✅কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস ধারাবাহিক পর্ব-০৭( কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এর বর্ণনায় আহলে বাইত শরীফ ও আওলাদে রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ফযীলত )


কারবালার হৃদয় বিদারক ইতিহাস ধারাবাহিক পর্ব-০৭( কুরআন শরীফ ও হাদীছ শরীফ-এর বর্ণনায় আহলে বাইত শরীফ ও আওলাদে রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের ফযীলত )

12109205_1134518219910921_2515157241511440877_n

আরো বর্ণিত রয়েছে, হযরত উমর ফারূক আলাইহিমুস সালাম উনার প্রস্তাবিত বিষয়ে ২২ খানা আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে। সেই হযরত উমর ফারূক আলাইহিমুস সালাম উনার সাওয়ানেহ উমরীতে বর্ণিত রয়েছে, যখন আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিদায় নেন তখন হযরত হাসান আলাইহিস সালাম উনার বয়স মুবারক ছিল সাড়ে সাত বছর আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার বয়স মুবারক ছিল সাড়ে ছয় বছর। দুজনের মধ্যে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হাসান আলাইহিস সালাম তিনি ছিলেন জামালী তবিয়ত আর সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি ছিলেন জালালী তবিয়ত।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যিনি ছিলেন বিশিষ্ট ছাহাবী। কিতাবে বর্ণিত রয়েছে, যাঁরা সুন্নতের ইত্তিবা করতেন, সুন্নতের ইত্তিবার মধ্যে যাঁরা মশহুর রয়েছেন, বেমেছাল রয়েছেন উনাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। যার জন্য হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম উনার শাহাদাত বরণ করার সময় অনেক ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা প্রস্তাব দিয়েছিলেন, হে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন! আপনি আপনার পরবর্তী খলীফা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে মনোনীত করুন, উনার যে যোগ্যতা রয়েছে, আমল-আখলাক রয়েছে তা বেমেছাল।

কিন্তু হযরত উমর ফারূক আলাইহিমুস সালাম তিনি যেহেতু ইলহাম-ইলক্বার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আগেই ফায়ছালা করেছেন, সে ফায়ছালা অনুযায়ী তিনি রায় দিয়েছেন হযরত উছমান যুন নুরাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সম্পর্কে। সেই হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম উনার ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার সাথে চলাচল করতেন, উঠাবসা করতেন। কোন এক প্রসঙ্গে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বলেছিলেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম।’ এটা শুনে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। তিনি বিষয়টা খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন যিনি উনার পিতা উনার কাছে জানালেন যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি আমাকে ‘গোলামের ছেলে গোলাম’ বলেছেন। এখন এটার একটা ফায়ছালা করার প্রয়োজন রয়েছে। খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম তিনি বললেন, বেশ ভালো কথা। আপনি যখন ফায়ছালা চাচ্ছেন, তাহলে মুখের কথায় তো হবে না। এটা লিখিত আনতে হবে, কাগজে-কলমে থাকতে হবে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার নিকট গিয়ে বললেন, হে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম! আপনি যে আমাকে বলেছেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’ এটা লিখিত দিতে হবে। আমি খলীফার কাছে ব্যাপারটা পেশ করেছি। সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি বললেন : ঠিক আছে, অসুবিধা নেই, আমি তো বলেছি, আমি লিখিত দিব। তিনি সত্যিই একটা কাগজে লিখে দিলেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। সেটা নিয়ে পেশ করা হলো, খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম উনার কাছে। তিনি বললেন, ঠিক আছে, এটার যখন ফায়ছালা চাওয়া হয়েছে, আমি এটার ফায়ছালা করবো, তবে কবে করা হবে, কোথায় করা হবে, নির্দিষ্ট দিন, তারিখ, সময় ঘোষণা করা হলো। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনারা সকলেই চিন্তিত হলেন ব্যাপারটি নিয়ে। চিন্তিত হলেন যে, হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম তিনি জালালী তবিয়তের, তিনি ইনসাফগার হিসেবে মশহুর, আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ছাহাবী, নবীদের পরে তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব।

একদিকে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম, আরেকদিকে হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম। সকলেই চিন্তিত হলেন, বিষয়টি কি ফায়ছালা করা হবে? হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম তিনি ইনসাফ করে থাকেন, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার করে থাকেন। তিনি কি বিচার করবেন? নিদিষ্ট স্থান, সময়, তারিখ সব ঘোষণা করা হলো, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ লোক সেখানে জমা হয়ে গেলেন। হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম যাঁরা ছিলেন উনারা সকলেই সেখানে জমা হয়ে গেলেন। সবাই উদ্বিগ্নের সাথে চিন্তা-ফিকির করতে লাগলেন যে, কি ফায়ছালা করা হয় সেটা জানতে হবে। এর কি ফায়ছালা রয়েছে?

এদিকে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি উপস্থিত হলেন। তিনি যখন উপস্থিত হলেন, তখন হযরত উমর ফারূক আলাইহিমুস সালাম তিনি উনাকে অত্যন্ত তা’যীম-তাকরীম করে একটি সম্মানিত আসনে বসালেন। আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি যখন আসলেন উনাকেও বসতে বললেন। লোকজন সকলেই উপস্থিত। বিচারের নিদিষ্ট সময় যখন উপস্থিত হলো, তখন হযরত উমর ফারূক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি উনার পকেট থেকে কাগজটা বের করে বললেন, দেখুন! একটা কাগজ আমার কাছে পেঁৗঁছানো হয়েছে। এ কাগজের মধ্যে লিখিত রয়েছে ‘গোলামের ছেলে গোলাম’, কাগজটা দিয়েছেন আমার ছেলে হযরত আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। উনার বক্তব্য হচ্ছে যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি উনাকে বলেছেন ‘গোলামের ছেলে গোলাম’।

এ বিষয়ে ফায়ছালার জন্য এ কাগজটা আমার নিকট পেশ করা হয়েছে। তখন হযরত উমর আলাইহিমুস সালাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনাকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, এটা কি আপনি লিখেছেন?

তিনি বললেন যে, হ্যাঁ। এটা আমার লিখিত, আমি বলেছি এবং লিখেছি। যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, জবাব নেয়া হলো, বিষয়টা, সবাইকে জানানো হলো যে, সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি বলেছেন এবং লিখেছেন। এটা লোকজন শুনলেন। তখন হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম তিনি বললেন যে, এটা এখন ফায়ছালা করা হবে। কি ফায়ছালা করা হবে? সকলেই তো স্তব্ধ হয়ে গেলেন, মনে হয়েছে যেন বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সকলেই একদৃষ্টিতে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম উনার দিকে চেয়ে রয়েছেন যে, এটা তিনি কি ফায়ছালা করেন, এটার কি ফায়ছালা রয়েছে?

হযরত উমর বিন খত্তাব আলাইহিমুস সালাম তিনি ঘোষণা করলেন যে, এর ফায়ছালা হচ্ছে- এই যে কাগজটা, এতে লিখিত রয়েছে, ‘গোলামের ছেলে গোলাম।’ অর্থাৎ আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের যিনি উজ্জ্ব নক্ষত্র সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি আমার ছেলেকে বলেছেন, ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। এর অর্থ হচ্ছে খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন তিনি হচ্ছেন গোলাম। আর উনার ছেলে হচ্ছেন ‘গোলামের ছেলে গোলাম’। এর ফায়ছালা হচ্ছে, আপনারা সকলেই সাক্ষী থাকুন, আমি আমার জিন্দেগীর অনেক সময় ব্যয় করেছি, অতিবাহিত করেছি, পূর্ববর্তী জিন্দেগী ত্যাগ করেছি, কুফরী জিন্দেগী বাদ দিয়েছি, আমার অতীতের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি যা ছিল সেটা আমি ত্যাগ করেছি, একাধিক স্ত্রী ছিল উনাদেরকেও ত্যাগ করেছি আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সন্তুষ্টির জন্য। এসব ত্যাগ করে আল্লাহ পাক উনার হাবীব উনার উম্মত হয়েছি, আমি ঈমান এনেছি, মুসলমান হয়েছি। আমার চাওয়া এবং পাওয়ার বিষয় এটাই ছিল যে, আল্লাহ পাক উনার সন্তুষ্টি এবং আল্লাহ পাক উনার হাবীব উনার সন্তুষ্টি। আল্লাহ পাক যতটুকু দিয়েছেন ততটুকু পাওয়া হয়েছে। তবে আমার একটা লিখিত দলীল প্রয়োজন ছিল, যে লিখিত দলীলের আমি প্রত্যাশা করেছিলাম। আজকে সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি এটা লিখিত দিয়েছেন। এখন থেকে আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম ‘আমি উনাদের গোলাম’।

আমি বিছাল শরীফ লাভ করলে এই কাগজখানা আমার কাফনের ভিতরে, আমার সিনার মধ্যে রেখে দিতে হবে। এটা আমার ওছীয়ত। আমি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক এবং আল্লাহ পাক উনার হাবীব উনাদের কাছে আরজু করবো, দাবি করবো যে, “ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনার যিনি লখতে জিগার, যিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম তিনি আমাকে লিখিত দিয়েছেন যে, ‘আমি গোলাম’। কাজেই আমার আমল যা কিছু রয়েছে কমপক্ষে এই দলীলের খাতিরে আমাকে গোলাম হিসেবে কবুল করা হোক।” সুবহানাল্লাহ! তিনি যখন এটা ফায়ছালা করলেন, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম এবং তাবিয়ীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের মধ্যে যাঁরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন উনারা সকলেই তখন লা জাওয়াব হয়ে গেলেন।
মূল কথা হলো- উপরোক্ত কুরআন শরীফ, সুন্নাহ শরীফ ও হযরত উমর ফারূক আলাইহিমুস সালাম উনার ওয়াকিয়া শরীফ থেকে সুস্পষ্টভাবে এটাই ফুটে উঠে যে, আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালামগণ উনারা বেমেছাল ফাযায়িল-ফযীলত, মর্যাদা-মর্তবা, বুযূর্গী-সম্মানের অধিকারী। আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি উনাদের সন্তুষ্টি ও রেযামন্দি হাছিল করতে হলে প্রত্যেক উম্মতের জন্য দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে- আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের প্রতি হুসনে জন তথা সুধারণা পোষণ করা, উনাদেরকে মুহব্বত করা এবং উনাদের যথাযথ তা’যীম-তাকরীম করা, সম্মান-ইজ্জত করা। সাথে সাথে এটাও ফুটে উঠে যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে সীমাহীন মুহব্বত, তা’যীম-তাকরীম, সম্মান করেছেন, জান-মাল দিয়ে উনাদের সর্বাত্মক খিদমত করেছেন; যা বলার অপেক্ষা রাখেনা।
(ইনশাআল্লাহ চলবে…Wink

Views All Time
1
Views Today
5
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে