সুন্নত মুবারক পালনের গুরুত্ব ও ফযীলত !


একটি সুন্নত পালনে যদি ১০০ শহীদের সওয়াব পাওয়া যায়, তাহলে সুন্নত উনার গুরুত্ব, মর্যাদা, ফযীলত কতটুকু নিচের ওয়াকিয়াটি পড়ে আমাদের ফিকির করা উচিত!

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজা রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা উনার মামাতো ভাই। তিনি ছিলেন জন্মান্ধ।উনার সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফে প্রায় ১৬ টি আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে।

ইবনে উম্মে মাকতূম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার প্রতি হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিশেষ মর্যাদা প্রদানের প্রকৃষ্ট উদাঃ এটাই যে, নিজের অনুপস্থিতির সময় দশ বারেরও বেশি উনাকে নিজের প্রতিনিধি বানিয়ে মদিনা শরীফে গিয়েছিলেন।

বদর যুদ্ধের পর আল্লাহপাক মুজাহিদদের উঁচু মর্যাদা সম্পর্কে কিছু আয়াত শরীফ নাযিল করলেন। সেই আয়াত শরীফগুলোতে জিহাদে অংশ না নেওয়া ব্যক্তিদের উপর অংশগ্রহণকারীদের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ননা দান করা হয়।

এ বিষয়টি হযরত ইবনে মাকতূম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে এবং জিহাদ এর ফযীলত থেকে মাহরুম থাকা উনার জন্য খুব বেদনাদায়ক হয়ে উঠে। তাই তিনি রাসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট ছুটে গিয়ে বললেন,
“ইয়া রাসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি প্রতিবন্ধী না হলে তো অবশ্যই জিহাদ করতাম, জিহাদ থেকে কখনওই দূরে থাকতাম না”।

এরপর তিনি কাতর কণ্ঠে, চোখের পানি ফেলে দোয়া করতে থাকলেন,
“হে আল্লাহ পাক আমার অপারগতা ক্ষমা করে কোন আয়াত শরীফ নাযিল করুন ,হে আল্লাহপাক আমার অপারগতা ক্ষমা করে কোন বিধান দান করুন।”

সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ পাক উনার দোয়া কবুল করে নিলেন। সাহাবী হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তিনি বর্ণনা করেন,
আমি নবীজি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পাশে বসে ছিলাম হঠাৎ উনাকে সাক্বীনা ঢেকে নিলেন। আমার উরুতে হঠাৎ উনার উরু মুবারকের চাপ পড়ল আর তাতে আমার মনে হল জীবনে উনার উরু মুবারকের চেয়ে ভারী আর কোনো চাপ আমার উরুতে পড়েনি। যখন তিনি ওহী মুবারকের ত্রীবভার ও চাপ মুক্ত হলেন। আমাকে বললেন, হে যায়েদ! লিখো… আমি তখনই লিখে নিলাম,
‘মুমিনদের মধ্যে থেকে যারা আল্লাহপাক উনার রাস্তায় জিহাদ করে আর যারা জিহাদ না করে বসে থাকে তারা সমান হতে পারে না’।
(সূরা নিসা শরীফ-৯৫)

হযরত ইবনে উম্মে মাকতূম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি দাঁড়িয়ে বললেন,
‘ইয়া রাসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! যারা অপারগতার কারণে জিহাদে অংশ নিতে পারে না, তাদের কি হবে? তারাও কি জিহাদ না করে বসে থাকা মুমিন হিসেবে গণ্য হবে?

উনার কথা শেষ হতে না হতেই নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপর ওহী মুবারকের আভাস পাওয়া গেল, উনার উরু মুবারকের চাপ আমার উরুর উপর পড়তেই ১ম বারের মতো সেই ভয়াবহ চাপ ও ভার অনুভব করলাম।
এই ভার ও চাপ কেটে গেলে তিনি আমাকে বললেন,
‘হে যায়েদ! পড়ে শোনাও যেটা লিখেছ’।
আমি শুরু করলাম পড়া,
‘মুমিনদের মধ্য থেকে যারা জিহাদ না করে বসে থাকে তারা’
তিনি বললেন এখানে যোগ করে দাও,
‘যারা অপারগ তারা ছাড়া’।
যারা অক্ষমতার কারণে জিহাদে অংশ নিতে পারে না তাদের যেন ব্যতিক্রম ধরা হয়।

আল্লাহপাক ইবনে উম্মে মাকতূম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং উনার মতো অক্ষমদের জিহাদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সত্ত্বেও তিনি জিহাদ থেকে বিরত থাকা লোকদের দলভুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানালেন।সেইদিন থেকে তিনি ব্যাকুল হয়ে থাকলেন যেন আর একটি জিহাদ উনার থেকে ছুটতে না পারে । তিনি যুদ্ধের ময়দান গুলিতে নিজের করণীয় ঠিক করে নিলেন।

তিনি সকলকে বলতেন, আমাকে তোমরা উভয় পক্ষের মাঝে দাঁড় করে দিও আমি মুসলিম বাহিনীর পতাকা বহন করব, আমি ইনশাআল্লাহ ভালোভাবে পতাকা হিফাযত করতে পারব। কারণ আমিতো অন্ধ কিছুতেই পালিয়ে যেতে পারবো না!

হিজরী চতুর্থদশ বর্ষে খলিফা হযরত উমর রদিয়াল্লাহু আনহু তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন, উনার আহব্বানে মুসলিম বাহিনী দলে দলে সাড়া দিয়ে মদিনা শরীফে সমবেত হতে থাকলো। সমবেত সেই মুজাহিদদের একজন ছিলেন দৃষ্টিশক্তিহীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। হযরত ওমর রদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু তিনি সেনাপতি নিযুক্ত করলেন এবং বিশেষ উপদেশ ও নির্দেশনা দিয়ে বিদায় জানালেন। এই বাহিনী যখন কাদেসিয়া পৌঁছাল তখন দেখা গেল হযরত আব্দুল ইবনে মাকতুম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু লৌহবর্ম পড়ে যুদ্ধের সাজে একেবারে প্রস্তুত হয়ে এসেছেন।

মুসলিম বাহিনীর পতাকা বহন এবং জীবন দিয়ে হলেও তা সমুন্নত রাখার দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে পেশ করলেন।বিশাল পারস্য বাহিনী ও ইসলামী সাম্রাজ্যের পতাকাবাহী মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি হল যুদ্ধের ইতিহাসে নজিরবিহীন ভয়াবহ লড়ায় মধ্যে দুই দিন পেরিয়ে গেল ।

জয়-পরাজয়ের কোন মীমাংসা ছাড়াই যুদ্ধ তৃতীয় দিন গড়ালো, অবশেষে ৩য় দিন নির্ধারিত হল যুদ্ধের ফলাফল মুসলিম বাহিনীর বিশাল বিজয়ের মাধ্যমে।পৃথিবীর বিশাল পরাশক্তি পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটলো। এই মহা বিজয়ের অর্জনের জন্য মূল্য হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছিল শত শত শহীদের অমূল্য জীবন। তাদের মাঝে ছিল হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জীবনও।

হযরত সাহাবায়ে কিরামগণ শহীদ হওয়ার তামান্নায় জিহাদ করেছেন, যাদের উপর জিহাদ ফরয ছিল না, উনারাও জিহাদ থেকে বিরত থাকেন নি।বর্তমান আমাদের অবস্থা এতটাই করুন  জিহাদ তো দূর , সুন্নত পালনেও আমাদের ভয় ।অথচ মহব্বতের সহিত খুব ছোট (ফযীলতের দিক থেকে অনেক বড়) ও সহজ ১ টি সুন্নত পালন করলেও একশত শহীদের সওয়ার আমলনামায় লিখা হয়। তাহলে সুন্নত পালনের গুরুত্ব কতটুকু ? তা মূলতঃ আমাদের ফিকিরেরও বাইরে।

আল্লাহপাক আমাদেরকে মুহব্বতের সহিত প্রতিটি সুন্নত মুবারক পালন করার তৌফিক দান করুন।

আমীন

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে