হালাল ও হারাম উভয়ের গুরুত্ব: গইরুল্লাহর মুহতাজ হওয়া হারাম


খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি হচ্ছেন এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সব বিষয়ে ক্ষমতাবান। সবকিছুই উনার করায়ত্তে। তিনি কারো মুহতাজ নন। বরং কুল-কায়িনাতের সবাই হচ্ছে উনার মুহতাজ। তাই সকল মাখলূক্বাতের জন্য বিশেষ করে জিন-ইনসানের জন্য ফরয-ওয়াজিব হচ্ছে- খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার মুহতাজ হওয়া। তিনি ছাড়া অন্য কারো মুহতাজ না হওয়া। কেননা গইরুল্লাহর মুহতাজ হওয়া হারাম। যেমন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِي وَلِأُتِمَّ نِعْمَتِي عَلَيْكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থ: “তোমরা তাদেরকে (কাফির-মুশরিকদেরকে) ভয় করো না, আমাকেই ভয় করো। যাতে আমি তোমাদের জন্য আমার নিয়ামতরাজিকে পরিপূর্ণ করে দেই এবং তাতে তোমরা অবশ্যই হিদায়েতপ্রাপ্ত হবে।” (পবিত্র সূরা বাক্বারা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫০)
কাজেই সকল জিন-ইনসান মুসলমান পুরুষ-মহিলা সকলের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- গইরুল্লাহ (মহান আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত অন্য সবকিছু)কে বাদ দিয়ে একমাত্র মহান আল্লাহ পাক উনার উপর তাওয়াক্কুল বা নির্ভর করা। গইরুল্লাহর মুহতাজ না হওয়া। আর এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে- “বিশিষ্ট ছাহাবী হযরত আবূ যর গিফারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
انى لاعلم اية لو اخذ الناس بها لكفتهم وَمَن يَتَّقِ اللَّـهَ يَجْعَل لَّه مَخْرَجًا. وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: ‘পবিত্র কুরআন শরীফ উনার এমন একখানা পবিত্র আয়াত শরীফ আমি জানি, যদি লোকেরা সেই পবিত্র আয়াত শরীফ উনার উপর আমল করতো, তাহলে তাদের জন্য ইহাই যথেষ্ট হতো।’ আর সেই পবিত্র আয়াত শরীফখানা হচ্ছেন-
وَمَن يَتَّقِ اللّـهَ يَجْعَل لَّه مَخْرَجًا. وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ. وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّـهِ فَهُوَ حَسْبُه
অর্থ: ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করে তিনি তার জন্য কল্যাণের সমস্ত রাস্তা খুলে দেন। আর এমন স্থান হতে তাকে রিযিক দান করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি তাওয়াক্কুল করেন, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হন।” (আহমাদ শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ, দারেমী শরীফ, মিশকাত শরীফ)
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَعَلَى اللَّـهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক উনার উপর তাওয়াক্কুল করা মু’মিনগণের জন্য ফরয-ওয়াজিব।” (পবিত্র সূরা মায়িদা শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ২৩)
মহান আল্লাহ পাক তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন-
إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
অর্থ: “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার উপর তাওয়াক্কুলকারীগণকে মুহব্বত করেন।” (পবিত্র সূরা আলে ইমরান শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৫৯)
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইহাও ইরশাদ মুবারক করেন যে-
اَلَيْسَ اللّـهُ بِكَافٍ عَبْدَه
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি কি উনার বান্দা-বান্দীর জন্য যথেষ্ট নন?” (পবিত্র সূরা যুমার শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৬)
অবশ্যই মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার বান্দা-বান্দীগণের জন্য যথেষ্ট।
সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ পাক উনার উপর তাওয়াক্কুল করেন, তিনি তার সমস্ত কাজ নিজ দায়িত্বে সুসম্পন্ন করে দেন এবং সব বিষয়ে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হন। আর এমন স্থান হতে তাকে রিযিক দান করেন যা কোনো সময় তার কল্পনায়ও আসেনি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়া বা দুনিয়াবী কোনো বিষয় বস্তুর প্রতি মনোনিবেশ করে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে দুনিয়ার সাথে ছেড়ে দেন।” (কিমিয়ায়ে সায়াদাত-৪/৩৪৫)
কিতাবে বর্ণিত রয়েছে- “রঈসুল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, একদিন আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাওয়ারির পিছনে বসা ছিলাম। তখন তিনি আমাকে লক্ষ্য করে ইরশাদ মুবারক করলেন- হে প্রিয় বৎস! মহান আল্লাহ পাক উনার আদেশ নিষেধসমূহ যথাযথভাবে মেনে চলবেন, তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনিই আপনাকে হিফাযত (সংরক্ষণ) করবেন। মহান আল্লাহ পাক উনার হক্ব আদায় করবেন, তাহলে আপনি মহান আল্লাহ পাক উনাকে সবসময় সামনে পাবেন। যখন কোনোকিছুর প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন মহান আল্লাহ পাক উনার নিকটেই চাইবেন। যখন কারো সাহায্যের প্রয়োজন পড়বে, তখন মহান আল্লাহ পাক উনার কাছেই সাহায্য চাইবেন। জেনে রাখুন! যদি পৃথিবীর সমস্ত মাখলূক্বাত একত্রিত হয়ে আপনার কোনো উপকার করতে চায়, তবুও মহান আল্লাহ পাক উনার নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত আপনার কোনো উপকার করতে পারবে না। পক্ষান্তরে যদি সকল মাখলূক্বাত সম্মিলিতভাবে আপনার কোনো ক্ষতিসাধন করতে চায়, তাহলেও মহান আল্লাহ পাক উনার নির্ধারিত পরিমাণ ব্যতীত আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।” সুবহানাল্লাহ! (আহমদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ)
অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছা মুবারক ও নির্ধারণ ব্যতীত কোনো কিছুই হবে না। কাজেই সবক্ষেত্রে উনার উপরই তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখা উচিত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আরো বর্ণিত রয়েছে-
عن حضرت عمر بن الخطاب عليه السلام قال سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول لو انكم تتوكلون على الله حق توكله لرزقكم كما يرزق الطير تغدوا خماصا وتروح بطانا.
অর্থ: “হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস তিনি বলেন, আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে ইরশাদ মুবারক করতে শুনেছি যে, তোমরা যদি মহান আল্লাহ পাক উনার উপর যথাযথভাবে তাওয়াক্কুল করতে পারো, তাহলে তিনি তোমাদেরকে অনুরূপ রিযিক দান করবেন, যেরূপ পাখিকে তিনি রিযিক দিয়ে থাকেন। পাখিরা ভোরে খালি পেটে বাসা থেকে বের হয় এবং দিনের শেষে ভরা পেটে বাসায় ফিরে আসে। অর্থাৎ কুদরতী রিযিক খেয়ে থাকে।” (তিরমিযী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ)
মহান আল্লাহ পাক উনার জলীলুল ক্বদর রসূল হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাকে যখন কাফিররা চড়কে বেঁধে আগুনে নিক্ষেপ করতেছিল তখন তিনি বলেছিলেন-
حسبى الله ونعم الوكيل
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনিই আমার সাহায্যের জন্য যথেষ্ট। আর তিনিই আমার উত্তম উকীল বা কার্যনির্বাহক।”
চড়ক থেকে নিক্ষিপ্ত হয়ে হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি যখন শূন্যে ভাসমান ছিলেন, তখন হযরত জিবরীল আলাইহিস সালাম তিনি এসে উনাকে বললেন, আপনি কি আমার কোনো সাহায্যের (খিদমত) প্রয়োজনবোধ করেন? জাওয়াবে তিনি বললেন, “আপনার খিদমতের কোনো প্রয়োজন নেই।” এ কারণেই মহান আল্লাহ পাক তিনি হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনার প্রশংসা করে ইরশাদ মুবারক করেন-
وابراهيم الذى وفى
অর্থ: “আর হযরত খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম তিনি উনার ওয়াদা বা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছেন।” (পবিত্র সূরা নজম শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ৩৭
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝলাম গইরুল্লাহর মুহতাজ হওয়া হারাম। আর মহান আল্লাহ পাক উনার মুহতাজ হওয়া, উনার উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা প্রত্যেক মুসলমান, জিন, ইনসান, পুরুষ, মহিলা সকলের জন্য ফরয-ওয়াজিব উনার অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!
মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে উনার মুখাপেক্ষী হওয়ার ও গইরুল্লাহ বিমুখ হওয়ার হাক্বীক্বী তাওফীক্ব দান করুন। আমীন।

Views All Time
1
Views Today
4
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে