সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দু:খিত। ব্লগের উন্নয়নের কাজ চলছে। অতিশীঘ্রই আমরা নতুনভাবে ব্লগকে উপস্থাপন করবো। ইনশাআল্লাহ।

হযরত মহিলা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্না-উনাদের ফযীলত।(সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ উনার মাহফিল)


৫. হযরত উম্মে হাকীম বিনতুল হারিছ বিন হিশাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা

 

কুরাইশ গোত্রের বনু মাখযুম শাখার মহিলা, মাতা হযরত ফাতিমা বিনতুল ওয়ালীদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা, হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার বোন ।

 

উহুদের জিহাদে কাফির অবস্থায় কুরায়শদের পক্ষে অংশ গ্রহণ করেন । শুধু তাই নয়, ইসলামের শুরু থেকে প্রায় বিশ বছর উনার গোটা পরিবার নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসলামের বিরোধিতা করেছেন । মক্কা শরীফ বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন । এইদিন তিনি, উনার পিতা, মাতা ও স্বামী — সকলই একযোগে ইসলাম গ্রহণ করেন ।

 

হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-উনার পিতা হযরত হারিছ বিন হিশাম ইবনুল মুগীরা আল-মাখযুমী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, নরাধম আবু জেহেল-এর ভাই । মক্কা শরীফ বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন । তিনি একজন ভদ্র ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন । হুনায়নের জিহাদে প্রাপ্ত গণীমত থেকে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে একশত উট দান করেন । ইসলাম গ্রহণের পর তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানে পরিণত হন। পরবর্তীকালে একজন মুজাহিদ হিসাবে সিরিয়া যান এবং সেখানে তাউন রোগে আক্রান্ত হয়ে শাহাদত লাভ করেন ।

 

হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-উনার স্বামী প্রখ্যাত কুরাইশ নেতা হযরত ইকরিমা বিন আবী জাহল রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু । যখন হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ইসলাম গ্রহণ করেন, সে সময় হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইয়ামানে পলায়ন করেন । হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনার স্বামীর জন্য হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। তিনি উনার স্বামীর সন্ধান করার জন্যও অনুমতি প্রার্থনা করেন । হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অনুমতি দান করেন । অত:পর তিনি হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনাকে ইয়ামান থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। অত:পর হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন । ইসলাম গ্রহণের পর তিনি বলেন : হে আল্লাহ পাক-উনার রসুল ! আল্লাহ পাক-উনার কসম ! আল্লাহ পাক-উনার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যত কিছু আমি ব্যয় করেছি, তার দ্বিগুণ আমি আল্লাহ পাক-উনার পথে ব্যয় করব এবং আল্লাহ পাক-উনার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যত যুদ্ধ আমি করেছি, তার দ্বিগুণ জিহাদ আমি আল্লাহ পাক-উনার পথে করব (উসুদুল গাবা). সেই দিন থেকে তিনি আল্লাহ পাক-উনার যমীনে আল্লাহ পাক-উনার দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী কাফেলায় শরীক হন এবং ইয়ারমুকের জিহাদে শাহাদত বরণ করে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার সাথে কৃত অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ করেন । সুবহানাল্লাহ !

 

হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হিজরী ১৩ সনে ইয়ারমুকের জিহাদে শাহাদত বরণ করেন। এই জিহাদে তিনি সত্তরেরও অধিক তীর, বর্শা ও তরবারির আঘাত প্রাপ্ত হন । ফলে তিনি শাহাদত বরণ করেন । হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাও স্বামীর সাথে রোমানদের সাথে জিহাদের উদ্দেশ্যে সিরিয়া যান । এই জিহাদে কুরাইশ রমণীরা তরবারি চালনায় পুরুষ যোদ্ধাদেরকেও হার মানায় । ্এই রমণীদের মধ্যে হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাও ছিলেন একজন । ইয়ারমুকের জিহাদে তিনি স্বামীকে হারান।

 

স্বামীর শাহাদতের পর চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করে হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-উনার পুণ:র্বিবাহ হয় হযরত খালিদ বিন সা‘ঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার সাথে । যখন ইয়ারমুকের জিহাদের পর মুসলমানগণ দমিশকের সন্নিকটে মারাজাছ ছুফ্ফার-এর জিহাদে লিপ্ত, এই সময়ে উনাদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় । বিবাহ শেষে হযরত খালিদ বিন সা‘ঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন বাসর যাপন করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন : যদি শত্র“ বাহিনীকে আল্লাহ পাক পরাস্ত করা পর্যন্ত আপনি অপেক্ষা করতেন, তবে উত্তম হতো । তখন হযরত খালিদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন : আমার মন বলছে, আমি এই জিহাদে শহীদ হব । তখন হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বললেন: তা হলে আপনার আকাঙ্খা অনুযায়ী বাসর যাপন করুন । অত:পর আছ-ছুফ্ফার এলাকার অন্তর্গত একটি পুলের নিকট একটি তাঁবুতে উনাদের বাসর রাত্র উদযাপিত হয় । অত:পর যে পুলের নিকটে উনাদের বাসর উদযাপিত হয় সেই পুলের নাম হয় “ক্বানতারা উম্মে হাকীম (উম্মে হাকীমের পুল)”. এখানেই ভোর বেলা উনাদের বিবাহের ওলীমা অনুষ্ঠানের খাওয়া দাওয়া স¤পন্ন করা হয় । খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর পরই রুমীয় শত্র“ সৈন্য মুসলমানদেরকে আক্রমণ করে বসে । উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয় । অনতিবিলম্বে হযরত খালিদ বিন সা‘ঈদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং বীর বিক্রমে জিহাদ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন । জিহাদে মুসলমানগণ বিজয় লাভ করেন । হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তখনও নববধুর সাজে । হাতে মেহেদীর রং, দেহে সুগন্ধি । যে তাঁবুতে তিনি উনার স্বামীর সাথে বাসর রাত উদযাপন করেছেন, তার একটি খুঁটি উঠিয়ে হাতে তুলে নেন । সেই তাঁবুর পাশেই রোমাণ সৈনিকদের সাথে জিহাদে লিপ্ত হন এবং সেই খুঁটি দিয়ে পিটিয়ে সেদিন সাত জন রোমান সৈন্যকে তিনি হত্যা করেন। সুবহানাল্লাহ। (উসুদুল গাবা, ইছাবা)।

 

হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা আবার বিধবা হয়ে মদীনা শরীফে ফিরে আসেন । অত:পর খলীফা হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সাথে উনার বিবাহ হয় এবং এই সংসারে উনার রেহেম শরীফে হযরত ফাতিমা বিনতে উমর রহমতুল্লাহি আলাইহা-উনার বিলাদত শরীফ হয় । হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার ভাই হযরত যায়দ ইবনুল খাত্তাব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার পুত্রের সাথে হযরত ফাতিমা বিনতু উমর ফারুক রহমতুল্লাহি আলাইহা-উনার বিবাহ হয় (আত-তাবারী)।

 

হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-উনার বিছাল শরীফের সুনির্দিষ্ট তারিখ জানা না গেলেও বিভিন্ন ঘটনার আলোকে বুঝা যায়, তিনি উনার স্বামী হযরত উমর ফারুক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার জীবদ্দশায় উনারই খিলাফতকালে মদীনা শরীফে বিছাল শরীফ লাভ করেন । কেউ কেউ উনার বিছাল শরীফের তারিখ হিজরী ১৪ সন বলেছেন । (উসুদুল গাবা, ইছাবা, তাবারী, সীরাত গ্রন্থাবলী)

 

হযরত উম্মে হাকীম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা-উনার জীবনী মুবারকে অতুলনীয় সাহসিকতা ও আল্লাহ পাক-উনার উপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় । জিহাদের ময়দানে নিজ স্বামী হযরত ইকরিমা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনাকে হারিয়েও তিনি সাহস হারা হন নি । তিনি জিহাদের ময়দানেই পূণরায় বিবাহিত হলেন এবং বিবাহ উপলক্ষে ওলীমা শেষে স্বয়ং জিহাদে অংশ গ্রহণ করে সাত জন রুমীয় সৈন্যকে তাঁবুর খুঁটি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন । সুবহানাল্লাহ !

 

পর্যালোচনা

 

মহিলা ছাহাবীদের পর্দ্দা পালন : মহিলা ছাহাবী সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনাবলী এবং উনাদের জীবনী মুবারক আলোচনায় একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, হিজরী ৫ম সনে জিলক্বদ মাসে পর্দা পালন ফরয করা হয় । এ সময়ের মধ্যে বড় বড় জিহাদ সমূহ যেমন বদর, উহুদ ও খন্দক সমাপ্ত হয় । এসব জিহাদে অনেক মহিলা ছাহাবী অংশ গ্রহণ করেছেন । সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উপস্থিতিতে এবং উনার তত্ত্বাবধানে থেকে মহিলা ছাহাবীগণ এ সব জিহাদে আহত ছাহাবীদের জন্য পানি সরবরাহ এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন, সরাসরি পুরুষদের ন্যায় অস্ত্র চালনা করেন নি। তবে ব্যতিক্রম হিসাবে কিছু কিছু মহিলা ছাহাবী অস্ত্র শস্ত্র ও ঢাল তলোয়ার সহ জিহাদে অবতীর্ণ হয়েছেন, কঠিন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং হুয়ূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুমতিতে। ৫ম হিজরী সনের জিলক্বদ মাসে পর্দ্দার নির্দেশ জারী হওয়ার পর মহিলাগণ জিহাদের ময়দানে এবং অন্যান্য সময় সর্বাবস্থায় শরঈ পর্দ্দা পালন করেছেন । অনেক হাদীছ শরীফ থেকে এর প্রমাণ মিলে । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়,একটি হাদীছ শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে যে, একবার রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার উপস্থিতিতে উম্মুল মু’মিনীন হযরত উম্মে সালামা আলাইহাস সালাম এবং উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মুনা আলাইহাস সালাম উনারা পরস্পর কথাবার্তা বলছিলেন, এমন সময় অন্ধ ছাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট আসার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। হুয়ূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উম্মুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেন । উনারা বলেন যে, এই ছাহাবী তো অন্ধ। তখন হুয়ূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেন : আপনারা তো অন্ধ নন । তখন উনারা সেখান থেকে সরে পর্দ্দার অন্তরালে চলে যান ।

 

মহিলা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহ্ন্নুা উনাদের যেসব সাধারণ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে এবং কতিপয় মহিলা ছাহাবীর সংক্ষিপ্ত জীবনী মুবারক আলোচনা করা হয়েছে, তা থেকে স্পষ্টত: প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে মহিলা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্না উনাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। উনারা জিহাদে অংশ গ্রহণ করেছেন, কিচু কিছু ক্ষেতে পুরুষদের ন্যায় বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, পুরুষদের উৎসাহ প্রদান করেছেন । এতদ্ব্যতীত উনারা পারিবারিক খিদমত, জ্ঞান চর্চা ও অন্যান্য বিষয়ে মহিলাদের আদর্শ হিসাবে বিভিন্ন বিষয়ে নজির স্থাপন করেছেন এবং ইবাদত-বন্দেগীতে পুরুষ ছাহাবীদের ন্যায় রিয়াযত মুশাক্কাতও করেছেন। উনারা দীন ইসলামের শুরুতে ইহার ভিত্তি মজবুত করেছেন এবং পরবর্তীতে সমস্ত উম্মতে হাবীবি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাদের শিক্ষাদানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন । উনাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান ছিল দ্বীন ইসলাম প্রচার । ইসলামের প্রারম্ভ কাল থেকে এই বিষয়ে মহিলা ছাহাবীদের উজ্জ্বল প্রচেষ্টা লক্ষ্মণীয় । হযরত উম্মে শুরাইক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা ছিলেন একজন মহিলা ছাহাবী যিনি মক্কা শরীফে ইসলামের শুরুতে গোপনে মহিলা ছাহাবীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। কুরাইশরা যখন সেই সংবাদ জানতে পারল উনাকে তারা মক্কা শরীফ থেকে বের করে দেয় (উসুদুল গাবা)। অত:পর মদীনা শরীফে উম্মুহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনাদের তা’লীমী হালকায় বহু মহিলা ছাহাবী প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন এবং উনারা দ্বীন ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন । তম্মধ্যে হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার নিকট প্রশিক্ষণ-প্রাপ্ত হযরত উমরা রহমতুল্লাহি আলাইহা, হযরত ছফিয়া বিনতে শায়বা রহমতুল্লাহি আলাইহা, হযরত আয়েশা বিনতে তাহলা রহমতুল্লাহি আলাইহা প্রমূখ মহিলা তাবেয়ীর নাম উল্লেখযোগ্য ।

 

এটা সর্বজন বিদিত যে, নবী-রসুল আলাইহিমুস সালামগণের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ । ছাহাবা ও ছাহাবিয়াগণের মধ্যে মর্যাদা হিসাবে স্তরভেদ থাকতে পারে। কিন্তু পরবর্তী যুগের কোন ব্যক্তিই তিনি যত বড় জ্ঞানীগুনী, সাধক, ওলী, দরবেশ হোন না কেন, কেউই উনাদের সম-মর্যাদা লাভ করতে পারবেন না । এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ এবং মুসলিম উ¤মাহর কোন দ্বিমত্ নেই । হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ, পুরুষ হোক, মহিলা হোক, সকলই সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার বরকতময় ছোহবতে ধন্য হয়ে উনার অনুসরণ-অনুকরণের মাধ্যমে আল্লাহ পাক-উনার এতটুকু সন্তুষ্টি হাছিল করেছেন যে, উনারা আল্লাহ পাক-উনার পক্ষ থেকে মাহ্ফুয এবং সর্ব প্রকার সমালোচনার উর্ধ্বে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের অনুসরনীয় ও অনুকরণীয় হয়েছেন। মূলত: যেহেতু উনাদের উপর স্বয়ং আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন, উনাদের অনুসরণ স্বয়ং আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং স্বয়ং আল্লাহ পাক-উনারই অনুসরণের শামিল হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। ছ্বুহানাল্লাহ !

 

বর্তমান যামানায় উম্মুল উমাম হযরত আম্মা হুযূর ক্বিবলা আলাইহাস সালাম হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম এবং মহিলা ছাহাবী উনাদের সুযোগ্য ক্বায়েম-মক্বাম এবং পূর্ণ মিছদাক। তিনি নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার সম্মানিত আওলাদ। আবার আওলাদে রসুল, মুজাদ্দিদে আ’যম আমাদের মামদুহ মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার সম্মানিত আহলিয়া। হযরত মুজাদ্দিদে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার জাহেরী ও বাত্বেনী ইলেমের ভান্ডার থেকে সার্বক্ষণিক রুহানী ফয়েজে ফয়েজাব হয়ে খাছ ও ’আম সমস্ত মহিলাদের মধ্যে তিনি দরস, তাদরিস, তা’লীম-তালক্বীন ও ফয়েজ তাওয়াজ্জুহ দিয়ে তাদেরকে ওলী-আল্লাহ হিসাবে ও আদর্শ নারী হিসাবে গড়ে তুলছেন। সুবহানাল্লাহ !

 

সারা পৃথিবীতে খালেছ পর্দ্দার মধ্যে রেখে মহিলাদের জন্য কোন আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই বললেনই চলে। আমাদের দেশের নামধারী মহিলা মাদ্রাসাগুলি পুরুষ শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত। তাছাড়া এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাছাউফ শিক্ষার কোন ব্যবস্থাই নেই । ফিক্বাহের ইলেমের শিক্ষা ব্যবস্থা পৃথিবীর কোন কোন স্থানে পাওয়া গেলেও মহিলা ছাহাবীদের আদর্শে খালেছ সুন্নতের অনুসরণে ফিক্বাহ ও তাছাওফ শিক্ষা ব্যবস্থা সম্বলিত কোন মহিলা মাদ্রাসার অস্তিত্ব আদৌ নেই। আমাদের দেশের তথাকথিত সুন্নী মাদ্রাসাগুলিও এখন বেপর্দ্দায় ভরে গেছে, স্কুল কলেজের ন্যায় ছাত্র-ছাত্রি, শিক্ষক শিক্ষিকা একত্র সমাবেশ করে বেপর্দ্দেগী ও বেহায়াপণায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। সৌদি আরবে মহিলাদের জন্য মহিলাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পৃথক মাদ্রাসা ব্যবস্থা রয়েছে সত্য, কিন্তু সেখানে কুরআন শরীফ, হাদীছ শরীফের পাশাপাশি শিক্ষা দেয়া হয় ছলফী ও কাট্টা ওহাবী আক্বীদা, যা ঈমান নষ্টের কারণ। আর সেখানে তাছাউফ শিক্ষার কোন ব্যবস্থাই নেই।

 

সারা পৃথিবীতে মহিলাদের জন্য মহিলা ছাহাবীদের অনুসরণে এবং সুন্নতের অনুসরণে খালেছ ফিক্বহী ও তাছাউফ সংশ্লিষ্ট রুহানী তা’লীমের খুব বেশী প্রয়োজন । মহিলাগণই হচ্ছেন উনাদের সন্তান-সন্ততিদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষক । নিজেরা বেপর্দ্দেগী ও শরীয়ত বিগহৃত কাজে লিপ্ত থাকার কারণে বর্তমান যামানায় মহিলাগণ উনাদের সন্তান-সন্ততিদেরকে সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে পারছেন না। সেইজন্য অধিকাংশ তথাকথিত ভদ্র-পরিবারের সন্তান-সন্ততিগণ সন্ত্রাসী ও আদব-বিবর্জিত সন্তান সন্ততিতে পরিণত হচ্ছে। এই বেপর্দ্দেগী বেহায়াই শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতে এখন ছেয়ে গেছে । কেউ হজ্জে গেলে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলে । ইন্দোনেশিয়ার পুরুষ মহিলাগণ অল্প বয়সেই হজ্জ করে থাকে । বোরকা পরে থাকে, কিন্তু চেহারা, হাত, পা খোলা থাকে । পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মহিলাগণ যারা হ্জ্জ করতে আসে, কেউ কেউ বোরকা পরিধান করলেও চেহারা খোলা রাখে। একমাত্র সওদী মেয়েরা দেখা যায় কাল বোরকা পরে এবং হাত পায়ে মোজা ব্যবহার করে থাকে । কিন্তু আমরা শুনেছি, তাদের পারিবারিক অঙ্গনে পর্দ্দা নেই, কেননা সেখানে টিভি, ভিসিআর, নাচ গান ইত্যাদিতে ভরপুর । তবে তাদের পারিবারিক পরিবেশে বাইরের লোক যেতে পারে না ।

 

সত্যিকার শরঈ পর্দ্দার বাস্তব নমুনা একমাত্র মুজাদ্দিদে আযম আমাদের হযরত মামদুহ মুর্শিদ ক্বিবলা আলাহিস সালাম উনার সম্মানিত আহলে বায়ত শরীফেই রয়েছে । উম্মুল উমাম সাইয়্যিদাতুনা হযরত আম্মা হুযূর ক্বিবলা আলাইহাস সালাম শরীয়ত সম্মত খালেছ পর্দ্দার মধ্যে একটি আদর্শ বালিকা মাদ্রাসা প্রত্যক্ষভাবে তত্ত্বাবধান করছেন, যা আদর্শ ও উচ্চ-শিক্ষিতা মহিলা মু’য়াল্লিমগণ দ্বারা পরিচালিত। তিনি সব মহিলা শিক্ষিকা ও ছাত্রিদেরকে ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাউফের শিক্ষায় শিক্ষিতা করে তুলছেন, তদুপরি বহিরাগত ’আম মহিলাদেরকেও নিয়মিতভাবে তা’লীম তালক্বীন ও তাছাওফের শিক্ষায় শিক্ষিতা করে তুলছেন। ছুবহানাল্লাহ ! উনার তা’লীমী হালক্বার একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক হচ্ছে খালেছ পর্দ্দা পালন । এখানে নাবালিগ ছোট শিশু বাচ্চারাও পর্দ্দা পালন করেন। পাঁচ বছর বয়সের অধিক কোন পুরুষ শিশু এখানে প্রবেশ নিষেধ । হজ্জে গেলেও যে একজন মহিলা চেহারা ঢেকে পর্দ্দার সাথে হজ্জ করতে পারে, সেই সব নিয়ম কানুনও এখানে শিক্ষাদান করা হয়। এখানে পর্দ্দা পালনের একটি ঘটনা সাইয়্যিদাতু নিসাঈ আহলিল জান্নাহ হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম উনার জীবনী মুবারক থেকে দেয়া যেতে পারে । এক হাদীছ শরীফে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন : একবার নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম পরিবেষ্টিত অবস্থায়) তিনি ইরশাদ মুবারক করেন : ما خير للنساء (মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম কাজ কী) ? হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন: এর উত্তরে আমরা যে কী বলব, তা আমাদের জানা ছিল না । অত:পর হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু ওয়া আলাইহিস সালাম তিনি হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম-উনার নিকট গমন করেন । এই প্রশ্ন উনাকে অবহিত করলে তিনি বলেন : আপনি গিয়ে বলবেন, মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম কাজ হচ্ছে, তারা কোন পুরুষকে দেখবে না এবং কোন পুরুষও তাদেরকে দেখবে না। অত:পর হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু ওয়া আলাইহিস সালাম তিনি ফিরে এসে নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনাকে এ বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি জিজ্ঞাসা করেন : কে আপনাকে ইহা শিক্ষা দিয়েছেন ? তিনি বললেন : হযরত ফাতিমাতুয যাহরা আলাইহাস সালাম । অত:পর নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন : إنها بضعة منى (নিশ্চয়ই তিনি আমার শরীর মুবারকের অংশ) । (হেলয়াতুল আওলিয়া).সঠিক পর্দ্দা সম্পর্কে হযরত যাহরা আলাইহাস সালাম যে অভিমত পেশ করেছেন, উহা ছিল উনার জীবনী মুবারকে শরঈ পর্দ্দা পালনের বাস্তব চিত্র, যা শুনে হুয়ূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশংসা করেছেন । এই সুমহান আদর্শই আমাদের পরম সম্মানিত, উম্মুল উমাম, হযরত আম্মা হুযূর ক্বিবলা আলাইহাস সালাম উনার তা’লীমী মজলিসে বাস্তবায়ন করছেন । সকল মহিলাদের জন্য উনার খিদমতে উপস্থিত হয়ে উনার পবিত্র তা’লীমে অংশ গ্রহণ করে ফায়দা হাছিল করা ফরয-ওয়াযিব । খালিক, মালিক, রব্ব মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে এর তৌফিক দান করুন।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে