সম্মানিত ইয়ারমূকের জিহাদ


রোমান সৈন্যদের একদল কানাতীরের নেতৃত্বে লাজিকিয়ার পথ ধরে এগুতে আরম্ভ করলো। আরেকদল জার্জিরের নেতৃত্বে জাদাতুল উজমার ও সাওমীনের পথ ধরে এগুতে থাকলো। আরেকদল কাওরীনের নেতৃত্বে হালাব ও হামাতের পথ ধরে এগুতে থাকলো । আরেকদল দীরজানের নেতৃত্বে আওয়াসিমের পথ ধরে এগুতে থাকলো । মাহান তার নেতৃত্বাধীন সৈন্যদের নিয়ে সবার পিছনে চললো। জাবালা বিন আইহাম গসসান, লাখম, ও জুযাম গোত্রের আরব খ্রিষ্টানদের নিয়ে সবার আগেই রওয়ানা হয়।
সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার নিকট খ্রিষ্টনাদের ব্যাপক প্রস্তুতির সংবাদ প্রেরণ করা হলে, তিনি সম্মানিত মুসলমান উনাদের প্রধান সেনাপতি হযরত আবূ উবাইদা ইবনে র্জারাহ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার নাম মুবারক-এ মর্মস্পর্শী ভাষায় একখানা পত্র মুবারক লিখলেন এবং কাসেদকে বললেন, আপনি নিজে যেয়ে সৈন্যগণ উনাদের প্রত্যেক কাতারে কাতারে আমার এই পত্র মুবারক পাঠ করে শুনাবেন এবং মুখে বলবেন, “সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি আপনাদেরকে সালাম মুবারক জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে সম্মানিত মুসলমানগণ! আপনারা বীরবিক্রমে শত্রুদের সম্মুখীন হোন এবং সর্বশক্তি দিয়ে জিহাদ করে তাদেরকে চরম শিক্ষা দিয়ে দিন। আমি সুনিশ্চিত যে আপনারাই বিজয়ী হবেন।” সুবহানাল্লাহ!
সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত নির্দেশ মুবারক যথাযথ পালন করা হলো। সম্মানিত মুজাহিদগণ উনাদের মধ্যে আরো কঠিনভাবে জজবা বৃদ্ধি পেলো। সুবহানাল্লাহ!
খ্রিষ্টানরা ২ লাখ সৈন্য নিয়ে জিহাদের ময়দানে উপস্থিত হলো। তারা মোট চব্বিশ সারিতে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলো। তাদের মধ্যে ৩০ হাজার সৈন্য পায়ে বেড়ী লাগিয়ে এসেছিলো, যেন পালাবার কোনো সুযোগ না থাকে। সম্মানিত মুসলমান উনাদের সৈন্য সংখ্যা ছিলো মোট ৩৫ হাজার। এক বর্ণনা মতে সম্মানিত মুসলমান উনাদের মধ্যে এক হাজার জন ছিলেন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম উনাদের অন্তুর্ভুক্ত এবং উনাদের মধ্যে ১০০ জন ছিলেন সরাসরি বদরী ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহুম। সুবহানাল্লাহ!
জিহাদের শুরুতে বিশালকায় এক পাদ্রী ব্যূহ হতে বের হয়ে সম্মানিত মুসলমান উনাদেরকে মল্লযুদ্ধের জন্য আহ্বান করলো। তখন কায়েস ইবনে হুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি একটি কবিতা পাঠ করতে করতে এমন ক্ষিপ্রগতিতে পাদ্রীর দিকে অগ্রসর হলেন যে, পাদ্রী অস্ত্র পর্যন্ত ঠিক করতে পারলো না। তিনি একদম পাদ্রীর মস্তকে তরবারী দিয়ে প্রচ- আঘাত করলেন। এক আঘাতেই তার খ-িত দেহ ঘোড়ার উপর থেকে লুটিয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে সম্মানিত মুসলমানগণ উনারা আকাশ-বাতাস কাপিয়ে সম্মানিত তাকবীর মুবারক দিতে লাগলেন। সুবহানাল্লাহ! তখন সাইয়্যিদুনা হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি বললেন, সূচনা উত্তমভাবে হয়েছে, এখন সম্মুখে আমাদের সুনিশ্চিত জয়।” সুবহানাল্লাহ!
জিহাদের এক পর্যায়ে হযরত ইকরামা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি সৈন্য উনাদেরকে একথা বললেন,
‘আপনাদের মধ্যে কে আছেন যে, সম্মানিত শাহাদাত মুবারক উনার উপর বায়াত গ্রহণ করবেন?
উনার সম্মানিত আহবান মুবারক সাড়া দিলেন উনার চাচা হারিস ইবন হিশাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু, হযরত দিরার ইবনে আযওয়ার রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু এবং আরো চার শ’ মুসলিম সৈনিক। উনারা তুমুলভাবে জিহাদ করে খ্রিষ্টনাদেরকে কচুকাটা করে দিলেন।
এই ইয়ারমুকের ময়দানেই ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল হারিস ইবন হিশাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনাকে, আইয়্যাশ ইবন আবী রবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনাকে এবং ইকরিমা ইবন আবূ জাহল রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনাকে অর্থাৎ উনাদেরকে ।
পিপাসায় কাতর হারিস ইবনে হিশাম রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি পানি চাইলেন। যখন উনাকে পানি দেওয়া হলো, হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি তখন উনার দিকে তাকালেন। হযরত ইকরামা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার চাহনী দেখে হযরত হারিস রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি পানি পান না করে বললেন, ‘হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনাকে পানি দিন।’ পানির পাত্রটি যখন হযরত ইকরামা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো তখন হযরত আইয়্যাশ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি উনার দিকে তাকালেন। তা দেখে হযরত ইকরামা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি বললেন, ‘হযরত আইয়্যাশ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনাকে দিন।’
হযরত আইয়্যাশ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার কাছে পানির পাত্রটি যখন নিয়ে যাওয়া হলো, দেখা গেল, তিনি শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন। সুবহানাল্লাহ!
তারপর পাত্রটি হাতে নিয়ে একে একে উনার অপর দুই সাথীর কাছে নেয়া হলো, ততক্ষণে উনারাও সম্মানিত শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন। সুবহানাল্লাহ!
এক পর্যায়ে লাঞ্চিত, অপদস্থ রোমান সৈন্যরা হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার সেনাবাহিনী উনাদের হাতে পরাজিত হওয়ার কথা তাদের কথিত সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট জানায়। সে খবর শুনে হিরাক্লিয়াস বলে উঠলো, লা’নত তোমাদের উপর! যাঁরা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেছেন, উনাদের সম্পর্কে আমাকে বলো। উনারা কি তোমাদের মতো মানুষ নন?
তারা জবাব দিলো, হ্যাঁ। উনারা আমাদের মতোই মানুষ।
হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের সংখ্যা বেশি নাকি উনাদের?
তারা উত্তরে বললো, বরং আমরা তো প্রতিটি জিহাদেই সংখ্যার দিক থেকে উনাদেরকে বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছি।
হিরাক্লিয়াস প্রশ্ন করলো, তাহলে, কেন উনারা তোমাদেরকে পরাজিত করলো?
তখন উচ্চপদস্থ একজন ব্যক্তি এগিয়ে এসে বললো, “কারণ উনারা রাতে জেগে উঠে সালাত আদায় করেন, দিনের বেলায় সিয়াম পালন করেন, ওয়াদা পূরণ করেন, সৎ কাজে উৎসাহ দেন, মন্দ কাজে বাধা দেন এবং উনারা একে অপরের সাথে উত্তম ব্যবহার করেন। সুবহানাল্লাহ!
অন্যদিকে আমরা মদ খাই, ব্যভিচার করি, নিষিদ্ধ কাজে মত্ত হই, চুক্তি ভঙ্গ করি, অন্যায় ও অত্যাচার করি, আমাদের সৃষ্টিকর্তকে রাগান্বিত করে এমন কাজে উৎসাহ দেই, আর যা তাঁকে সন্তুষ্ট করে তাতে বাধা প্রদান করি এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ছড়িয়ে বেড়াই।” না‘ঊযুবিল্লাহ!
হিরাক্লিয়াস বললো, “তুমি সত্য বলেছো।”
জিহাদের শেষ দিন তথা ১০ই রজবুল হারাম শরীফ যখন সম্মানিত মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মাঝে কঠিন যুদ্ধ চলতে থাকলো। এমতাবস্থায় সম্মানিত মুসলমান উনাদের পশ্চাদভাগের ভারপ্রাপ্ত সেনাপতি হযরত ক্বায়েস ইবনে হুবাই রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি হঠাৎ এসে ভীষণভাবে আক্রমণ করে বসলেন। উনার এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য খ্রিষ্টানরা মোটেই প্রস্তুত ছিলো না; সুতরাং আক্রমণের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে পশ্চাদপসরণ করতে লাগলো। ঐদিকে ব্যূহের মধ্যভাগ হতে হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনিও হযরত ক্বায়েস রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনার সাথে যুগ দিলেন এবং শত্রুদেরকে পশ্চাদ্ধাবন করতে লাগলেন। দেখতে দেখতে রোমীয় খ্রিষ্টানদের মৃতদেহ রণভূমি পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। সম্মানিত মুসলমানগণ উনারা জিহাদের ময়দান সংলগ্ন খালের দিকে ধাওয়া করলেন। অল্পক্ষনের মধ্যেই খালটি মৃতদেহে ভরে গেলো। অগণিত শত্রুর দ্বারা পরিবেষ্টিত যুদ্ধক্ষেত্র অতি অল্প সময়ের মধ্যে শূন্য হয়ে গেলা। সঙ্গেসঙ্গে সম্মানিত মুসলমান উনারা বিজয়ের তাকবীর ধ্বনি দিতে থাকলেন। সুবহানাল্লাহ!
সম্মানিত মুসলমান উনারা ইয়ারমুকের জিহাদে ১লাখের চেয়েও অধিক খ্রিষ্টানদেরকে কচুকাটা করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন। আর সম্মানিত মুসলমান উনাদের মধ্যে ৩ হাজার জন সম্মানিত শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ! আর উনাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সিবতু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম ইবনে যুন নূর আলাইহিস সালাম তিনি এবং হযরত ইকরামা রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি, হযরত দ্বিরার ইবনে আযওয়ার রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি হযরত সা‘ঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনিসহ আরো অনেকে। সুবহানাল্লাহ! সিবতু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম ইবনে যুন নূর আলাইহিস সালাম তিনি এ সম্মানিত জিহাদ মুবারক-এ প্রচন্ড লড়াই করে অনেক কাফেরকে হত্যা করে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন। অতঃপর তিনি এই জিহাদের শেষ দিন তথা ১০ই রজবুল হারাম শরীফ ইয়াওমুল আহাদ শরীফ মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র সম্মানিত জিহাদের ময়দানেই মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেন। সুবহানাল্লাহ!
কিতাবে বর্ণিত রয়েছে,
وعلى بن أبي العاص، قتل يوم اليرموك
অর্থ: “সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম ইবনে যুন নূর আলাইহিস সালাম তিনি ইয়ারমূকের জিহাদে মহাসম্মানিত ও মহাপবিত্র শাহাদাতী শান মুবারক প্রকাশ করেন।” সুবহানাল্লাহ!
হযরত আবূ উবাইদা ইবনে জাররাহ রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু তিনি হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামেন রদ্বিয়াল্লাহু তা‘য়ালা আনহু উনারে নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল খলীফা উনার দরবারে বিজয় সংবাদ প্রদানের জন্য প্রেরণ করলেন। সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আযম আলাইহিস সালাম তিনি দীর্ঘদিন যাবৎ জিহাদের খবরের জন্য খাওয়া-দাওয়া ও ঘুম ত্যাগ করে অপেক্ষ করতেছিলেন। বিজয়ের সংবাদ পাওয়া মাত্র তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট সিজদা করে শুকরিয়া আদায় করলেন। সুবহানাল্লাহ!

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে