দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনার উপর আমলের বিষয়ে শরয়ী ফায়সালা


কোন একটি হাদীছ শরীফ উনার মূল বিষয় থাকে ২টি-

১) সনদ (Chain) : পবিত্র হাদীছ শরীফ বর্ণনাকারী বা রাবীদের সিলসিলাকে সনদ বলে।

২) মতন (Text) : সনদ ব্যতীত মূল বক্তব্যকে মতন বলে।

সনদ ও মতন মিলেই একটি হাদীছ শরীফ গঠিত হয়।

পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের মধ্যে অনেক প্রকারভেদ রয়েছে। সাধারণত পবিত্র হাদীছ শরীফ তিন প্রকার। ১) ছহীহ হাদীছ শরীফ, ২) হাসান হাদীছ শরীফ ও ৩) দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ।

১) ছহীহ হাদীছ শরীফ : যে হাদীছ শরীফ উনার সনদে প্রত্যেক রাবী পূর্ণ আদালত ও জবত গুণ সম্পন্ন এবং হাদীছ শরীফখানা যাবতীয় দোষত্রুটি মুক্ত তাকে ছহীহ হাদীছ শরীফ বলে।

২) হাসান হাদীছ শরীফ : যে হাদীছ শরীফ উনার সনদে কোন রাবীর জবত গুণের পরিপূর্ণতার অভাব রয়েছে তাকেই হাসান হাদীছ শরীফ বলে। ফক্বীহগণ সাধারণত ছহীহ ও হাসান হাদীছ শরীফ উনাদের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করেন।

৩) দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ : যে হাদীছ শরীফ উনার সনদে কোন রাবী হাসান হাদীছ শরীফ উনার রাবীর গুণ সম্পন্ন নন তাকে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ বলে।

কোন হাদীছ শরীফই দ্বয়ীফ নয় অর্থাৎ নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কোন কথা মুবারকই দ্বয়ীফ নয় বরং রাবীর দূর্বলতার কারণে হাদীছ শরীফ দ্বয়ীফ বলা হয়। দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনার দ্বু’ফ বা দূর্বলতা কম ও বেশি হতে পারে। কম দূর্বল হলে হাসানের নিকটবর্তী থাকে আর বেশি দূর্বল হলে মওজুতে পরিণত হতে পারে। প্রথম পর্যায়ের দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ আমলে উৎসাহিত করার জন্য বর্ণনা করা যেতে পারে বা করা উচিত। তবে আইন প্রণয়নে গ্রহণযোগ্য নয়।

হযরত ইমাম ইবনে হুমাম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

الضعف غير المضوع يعمل به في فضائل الاعمال

অর্থ : “দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ যা মওজু নয় তা ফযীলতের আমলসমূহে গ্রহণযোগ্য।” (ফতহুল ক্বাদীর)

বিখ্যাত মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

الضعيف يعمل به فى فضائل الاعمال اتفاقا

অর্থ : “সকলেই একমত যে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ ফযীলত হাছিল করার জন্য আমল করা যায়িয আছে।” (আল মওজুয়াতুল কবীর, পৃষ্ঠা ১০৮)     

এ ছাড়াও মুকাদ্দিমায়ে ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দিমায়ে ইবনুছ ছালাহ, মুকাদ্দিমায়ে ইমাম আবু আমর, মুকাদ্দিমায়ে জুরজানিয়া, শরহে ফাইতুল মুছান্নাফ, তাকরিবুন নাওয়াবী, হেসনে হাসানী, ফতহুল মুবীন, হাদীছ শরীফ-এ আরবাঈন লি ইবনে হাযার আসকালানী, হাদীছ শরীফ-এ আরবাঈন লি ইমাম নবাবী, হাদীছ শরীফ-এ আরবাঈন লি ইমাম গাজজালী, কুওওয়াতুল কুলুব (ইবনে হাযার মক্কী), আল বায়িসুল হাছীছ ফি ইখতেছারে উলুমিল হাদীছ, মাকাসিদে হাসনাহ, মাকালাতে কাওসারী আফুবাতুল ফায়েলাহ (আবদুল হাই লাক্ষৌবী রহমতুল্লাহি আলাইহি), ইলাউস সুনান, দুররুল মুখতার, তালীকাতে বরকতী মুফতী সাইয়্যিদ আমীমুল ইহসান বরকতী, শামী, মুকাদ্দিমায়ে ফতহুল মুলহীম, যাফরুল আমানী, কাওলুল বদি, শরহে মুনীয়া আল্লামা হালবী, আল আছকার শায়খুল ইসলাম আবু যাকারিয়া আল হারাবি রহমতুল্লাহি আলাইহি, আওয়ারিফুল মাআরিফ শায়েখ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়াদী রহমতুল্লাহি আলাইহি ইত্যাদি কিতাবে এবং

হাফিজ শামসুদ্দীন যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিজ সাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিজ যায়নাঈ রহমতুল্লাহি আলাইহি, হাফিজ জয়নুদ্দীন ইরাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি, শায়েখ যাকারিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইবনে সাইয়্যিদুন্নাস রহমতুল্লাহি আলাইহি ও আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহমতুল্লাহি আলাইহি এ সমস্ত ফকীহগণ উনাদের স্ব-স্ব কিতাবে আমলের ক্ষেত্রে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফকে গ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কথা হল কোন দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ যদি বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণনা করা হয় তাহলে তা হাসান লি গায়রিহির দরজায় পৌঁছে যায় এবং এটা তখন আহকাম, আকায়িদের দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।

আল্লামা সুয়ুতী রহমতুল্লাহি উল্লেখ করেন,

ويعمل بالضعيف ايضافى الاحكام اذا كان فيه احتيا ط

অর্থ : “দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ আহকামের জন্য গ্রহণযোগ্য যখন ওতে সাবধানতা অবলম্বন করা হবে অর্থাৎ যখন হাসান লি গায়রিহি হবে।” (তাদরিবুর রাবী, ২৯৯ পৃষ্ঠা)

আল্লামা জাফর আহমদ উছমানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও উনার ইলাউস সুনান কিতাবের মুকাদ্দিমার ৫৮ পৃষ্ঠায় হযরত ইমাম সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ইবারত উল্লেখ করেছেন।

উপরোক্ত বর্ণনার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ ফযীলত হাছিলের জন্য আমল করা শুধু জায়িযই নয় বরং হাসান লি গাইরিহি হলে আহকামের ব্যাপারেও গ্রহণযোগ্য হয়। দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ দ্বারা সাব্যস্ত মুস্তাহাব সব সময় আমল করলেও তা ফরয, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদায় পরিণত হয় না। বরং মুস্তাহাবই থেকে যায়।

যেমন আল্লামা ইবরাহী হালবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার গুনিয়াতুল মুস্তামালী ফি শরহে মুনিয়াতুল মুছাল্লি কিতাবে উল্লেখ করেছেন-

يستحب ان يـمسح يدئه يبنديل بعد الغسل لـماروت عاشه عليها السلام قالت كان للهنبى صلى اله تعالى عليه وسلم خر قة يثنق بـها بعد الوضؤ رواه التر مدى وهو ضعيف ولكن يـجوذيـجز العمل بالضعيف فى الفضال.

অর্থ : “গোসলের পরে রূমাল (কাপড়) দিয়ে শরীর মোছা মুস্তাহাব। হযরত ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনার থেকে বর্ণিত আছে। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এক টুকরা কাপড় (রূমাল) ছিল যা দিয়ে তিনি উযূর পরে শরীর মুবারক মুছতেন। (তিরমিযী শরীফ)

এটা দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ। ফযীলত হাছিল করার জন্য দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ আমল করা জায়িয আছে।”

হযরত ইমাম মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার মওজুআতে কবীরে ১০৮ পৃষ্ঠায় বলেন,

الضعيف يعمل به فى فضائل الاعمال اتفاقاول ذا قال اءمتنا ان مسح الر قبة مستحب او سئة.

অর্থ : “সকলে একমত যে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ ফযীলত হাছিল করার জন্য আমল করা জায়িয আছে। এজন্য আমাদের আইম্মায়ি কিরামগণ বলেছেন, উযূর মধ্যে গর্দান মসেহ করা মুস্তাহাব বা সুন্নত। এ হাদীছ শরীফও দ্বয়ীফ। এটাও ফযীলত হাছিলের জন্য আমল করা যায়।”

মূলত মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য বা সন্তুষ্টি হাছিল করতে হলে মুস্তাহাব বা নফল বেশি বেশি আমল করতে হবে। পবিত্র হাদীছে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, বান্দারা নফল (মুস্তাহাব) ইবাদত করতে করতে আমার এত নৈকট্য লাভ করে যে আমি উনাকে মুহব্বত করি। আমি যখন উনাকে মুহব্বত করি তখন উনার কান হয়ে যাই, তিনি আমার কানে শুনেন। আমি উনার চোখ হয়ে যাই তিনি আমার চোখে দেখেন। আমি উনার জবান হয়ে যাই, তিনি আমার জবানে কথা বলেন। আমি উনার হাত হয়ে যাই, তিনি আমার হাতে ধরেন। আমি উনার পা হয়ে যাই তিনি আমার পায়ে চলেন। তিনি আমার কাছে যা চান, তাই উনাকে দেই। (বুখারী শরীফ, মিশকাত শরীফ)

বান্দা কখনও আল্লাহ পাক হতে পারবেন না এবং মহান আল্লাহ পাক তিনিও বান্দা হন না। উক্ত হাদীছ শরীফ দ্বারা বান্দা যে মহান আল্লাহ পাক উনার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রনাধীন হয়ে যান উনার মত মুবারক অনুযায়ী মত পোষন করেন তাই বুঝানো হয়েছে।

নিয়মিত আমল যা মুস্তাহাবকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা, ওয়াজিব বা ফরজে পরিণত করে না তার উদাহরণ হলো-উযূতে গর্দান মাসেহ করা ও উযূ-গোসলের পর কাপড় (রূমাল) দিয়ে শরীর মোছা; এ দু’টি কাজ নিয়মিতভাবে করে না এমন লোক অত্যন্ত কম। অর্থাৎ প্রায় সকল মুসলমানই এ কাজ দু’টি করে থাকে। তা সত্ত্বেও এ মুস্তাহব আজ পর্যন্ত ফরয, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদার পরিণত হয়নি। আর কোন দিন হবেও না। বরং সবাই এ দু’টিকে মুস্তাহাব জ্ঞান করেই নিয়মিত আমল করে আসছে। সুতরাং মুস্তাহাব আমল করতে হবে। কিন্তু যবরদস্তি করা যাবে না। তবে উৎসাহ পয়দা করার জন্য বুঝানো যেতে পারে। আমল করার নিয়ত থাকবে মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্য লাভ।

উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা এটাই ছাবিত হল যে মুস্তাহাব (নফল) আমল দ্বারা মহান আল্লাহ পাক উনার পরিপূর্ণ নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কারণ ফরয, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা অবশ্যই পালন করতে হবে; এবং মোটামুটিভাবে সবাই করেও। আর তাই এ দিক দিয়ে সকলেই প্রায় সমান মর্যাদার অধিকারী, যদিও ইখলাছের কারণে পার্থক্য হয়ে থাকে। মূলত মর্যাদা বা মহান আল্লাহ পাক উনার নৈকট্যের দিক দিয়ে পার্থক্য সূচিত হয় মুস্তাহাব (নফল) আমল দ্বারা।

যেমন, ফরয নামায পাগড়ী ছাড়া পড়লে এক রাকায়াতে ১ রাকায়াতের ছওয়াব পাওয়া যাবে। আর যদি পাগড়ীসহ নামায পড়ে তবে এক রাকায়াতে ৭০ রাকায়াতের ছওয়াব পাওয়া যাবে। যদিও পাগড়ী পড়া ফরয, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা কোনটাই নয়। তথাপিও সুন্নতে যায়িদা বা মুস্তাহাব ফরযকে ৭০ গুণ মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিল। এভাবে মুস্তাহাব প্রত্যেক আমলের ক্ষেত্রেই মূল আমলকে মর্যাদাবান করে দেয়। এমনকি যে ব্যক্তি নিজে বেশি মুস্তাহাব আমল করেন তিনিও মর্যাদাবান হয়ে যান। যেমন হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত ইমামগণ ও আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা মুস্তাহাব আমল করে মর্যাদাবান হয়েছেন।

দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনাকে গুরুত্ব, সম্মান বা মর্যাদা না দিলে গযবে বা মসিবতে পড়তে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ থেকে দুটি ঘটনা বর্ণনা করা হল। এতে চিন্তা ফিকিরের যথেষ্ট উপাদন আছে।

ইয়াওমুল আরবিয়ায়ি বা বুধবার ও ইয়াওমুস সাবতি বা শনিবার দিনে শিঙ্গা লাগানো দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনার দ্বারা নিষেধ আছে,

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم من يوم الاربعاء ويوم السبت فا صابه برص- ا احتجم.

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি ইয়ামুল আরবিয়ায়ি বা বুধবার ও ইয়াওমুস সাবতি বা শনিবারে শিঙ্গা লাগাবে তার শ্বেত কুষ্ঠ রোগ হবে।”

(১)

এ প্রসঙ্গে ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার “লালী” ও “তাআক্কুবাত” কিতাবে মুসনাদুল ফিরদাউসে দায়লামী শরীফ হতে নকল করেছেন,

سـمعت ابى يقول سـمعت اب عمرو مـحمد بن جعفر بن مطر النيشافورى قال قلت يوما ان هذا الـحديث ليس بصحيح فا فتصدث يوم الاربعا فاصابنى البرص فرأيت رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم فى النوم فشكوت اليه حالى فقال اياك والا ستهانة بـحديشى فقلت بست يا رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم فا نتبهت وقد عا فانى الله تعالى وذالك عنى.

অর্থ : “আমি আমার পিতার নিকট শুনেছি, তিনি আবূ উমর মুহম্মদ জাফর নিশাপুরী উনাকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন আমি একদিন খেয়াল করলাম পবিত্র হাদীছ শরীফখানা ছহীহ নয়। তাই জরুরতবশত: ইয়াওমুল আরবিয়ায়ি আমি শিঙ্গা লাগালাম। অতঃপর আমার শ্বেত কুষ্ঠ হয়ে গেল। এরপর স্বপ্নে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখে আমি আমার অবস্থা সম্পর্কে অভিযোগ করলাম। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, সাবধান! আমার হাদীছ শরীফ উনাকে হালকা মনে কর না (হাদীছ শরীফ যদিও দ্বয়ীফ হয়েছে রাবীর কারণে তথাপিও আমার নামের সাথে সম্পর্কযুক্ত)। অতঃপর আমি বললাম, ইয়া রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি তওবা করতেছি (আমার অপরাধ হয়েছে। নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ক্ষমা করে দিলেন) অতঃপর আমি ঘুম থেকে জেগে দেখি মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে ক্ষমা করেছেন এবং এর চিহ্ন মাত্র আমার শরীরে নেই।”

হযরত ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার আরবাইন কিতাবেও এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

(২)

আল্লামা তাহতাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি হাশিয়ায়ে দুররে মুখতারে বলেন, পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে আছে-

النهى عن قص الاظنار يوم الاريعاء فانه يورث البرص.

অর্থ : “পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইয়াওমুল আরবিয়ায়ি নখ কাটা নিষেধ করা হয়েছে। নিশ্চয়ই এতে শ্বেত কুষ্ঠ হয়।”

এ প্রসঙ্গে আল্লামা শিহাবুদ্দীন খাফাজী মিসরী হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি “নাসিমুর রিয়াজ ফি শরহে ইমাম কাজি ইয়াজ” কিতাবে বলেন-

قص الاظفار رتقليمها سنة و ورد النهى عنه فى يوم الاربعاء وانه يورث البرص و حكى بعض العلماء ائه فعله فنهى عنه فقال لـم يثبت هذا الله فلحقه البرص من ساعته قراى النبى صلى الله عليه وسلم فى منا مه فشكى اليه فقال له الـم تسمع نـهى عنه فقال لـم يصح عندى فقال صلى الله عليه وسلم يكفيك انه سـمع ثـم مسح يدنه بيده الضر يفة فذ هب ما يه فتاب عن مـخالفة ما سـمع.

অর্থ : “নখ কাটা বা ছোট করা সুন্নত। তবে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইয়াওমুল আরবিয়ায়ি বা বুধবার নখকাটা নিষেধ করা হয়েছে। কেননা কাটিলে শ্বেত কুষ্ঠ হয়। বর্ণিত আছে কোন একজন আলিম (ইমাম ইবনুল হজ মক্কী মালেকী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি) ইয়াওমুল আরবিয়ায়ি নখ কাটলে তাকে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বরাত দিয়ে নিষেধ করা হয়। তিনি বলেন, ইহা ছহীহ হাদীছ শরীফ বলে প্রমাণিত নয়। অতঃপর উনার শ্বেত কুষ্ঠ হয়ে গেল। তিনি স্বপ্নে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে দেখে উনার অবস্থা সম্পর্কে অভিযোগ করলেন। তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনাকে বলেন তুমি কি এ সম্পর্কে আমার নিষেধ বাণী শুন নাই? তিনি বলেন, এই হাদীছ শরীফ আমার নিকট ছহীহ হিসাবে পৌঁছেনি। তারপর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ঠ ছিল যে তুমি শুনেছ এই হাদীছ শরীফ আমার নাম মুবারকের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর হাত মুবারক দ্বারা উনার শরীর মাসেহ করে দিলেন। তৎক্ষনাৎ সেই রোগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। তৎপর তিনি তওবা করলেন যে জীবনে আর কখনো পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বিরোধিতা করব না।”

উপরোক্ত দু’খানা পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বারা এ কথাই বুঝা গেল যে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ না করলে ভয়ংকর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, শরহে আকায়িদে নসফী ও অন্যান্য আকায়িদের কিতাবের বর্ণনা মুতাবিক পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল বা অবজ্ঞা প্রদর্শন করা কুফরী।

ইমামগণ প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত রায়ের উপর দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইমাম আ’যম ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-

الله لضعيفص سرو لاالـخبرا عليه وسلم اولى من القياس الله صلى ولا يـحل القياس مع وجوده.

অর্থ : “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণিত, পবিত্র হাদীছ শরীফ যদিও রাবীদের কারণে দ্বয়ীফ হয় উহা ক্বিয়াস হতে উত্তম। যে ক্ষেত্রে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ পাওয়া যাবে সে ক্ষেত্রে কোন অবস্থাতেই ক্বিয়াস হালাল নয়।” (মুকাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান, ৫৯ পৃষ্ঠা)

আব্দুল ফাতাহ বলেছেন,

بل اختلف ساد تنا الـحنفيه- فيما اذا تعارض قول الصحابى والقياس فا يهما يقدم؟ قال فخر الاسلام للبزدوى: اقول الصحا بة مقد مة على القياس.

অর্থ : “হানাফীগণের মধ্যে এ ব্যাপারে ইখতিলাফ আছে যে, যদি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের ক্বওল শরীফ ও ক্বিয়াসের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় তবে কোনটা প্রাধান্য পাবে? এর জবাবে ফখরুল ইসলাম বায়দুবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের ক্বওল শরীফই প্রাধান্য পাবে।” (মুকাদ্দিমায়ে ইলাউস সুনান, ৫৯ পৃষ্ঠা)

উল্লেখ্য যে, ক্বিয়াসকে দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনার উপর প্রাধান্য দেওয়া তো দূরের কথা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের কথা মুবারক বা ক্বওল শরীফের উপরও ক্বিয়াসকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না।

জামিউর রুমুজ কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ২০ বছর যাবৎ উযূতে পায়ের অঙ্গুলীর উপর দিয়ে খিলাল করে নামায পড়েছিলেন; পরে যখন জানতে পারলেন পায়ের আঙ্গুলের নীচে দিয়ে খিলাল করা মুস্তাহাব তখন তিনি বিগত ২০ বছরের সম্পূর্ণ নামায ক্বাযা পড়েছিলেন।

ফতওয়া আলমগীরিফতহুল ক্বাদির কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে- নামাযের মধ্যে যদি মাকরূহ তাহরীমী হয় তবে নামায দোহরান ওয়াজিব। আর মাকরূহ তানযীহি হলে দোহরান মুস্তাহাব। নামাযের মধ্যে কোন মুস্তাহাব তরক হলে বা ছুটে গেলে নামায দোহরানোর আদেশ ইসলামী শরীয়ত উনার মধ্যে নেই। তা সত্ত্বেও হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি মুস্তাহাবের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য তথা মুস্তাহাবের প্রতি সবাইকে উৎসাহিত করার জন্য পায়ের আঙ্গুলের নীচ দিয়ে খিলাল করে উযূ সম্পন্ন করে ২০ বছরের নামাযের ক্বাযা আদায় করেছেন।

হযরত ইমাম আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার উপরোক্ত ঘটনায় এটাই ছাবিত হয় যে, তিনি ক্বিয়াসের উপর পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাকে বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছেন আর মুস্তাহাবকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কষ্টসাধ্য হওয়া সত্ত্বেও ২০ বছরের নামায দোহরায়ে পড়েছেন।

উল্লেখ্য যে, এমন কোন কিতাব নেই যে কিতাবের সমস্ত হাদীছ শরীফ উনাদের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে সমস্ত মুহাদ্দিছিনগণ একমত হয়েছেন। কোন একটি হাদীছ শরীফ উনাকে কোন একজন ছহীহ বলেছেন, আরেকজন দ্বয়ীফ বা হাসান বলেছেন ইত্যাদি। যেমন, ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা এমন বহু হাদীছ শরীফ ছহীহ নয় বলে ছেড়ে দিয়েছেন অথচ ইমাম আবূ দাঊদ রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম তিরমিযী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম নাসায়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম দারে কুতনী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রমুখ ইমামগণ উক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ ছহীহ বলে গ্রহণ করেছেন। (সায়েকাতুল মুসলিমীন)

এমনকি অনেক পবিত্র হাদীছ শরীফ ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম মুসলিম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা গ্রহণ করেছেন যা ছিহাহ সিত্তার অন্যান্য ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা গ্রহণ করেননি।

হযরত মুল্লা আলী ক্বারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেছেন, ইমাম ছাখাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাবের হাশিয়ায় উল্লেখ করেছেন, ছহীহ বুখারী শরীফ উনার মধ্যে ৮০ জন ও ছহীহ মুসলিম শরীফ উনার মধ্যে ১৬০ জন রাবীর বর্ণনাকৃত হাদীছ শরীফ দ্বয়ীফ বলে প্রমাণিত হয়েছে। (নুজহাতুন নাজার)

ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ইমাম দারে কুতনী রহমতুল্লাহি আলাইহি, আবু আলী রহমতুল্লাহি আলাইহি ও আবূ দাউদ দামেশকী রহমতুল্লাহি আলাইহি বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উনাদের মধ্যে ২০০ হাদীছ শরীফ দ্বয়ীফ বলে উল্লেখ করেছেন। (মুকাদ্দিমায় শরহে মুনাম)

ইমাম কুস্তলানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, ছহীহ বুখারী শরীফ উনার মধ্যে এরূপ হাদীছ শরীফ আছে যা কারো মতে ছহীহ আর কারো মতে দ্বয়ীফ। (শরহে বুখারী)

কাশফূজ্জুনুন, মুকাদ্দিমায়ে ফতহুল বারী ইত্যাদি কিতাবে বুখারী শরীফ উনার কিছু কিছু হাদীছ শরীফ উনাদেরকে দ্বয়ীফ বলে প্রমাণ করা হয়েছে।

ছহীহ বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উনাদের মধ্যে ২০ জন মরজিয়া, ২৩ জন কদরিয়া, ২৮ জন শিয়া, ৪ জন রাফেজী, ৯ জন খারেজী, ৭ জন নাসেবী ও ১ জন জহমিয়া কর্তৃক হাদীছ শরীফ বর্ণিত হয়ছে। (সায়েকাতুল মুসলিমীন ১৯০ পৃষ্ঠা)

এর দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, সমস্ত ছহীহ হাদীছ শরীফ উনার কিতাবেই (কারো কারো মতে) কিছু সংখ্যক দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ রয়েছে। সুতরাং এটাও প্রমাণিত হল যে, দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ মাত্রই পরিত্যজ্য বা বাতিল নয়।

এখানে বলা আবশ্যক যে, ছিহাহ সিত্তাহ ছাড়াও ৫০ এর অধিক ছহীহ হাদীছ শরীফ বিষয়ক কিতাব রয়ে গেছে যা ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইবনে সালাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি, শাহ আব্দুল আযিয রহমতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন, ছহীহ বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফ উনাদের মত আরো কতগুলি হাদীছ শরীফ উনার কিতাব আছে, যেমন-

(১) ছহীহ ইবনে খুযায়মা,                       (২২) মুসনাদে আব্দ ইবনে হুমায়িদ,

(২) ছহীহ ইবনে হাব্বান,                        (২৩) মুসনাদে আবূ দাউদ তায়ালাসী,

(৩) ছহীহ ইবনে উয়ায়না,                       (২৪) সুনানু দারে কুতনী,

(৪) ছহীহ ইবনুস সাকান,                        (২৫) সুনানে দারিমী,

(৫) ছহীহ মুন্তাকা,                                (২৬) সুনানে বায়হাক্বী,

(৬) মুখতাসারেজিয়াহ,                           (২৭) মা’রিফাতু সুনানে বায়হাক্বী,

(৭) ছহীহ যুরকানী,                              (২৮) মা’য়ানিয়ুল আছার-তহাবী,

(৮) ছহীহ ইসফেহানী,                           (২৯) মুশফিক্বিয়ুল আছার-তহাবী,

(৯) ছহীহ ইসমাঈলী,                            (৩০) মু’জামুল কবীর-তিবরানী,

(১০) মুস্তাদরাক ইবনে হাকিম,                 (৩১) মু’জামুল আওসাত-তিবরানী,

(১১) মুসনাদে ইমাম আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি,  (৩২) মু’জামুছ ছগীর-তিবরানী,

(১২) মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি,  (৩৩) কিতাবুল ই’তিক্বাদ,

(১৩) মুয়াত্তায়ে ইমাম মুহম্মদ,                (৩৪) কিতাবুদ্ দোয়া,

(১৪) কিতাবুল আছার,                         (৩৫) মুসনাদে হারিস ইবনে উমামা,

(১৫) কিতাবুল খিরাজ,                         (৩৬) মুসনাদে বাজ্জাজ,

(১৬) কিতাবুল হিজাজ,                        (৩৭) সুনানে আবী মুসলিম,

(১৭) কিতাবুল আ’মালী,                      (৩৮) সুনানে সাঈদ বিন মনছূর,

(১৮) মুসনাদে শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি, (৩৯) শরহুস্ সুন্নাহ,

(১৯) মুসনাদে আবূ ইয়ালী,                      (৪০) শিফা,

(২০) মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক,                  (৪১) হুলইয়া,

(২১) মুসনাদে আবূ বকর ইবনে আবী শায়বা, (৪২) তাহযীবুল আছার,

(৪৩) আল মুখাতারা ইত্যাদি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ছহীহ কিতাবসমূহ।

দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ উনার উপর আমল করা যে জায়িয, তার নমুনাস্বরূপ আরো কিছু পবিত্র হাদীছ শরীফ উল্লেখ করা হল-

عن حضرة ابى الدرداء رضى الله تعالي عنه قال رسول الله صلى الله عليه وسلم فقيل يا رسول الله ما حد العلم الذى اذا بلغه الرجل كان فقيها؟ فقتل رسول الله صلى الله عليه وسلم: من خفظ على امتى ا اربعين حديثافى امر دينها بعثه الله فقيها و كنت له يوم القيمة شافعا وشهيدا-

رواه البيقى فى شعب الا يـمان قال قال الا لـماء احـمد هذا متن مشهور فيما بين الناس وليس اسناد صحيح.

অর্থ : “হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে জিজ্ঞাসা করা হল এবং বলা হল- ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ইলমের কোন্ সীমায় পৌঁছলে কোন ব্যাক্তি ফক্বীহ হতে পারে? উত্তরে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আমার উম্মতের জন্য তাদের দ্বীন উনার ব্যাপারে ৪০টি হাদীছ শরীফ ইয়াদ করেছে, (এবং অপরকে তা পৌঁছিয়েছে) কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ পাক উনাকে ফক্বীহরূপে উঠাবেন। এ ছাড়া কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সুপারিশকারী ও সাক্ষী হব। ইমাম হযরত বায়হাক্বী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার শু’য়াবুল ঈমান কিতাবে ইহা বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন- পবিত্র হাদীছ শরীফখানা লোকের মধ্যে মশহুর তবে এর কোন ছহীহ সনদ নেই।

এ পবিত্র হাদীছ শরীফখানা দ্বয়ীফ হওয়া সত্ত্বেও ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম ইবনে হাযার আসকালানী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারাসহ অনেক ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ফযীলত হাছিলের লক্ষ্যে “হাদীছে আরবাইন” নামক কিতাব রচনা করেছেন।

শুধু তাই নয়, এ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার ফযীলত হাছিলের লক্ষ্যে স্কুল, কজেজে, ইউনিভার্সিটি ও মাদ্রাসায় পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে চল্লিশ হাদীছ সংঙ্কলন করে পড়ানো হয়।

وعن انس قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: طلب العلم فريضة على كل مسلم (رواه البيهقى(

অর্থ : “হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  উনার থেকে বর্ণিত বর্ণিত। তিনি বলেন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, ইলম তলব করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয।” (বায়হাক্বী)

এ পবিত্র হাদীছ শরীফখানা দ্বয়ীফ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় প্রত্যেক কিতাবেই এর উদ্ধৃতি এসেছে। ইলমের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বুঝানোর জন্য সমস্ত মুহাদ্দিছীনে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা ইলম অধ্যায়ে এর অবতারণা করেছেন। আর ইলম হাছিলের উৎসাহ প্রদানের জন্য এ পবিত্র হাদীছ শরীফখানা বর্ণনা করেছেন।

উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ দুখানা দ্বারা এটাই ছাবিত হল যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ দ্বয়ীফ হলেও গুরুত্ব মোটেও কমেনা বরং আমলেরও জরুরত রয়ে গেছে। এ জরুরত থাকার কারণেই ইমামগণ এ সমস্ত হাদীছ শরীফ উনাদের উপরে গুরুত্ব সহকারে আমল করেছেন এবং আমল করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

সুতরাং দ্বয়ীফ হাদীছ শরীফ ফযীলত হাছিলের জন্য আমল করা শুধু জায়িযই নয় বরং উক্ত আমল মুস্তাহাব সাব্যস্ত হয়। আর মুস্তাহাব সব সময় আমল করলেও তা ফরয, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদায় পরিণত হয় না বরং মুস্তাহাবই থেকে যায়। তাই এ ব্যাপরে কোন প্রকার বিতর্ক সৃষ্টি করা বা বাড়াবাড়ী করে ফেৎনা সৃষ্টি করা আদৌ জায়িয নেই বরং হারাম। কেউ যদি ইহা আমল করে, তবে ইহাকে যেমন বিদআত বলা যাবে না। তদ্রুপ কেউ যদি না করে, তাকেও গুনাহগার বলা যাবে না। তবে করাটা আফজল বা উত্তম। প্রকৃত জ্ঞানী তো তারাই, যারা ফরযকে ফরয, ওয়াজিবকে ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা, সুন্নতে যায়িদাকে সুন্নতে যায়িদা ও মুস্তাহাবকে মুস্তাহাব হিসেবে মেনে নিবে। জানা আবশ্যক যে, মুস্তাহাবকে যদি আমলের জন্য তাকিদ দেওয়া হয়, তা কখনই ওয়াজিব হবে না। এর বাহিরে যারা মত পোষন করবে তারা সীমা লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে।

Views All Time
1
Views Today
2
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

  1. অসাধারণ পোস্ট। প্রিয়তে রাখলাম

    কিন্তু শিরোনাম নেই কেন ভাইজান?

  2. jaamindar says:

    এরকম পোস্ট দরকার ছিলো।
    সরারসরি প্রিয়তে।

    আপনার জন্য অনেক শুকরিয়া।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে