৫ই শা’বান শরীফ: সাইয়্যিদু শাবাবি আহলিল জান্নাহ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সুমহান বিলাদত শরীফ এর দিন


৪র্থ হিজরীর ৫ই শা’বান শরীফ রোজ মঙ্গলবার বাদ আছর পবিত্র মদীনা শরীফ-এ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার লখতে জিগার সাইয়্যিদু শাবাবি আহলিল জান্নাহ, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি দুনিয়ার জমীনে তাশরিফ আনেন।

মহা সম্মানিত নানাজান সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাস্সাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সম্মানিত পিতা শেরে খোদা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম এবং সম্মানিতা মাতা সমগ্র বিশ্বের নারী জাতির সাইয়্যিদা, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার অত্যন্ত স্নেহের কন্যা হযরত ফাতিমাতুয যাহরা আলাইহাস সালাম উনাদের লখ্‌তে জিগার, স্নেহের ধন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি বেহেস্তের যুবকদের সাইয়্যিদ এবং আহলে বাইত শরীফ-উনাদের তৃতীয় ইমাম। আহলে বাইত শরীফ-উনাদের প্রথম ইমাম হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম এবং দ্বিতীয় ইমাম হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম।

হযরত হুসাইন বিন আলী বিন আবী তালিব আলাইহিস সালাম উনার উপনাম ছিলো: আবু আবদুল্লাহ, রায়হানাতুন (এক প্রকার সুগন্ধি চারাগাছ) এবং লক্বব ছিল ‘‘সাইয়্যিদুশ শুহাদা” আর্থাৎ শহীদগণ উনাদের সাইয়্যিদ।

উনার বিলাদত শরীফ-এর পর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ডান কান মুবারক-এ আযান এবং বাম কান মুবারক-এ ইক্বামত দেন এবং প্রথম খাদ্য হিসেবে শিশুর মুখে আপন পবিত্র থুথু মুবারক তুলে দেন । অতঃপর উনার নাম মুবারক রাখেন “হুসাইন” (আলাইহিস সালাম)। সপ্তম দিনে মাথা মুবারকের চুল মুন্ডন করে চুলের সম-ওজনের রৌপ্য হযরত যাহ্‌রা আলাইহাস সালাম উনি ছদকা করে দেন এবং একটি কিংবা দু’টি ভেড়া যবেহ করে আকীকা প্রদান করেন ।

রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। হযরত উমর ফারূক্ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “একবার আমি গিয়ে দেখি,  হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে পিঠ মুবারক-এর উপর বসিয়ে নিজ মুখ মুবারকে লাগামের ন্যায় একটি সূতা দিয়ে উহা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার হাত মুবারক-এ ধরিয়ে দিয়েছেন এবং নিজে হামাগুড়ি দিয়ে চলছেন”। এ দৃশ্য দেখে আমি বললাম, “হে পেয়ারে হুসাইন আলাইহিস সালাম! কতই না উত্তম আপনার এ বাহন মুবারক”। আল্লাহ পাক-উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুবারক হাসি দিয়ে ইরশাদ করলেন, “হে উমর রদ্বিয়াল্লাহু আনহু, সওয়ারীও কতই না উত্তম!” (ছুবহানাল্লাহ)  (উসুদুল গাবা)

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র সত্ত্বা ও গুণাবলী মুবারক সম্পর্কে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আমা হতে এবং আমি হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম হতে। আল্লাহ পাক তাকে ভালবাসেন, যে হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে ভালবাসে। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম আমার সন্তানের সন্তান”। ছুবহানাল্লাহ!  (তিরমিযী শরীফ)

হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম প্রথম বয়স থেকেই সংস্কার-সংশোধন ও শিক্ষার দিকে আগ্রহী ছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম কুরআন শরীফ-এর তাফসীর এবং হাদীছ শরীফ বর্ণনা করতেন। মদীনা শরীফ-এর বিখ্যাত বুযূর্গ ব্যক্তিগণও মাসয়ালা-মাসায়িলের সমাধানের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সমস্ত ইবাদত-বন্দেগীর জামে হচ্ছেন আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা। ইবাদতের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য বলা, ইবাদত-বন্দেগী ও রিয়াযত-মুজাহাদা ছিল উনার স্বভাবগত অভ্যাসের অন্তর্গত। তিনি অধিক পরিমাণে নফল নামায আদায় করতেন। তাহাজ্জুদ নামায নিয়মিত পড়তেন। বেশী পরিমাণে রোযা রাখতেন এবং সাধারণ খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ইফতার করতেন। তিনি পঁচিশ বার হজ্জ করেছেন। রমাদ্বান মাসে কমপক্ষে একবার কুরআন শরীফ খতম করতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা)

তিনি ছিলেন সমস্ত বিপদ-আপদ বরণকারী ক্বিবলা এবং সাইয়্যিদ। তাই যখন সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল তখন তিনি সেই সত্যের অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু সত্য যখন তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল তখন তিনি অস্ত্র ধারণ করলেন এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ধন সম্পদ, আত্মীয় স্বজন এমনকি জীবনটিও আল্লাহ  পাক-উনার পথে কুরবানী করলেন।

বর্নিত আছে এক ব্যক্তি ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নিকট এসে বলল, “হে রসুল তনয় আলাইহিস সালাম! আমি খুবই গরীব। আমার ছোট ছোট ছেলে মেয়ে ঘরে অনাহারে রয়েছে। আপনি আজ রাতে খাবার মত কিছু তাদেরকে দান করুন”। (সম্ভবত: উনার ঘরেও সেদিন খাওয়ার মত কিছু ছিল না।) তাই তিনি বললেন, “তুমি বস! আমার জীবিকাও আসছে। যদি আসে তবে তোমাকে দিব”। ইত্যবসরে এক ব্যক্তি হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-উনার পক্ষ হতে পাঁচ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা হাদিয়া নিয়ে আসলেন। হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম পাঁচ হাজার স্বর্ণমুদ্রাই অপেক্ষমান ব্যক্তিকে দান করে বললেন, “আমরা কঠিন পরীক্ষায় লিপ্ত। আমি দুনিয়ার সমস্ত সাজ সজ্জা ত্যাগ করেছি এবং নিজেদের চাহিদা খুব কমিয়ে দিয়েছি। দুঃখের বিষয় আপনাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল এবং আমি এর বেশী কিছু দিতে পারলাম না”। (তিরমিযী শরীফ, কাশফুল মাহজুব, মিরাতুল আসরার, সিয়ারু আলামিন নুবালা, হিলইয়াতুল আওলিয়া, তারীখে তাবারী, উসুদুল গাবা)

আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের মর্যাদা বুঝাতে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফ-এ ইরশাদ করেন:

“হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলুন, (হে বিশ্ববাসী) আমি তোমাদের নিকট নুবুওওয়াতের দায়িত্ব পালনের কোন প্রতিদান চাইনা। তবে তোমরা আমার আত্মীয়-স্বজনগণের সাথে সদাচরণ করবে।”

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+