়ে এদেশের কথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী মানেই নাস্তিক গোষ্ঠী, এমনটি সবাই মনে করে। অথচ বাংলাদেশের এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণী গঠিত হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মুসলমানদের আলাদা ভূখণ্ডের দাবিতে সাতচল্লিশের আগে যেই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা, তার পুরো দায়িত্বই ছিল বাঙালি মুসলমান কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের হাতে।
সেই গোষ্ঠীটিই পরবর্তীতে দ্বীন ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে হিন্দুদের দালাল ও নাস্তিকে পরিণত হলো। এ প্রসঙ্গে ‘দৈনিক ইনকিলাব’-এর ২১শে নভেম্বর ১৯৮৬ সংখ্যায় কবি তালিম হোসেন ‘ফররুখ আহমদ ও আমি’ নামক একটি স্মৃতিকথায় লিখেছেন-
“আমার কলকাতা জীবনের যে বন্ধু-সহচরদের কথা আগে বলেছি (আবদুল গনি হাজারী, কামরুল হাসান, সরদার জয়েনউদ্দীন প্রমুখ) ইতোমধ্যে নানা কারণে তাদের মধ্যে পাকিস্তানী জোশ-জজবা মিইয়ে এসেছে। তাদের উপর তখন ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্যবাদ, মানবতাবাদ প্রভৃতির আছর পড়তে শুরু করেছে। কাছাকাছি সময়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ‘মানবতাবাদী’ সমাজচিন্তাবিদ এম. এন. রায় ঢাকা সফর করে গেছে। তার প্রতি আমার (তালিম হোসেন) শ্রদ্ধাবোধ ছিল। এম এন রায় ‘পাকিস্তান’ সমর্থন করেছিল। সম্ভবত সেজন্যই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সেই উষাকালে তার সফরে পাক-সরকারের তরফ থেকে কোনো বাধা হয়নি এবং এম এন রায়ও উৎসাহ বোধ করেছিল এখানকার বুদ্ধিজীবী মহলের সঙ্গে পরিচয় ও ভাব-বিনিময় করতে। এম এন রায় বর্তমান গুলিস্তান হলের পিছনে সরকারি রেস্ট হাউজে উঠেছিল। যে কয়দিন ঢাকায় ছিল, তখন শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপক অনেকেই প্রতিদিন গিয়ে তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, আলাপ-আলোচনা করেছে। অধ্যাপক অমিয় চক্রবর্তী, মুহম্মদ আবদুল হাই, মুনীর চৌধুরী, অজিত গুহ, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, আবদুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদ্দীন, কামরুল হাসান, হাবীবুর রহমান-আরো অনেকেই। ফররুখ আহমদ যাননি। আমি গিয়েছি একাধিকবার।” (তথ্যসূত্র: ফররুখ আহমদ: জীবন ও সাহিত্য, আবদুল মান্নান সৈয়দ, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ৫৭)
কবি তালিম হোসেনের বক্তব্যে এম এন রায়ের সাথে যারা যারা সাক্ষাৎ করেছিল, তারাই বর্তমানে এদেশের কথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর পূর্বসূরি। কলকাতা থেকে আগত নাস্তিকের সাহচর্যে তারা সবাই তাদের ইসলামী চিন্তাচেতনা বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। কিন্তু ফররুখ আহমদ, তিনি এম এন রায়ের সাথে দেখাও করেননি, নিজের ধর্মীয় অবস্থানও ত্যাগ করেননি।
কারণ ফররুখ আহমদ ছিলেন ফুরফুরা শরীফ উনার খলীফা হযরত আবদুল খালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরীদ। ফররুখ আহমদ মুরীদ হয়ে নিয়মিত যিকির-ফিকির করতেন বিধায় তিনি অন্যদের মতো নষ্টদের কাতারে যাননি। এ প্রসঙ্গে উপরোক্ত ‘ফররুখ আহমদ: জীবন ও সাহিত্য’ গ্রন্থের ২৮৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে-
“কবিতাচর্চার সূচনাকালেই ফররুখ আহমদের আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ ঘটে। এ ক্ষেত্রে তাঁর পীরসাহেব ছিলেন হযরত আবদুল খালেক, যাঁকে কবি তাঁর ‘সিরাজাম মুনীরা’ (১৯৫২) কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেন। এই পীরসাহেব উনার নিকট থেকে তিনি নকশবন্দিয়া মুজাদ্দিদিয়া তরীক্বা উনার বিভিন্ন সবক গ্রহণ করেন এবং সব কয়টি মাক্বাম উত্তীর্ণ হন।”
অর্থাৎ যিকির-ফিকির তথা ইছলাহী না থাকার কারণেই বাঙালি মুসলমানদের যে বুদ্ধিজীবী শ্রেণী, তা তার শেকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে নাস্তিকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। যিকির-ফিকির ও ছোহবত ছাড়া মুসলমানদের মধ্যে কোনো বুদ্ধিজীবী শ্রেণী গড়ে উঠতে পারে না। আমরা মুসলিম স্বর্ণযুগের যেসব বিজ্ঞানী ও কবি-সাহিত্যিকদের নাম শুনে থাকি, উনাদের সকলেরই পীরসাহেব ছিলো। উনারা সকলেই ছিলেন ছূফী।
তবে বাঙালি মুসলমান বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর নষ্ট হওয়ার পেছনে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অপরিনামদর্শী ভূমিকাও কম নয়। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ শত্রু চিনতে পারেনি। তারাই এই এম এন রায়কে ঢাকায় এনে সরকারি রেস্টহাউজে রেখে এদেশের লেখক-সাহিত্যিকদের বিপথগামী করার সমূহ ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। নাউযুবিল্লাহ!

 

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে