হানাফী মাযহাব মতে যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে; তার নামে কুরবানী না করে মৃত বা জীবিত অপরের নামে কুরবানী করলে ওয়াজিব তরকের কারণে সে কঠিন গুনাহে গুনাহগার হবে।”


সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করবে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে|’
যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে তার নামে কুরবানী না করে মৃত বা জীবিত অপরের নামে কুরবানী করলে ওয়াজিব তরকের কারণে সে কঠিন গুনাহে গুনাহগার হবে|
কারণ আমাদের হানাফী মাযহাব মতে মালিকে নিছাব প্রত্যেকেরই উপর আলাদাভাবে কুরবানী করা ওয়াজিব| অর্থাৎ যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে|
কেউ কেউ ফতওয়ায়ে কাজীখান ও শামী কিতাবের বরাত দিয়ে বলে থাকে যে, ‘যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে নিজের নামে কুরবানী না করে অপরের নামে করলেও তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে’| মূলতঃ আমাদের হানাফী মাযহাবের মতে তাদের এ মতটি বিশুদ্ধ নয় বরং মারাত্মক অশুদ্ধ|
এ সম্পর্কে শাফিয়ী মাযহাবের অভিমত হলো- শাফিয়ী মাযহাবের ইমাম হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মতে কুরবানী করা ওয়াজিব নয় বরং সুন্নত|
“নূরুল হিদায়া” কিতাবের ৪র্থ খণ্ডের ৫০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “আর হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট কুরবানী করা সুন্নত|” অতএব, শাফিয়ী মাযহাবে যেহেতু কুরবানী করা সুন্নত তাই নিজের পক্ষ থেকে না করে অপরের পক্ষ থেকে করলেও কোনো অসুবিধা নেই|
এ সম্পর্কে মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের অভিমত হলো- মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের কুরবানী সম্পর্কিত দুটি মত কিতাবে উল্লেখ রয়েছে| একটি মতে কুরবানী ওয়াজিব নয়|
যেমন এ প্রসঙ্গে“আইনুল হিদায়া” কিতাবের ৪র্থ খণ্ডের ২২২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের নিকট কুরবানী করা ওয়াজিব নয়|”
মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের অপর এক মতে কুরবানী করা ওয়াজিব| তবে এক্ষেত্রে উনাদের মূল বক্তব্য হলো, “যদি পরিবারের একাধিক লোকের উপর কুরবানী ওয়াজিব হয়| আর সকলের পক্ষ থেকে একটি মাত্র কুরবানী করে তবে সকলেরই ওয়াজিব আদায় হবে যাবে|” অর্থাৎ প্রত্যেকের আলাদা আলাদা কুরবানী করার প্রয়োজন নেই|
যেমন এ প্রসঙ্গে “আল হিদায়া” কিতাবের ৪র্থ খণ্ডের ৪২৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আহলে বাইতের পক্ষ থেকে একজন একটি কুরবানী করলেই জায়িয হবে| যদিও উক্ত আহলে বাইতের মধ্যে সাত জনের বেশি কুরবানীদাতা থাকে|। অর্থাৎ যদি একই আহলে বাইতের মধ্যে সাত জনের বেশি অর্থাৎ ৮-১০ জন লোক থাকে, আর উক্ত ৮-১০ জন লোকের প্রত্যেককেরই উপর যদি পৃথক পৃথকভাবে কুরবানী ওয়াজিব হয়; তাহলে উক্ত ৮-১০ জন কুরবানীদাতা আহলে বাইতের পক্ষ থেকে একজনই একটি কুরবানী করলে সকলেরই পক্ষ থেকে কুরবানী আদায় হয়ে যাবে| এটাই হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মত|”
আর এ ব্যাপারে উনাদের দলীল হলো নিম্নোক্ত হাদীছ শরীফ| যেমন, “মিশকাত শরীফ”-এর ১২৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “হযরত মিখনাফ ইবনে সুলাইম রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার হতে বর্ণিত আছে| তিনি বলেন, আমরা বিদায় হজ্জে খালিক্ব মালিক রব মহান মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে আরাফার ময়দানে অবস্থান করছিলাম| অতঃপর আমি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলতে শুনলাম, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, হে লোক সকল! প্রত্যেক পরিবারের পক্ষে, প্রত্যেক বৎসরই একটি কুরবানী রয়েছে|” (তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ)
কাজেই ‘ফতওয়ায়ে কাজীখান’ ও “শামী’ কিতাবে যে বলা হয়েছে, “মাইয়্যিতের ওয়ারিছ যদি মৃত ব্যক্তির আদেশে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে কুরবানীর সমস্ত গোশতগুলো ছদকা করতে হবে এবং কুরবানীদাতার ওয়ারিছ উক্ত কুরবানীর গোশত খেতে পারবে না| আর মাইয়্যিতের ওয়ারিছ যদি স্বেচ্ছায় মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী দেয় তাহলে কুরবানীদাতার ওয়ারিছ উক্ত কুরবানীর গোশত খেতে পারবে| কেননা, কুরবানীটি কুরবানীদাতার মিলকিয়াতে সম্পন্ন হয়েছে| আর কুরবানীর ছওয়াব মাইয়্যিত পাবে| আর এ কারণেই (অর্থাৎ কুরবানীটা যেহেতু কুরবানীদাতার মিলকিয়াতে সম্পন্ন হয়েছে সেহেতু) কুরবানীদাতার উপর যদি কুরবানী থেকে থাকে তাহলে কুরবানীদাতার পক্ষ থেকে তা সাকিত হয়ে যাবে| অর্থাৎ আদায় হয়ে যাবে|” এ মতটি মূলত মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবেরই মত| হানাফী মাযহাবের মত এটি নয়|
আমাদের হানাফী মাযহাব মতে মালিকে নিছাব প্রত্যেকের উপর আলাদা আলাদাভাবে কুরবানী করা ওয়াজিব| যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে| যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকে কুরবানী না করে মৃত বা জীবিত অপরের পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তার ওয়াজিব আদায় হবে না| এ ব্যাপারে হানাফীদের দলীল হলো- খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার কালাম পাকে ইরশাদ করেন, “আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায আদায় করুন এবং কুরবানী করুন|” (সূরা কাওছার : আয়াত শরীফ ২)
উক্ত আয়াত শরীফ-এর তাফসীরে, কাযী মুহম্মদ ছানাউল্লাহ উসমানী, পানীপথি, মুজাদ্দিদী, নকশবন্দী, আল হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার লিখিত সর্বজনমান্য ও বিশ্বখ্যাত তাফসীরের কিতাব “তাফসীরে মাযহারী” কিতাবের ১০ম খণ্ডের ৩৫৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, “এই আয়াতে কারীমা দ্বারা এটাই ছাবেত হয় যে, ঈদের নামায পড়া এবং কুরবানী করা উভয়টি ওয়াজিব|”
“শরহে বেকায়া” কিতাবে উল্লেখ আছে, “কুরবানীদাতা তার নিজের পক্ষ থেকে বা নিজের নামেই কুরবানী করা ওয়াজিব| কেননা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও কুরবানী করবে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে|”
“শরহে ইলইয়াছ”-কিতাবে উল্লেখ আছে, “প্রত্যেক স্বাধীন, মুসলমান, মুক্বীম, সামর্থ্যবান (মালিকে নিসাব) ব্যক্তির উপর কুরবানীর দিনে তার নিজের পক্ষ থেকেই বা নিজের নামেই কুরবানী করা ওয়াজিব| আর এটাই ইমামে আযম হযরত আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম মুহম্মদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত ইমাম যুফার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের মত| …আর অধিক ছহীহ মতে আমাদের হানাফী মাযহাবে কুরবানী করা ওয়াজিব|”
“ফতওয়ায়ে নাওয়াযিল” কিতাবের ২৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “কুরবানীদাতা তার নিজের পক্ষ থেকেই বা নিজের নামেই কুরবানী আদায় করা ওয়াজিব| কেননা কুরবানী মূলত তারই উপর ওয়াজিব| অর্থাৎ কুরবানী মূলত যার উপর ওয়াজিব হবে, সর্ব প্রথম তার নিজের পক্ষ থেকেই বা নিজের নামেই কুরবানী আদায় করা ওয়াজিব|”
হ্যাঁ, কেউ যদি ওছীয়ত বা গাইরে ওছীয়তের কারণে মৃত বা অপরের পক্ষ থেকে কুরবানী করতে চায় তবে তাকে পৃথক আরেকটি কুরবানী করতে হবে| এ ব্যাপারে হানাফীদের মজবুত দলীল হচ্ছে এ হাদীছ শরীফখানা: “মিশকাত শরীফ” কিতাবের ১২৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, “তাবিয়ী হযরত হানাশ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনাকে দুটি দুম্বা কুরবানী করতে দেখে উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম ইহা কি? অর্থাৎ দুটি কেনো? তিনি বললেন,নিশ্চয়ই রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাকে ওছীয়ত করেছেন, আমি যেনো উনার পক্ষ হতে কুরবানী করি। সুতরাং আমি উনার পক্ষ হতে অর্থাৎ সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে একটি কুরবানী করছি|” (আর অপরটি আমার পক্ষ থেকে) (আবু দাঊদ শরীফ ২য় খ- ২৯ পৃষ্ঠা, তিরমিযী শরীফ ১ম খ- ১৮০ পৃষ্ঠা)
আমাদের প্রশ্ন হলো- যদি একটি কুরবানী করলে একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে আদায় হতো অর্থাৎ যার উপর ওয়াজিব তার ওয়াজিব সাকিত হয়ে যেতো; তবে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম তিনি দুটি কুরবানী করলেন কেনো? এর দ্বারা কি এটাই প্রমাণিত হয়না যে, যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে|
উপরোক্ত দলীলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা সুস্পষ্ট ও অকাট্যভাবেই প্রমাণিত হলো যে, হানাফী মাযহাব মতে যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার পক্ষ থেকেই কুরবানী করতে হবে| নিজের ওয়াজিব কুরবানী মৃত ব্যক্তি বা অপরের নামে করা অথবা একভাগে একাধিক নাম শরীক করা জায়িয নেই| তবে হাম্বলী ও মালিকী মাযহাব মতে একটিমাত্র কুরবানী একাধিক ব্যক্তির পক্ষ থেকে করলেও সকলের পক্ষ থেকে তা আদায় হয়ে যাবে| ‘ফতওয়ায়ে শামী’ ও ‘ফতওয়ায়ে কাজীখান’ কিতাবে একথাটিই মূলত উল্লেখ করা হয়েছে|
কাজেই যারা বলে- ‘যার উপর কুরবানী ওয়াজিব সে নিজের নামে কুরবানী না করে অপরের নামে করলেও তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে’- তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণই ভুল, দলীলবিহীন তথা কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ, ইজমা ও ক্বিয়াসের খিলাফ হওয়ার কারণে তা হানাফী মাযহাব মতে সম্পূর্ণ বাতিল ও পরিত্যাজ্য|

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে