হাজার বছর পার হলেও বিধর্মীর বিধর্মীয়ানা যায় না; কিন্তু মুসলমানের মুসলমানিত্ব যেতে, তাদের মনে হীনতা আনতে সময় লাগে না ১শ বছরও!


“বাঙালি (বিধর্মী) পুরুষ ইংরেজ রাজত্বের আগে একমাত্র মুসলমান নবাবের কর্মচারী হইলে মুসলমানী পোশাক পরিত, উহা অন্দরে লইয়া যাওয়া হইত না। বাহিরে বৈঠকখানার পাশে একটা ঘর থাকিত, সেখানে চোগা-চাপকান-ইজার ছাড়িয়া পুরুষেরা ধুতি পরিয়া ভিতরের বাড়িতে প্রবেশ করিত। তাহার প্রবেশদ্বারে গঙ্গাজল ও তুলসীপাতা থাকিত, মেøচ্ছ পোশাক পরিবার অশুচিতা হইতে শুদ্ধ হইবার জন্য পুরুষেরা গায়ে গঙ্গাজল ছিটাইয়া মাথায় একটা দুইটা তুলসীপাতা দিতো। আমি কলিকাতার বড়লোকের বাড়িতে সাহেবী পোশাক রাখিবারও এই ব্যবস্থা দেখিয়াছি।” (সূত্র: আত্মঘাতী বাঙালী, নীরদ সি চৌধুরী, মিত্র এন্ড ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৫০)
উপরোক্ত বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইংরেজ রাজত্বের আগে এই ভারতবর্ষ যখন মুসলিম শাসনাধীন ছিল, তখন মুসলমান নবাবের বিধর্মী কর্মচারীদেরকে প্রশাসনিক ভাষা ফার্সী শিখতে হতো এবং মুসলমানদের মতো পোশাক পরিধান করতে হতো। এই ভারতবর্ষে টানা আটশ বছর মুসলমান শাসনাধীন ছিল, অর্থাৎ বিধর্মীদেরকে বংশ পরম্পরায় সেই টানা আটশ বছরই মুসলমানের পোশাক পরে চাকরি করতে হয়েছে।
তবে তাতে করে বিধর্মীরা কিন্তু তাদের বিধর্মীয়ানী বিসর্জন দেয়নি। অর্থ উপার্জনের খাতিরে কর্মক্ষেত্রে মুসলমানদের পোশাক পরিধান করলেও বাসায় এসেই বিধর্মীরা তা অপবিত্র জ্ঞান করে ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করতো (নাউযুবিল্লাহ!) এবং ‘পবিত্র’ হওয়ার জন্য তারা গায়ে গঙ্গার পানি ছিটিয়ে মাথায় তুলসীপাতা দিতো।
পরবর্তীতে যখন খ্রিস্টানরা আসলো, তখন বিধর্মীদেরকে কাজ চালাতে পরিধান করতে হলো খ্রিস্টানদের পোশাক। তবে খ্রিস্টানদের পোশাকের ক্ষেত্রেও যে যে ইসলামী পোশাকের ন্যায় ব্যবস্থা ছিল, সেটাও নীরদ সি চৌধুরী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছে।
শুধু বিধর্মীদের ক্ষেত্রে নয়, বরং খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই জিনিস পরিলক্ষিত হয়। মুসলমানরা এক-দুইশ বছর নয়, টানা ৮০০ বছর স্পেন শাসন করেছে। এখন টানা আটশ বছর মুসলমানদের অধীনে থাকার পরেও কী উক্ত অঞ্চলের খ্রিস্টানদের খ্রিস্টানী মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছিল? উক্ত অঞ্চলের খ্রিস্টানরা কী মুসলমানদের শাসনাধীনে থাকার কারণে হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হয়েছিল? মানসিক দাসত্বের বেড়াজালে কী আবদ্ধ হয়েছিল স্পেনের খ্রিস্টানরা?
স্পেনের খ্রিস্টানরা তাদের খ্রিস্টীয় আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখার কারণেই কিন্তু আটশ বছর পরে হলেও মুসলমান শাসকদের সরিয়ে তারা ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিল। বিপরীতে মুসলমানদের ক্ষেত্রে কী হয়েছে?
যদিও পলাশীর প্রহসনের পর বাংলা অঞ্চল ব্রিটিশদের করায়ত্ত হয়েছিল, কিন্তু গোটা ভারতবর্ষকে ইংরেজরা সম্পূর্ণ দখলে আনতে পেরেছে ১৮৫৭’র সিপাহী বিদ্রোহের পর। সে হিসেবে কিন্তু ইংরেজদের দ্বারা এ অঞ্চলের মুসলমানরা পুরোপুরি একশ বছরও শাসিত হয়নি। আর বিধর্মীদের শাসন তো শুরুই হয়েছে মাত্র সাতচল্লিশের পর! ভারতবর্ষে মুসলমানদের টানা ৮০০ বছরের শাসনের বিপরীতে বিধর্মীদের দ্বারা তাদের খুব অল্প সময়ই শাসিত হতে হয়েছে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছে।
কিন্তু তারপরও দেখুন পাঠকেরা, এই মুসলমানরাই কিন্তু শেষমেশ হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হয়েছে। স্বাধীন ভূখ- লাভ করার পরও এই মুসলমানরাই খ্রিস্টানদের ন্যায় স্যুট-কোট-টাই পরছে, বিধর্মীদের ন্যায় ধুতি পরে পহেলা বৈশাখ পালন করছে। তাহলে এই স্বাধীনতার কী মূল্য রইলো? যেখানে বিধর্মীরা মুসলমানদের অধীনে প্রায় হাজার বছর শাসিত হবার পরও তাদের নিজস্ব স্বকীয়তাকে বিসর্জন দেয়নি, সেখানে মুসলমানদের আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দিতে সময় লাগেনি মাত্র একশ বছরও! নাঊযুবিল্লাহ!

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে