সন্ত্রাসবাদের নেপথ্য নায়ক বনাম আজকের বাংলাদেশ

চীনের সাথে উপমাহাদেশের চারটি দেশের সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত না থাকলেও বিগত দশকগুলোতে যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা ক্রমেই ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চীনের সাথে পাকিস্তানের এবং মায়ানমারের মধ্যে যে ধরনের কৌশলগত সামরিক সম্পর্ক রয়েছে সে কারণেই ভারতের মতো আগ্রাসী শক্তির দেশটি চীন-পাকিস্তান-মায়ানমারকে যথেষ্ট সন্দেহ করছে। ভারতের আশঙ্কা আছে চীন একসময় ভারতকে ঘিরে ফেলতে পারে। চীনের ভারত মহাসাগরে উপস্থিতি ভারতকে যথেষ্ট প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে ভারত তার নৌশক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারত মহাসাগরে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে ক্রমবর্ধমান চীন-ভারত এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা বাংলাদেশের জন্য মোটেও ভালো হচ্ছে না।
৯/১১-এর সাজানো নাটকের পর থেকে সন্ত্রাসবাদের অজুহাতে যেভাবে ইসলামী দেশগুলোকে ভয়ভীতির মধ্যে রাখা হয়েছে তাতে মুসলিম দেশের নেতারা এখন সত্য কথাও বলতে পারছে না। মুসলিম দেশের নেতারা এক ধরনের জুজুর ভয়ে ভীত। আর এই জুজু তৈরি করছে পশ্চিমা হানাদার বিশ্ব। আফগানিস্তান দখল, ইরাক আক্রমণ, ইরানে হুমকি, পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে হঠাৎ হঠাৎ সন্ত্রাসী আক্রমণ, সেখানে মুসলমান নাম জড়িয়ে যাওয়া- এভাবে ইসালামী দেশগুলোকে সংঘাতের মধ্যে রেখে সরকারগুলোকে আভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে রাখা এবং ওয়াশিংটনের ভাব বলয়ের মধ্যে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু সবারই জানা যে- মুসলমানগণকে সন্ত্রাসী হিসেবে সাজিয়েছে আজকের পশ্চিমা শাসক শ্রেণী।
প্রতিবেশী দেশ ভারতও ইসলাম ফোবিয়াতে ভুগছে এবং তথাকথিত ইসলামপন্থীদের আগ্রাসনের কল্পিত চিত্র এঁকে বাংলাদেশকে বিব্রত করে রাখছে। ‘ভারতে সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করতে পারে’- এসব মিথ্যাচারপূর্ণ কথা বলে এখন পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হচ্ছে বেশি। ভারতীয় কিছু ভাড়াটে বিশ্লেষক আছে, এরা বই লিখছে এবং তা যেন পশ্চিমা বিশ্বেও পাওয়া যায় সে ব্যাপারে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
হিরন্ময় কারলেকারের লেখা ‘বাংলাদেশ নেক্সট আফগানিস্তান’, জয়দীপ সাইকিয়ারের ‘টেরর সান্স ফ্রন্টিয়ার’, ‘বাংলাদেশ ট্রেডিং দ্যা তালেবান ট্রেইল’, ‘ককুন অফ টেরর’- এসব বই-প্রবন্ধ অত্যন্ত বিতর্কিত ও সন্দেহজনক প্রমাণিত হয়েছে। সাইকো বলেছে- “প্রায় সব সমস্যায় বাংলাদেশ ভারতকে যুক্ত করতে চায়। এমনকি মায়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতকে সহযোগিতা না করে অসম্ভব শর্ত জুড়ে দিয়েছে।”
এখান থেকে সাইকোর লেখার আসল উদ্দেশ্যটা বোঝা গেল।
হিরন্ময় কারলেকার লিখেছিলো- “বাংলাদেশের সমাজে অল্পসংখ্যক উদার চিত্তের সিভিল সমাজের সদস্যের কারণে হয়তো আফগানিস্তানের মতো নাও হতে পারে, তবে সংবিধান ১৯৭২ সালের মূলে ফিরে না আসলে ততদিন বাংলাদেশের কপালে কলঙ্ক লেগেই থাকবে।”
বাংলাদেশ কিন্তু ৭২ সালের সংবিধানে ফিরে এসেছে; কিন্তু কলঙ্ক কি গেছে? আর ভারতের মতো ‘বন্ধু’ থাকলে তার শত্রুর প্রয়োজন নেই।
আর কুশীলদের কাজ দেখুন- দেশের একজন তথাকথিত অর্থনীতিবিদ ডঃ আবুল বারাকাত সে লিখেছে- “এ দেশে উগ্র ধর্মবাদীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লগ্নি থেকে আয় ১৮০ বিলিয়ন ডলার এবং এসব অর্থকরী সংস্থা প্রায় ৫ লাখ লোককে নিয়োগ দিয়েছে।”
এর মানে কারলেকারের মতে, ৫ লাখের বেশি লোক সন্ত্রাসী হবার পথে। নাউযুবিল্লাহ!
কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানেন, জয়দীপ সাইকোর লেখা ‘টেরর সান্স ফ্রন্টিয়ার’. ‘বাংলাদেশ ট্রেডিং দ্যা তালেবান ট্রেইল’ বই ছাপাতে অর্থায়ন করেছে এমেরিকার ফোরড ফাউন্ডেশন। বাহ! বাংলাদেশকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানানোর ক্ষেত্রে ভারত-আমেরিকার কি মিল! এই বইটিতে লেখা আছে (১১২-১১৩পৃ)- “বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ হওয়াতে যুক্তরাষ্ট্র মিত্র হিসেবে পেতে চায় বলে কিছুটা নমনীয় তোয়াজ করে চলে।”
হায়রে বন্ধু! যারা শোষণ আর ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু সভ্যতা জানে না; তারা কেমন বন্ধু হবে?
এদিকে ভারত তার নিজের স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে ভাড়াটে লোক দ্বারা। এই অপপ্রচারের টার্গেট হচ্ছে আমেরিকা ও ব্রিটেনের নজর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কারণ আমেরিকাই সারাবিশ্বে মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে এবং সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার ব্যাপারে অপপ্রচার এবং আজকের সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছে তার হীন স্বার্থে।
এসব ভারতীয় বিশ্লেষকরা লস্কর-ই তৈয়্যবার (এলইটি) সাথে ভারতবিরোধী তৎপরতায় বাংলাদেশকে দায়ী করছে। অথচ অবাক বিষয় হচ্ছে- সন্ত্রাসবাদী উত্থানের যাবতীয় বিস্ফোরক, অস্ত্র ও সরঞ্জাম আসছে ভারত থেকে। উত্তর-পূর্ব ভারতে (সাতকন্যা যাদের বলা হয়, যেমন- অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা) বাংলাদেশী মুসলমানদের প্রবেশ করিয়ে ঐসব অঞ্চলকে আলাদা করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নাকি পরিকল্পনা চালাচ্ছে। ‘টেরর সান্স ফ্রন্টিয়ার: ইসলামিক মিলিট্যান্স ইন নর্থ-ইস্ট’ (জয়দীপ সাইকিয়া)- এই বইটিতে সে লিখেছে:- আসাম ও ত্রিপুরার কিছু অংশে রেজিস্টার্ড মাদরাসা ছিল ৮১০টি এখন বিনা রেজিস্টার্ড মাদরাসা হয়েছে ৬৫৬টি, মাসজিদ হয়েছে ৬৭২১টি। তাদের ধারণা আসামসহ বড় অংশ বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হবে। আসলে এসব পরিকল্পিত অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়।
আসুন ভারত যে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত করতে চায় সেটার জবাব আমরা একটি ভিন্নভাবে দেই। সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য দরকার অবৈধ অস্ত্রের। এবার তার একটা পরিসংখ্যান দিচ্ছি।
বিশ্বের মোট ছোট অস্ত্রের প্রায় সাড়ে ৭ কোটি (৭৫ মিলিয়ন) রয়েছে এই উপমহাদেশে। আর এর মধ্যে ৬৩ মিলিয়ন হচ্ছে অবৈধ ছোট অস্ত্র। যার মধ্যে ৪০ মিলিয়ন ভারতে, ২০ মিলিয়ন পাকিস্তান অঞ্চলে, ৩ মিলিয়ন নেপাল ও শ্রীলঙ্কায়। এই পরিসংখ্যান আমাদের বানানো নয়; এটি অন্তর্জাতিক সংগঠন ওঅঘঝঅ (রহঃবৎহধঃরড়হধষ ধপঃরড়হ হবঃ ড়িৎশ ড়হ ংসধষষ ধৎসং)-এর পরিসংখ্যান থেকে নেয়া। এখানে কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই।
আবার জনসংখ্যা অনুযায়ী বলা আছে- ভারতে প্রতি ১০০ জনে ১টি, পাকিস্তানে ৭ জনে ১টি, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা মিলিয়ে ১৩৩ জনে ১টি অবৈধ অস্ত্র আছে। কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই। কেন নেই?
গোটা ভারতে ২৩০টির বেশি গোপন অবৈধ সন্ত্রাসী সংগঠন রয়েছে। ভারতেই রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংখ্যার অবৈধ অস্ত্র কারখানা, যা প্রায় ক্ষুদ্র শিল্পের মতো কয়েকটি রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গজিয়ে উঠেছে। এর মধ্যে বিহার অন্যতম। ভারতের মদদে শ্রীলঙ্কায় তৎপর বিশ্বের অন্যতম সুসজ্জিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন এলটিটিই-এর হাতে আছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। নেপালের মাওবাদীদের হাতে আছে লক্ষাধিক অস্ত্র।
উত্তর-পূর্ব ভারতে ১৩৬টি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে এবং ভারতীয় বাহিনীদের সাথে এদের যুদ্ধ অব্যাহত আছে। তেমনি মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্ধশত সুসজ্জিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী রয়েছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এই পরিসংখ্যানেও কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই। এর প্রধান কারণ দুটি-
(১). বাংলাদেশে কয়েকটি বামপন্থী সর্বহারা সংগঠন আর বর্তমানে চট্টগ্রামে কয়েকটি ভুঁইফোড় উপজাতি সংগঠন ছাড়া কোনো বড় কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন নেই; যাদের অস্ত্রের প্রয়োজন।
(২). বাংলাদেশের আর্থিক ও সামাজিক স্থিরতা উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের চেয়ে ভালো।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের হাতে যেসব মাস্তানি বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে; তা হয় রিভলবার, কাটা রাইফেল, পিস্তলের দ্বারা।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা হানাদার ভারত থেকে বাংলাদেশে বিস্ফোরক, অস্ত্র, গোলা-বারুদও সরঞ্জাম আসার একটি সুপরিকল্পিত পথও চিহ্নিত করেছে।
শ্রীলঙ্কাকে অনুগত করে রাখার জন্য ভারত ১৯৮৩ সালে এলটিটিই (খরনবৎধঃরড়হ ঞরমবৎং ড়ভ ঞধসরষ ঊবষধস) নামক সন্ত্রাসী সংগঠন গঠন করেছিল। যার কারণে ৩ দশক শ্রীলঙ্কাকে গৃহযুদ্ধের মধ্যে থাকতে হয়েছিলো। কিন্তু তাতে কি ভারত মুক্তি পয়েছিলো? রাজীর গান্ধীর মৃত্যু হয়েছিল এই এলটিটিই’র হাতে।
*** আফগান যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের নামে মিসরে প্রস্তুত করা একে-৪৭ সিআইএ (ঈওঅ) কর্তৃক পাকিস্তানের মাধ্যমে বিলি করা হয়েছিল।
***আফগান যুদ্ধের সময় সিআইএ গেরিলা যুদ্ধ, নাশকতামূলক অভিযান, ক্ষুদ্রাস্ত্রের ব্যবহার, চোরাগুপ্তা হামলা, বিস্ফোরক ব্যবহারের বিশদ বিবরণ তারা তিনটি ভাষায় অনুবাদ করেছিলো- উর্দু, আরবী, দারী (আফগান সরকারি ভাষা)। তারা প্রস্তুত করে ছিলো- ‘এন্সাইক্লোপিডিয়া ফর জিহাদ’।
সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থ বাজারের উপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য এবং সন্ত্রাসে অর্থ যোগানের জন্য পপি চাষ বাড়িয়ে দেয়, জাল ডলার, রুবল আর আফগান প্রস্তুত করে। জালনোট তরি করার জন্য আলজেরিয়ানদের কাজে লাগানো হয়।
বাংলাদেশেও জালনোট তৈরির ক্ষেত্রে নাইজেরিয়ানদের পাওয়া গেছে এবং পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। বাংলাদেশে পপি উৎপাদন করে যেহেতু অর্থায়ন করা সম্ভব নয়, তাই ভারত তার দেশের সীমান্তে প্রচুর ফেন্সিডিল উৎপাদনের কারখানা, পূর্ব-ভারতের সীমান্তে ইয়াবা প্রস্তুতের কারখানায় ইয়াবা তৈরি করে পাঠাচ্ছে বাংলাদেশে। যেকোনো দেশের সরকারের উচ্চপর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এসব হয় না। বাংলাদেশের আইজিপি সাহেবের জানা থাকা দরকার যে- যারা টিভি দেখে না তারা এসব করে না, বরং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভালোই জানা আছে যে- কারা এসব করে।
0 টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।