✅কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস ধারাবাহিক পর্ব-১৪ (কূফাবাসীর বেঈমানী )


কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস ধারাবাহিক পর্ব-১৪ (কূফাবাসীর বেঈমানী )

12109205_1134518219910921_2515157241511440877_n

ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির অনুসারীদের মধ্যেও অনেকে কূফায় অবস্থান করতো। তারা যখন দেখলো, হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত গ্রহণ করেছে, তখন তারা ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহিকে এ ব্যাপারটা জানিয়ে উসকানিমূলক একটি চিঠি দিলো। তারা ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির কাছে পত্র লিখলো যে,

“ওহে ইয়াযীদ! তুমি তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছো। আর এদিকে তোমার বিরুদ্ধে কূফায় বিদ্রোহের দানা বেঁধে উঠছে; যা তোমার পক্ষে প্রতিরোধ করা খুবই কষ্টসাধ্য হবে। তোমার তো খবরই নেই, তোমার বিরুদ্ধে চল্লিশ হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং আরো লোক বাইয়াত হচ্ছে। যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে এখান থেকে এমন এক ভয়ানক ঝড়-তুফানের সৃষ্টি হবে, যা তোমাকে খড়-কুটার ন্যায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে। তাই তুমি যেভাবেই হোক এটাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা কর।”

যখন ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহি ভক্তদের কাছ থেকে চিঠির মাধ্যমে এ ধরনের খবর পেলো, তখন সে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো। সে অবহিত আছে যে, রাজক্ষমতা বড় জিনিস। কেউ নিজ ক্ষমতা সহজে ত্যাগ করতে চায় না। আপ্রাণ চেষ্টা করে সেই ক্ষমতা, সেই সিংহাসন আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। তাই ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির কাছেও যখন তার রাজত্ব হুমকির সম্মুখীন মনে হলো, তখন কূফার গভর্নর ‘নোমান বিন বশীর’কে কূফার গভর্নর পদ থেকে পদচ্যুত করলো। তাঁর একটাই অপরাধ ছিল যে, তিনি হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কোন বিরোধিতা করেননি বা উনার বিরুদ্ধে কোন প্রতিকার নেননি। তাই তাঁর স্থলে ইবনে যিয়াদ ওরফে ‘উবাইদুল্লাহ’কে কূফার গভর্নর নিয়োগ করলো। ইবনে যিয়াদ ছিল বড়ই যালিম ও কঠোর ব্যক্তি; যে পূর্বে বছরার গভর্নর ছিল। ইবনে যিয়াদকে কূফার গভর্নর নিয়োগ করে ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহি তার কাছে একটি চিঠি লিখলো। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল এই-
“হে ইবনে যিয়াদ! তুমি বছরার গভর্নরও থাকবে, সাথে সাথে তোমাকে কূফারও গভর্নর নিয়োগ করা হলো। তুমি শীঘ্রই কূফায় চলে এসো। সেখানে আমার বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহের দানা সৃষ্টি হয়েছে, তা যেভাবেই হোক দমিয়ে ফেল। এ ব্যাপারে যা কিছু করতে হয়, তা করার জন্য তোমাকে পূর্ণ ইখতিয়ার দেয়া হলো। যেভাবেই হোক, যে ধরনের পদক্ষেপই নিতে হোক না কেন, এ বিদ্রোহকে নির্মূল করে দাও।”
ইবনে যিয়াদ ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির পক্ষ থেকে পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে বছরা থেকে কূফা আসলো। সে কূফায় এসে সর্বপ্রথম যে কাজটা করলো, তা হচ্ছে যতগুলো বড় বড় সর্দার ছিল এবং যারা হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে ছিল ও বাইয়াত গ্রহণ করেছিল, সেইসব সর্দারদের সবাইকে বন্দি করে ফেললো এবং বন্দি করার পর কূফার গভর্নর হাউজে নজরবন্দি করে রাখলো। তাদের এই বন্দির কথা বিদ্যুৎ বেগে সমগ্র কূফায় ছড়িয়ে পড়লো এবং এতে সমস্ত লোক হতভম্ব ও মর্মাহত হলো। সবাই চিন্তিত হলো, এখন কি করা যায়? সমস্ত বড় বড় সর্দারকে বন্দি করছে। এমনকি হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকেও বন্দি করার কৌশল নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে।

যখন হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি দেখলেন যে, বড় বড় সর্দারদেরকে বন্দি করা হয়েছে এবং আরো নতুন নতুন বন্দি করার জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তখন তিনি উনার সমস্ত অনুসারী ও বাইয়াত গ্রহণকারীদের আহবান করলেন। উনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেই চল্লিশ হাজার বাইয়াত গ্রহণকারী ব্যক্তি ও সমস্ত অনুসারী সবাই সমবেত হলো। তিনি তাদের হুকুম দিলেন, গভর্নর ভবন ঘেরাও করতে। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নেতৃত্বে সেই চল্লিশ হাজার বাইয়াত গ্রহণকারী ও অনুসারীগণ গভর্নর ভবন ঘেরাও করে ফেললো। তখন অবস্থা এমন উত্তপ্ত ছিল যে, তিনি একটু ইশারা করলে ওই চল্লিশ হাজার লোক এক মূহূর্তের মধ্যে গভর্নর ভবন ধূলিসাৎ করে ফেলতো এবং ইবনে যিয়াদ এর কোন প্রতিরোধ করতে পারতো না।

কারণ ওই চল্লিশ হাজার লোকের মোকাবেলা করার ক্ষমতা তখন তার ছিল না। এমনকি তখন তার কাছে এত সৈন্যও ছিল না। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি যখন চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করলেন, তা দেখে ইবনে যিয়াদ খুবই ভয় পেলো। তবে সে চালাকি ও ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিল। যেসব বড় বড় সর্দারদেরকে গভর্নর ভবনে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল, তাদের সবাইকে একত্রিত করে বললো, দেখুন! আপনারা যদি আপনাদের পরিবার-পরিজনের মঙ্গল চান তাহলে আমার পক্ষ অবলম্বন করুন, আমাকে সহযোগিতা করুন। নচেৎ আমি আপনাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং আপনাদের পরিবারের ও আপনাদের সন্তান-সন্ততিদের যে কঠিন পরিণতি হবে, তা দুনিয়াবাসী দেখবে।
তখন বড় বড় সর্দারেরা বললো, আপনি কি চান? আমাদের থেকে আপনি কি ধরনের সহযোগিতা চান? ইবনে যিয়াদ বললো- যারা এ মুহূর্তে গভর্নর ভবন ঘেরাও করে রেখেছে, তারা হয়তো কেউ আপনাদেরই ছেলে হবে, ভাই হবে, পুত্র হবে বা অন্য কোন আত্মীয়-স¦জন হবে। আমি এখন আপনাদেরকে গভর্নর ভবনের ছাদের উপর উঠাচ্ছি। আপনারা নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডেকে বুঝান, যেন তারা গভর্নর ভবন ঘেরাও প্রত্যাহার করে নেয় এবং হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গ ত্যাগ করে। যদি আপনারা এ রকম না করেন, তাহলে সবার আগে আপনাদের হত্যা করার নির্দেশ দিব এবং অতি সহসা আমার যে সৈন্যবাহিনী আসছে তারা কূফা আক্রমণ করবে, আপনাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হবে এবং আপনাদের শিশুদেরকে বর্শার অগ্রভাগে উঠানো হবে অর্থাৎ আপনাদের কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। তাই আমি আপনাদেরকে বলছি- আমার পক্ষ অবলম্বন করুন, যদি নিজের এবং পরিবার পরিজনের মঙ্গল চান।

এভাবে যখন সে হুমকি দিলো তখন বড় বড় সর্দারেরা ঘাবড়িয়ে গেলো এবং সবাই বলতে লাগলো, ইবনে যিয়াদ! আপনি যা করতে বলেন আমরা তাই করবো। ইবনে যিয়াদ বললো, চলুন! ছাদে উঠুন এবং আমি যেভাবে বলি সেভাবে করুন। সর্দারেরা সাথে সাথে ছাদের উপর উঠলো এবং নিজ নিজ আপনজনদেরকে ডাকতে লাগলো। ডেকে চুপি চুপি বুঝাতে লাগলো- দেখ! ক্ষমতা, সৈন্যবাহিনী এখন ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির হাতে। অস্ত্র-শস্ত্র, ধন-সম্পদ ইত্যাদিও ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির হাতে। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি অবশ্যই রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বংশধর। কিন্তু উনার কাছে না আছে রাজত্ব, না আছে সম্পদ, না আছে সৈন্য-সামন্ত, না আছে অস্ত্র-শস্ত্র। তাই তিনি সৈন্য-সামন্ত, অস্ত্র-শস্ত্র ও ধন-সম্পদ ব্যতিরেকে কিভাবে ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির মোকাবিলা করবেন? মাঝখানে আমরা বিপদগ্রস্ত হবো। এটা রাজনৈতিক ব্যাপার। তাই তোমরা এখন এ ঘেরাও উঠিয়ে নাও এবং হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গ ছেড়ে দাও। স্মরণ রেখ, তোমরা যদি এরকম না কর, তাহলে না তোমরা আমাদের মুখ দেখবে আর না আমরা তোমাদের মুখ দেখবো। আমাদেরকে এখনই কতল করে ফেলবে আর তোমাদের পরিণামও হবে খুব ভয়াবহ ।

যখন বড় বড় সর্দারেরা নিজ নিজ আপনজনদেরকে বুঝাতে ও পরামর্শ দিতে লাগলো, তখন লোকেরা অবরোধ ছেড়ে দিয়ে নীরবে চলে যেতে লাগলো। দশ-বিশজন করে এদিক-ওদিক থেকে চলে যেতে লাগলো। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি চল্লিশ হাজার লোক নিয়ে গভর্নর ভবন ঘেরাও করেছিলেন। কিন্তু আসরের পর মাগরিবের আগে মাত্র পাঁচশত জন লোক ছাড়া বাকি সব চলে গেলো। এতে হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি ভাবলেন, চল্লিশ হাজার লোক থেকে সাড়ে ঊনচল্লিশ হাজার লোক চলে গেছে। কেবল পাঁচশত জন রয়ে গেলো, তাদের উপরইবা কতটুকু আস্থা রাখা যায়?
অতঃপর হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ পাঁচশত জন লোককে বললেন, চলুন! আমরা জামে মসজিদে গিয়ে মাগরিবের নামায আদায় করি। নামাযের পর পরামর্শ করবো- কি করা যায়? সবাই বললেন, ঠিক আছে। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি পাঁচশত লোককে নিয়ে মসজিদে গেলেন। তখন নামাযের সময় হয়ে গেছে। আযান হয়েছে। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমামতির জন্য সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। সেই পাঁচশত জন লোক পিছনে ইক্তিদা করলো। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মাগরিবের তিন রাকায়াত ফরয নামায পড়ার পর যখন সালাম ফিরালেন তখন দেখলেন, ওই পাঁচশত জনের মধ্যে একজনও নেই। সবাই হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে ফেলে চলে গেছে।
কি আশ্চর্য! সকালে যেখানে চল্লিশ হাজার লোক ছিল সাথে এখন মাগরিবের পরে একজনও নেই! এরা সবাই নিজেদেরকে আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের একান্ত ভক্ত বলে দাবি করতো। যাদের পূর্ব পুরুষেরা আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের অনুসারী বলে দাবিদার ছিল। এরাই কাকুতি-মিনতি করে চিঠি লিখেছিল, এরাই সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে কূফায় আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল, এরাই জান-মাল কুরবান করার জন্য নিশ্চয়তা দিয়েছিল! এরাই হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল এবং বড় বড় শপথ করে ওয়াদা করেছিল যে, তারা জান দেবে তবুও উনার সঙ্গ ত্যাগ করবে না। কিন্তু তাদের প্রাণও দিতে হলো না, তীর দ্বারা আহতও হতে হলো না, তরবারি দ্বারা আঘাতপ্রাপ্তও হতে হলো না। কেবল ইবনে যিয়াদের এক ধমকেই হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সঙ্গ ছেড়ে দিলো এবং বিশ্বাসঘাতকতা করলো! হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নামায শেষে আল্লাহ পাক উনাকে স্মরণ করছিলেন এবং মনে মনে ভাবছিলেন-
“এখন কি করা যায়? সব লোক তো আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আর এদিকে আমি তো সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে চিঠি লিখে দিয়েছি যে, এখানকার অবস্থা খুবই সন্তোষজনক। এখানকার লোকদের মনে উনার প্রতি গভীর আন্তরিক ও অসীম মুহব্বত রয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি এক মুহূর্তও বিলম্ব করবেন না। তিনি খুব তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিবেন। যখন তিনি এসে দেখবেন যে, এসব লোকেরা আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে; তখন কি যে প্রতিক্রিয়া হবে!”

এসব চিন্তা-ভাবনা করতে করতে তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে নিজ মুরীদদের কাছে গেলেন। কিন্তু যেই মুরীদের কাছেই গেলেন, দেখলেন যে, ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ডাকাডাকি করার পরও ঘরের দরজা খুলছে না। অথচ এরাই ওই সব লোক, যারা বড় বড় ওয়াদা করেছিল এবং আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের ভক্ত বলে দাবি করেছিল, এখন তারা ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে রাখলো!

হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি রাতের অন্ধকারে কূফার রাস্তায় রাস্তায় এমন অসহায় অবস্থায় ঘুরে বেড়াতে লাগলেন, যেমন একজন সহায়-সম্বলহীন উদভ্রান্ত মুসাফির ঘোরাফেরা করেন। তিনি বড় পেরেশানীর সাথে অলি-গলিতে হাঁটতে লাগলেন। এভাবে উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় গিয়ে এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখলেন, যিনি ঘরের দরজা খুলে দুয়ারে বসে ছিলেন। তিনি পিপাসায় কাতর হয়ে তার কাছে গিয়ে পানি চাইলেন। বৃদ্ধা পানি দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কে? কোথা থেকে এসেছেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন এবং কোথায় যাবেন?

যখন বৃদ্ধা মহিলাটি উনার অবস্থা জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি অকপটে বললেন, ওহে বোন! আমি মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার প্রতিনিধি হয়ে কূফায় এসেছিলাম। মহিলাটি আশ্চর্য হয়ে বললেন, আপনি কী হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনি এভাবে অসহায়ভাবে ঘোরাফেরা করছেন! কূফার সবাই জানে যে, আপনার হাতে হাজার হাজার লোক বাইয়াত হয়েছে এবং সবাই আপনার জন্য জান-মাল কুরবান করতে প্রস্তুত। কিন্তু এখন আমি কী দেখছি! আপনি যে এভাবে অসহায়, একাকী ঘুরাফিরা করছেন? হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ বোন! বাস্তবিকই তা ছিল। কিন্তু তারা আমার সাথে বেঈমানী করেছে। তাই আপনি আমাকে এই অবস্থায় দেখছেন। কূফার কোন ঘরের দরজা আজ আমার জন্য খোলা নেই, এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি রাত্রি যাপন করতে পারি এবং আশ্রয় নিতে পারি। বৃদ্ধা মহিলা বললেন, আমার গরিবালয় আপনার জন্য খোলা আছে। আমার জন্য এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর কি হতে পারে যে, রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একজন আওলাদ আমার ঘরে মেহমান হয়েছেন। সেই বৃদ্ধা মহিলাটি হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে তাঁর নিজ ঘরে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তার ঘরে আশ্রয় নিলেন এবং সেখানেই তিনি রাত্রী যাপন করলেন।

খোদা তায়ালার কি কুদরত! ওই বৃদ্ধার এক ছেলে ছিল বড় নাফরমান। এটা খোদা তায়ালা উনারই একটি শান যে, নেককার থেকে বদকার এবং বদকার থেকে নেককার পয়দা হয়। আল্লাহ তায়ালা তিনি মু’মিনদের ঘরে কাফির সৃষ্টি করে দেন আবার কাফিরদের ঘরে মু’মিন। চরম পাপিষ্ঠ ফিরআউনের স্ত্রী শ্রেষ্ঠ ঈমানদার মহিলা ছিলেন। আবার হযরত লুত আলাইহিস সালাম উনার স্ত্রী হয়ে যায় কাট্টা কাফির। কাফিরের ঘরে লালিত-পালিত হয়ে যান হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস সালাম। আর হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার ঘরে জন্ম ও লালিত-পালিত কেনান হয়ে যায় কাফির। বৃদ্ধা মহিলার ক্ষেত্রেও তাই। তিনি নেককার ছিলেন। কিন্তু তার ঘরেই জন্ম নিয়েছে এক বড় নাফরমান।

শেষ রাতে বৃদ্ধার সেই নাফরমান ছেলে ঘরে আসলো। এসে মাকে পেরেশান দেখে জিজ্ঞাসা করলো, মা! তুমি চিন্তিত কেন? বৃদ্ধা মহিলাটি বললেন, বৎস! হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি, যিনি আমাদের প্রিয় নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খান্দানের একজন। তিনি কূফায় এসেছিলেন সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার প্রতিনিধি হয়ে। কূফাবাসী উনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছিল। তারা উনার পিছে পিছে থাকতো এবং জান-মাল কুরবানী করার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান গভর্নরের হুমকি-ধমকিতে সবাই উনার সঙ্গ ত্যাগ করেছে এবং বেঈমানী করে সবাই উনার জন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি অসহায় অবস্থায় অলি-গলিতে ঘুরছিলেন। যাক, খোদা তায়ালা তিনি আমাকে সৌভাগ্যবান করেছেন। আজ তিনি আমার ঘরে মেহমান এবং আমার ঘরে অবস্থান করছেন। তিনি আমার গরিবালয়ে ক্বদম রেখেছেন। এর জন্য আমি আজ গর্ববোধ করছি যে, আমি উনার মেহমানদারীর সুযোগ লাভ করলাম। এ জন্যই একদিকে আজ আমি খুবই আনন্দিত। আর অন্যদিকে আমি খুবই দুঃখিত যে, কূফাবাসীরা একজন সম্মানিত মেহমানের সাথে এ ধরনের বেঈমানী করতে পারলো!

বৃদ্ধা মহিলাটি যখন এসব ঘটনা বলছিলেন, উনার সেই নাফরমান ছেলে মনে মনে খুবই খুশি হলো এবং মনে মনে বলতে লাগলো- শিকার হাতের মুঠোয়, এটা তো বড় সৌভাগ্যের বিষয়। নাঊযুবিল্লাহ! আমার মা’তো একজন সাধাসিধা মহিলা। তিনি কি জানেন ইবনে যিয়াদের ঘোষণার কথা? ইবনে যিয়াদ তো ঘোষণা করেছে, যে ব্যক্তি হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে গ্রেফতার করতে পারবে, তাকে এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দেয়া হবে। যাই হোক, তিনি যখন সৌভাগ্যবশত আমাদের ঘরে এসে গেছেন, আমি খুব সকালে গিয়ে ইবনে যিয়াদের কাছে খবর দিয়ে হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে আমার ঘর থেকে গ্রেফতার করাবো এবং হাজার দিরহাম পুরস্কার লাভ করবো। ছেলে এই অসৎ উদ্দেশ্য ও ইচ্ছা তার মা’র কাছে গোপন রাখলো।

এদিকে পুরস্কারের লোভে সে খুবই অস্থির হয়ে পড়লো। আর ভাবতে লাগলো কখন সকাল হবে, কখন খবর পৌঁছাবো এবং কখন পুরস্কার লাভ করবো ইত্যাদি ইত্যাদি! রাতে আর ঘুমাতে পারলো না। ফজরের ওয়াক্ত হওয়া মাত্র সে তার অন্যান্য বন্ধুদের নিয়ে ইবনে যিয়াদের নিকট খবর পৌঁছালো যে, হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তাদের ঘরেই অবস্থান করছেন। সে আরো জানালো যে, সেই এ সংবাদের একমাত্র অনুসন্ধানদাতা ও পুরস্কারের দাবিদার। ইবনে যিয়াদ বললো : ঠিক আছে, অসুবিধা নেই। তোমার পুরস্কার তুমি নিশ্চয়ই পাবে। প্রথমে উনাকে গ্রেফতার করার ব্যবস্থা কর। সে বললো, তাহলে আমার সাথে কয়েকজন সিপাহী পাঠিয়ে দিন। তার কথামতো ইবনে যিয়াদ তার সাথে সত্তরজন সিপাহী পাঠিয়ে দিলো। সত্তরজন সিপাহীকে নিয়ে বৃদ্ধার সেই নাফরমান ছেলে হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে গ্রেফতারের জন্য চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো।

হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এই অবস্থা দেখে তলোয়ার নিয়ে বের হলে সিপাহীরা জঘন্যভাবে বেয়াদবী শুরু করলো এবং এমন ভাষা উচ্চারণ করলো, যা মোটেই বরদাশতযোগ্য নয়। ওরা সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার কঠোর সমালোচনা করলো এবং ইয়াযীদ লা’নতুল্লাহি আলাইহির প্রশংসা করলো। আর উনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ আনলো। হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এর যথার্থ উত্তর দিলেন। কিন্তু ইত্যবসরে ওরা তীর নিক্ষেপ করলো।
হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, যদি আলোচনা করতে চাও তাহলে বুদ্ধিমত্তার সাথে আলোচনা কর। আর যদি তীর নিক্ষেপ কর আমিও এর যথোপযুক্ত জবাব দিব। ওরা বললো : ঠিক আছে, শক্তি থাকলে জবাব দিন। তাদের কথা শুনে হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তাদের সামনাসামনি এসে গেলেন এবং তলোয়ার চালাতে শুরু করলেন। তিনি একাই সত্তরজনের সাথে মোকাবিলা করতে লাগলেন। উনার বীরত্বপূর্ণ আক্রমণে ওরা হতভম্ভ হয়ে গেলো এবং তারা মনে মনে বললো, আমরা ধরাকে সরা জ্ঞান করে ভুল করলাম।
হযরত মুসলিম বিন আকীল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সুনিপুণ তলোয়ার চালনার সামনে ওরা টিকতে না পেরে পিছপা হলো। তিনি কয়েকজনকে হত্যা করতে সক্ষম হলেন এবং অনেককে আহত করলেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেও আহত হলেন। একটা তীরের আঘাতে উনার সামনের দাঁত ভেঙে গেলো। সেখান থেকে রক্ত বের হচ্ছিল। তখন তিনি বৃদ্ধা মহিলার কাছ থেকে পানি চাইলেন। মহিলাটি উনাকে পান করার জন্য এক পেয়ালা পানি দিলেন। যখন তিনি পানি পান করতে মুখে নিলেন, তখন সেই পানি মুখের রক্তে লাল হয়ে গেলো। শেষ পর্যন্ত তিনি পানি পান করতে পারলেন না। পেয়ালাটা মাটিতে রেখে তিনি মনে মনে বললেন, “হয়তো দুনিয়ার পানি আমার ভাগ্যে আর নেই। আমি জান্নাতুল ফিরদাউসে গিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করবো।” (ইনশাআল্লাহ চলবে…Wink

Views All Time
1
Views Today
1
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে