শবেবরাত কি বিদাহ নাকি ধর্মীও রীতি??????


শবেবরাত বা লাইলাতুল বরাত কি?????

আরবী মাসের ১৪ তারিখ দিবা গত রাতকে সাধারণ ভাবে শবেবরাত বা লাইলাতুল বরাত বলা হয়। ‘শবেবরাত’ শব্দটি ফারসী, এর অর্থ হিস্যা বা নির্দেশ পাওয়ার রাত্রী। ‘লাইলাতুল বরাত’ আরবী শব্দ যার অর্থ বিচ্ছেদ বা মুক্তির রাত্রি। বাংলাদেশে শবেবরাত ‘সৌভাগ্য রজনী’ হিসেবেই পালিত হয়।

মানুষের ধারনা এই রাতে তাদের আয়ু ও রুযী বৃদ্ধি হয় এবং গুনাহ মাফ হয়। মানুষের হায়াত মউতের ও ভাগ্যের খাতা লেখা হয়। অনেকে মনে করেন এই রাতে মৃতদের রুহু গুলো পৃথিবীতে নেমে আসে। আত্মীয়রা দলে দলে গুরস্থানে যায়। হালুয়া রুটির হিরিক পরে যায়। আগরবাতি, মোমবাতি ও আলোকসজ্জার ব্যাবস্থা করা হয়।

কিন্তু এই শবেবরাত কে আবার অনেকে বিদআত বলে গণ্য করে। তাই মুলত এই শবেবরাত নিয়ে আমরা দ্বিধা বিভক্ত।

এখন কোন কিছু নিয়ে মতবিরধ হলে আমাদের কি করতে হবে তা আল্লাহ্‌ পবিত্র কুরআন এ বলছে- “ হে মুমিনগণ, তুমরা আল্লাহ্‌র আনুগত্য করো, অনুগত্ত করো (তার) রাসুলের এবং সেসব লোকদের যারা তুমাদের মাঝে দায়িত্বপ্রাপ্ত, অতঃপর কোন ব্যাপারে তোমারা যদি একে অপরের সাথে মত বিরোধ হয়, তাহলে সে বিষয়টি (ফয়সালার জন্য) আল্লাহ্‌ তায়ালা ও তার রাসুলের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও, যদি তুমরা আল্লাহ্‌র উপর এবং শেষ বিচারের উপর ঈমান এনে থাকো!” [Al Qur’an 4:59]

 

বিদআত কাকে বলে??

“Bid’at” (অভিধান) এর সাহিত্যিক অর্থ “নতুনত্ব, নতুনের প্রবর্তন”. মুলত যে বিশ্বাস বা পদক্ষেপ যা রাসুলুল্লাহ সঃ এর পবিত্র সময়কালীন অনুশীলন ছিল না কিন্তু তার পর চালু ছিল.”

কুরআন ও হাদিসের উপর ভিত্তি করে এবং ইমাম আশ-শাতিবি, ‘বিদাহ’- এর সংজ্ঞা দিয়েছে: ধর্মের নতুন উদ্ভাবিত উপায়, যা Shari’ah সঙ্গে অঙ্গীভূত (বৈধ) ব্যাবস্থা বোঝানো হয় এবং লক্ষ্যে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে অনুসরণ করা হয় যা বৈধ উপায় অর্জন হবে।

বিদাহ এই সংজ্ঞার উপর ভিত্তি করে, ধর্ম জ্ঞানীরা বলেন প্রত্যেক বিদাহ ইসলামে নিষিদ্ধ।

ইমাম মালিক বলেছেন, “যে কেহ, ইসলামের মধ্যে একটি নতুনত্ব প্রবর্তন করে, যা সে ভালো বলে বিবেচনা করে, সে যেন দাবি করল যে মুহাম্মদ (সাঃ) বার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে  বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মহান আল্লাহর উক্তি পড়ুন,  “আজ আমি (আল্লাহ) তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম, আর তোমাদের উপর আমার (পতিশ্রুত) নেয়ামতও আমি (আল্লাহ) পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের জীবন বিধান হিসাবে আমি (আল্লাহ)  ইসলামকেই মনোনীত করলাম।” অধ্যায় 5, সূরা আল Maidah, আয়াত 3

সুতরাং তখন যা কিছু ধর্মে ছিল তা এখনও আছে। এবং যা এই উম্মাহর প্রথম অংশে সংশোধিত হয়েছে তা ছাড়া এই উম্মাহর শেষ অংশ আর সংশোধিত করা হবে না”

একটি প্রয়োজনীয় সম্পুরক যে ভাল বিদাহ বলে কিছু নেই।যদি ভালো বিদাহ বলে কেও দাবি করে তবে হয় সেটা ভালনা, অথবা সেটা বিদাহ না।

চলুন তাহলে আমরা আল্লাহ্‌র পবিত্র কুরআন ও রাসুলের দিকে ফিরে যাই। নবী সঃ এর সময় শবেবরাত কি পালিত হত নাকি নাকি হতনা তা জানি।

Dr Zakir Naik তার এক বক্তব্যে বলেছেন- 15 শাবান রাতকে গুরুত্ব প্রদান, কবরস্থান জিয়ারত, অতিরিক্ত ইবাদাত করা  এবং  বিশেষভাবে 15th শাবান উপলক্ষ্যে অতিরিক্ত নফল নামাজ পরা, আলোক শয্যা করা, এটি মৃতদের ঈদ হতে বিবেচনা করা এবং 15 শাবান পুরো রাতের জন্য জাগ্রত থাকা এবং অন্যদের একই কাজ করতে উত্সাহিত করা—- এই সব বিদাহ (নতুনত্ব)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবীরা এরকম করেনি কিংবা এটা করতে মুসলমানদের আদেশ করেনি।

আমরা নবী এবং তার সাহাবীগন এর সমগ্র খাঁটি Seerah এর মধ্যে শবেবরাতের কোনো প্রমাণ খুঁজে পাই না। আল্লামা ইবনে Rajab আবু বকর তুরতশি, ইবনে Wazzah Qurtubi, সুউতি, Shokani ইত্যাদি  এর মতে – এই বিষয় সংক্রান্ত সমস্ত হাদিস দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য।

সাধারণত 15 শাবান রাতে ইবাদাত সমর্থন করে যে হাদীস উদ্ধৃত করা হয়, Muhaddiseen (হাদিস বিশারদ) অনুযায়ী তা Zaif (দুর্বল)  এবং কার্যে পরিণত করা হয় না.

যেমন, আয়েশা (R.A.) হতে বর্ণিত, “একদা রাত্রিতে আমি আল্লাহর রসূল (সঃ) না পেয়ে দেখি তিনি একাকি মদীনার বাক্বী গোরস্থানে। সেখানে তিনি একপর্যায়ে আমাকে (আয়েশা R.A.) কে লক্ষ করে বলেনঃ তুমি কি ভয় পাচ্ছ যে আল্লাহ্‌ এবং তার রাসুল সঃ তোমার সাথে অবিচার করবেন? আমি (আয়েশা) বল্লামঃ আল্লাহর রসূল, আমি ভাবছিলাম যে আপনি হয়ত অন্য বিবিদের কাছে গেছেন। আল্লাহর রসূল (সঃ) বললেনঃ মধ্য শাবানের দিবাগত রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং ‘কল্ব’ গোত্রের ছাগল সমুহর লোম সংখ্যার চাইতে অধিক সংখ্যক লোককে মাফ করে থাকেন।”  (Tirmidhi, Hadith No. 739; Sunan Ibn-I-Majah, Hadith No. 1389; Ahmad Vol. 6, 238)

ইমাম বুখারী ও Tirmidhi অনুযায়ী, উপরে উল্লিখিত হাদীসে দুটি জায়গায় বর্ণনাকারীর একটি ভাঙা শৃঙ্খল আছে এবং সেহেতু এটি দুর্বল হাদীস। এই হাদিসটিতে হাজ্জাজ ইবনে আরত্বাত নামক একজন রাবী আছেন। আল্লামাহ ইবনুল আরাবি (543H), তার ভাষ্যে উল্লেখ করেন, হাজ্জাজ ইবনে আরত্বাত নির্ভরযোগ্য নয়। Sunan -At-Tirmidhi, titled ‘Arizatul-Ahwazi’, Vol 3, Pg No. 216 adds: ‘….further

যাই হক, এটা প্রমানিত যে নবী সঃ আল্লাহ্‌র নির্দেশে বাক্বী কবরস্থান পরিদর্শন করেছেন ও আহলে বাক্বীদের জন্য দুয়া করেছেন, কিন্তু সঠিক কোন রাত্রে তিনি এটি করেছেন তার পরিষ্কার কোন প্রমান নেই। নবী সঃ এটা করেছেন আল্লাহ্‌র নির্দেশে,  সুতরাং নবী এই আইনের একটি ব্যতিক্রম ছিল.

আয়েশা (R.A.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন যে: “জিবরাইল (আঃ) আমার কাছে এসেছিল এবং বললঃ আপনার রব আপনাকে আদেশ করেছেন বাক্বী কবরস্থানে যেতে এবং তাদের জন্য দুয়া চাইতে।”

সুতরাং আমাদের কবরস্থানে যাওয়া ও মৃত বেক্তির জন্য দুয়া চাওয়ার অনুমতি আছে, কিন্তু এটি করার জন্য বিশেষ ধর্মীও/সদ্গুণ হবেন তা বিবেচনা করে একটি নির্দিষ্ট দিন বা রাত ঠিক করার অনুমতি নেই যদি না আমরা কুরআন বা সাহি হাদিস থেকে এরকম করার পক্ষে কোন প্রমান খুজে পাই।

আল্লামাহ ইবনুল আরাবি লিখেছেনঃ “১৫ই শাবান সমন্ধে নির্ভরযোগ্য কোন হাদিস নেই। যদিও কিছু মন্তব্যকারীদের দাবি করে, Surah Dukhan, chapter 44, verse 4ঃ ‘এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় ফয়সালা হয়।’। কিন্তু এটা সত্য নয়। কারন আল্লাহ শাবান মাসে কোরান নাযিল করেনি। কুরআন নাযিল হয়েছিল রমজান মাসে Surah Baqarah, chapter 2, verse 185 “রোযার মাস (এমন একটি মাস) যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে,”।  সুতরাং যে ব্যাক্তি উপরক্ত বিবৃতি দেয়, সে অসতর্কতার ফলে আল্লাহ (SWT) এর পবিত্র কুরআনের বানী লঙ্ঘন করল।” (Arizatul Ahwazi, Vol. 3, Page No. 217)

সহীহ মুসলিম হাদীস অনুযায়ী (Vol. 2, Hadith No. 1885:) “অধিকাংশ মন্দ বিষয় তাদের হচ্ছে নতুনত্ব, এবং প্রত্যেক নতুনত্ব ভুল”

তাই মুসলমানদের সব নতুনত্ব এবং বিদাহ সম্বন্ধে হুঁশিয়ার থাকা উচিত।

আসুন বিদআত সম্পর্কিত কিছু তথ্য জানি।

Aisha (RA) বর্ণিত: আল্লাহর রাসুল(সঃ) বলেছেন ” যদি.কেও এমন কিছু প্রবর্তন করে যা আমাদের ধর্ম, নীতির সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ,  তা প্রত্যাখ্যাত হয় ,” বুখারী, ভলিউম 3, বই 49, সংখ্যা 861।

ইমাম আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত যে আল্লাহ এর নবী  (সাঃ) বলেছেন “যে কেউ একটি নতুনত্ব (ধর্মে) প্রবর্তন করে, তিনি এর জন্য দায়বদ্ধ হবে।  যে কেউ একটি নতুনত্ব প্রবর্তন করে বা নতুনত্ব (ধর্মে) প্রবর্তনকারী বেক্তিকে  যে আশ্রয় দেয়, তিনি আল্লাহ দ্বারা , তাঁর ফেরেশতা দ্বারা, এবং সমস্ত মানুষের দ্বারা অভিশপ্ত হয়।

যাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) দ্বারা বর্ণীত আছে,  নবী মোহাম্মদ (সাঃ) একটি নৈতিক বক্তৃতায় (খুতবা)  বলেছেন   “শ্রেষ্ঠ বানী আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থ আল- কুরআন, এবং শ্রেষ্ঠ নির্দেশিকা হচ্ছে আমার (মুহাম্মদ সঃ)কর্তৃক প্রদত্ত। সবচেয়ে মন্দ বিষয় নতুনত্বএবং প্রতি নতুনত্যে  ত্রুটি থাকে ” (reported by Muslim, no. 867)

khutbah haajah সম্পর্কে হাদিস , যার একটি অংশ বলেছেন: ওই কাজ খারাপ যা সদ্য উদ্ভাবিত করা হয়; প্রত্যেক সদ্য উদ্ভাবিত বিষয় একটি নতুনত্ব এবং প্রতি নতুনত্ব বিপথে যাচ্ছে; এবং প্রত্যেক বিপথগামী জাহান্নামী; (Reported by al-Nisaa’i in al-Sunan, Salaat al-‘Eedayn, Baab kayfa al-Khutbah). Reports with the same meaning were narrated via Jaabir (may Allaah be pleased with him) by Ahmad, via al-‘Irbaad ibn Saariyah by Abu Dawud and via Ibn Mas’ood (may Allaah be pleased with him) by Ibn Maajah.

সবশেষে বলব নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী ও ইনশাআল্লাহ তিনি আমাদের সঠিক পথ দেখাবেন। আপনাদের কারো কাছে যদি কুরআন ও সাহি হাদিস থেকে শবেবরাতের পক্ষে কোন প্রমান থাকে তা আমাকে জানাতে পারেন।

[হাদিস ও কুরআনের অনুবাদ গুলো রেফারেন্স হিসাবে ব্যাবহারের পূর্বে কুরআন ও হাদিসের সাথে মিলিয়ে নেওয়া উত্তম]

Md. Khaledul Islam.

SKYPE- Khaledul.islam3

Email/ facebook- khaledul.islam1@gmail.com

Dhaka-1212. Bangladesh.    

Views All Time
2
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+