সামরিক সারঞ্জাম তৈরি ও ব্যবহারে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান!


মুসলমানগণ বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়গুলোর মত সামরিক বিজ্ঞানেও প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। যদিও বর্তমানে ষষ্ঠ হিজরী শতকের আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে তেমন উল্লেখজনক কোন বই পাওয়া যায় না। তবে ষষ্ঠ থেকে পরবর্তী ২০০ বছরের ভিতরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রন্থ পাওয়া যায়। সম্ভবত ক্রুসেডের কারনেই মুসলিম সামরিক বিশেষজ্ঞরা এদিকে মনোযোগ দেন।
সামরিক বিষয়ে লেখা বই গুলোকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। প্রথমটি ফুরুসিয়া যা ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট। দ্বিতীয়টি ধনুরবিদ্যা এবং তৃতীয়টি সামরিক সংগঠন ও অস্ত্রসস্ত্র বিষয়ক। এই তিন বিষয়ের ৫০টির মত বই এখনো টিকে আছে। সবচেয়ে বিখ্যাত বই হল সুপরিচিত মুসলিম বীর নাযম আল- দীন আইয়ুব আল আহদাব হাসান আল রাম্মাহ (ইন্তিকাল হিজরী ৬৯৪, ১২৯৫ ঈসায়ী) উনার রচিত কিতাব “আল ফুরুসিয়া বিরাসসম আল জিহাদ”। সেই সময়ে মুসলমানদের সংগঠিত অশ্বারোহী সৈন্যদল, অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় ট্রেনিং সবই ছিল। এজন্যই তারা সারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
মুসলমানদের ব্যবহৃত কিছু সামরিক অস্ত্রের বর্ণনা:
নিক্ষেপ যন্ত্র:
সাধারন ভাষায় যাকে গুলতি বলা হয় সেই রকম যন্ত্রই ক্লাসিকাল সময়ে মিসাইলের মত কাজ করত। ইস্তাম্বুলের তোপকাপি সারাই জাদুঘরে সংরক্ষিত হিজরী ৮ম (চতুর্দশ ঈসায়ী) শতাব্দীর কিছু পা-ুলিপি থেকে বোঝা যায় সেইসময়ে মিসাইল নিক্ষেপের কলাকৌশল কি রকম ছিল। দুটি কাঠের টাওয়ার এর উপর ভর দিয়ে দাড়িয়ে থাকত অক্ষদ-। এর সাথে সংযুক্ত একটি কাঠের মাস্তুল এইরকম হচ্ছে একটি যন্ত্রের গঠন। যন্ত্রের ছোটবাহুটার সাথে বেশ কয়েক গোছা রশি আটকানো থাকত, কখনও রশির বদলে শক্ত কাঠ। এরকম আরও কিছু নমুনার বিবরন বেশকিছু সংরক্ষিত পা-ুলিপি থেকে পাওয়া যায়।
রকেট:
রকেটের কাজ ছিল আগুনে বস্তু অর্থাৎ গোলা নিয়ে উড়ে যাওয়া। বহুল ব্যবহৃত রকেটগুলো অনেকটা তীরের মত ছিল। এটি আগুনে বোমা ব্যবহার করত। মাহীসুরের টিপু সুলতান সার্থকভাবে হিজরী ১১৯৪ (১৭৮০ ঈসায়ী) সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। তার রকেট অনেক উন্নত ছিল। তিনই ধাতব সিলিন্ডার এর রকেট ব্যবহার করেন। এছাড়াও মুসলিমদের ব্যবহ্রত বিভিন্ন ধরনের রকেট এর নাম শোনা যায়। যেমন: তাইয়ার, আল মজনু ইত্যাদি।
টর্পেডো:
পানিতে চলাচল করতে পারে এমন টর্পেডো এর নকশা আল রাম্মাহ উনার গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়। লৌহপাতের ভিতর বারুদ পুরে দেয়া হত। রকেট এর সাহায্য নিয়ে এটি পানিতে ধাবমান হত। তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যে টর্পেডো অবশ্যই অনেক বড় এক যুদ্ধাস্ত্র ছিল।
সোরা বা যবক্ষার:
সোরা বা যবক্ষার প্রকৃতপক্ষে পটাসিয়াম নাইট্রেট। হিজরী ৮০০ (১৫০০ ঈসায়ী) সালের পর থেকে এটি মুসলিম বিশ্বে পরিচিত হয়ে আসছে। অথচ ব্রিটিশরা এর সাথে পরিচিত আরও ২০০ বছর পর থেকে। সুতরাং মুসলিমরাই এটি আবিষ্কারের দাবি রাখে। আবার বারুদ শব্দটা আরবী থেকেই প্রাপ্ত। পটাশিয়াম নাইট্রেট পরিশুদ্ধকরন প্রথম বর্ণনা করেন ইবনে বাখতাওয়াহ হিজরী ৪২০ (১০২৯ ঈসায়ী) সালে উনার আল মুকাদ্দিমাত নামক বইতে। এছাড়া পরিপূর্ণভাবে হাসান আল রাম্মাহ উনার বিখ্যাত আল ফুরুসিয়া আল মানাসিব ওয়া হারবিয়্যাহ বইতে। সামরিক কাজে এই বারুদ ব্যবহার করা হত।
গ্রেনেড:
আগ্নেয় পদার্থ ভর্তি পাত্রের আকার ছোট থেকে বড় যেকোনো তা হতে পারে। মূলত সাধারন আকারের আগ্নেয় ভর্তি পাত্রকে কারাজ্ব (গ্রেনেড) বলা হত। কাঁচ বা কাদা দিয়ে এটি তৈরী হত। কারাজ্ব এর সবচেয়ে বড়টির নাম ক্বিদর। নিক্ষেপন যন্ত্রের সাহায্যে এটি নিক্ষেপ করা হত। ৬৬৮ থেকে ৬৭৮ হিজরী (ঈসায়ী ১২৭০-৮০) সালের ভিতরে লিখিত সামরিক গ্রন্থ হাসান আল রাম্মাহ এর আল ফুরুসিয়া আল মানাসিব ওয়া হারবিয়্যাহ বই থেকে এসবের বর্ণনা পাওয়া যায়।
বিস্ফোরক পদার্থ:
বর্তমানে বিস্ফোরক পদার্থ তৈরিতে যে যে উপদান ব্যবহৃত হয় হাসান আল রাম্মাহ তার ঠিক কাছাকাছি মিশ্রনের বর্ণনা তার বিখ্যাত ‘আল ফুরুসিয়া আল মানাসিব ওয়া হারবিয়্যাহ’ বইতে করে গেছেন। ৭৪% সল্টপিটার, ১০% সালফার ,১৫% কার্বন। তিনি আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির ফরমুলাও বর্ণনা করেন। তিনি আর বলেন এগুলর অনেক কিছুই তার বাবা দাদারাও জানতেন। এগুলো ৬ষ্ঠ হিজরী (১২ ঈসায়ী) শতকের কথা। ৮ম হিজরী (১৪ ঈসায়ী) শতকের আগ পর্যন্ত চীন কিংবা ইঊরোপ এগুলোর সম্পরকে কিছুই জানত না। মধ্যযুগে ক্রুসেডের সময়ে যে মুসলমানরা বিস্ফোরক দ্রবের ব্যবহার করত তার বর্ণনাও পাওয়া যায়।
কামান:
বিভিন্ন তথ্য প্রমান থেকে পাওয়া যায়, মামলুক সেনাবাহিনী মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত হাল্কা কামান ব্যবহার করেন ৬৫৬ হিজরী (১২৫৮ ঈসায়ী) সালে। আর পাশ্চ্যাতে কামান ব্যবহার শুরু হয় হিজরী ৭৪৬ (১৩৪৬ ঈসায়ী) সালে ক্রেসির যুদ্ধে। ততকালিন সময়ে কামানের ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারন সাফল্য বয়ে আনত। ইতিহাসবিদ , বিশ্বকোষ প্রনেতা শিহাবুদ্দিন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন ফাদলুল্লাহ আল উমারি (৭০০-৭৪৯ হিজরী; ১৩০১-১৩৯৪ ঈসায়ী) মামলুক সাম্রাজ্যের একজন উচ্চপদস্থ ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে অন্যতম আল-তারিফ বিল মুস্তালাহ আল শরিফ। এই বইতে জনপ্রিয় ছয় প্রকারের নিক্ষেপক যন্ত্রের বর্ণনা করেছেন একটি আলাদা অধ্যায়ে। স্পেনে অনুষ্ঠিত ৭৪০-৭৪৩ হিজরী (১৩৪০-১৩৪৩ ঈসায়ী) সনের প্রতিটি যুদ্ধে কামানের ব্যবহার হয়ে ছিল। আবার ৭ম হিজরী শতকে কুবলাই খানের আমল থেকেই মুসলমানেরা ক্ষেপণাস্ত্র বানান। চীনা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী আলাদ্দিন এবং ইসমাইল হিজরী ৬৬৯-৬৭১ (ঈসায়ী ১২৭০-১২৭২) সালের ভিতরে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেন।
আগ্নেয়াস্ত্র:
ফাতহুল্লাহ সিরাজি মুঘল আমলেই মেশিন গান তৈরি করেন। এখানে বারুদ ব্যবহৃত হত। আবার আব্বাসিয় সেনাদলে আগ্নেয়াস্ত্র বিশেষজ্ঞ সৈন্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এদের বলা হত নাফফাতুন, এরা অগ্নিনিরোধক কাপড় পরিধান করত। আবার মামলুক সৈন্যগণ ১০-১১ হিজরী (১৬-১৭ ঈসায়ী) শতকের দিকে আবুস নামক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতেন। এটা বেশ উন্নত মানের ছিল।
অগ্নিনিরোধক কাপড় ও অন্যান্য:
মিশরিয়রা ৬৫৮ হিজরী (১২৬০ ঈসায়ী) সালে আইন জালুত এর যুদ্ধে প্রথম অগ্নিনিরোধক কাপড় ব্যবহার করেন। এছারাও দুর্গ নির্মাণ , তলোয়ার নির্মাণ, তীর ধনুক নির্মাণে মুসলমানগনেরা অগ্রগন্য এবং অসাধারন পারদর্শিতা দেখান।
নৌবাহিনী:
যেকোন সাম্রাজ্যে শক্তিশালী বুনিয়াদ রচনা করে কার্যকর নৌ-বাহিনী। মুসলমান শাসকবর্গ তাদের অধিকৃত অঞ্চল বিস্তারের নিমিত্তে নিজস্ব নৌ-বাহিনী গঠনসহ এর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণে ব্রতী হন। ইতিহাস হতে পাওয়া যায়, উত্তর আফ্রিকা এবং স্পেন বিজয়ের চল্লিশ বছর পর মুসলিম নৌবাহিনী পুরো ভূমধ্যসাগরে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপনে সচেষ্ট হন এবং এই গৌরব পরবর্তী দুইশত বছর পর পর্যন্ত অক্ষুন্ন থাকে। ২১১ হিজরী (ঈসায়ী ৮২৬) সালে উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হয়ে সিসিলি অধিক্রমণ করেন এবং ইতালি ও দক্ষিণ ফ্রান্সের উপকূলে প্রচেষ্টা চালান।
‘শিনি’ নামক ১৪৩ টি দাঁড় বিশিষ্ট বিশালাকার যুদ্ধ জাহাজের সন্ধান পাওয়া যায়, ৩৪৬ হিজরী (৯৫৭ ঈসায়ী) সালের দিকে ফাতেমীয় খলিফ মু’ইজ্জলি দীনিল্লাহ মিসরের মাক্বসের ডকইর্য়াড থেকে ৬০০টি শিনি যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ করেন।
‘বুত্তাসা’ নামে আরেকটি যুদ্ধজাহাজের নাম পাওয়া যায়। এই ছিল পালতোলা। এটি ৪০টি পাল, ১৪০০-১৫০০ অস্ত্রধারী নাবিক নিযুক্ত থাকতেন। এই জাহাজের অগ্রভাগ হত সূচালো, কাকের পায়ের মত।
এছাড়াও ছিল কার্গো বহনের জন্য জাহাজ শালান্দি এবং রসদ বহনকারী জাহাজ কুরকুরা। বড় জাহাজের পাশাপাশি নৌবাহিনীতে অন্যান্য ছোট ছোট জাহাজও অর্ন্তভূক্ত থাকত। রসদবহন, শত্রুপক্ষের অবস্থান জানার জন্য, বড় জাহাজ ও তীরের যোগাযোগ প্রভৃতি কাজে ছোট জাহাজ ব্যবহৃত হত। এদের বেশীর ভাগীয় হত দাঁড়টানা। এছাড়া শুব্বাবা নামে পালতোলা জাহাজেরও সন্ধান পাওয়া যায়। তখনকার সময়ে জাহাজগুলো আগ্নেয় গোলাবারুদের রসদ, কামান কিংবা নিক্ষেপক ব্যবহার করত। প্রথমে এসব নিক্ষেপকের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের শক্তি কমিয়ে তারপর সরাসরি আক্রমণ সূচিত হত। আল-রাম্মাহ উনার রচিত গ্রন্হে এরকম এক যুদ্ধ সাজে সজ্জিত নৌবহরের বিবরণ পাওয়া যায়।

Views All Time
2
Views Today
3
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে