সাইয়্যিদুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদেরকে ওয়াকিয়া বলতেন এবং উনাদের কাছ থেকে শুনতেন


খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

لقد كان فى قصصهم عبرة لاولى الالباب.

অর্থ: ‘অবশ্যই উনাদের ওয়াকিয়া বা ঘটনাসমূহে জ্ঞানীগণের জন্য ইবরত-নসীহত রয়েছে।

মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র সূরা ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনার মধ্যে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনার বিস্তারিত বিবরন উল্লেখ করতঃ পরিশেষে ঐ কথা বলেন। আর ঐ পবিত্র আয়াত শরীফ থেকে ইমাম-মুজতাহিদ, আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা উসূল বা মুলনীতি নির্নয় করেছেন-

قصص الاولين موعظة للاخرين.

অর্থ: “পূর্ববর্তীগণের ওয়াকিয়া বা ঘটনাসমূহে পরবর্তীগণের জন্য ইবরত-নছীহত রয়েছে।” তবে অবশ্যই সেগুলো হতে হবে সত্য। অশ্লীল-অশালীনতা মুক্ত।

সর্বোপরি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ওয়াকিয়া মুবারক বলা ও শুনা পছন্দ করতেন। ওয়াকিয়া বা ঘটনার মাধ্যমে ইবরত-নছীহত হৃদয়গ্রাহী হয়। সেটা শিক্ষা দিয়েছেন।

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের অত্যন্ত মুহব্বত করতেন। উনাদের হক্বসমূহ পুরোপুরি আদায় করে দিয়েছেন। তিনি প্রথমতঃ ২৪ ঘণ্টা সময়কে তিনভাগে ভাগ করেছিলেন। সম্মানিত আহাল ও ইয়াল আলাইহিমুস সালাম উনাদের জন্য ৮ ঘণ্টা বরাদ্দ করেছেন। ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য, আর ৮ ঘণ্টা বাইরের কাজের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন। পরবর্তীতে তা ১২ ঘণ্টা, ১২ ঘণ্টা করে নির্ধারণ করেছেন। তিনি পবিত্র আহাল-ইয়াল আলাইহিমুস সালাম উনাদের জন্য বরাদ্দ সময়ে উনাদের যাবতীয় খোঁজ-খবর নিতেন। উনাদেরকে বিশেষভাবে নছীহত মুবারক করতেন। তিনি উনাদেরকে বিভিন্ন ঘটনাও শুনাতেন। আবার উনাদের কাছ থেকেও ওয়াকিয়া বা ঘটনা শুনতেন অত্যন্ত মনোযোগের সাথে।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, এক রাতে তিনি হযরত উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদেরকে একটি ওয়াকিয়া শুনালেন। ইহা শুনে একজন উম্মুল মু’মিনীন আলাইহাস সালাম তিনি বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ ঘটনা যেন খুরাফার ঘটনার ন্যায় অভুতপূর্ব ও বিস্ময়কর।

তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে বললেন- আপনি কি খুরাফার আসল ঘটনা জানেন?

খুরাফা নামে বনী উযরা গোত্রের এক ব্যক্তি ছিল। জাহিলী যুগে তাকে একবার জিনেরা ধরে নিয়ে যায়। সে অনেক দিন তাদের সাথে কাটায়। দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পর জিনেরা তাকে লোকালয়ে দিয়ে যায়। সে ব্যক্তি সেখানে যে আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখেছিল সেগুলো মানুষদেরকে শুনাতে থাকে। পরবর্তীতে এটা প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়, মানুষ কোনো বিস্ময়কর ঘটনা শুনলে বলতো এটা খুরাফার গল্প। (শামায়িলে তিরমিযী শরীফ)

একদিন উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম তিনি একটি ওয়াকিয়া শুনালেন। যা উম্মে যারআ নামে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার জগতে মাশহুর।

তিনি বললেন, একবার এগার জন্য মহিলা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে বললো যে, তারা প্রত্যেকেই আপন স্বামীর অবস্থা সম্পূর্ণ খুলে বলবে। কেহ কোনো বিষয় গোপন করবে না।

প্রথম মহিলা বললো- আমার স্বামী অতিশয় দুর্বল উটের গোশত সদৃশ। সেই গোশতটিও আবার কঠিন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। সেই পাহাড়ের পথ ও সুগম নয় যে, অতি সহজেই সেখানে আরোহন করে গোশতের টুকরাটি লাভ করা যাবে। আর গোশতও এতো উৎকৃষ্ট নয় যে, কষ্ট স্বীকার করে সেখান থেকে সংগ্রহ করা হবে।

দ্বিতীয় মহিলা বললো- আমার স্বামী সম্পর্কে কিছু বলতে পারছিনা। আমার ভয় হচ্ছে, যদি তার দোষ বর্ণনা করি তাহলে তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব ধরনের দোষই বর্ণনা করতে হবে।

তৃতীয় মহিলা বললো- আমার স্বামী অতি দীর্ঘকার। কোনো কিছু বললে তৎক্ষণাৎ তালাক। আর যদি কিছু না বলি তাহলে আবার ঝুলন্ত অবস্থায় থেকে যাই।

চতুর্থ মহিলা বললো- আমার স্বামী তিহামার রাতের ন্যায় শান্ত মেজাজের লোক। অতি গরমও নয় আবার অতি ঠা-াও নয়। তার কাছে কোনো ভয়ও নেই। কোনো বিরক্তিবোধও নেই।

উল্লেখ্য যে, মক্কা শরীফ ও উনার আশপাশের এলাকাকে “তিহামা” বলা হয়। তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বলে ঐ এলাকার রাত খুবই শান্তিদায়ক হয়ে থাকে।

পঞ্চম মহিলা বললো- আমার স্বামী ঘরে প্রবেশ করলে চিতাবাঘ বনে যায়। আর বাইরে গেলে সিংহ। ঘরে কি ঘটে সে সম্পর্কে খবর রাখে না। যেন ঘরে আমার রাজত্ব। যা চাই তা পানাহার করি। কোনো বাঁধা নেই।

৬ষ্ঠ মহিলা বললো- আমার স্বামী যখন খায় তখন সবই খেয়ে ফেলে। পান করলে একাই সব শেষ করে। ঘুমাতে গেলে একাই সম্পূর্ণ কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আমার সুখ-দুঃখের কোনো খবর নেয়না।

সপ্তম মহিলা বললো- আমার স্বামী আমার হক্ব আদায়ে অক্ষম। এমনকি কথা বলারও ক্ষমতা রাখেনা। চিররোগা। পৃথিবীতে যত রোগ-ব্যাধি আছে সবই তার মাঝে বিদ্যমান। তাছাড়া এতো বদ মেজাজী যে, হয়তো তোমার মাথা ফেটে ফেলবে নয়তো তোমার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত করবে। কিংবা উভয়টিই করে বসবে।

অষ্টম মহিলা বললো- আমার স্বামীর শরীরের চামড়া খরগোশের চামড়ার মত কোমল, মোলায়েম। আর দেহের সুবাস জাফরানের সুবাসের মতো।

নবম মহিলা বললো- আমার স্বামী সুউচ্চ প্রাসাদের অধিকারী। তার বাসস্থান পরামর্শ সভার সন্নিকটে। অর্থাৎ তিনি অত্যন্ত দানশীল এবং গণ্য-মান্য ব্যক্তিত্ব।

দশম মহিলা বললো- আমার স্বামীর নাম মালেক। উনার সম্পর্কে কি বলবো! এতক্ষণ পর্যন্ত যাদের প্রশংসা করা হয়েছে তিনি তাদের সবার চেয়ে উত্তম। আমি উনার যা প্রশংসা করবো উনি তার চেয়েও উত্তম ও ঊর্ধ্বে। তিনি অনেক উটের মালিক। অধিকাংশ উট বাড়ির নিকটে বেঁধে রাখা হয়। মাঠে খুব কমই চড়ানো হয়। উটগুলো যখন বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ শুনতে পায় তখন তাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যায় যে, তারা মেহমানের আপ্যায়নের উদ্দেশ্যে প্রাণ হারাবে।

একাদশ মহিলা বললো- আমার স্বামী ছিলো আবু যারা। আবু যারা সম্পর্কে কি বলবো! সে অলঙ্কারে আমার কান ঝুলিয়ে রেখেছিল। খাইয়ে চর্বিতে আমার বাহু মোটা ও পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। আমাকে এতো সুখ-শান্তিতে রেখেছে যে, আত্মাভিমান ও খুশীতে আমি আত্মহারা হয়ে পড়েছিলোম। সে আমাকে এমন একটি ঘরে পেয়েছে যারা সামান্য কয়েকটি ছাগলের অধিকারী ছিলো। অতি কষ্টে তাদের দিন অতিবাহিত হতো। অথচ সে আমাকে উট, ঘোড়া, গরু-মহিষ এবং কৃষি সরঞ্জামের অধিকারী এক ধনী পরিবারে নিয়ে এলো। তার কাছে কোন কথা বলে আমি কখনো অপমানিত হইনি। ভোর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকতাম। খাওয়া পরা এতো পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিলো যে, আমি পরিতৃপ্তি লাভ করে রেখে দিতাম। আর আবু যারা উনার মাতা তথা আমার শ্বাশুড়ির কী প্রশংসা করবো! উনার বিশাল পাত্রগুলো সবসময় খানায় ভরপুর থাকতো। উনার ঘরটিও ছিলো বেশ প্রশস্ত। আবু যারার ছেলে সম্বন্ধে কী বললো! সে তো সোনায় সোহাগা। হালকা-পাতলা আকর্ষণীয় দেহের অধিকারী। তার শোয়ার স্থানটি তরবারীর ন্যায় সরু। তার কোনো অলসতা নেই। ছাগলের একটি বাহুই তার জন্য যথেষ্ট। আবু যারআর কন্যা সম্পর্কে কি বলবো! যে পিতা-মাতার একান্ত অনুগতা। হৃষ্টপুষ্ট। সে ছিলো সতীনের জ্বালা। তার শরীরের গঠন দেখে যে কোন মহিলা ঈর্ষান্বিত হবে। আবু যারার দাসীর কথা কি বলবো! সে কখনোই আমাদের ঘরের কথা বাইরে প্রকাশ করতো না। খাদ্য-দ্রব্য অপচয় বা বিনষ্ট করতো না। বাড়ী-ঘর সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতো। এমনিভাবে আনন্দের সাথে দিনাতিপাত করতেছিলাম। একদিন সকালে আবু যারা ঘর থেকে বের হলো। তখন দুধের পাত্রগুলো (মাখন তৈরীর জন্য) নাড়াচাড়া করা হচ্ছিল। পথিমধ্যে জনৈকা মহিলার সাথে সাক্ষাত হলো। সে উক্ত মহিলার প্রতি আসক্ত হলো। আমাকে তালাক দিলো এবং তাকে বিবাহ করলো। অত:পর আমি একজন কুলীন ও সরদার ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। তিনি একজন অশ্বারোহী সৈনিক। তিনিও আমাকে অনেক সুখ-স্বাচ্ছন্দ দিয়েছেন। উট, গরু, ছাগল, ইত্যাদি এক জোড়া করে দিয়েছেন। আবার আমাকে এটাও বলে দিয়েছেন যে, হে উম্মে যারা! তুমি নিজে খাও, পান কর এবং তোমার পিত্রালয়েও পাঠাতে পার। তবে উনার সমস্ত সুখ শান্তিও যদি একত্র করা হয় তবুও আবু যারার ক্ষুদ্র একটি পেয়ালার সমান হবে না।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত ছিদ্দিক্বা আলাইহাস সালাম তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ওয়াকিয়া (ঘটনা) শুনার পর আমাকে বললেন, হে ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম! আমি আপনার জন্য আবু যারা থেকে লক্ষ কোটি গুণ শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। নাসায়ী শরীফ উনার বর্ণনায় ইহাও এসেছে- তবে আবু যারা তাকে ছেড়ে দিয়েছে। আর আমি তার থেকে লক্ষ কোটি গুণ শ্রেষ্ঠ ও উত্তম হওয়ার কারণে আমি তা করবো না।

উল্লেখ্য যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তো অবশ্যই কারো মত নন। তিনি সৃষ্টির মাঝে একক। উনার সাথে কারো তুলনা হয় না। তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-

اِنّـِىْ لَسْتُ كَاَحَدِكُمْ

অর্থ: “আমি তোমাদের কারো মত নই।”

অপর বর্ণনায় এসেছে-

اِنّـِىْ لَسْتُ كَهَيْئَتِكُمْ

অর্থ: “আমি তোমাদের কারো মত নই।”

আরো বর্ণিত আছে-

ايكم مثلى

অর্থ: “তোমাদের মধ্যে কে আছে আমার মত।” (বুখারী শরীফ)

নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রত্যেক বাণী মুবারকের লক্ষ-কোটি হিকমত আছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে যে, যে ব্যক্তি তার আহলিয়া বা স্ত্রীর কাছে উত্তম সে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের কাছে উত্তম।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

خيركم خيركم لاهله وانا خيركم لاهلى

অর্থ: “তোমাদের মধ্যে তারা উত্তম যারা তাদের আহলিয়া বা স্ত্রীর কাছে উত্তম। আমি আমার আহলিয়া অর্থাৎ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের কাছে উত্তম।” সুবহানাল্লাহ! (পবিত্র তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাযাহ শরীফ, ইবনে হিব্বান শরীফ, বাজ্জার শরীফ)

কাজেই প্রত্যেকেরই উচিত আহলিয়া বা স্ত্রীর হক্বসমূহ যথাযথভাবে আদায় করতঃ মহান আল্লাহ পাক উনার এবং উনার হাবীব, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের প্রিয়ভাজন হওয়া। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক্ব দান করুন। আমীন।

Views All Time
1
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে