আহলান! সাহলান!! শাহরুল আ’যম, সাইয়্যিদুল আসইয়াদ, সাইয়্যিদুশ শুহূর মহাপবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস। আজ পহেলা রবীউল আউওয়াল শরীফ; যা মহিমান্বিত হিজরত মুবারক উনার সুমহান দিবস। হিজরত শরীফের চেতনায় মুসলিম বিশ্বকে পবিত্র ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হতে হবে।


হযরত নবী-রসূল আলাইহিমুস্ সালামগণ উনাদের মুবারক আগমন ও বিদায় এবং বিশেষ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার দিন, তারিখ, বার এবং মাস উম্মাহর জন্য ঈদ বা খুশি প্রকাশের মহান উপলক্ষের অন্তর্ভুক্ত।

সর্বশ্রেষ্ঠ মাস হলো- সাইয়্যিদুল আসইয়াদ, সাইয়্যদুশ শুহূর, শাহরুল আ’যম মহাপবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস। যাকে সাইয়্যিদুল আসইয়াদ, সাইয়্যিদুশ শুহূর, শাহরুল আ’যম বলা হয়। সুবহানাল্লাহ!
প্রসঙ্গত কারণ এ সাইয়্যিদুল আসইয়াদ, সাইয়্যিদুশ শুহূর, শাহরুল আ’যম মহাপবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাসে মহান আল্লাহ পাক উনার পরেই যিনি, যিনি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- তিনি এই দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নিয়েছেন। আবার এই যমীন থেকে মহান আল্লাহ পাক উনার দীদার মুবারক-এ মিলিত হয়েছেন এ মহাপবিত্র মাসেই। সুবহানাল্লাহ! এছাড়াও আনুষ্ঠানিককভাবে পবিত্র নুবুওওয়াত শরীফ, পবিত্র হিজরত শরীফ এবং আরো বহু মুবারক ঘটনা এই মহাপবিত্র মাসেই সংঘটিত হয়েছে। সুবহানাল্লাহ!
আখিরী রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনিই রহমত এবং তিনিই রহমত বণ্টনের মালিক অর্থাৎ ‘রহমতুল্লিল আলামীন’; তাই এই বিশেষ মাসে আলাদাভাবে বিশেষ রহমত নাযিল হয় শুধু মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানার্থে। সুবহানাল্লাহ!
সঙ্গতকারণে কুল-কায়িনাতের সবার উচিত সাইয়্যিদুল আসইয়াদ, সাইয়্যিদুশ শুহূর, শাহরুল আ’যম মহাপবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাসের ফাযায়িল-ফযীলত সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং এই সম্মানিত মাস উদযাপনের জন্য বিশেষ জজবায় অনুপ্রণিত হওয়া এবং সর্বাত্মক কোশেশ করা।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আজ শাহরুল আ’যম রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার প্রথম দিন। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে পবিত্র মদীনা শরীফে ‘পবিত্র হিজরত মুবারক’ করার মহাসম্মানিত দিন।
হিজরত মুবারকের মহিমান্বিত ঐতিহাসিক তাৎপর্যের ফলেই সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার শাসনামলে যখন মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র পঞ্জিকা প্রণয়নের কথা উঠে আসে তখন উনারা সর্বসম্মতভবে হিজরত থেকেই এই পঞ্জিকার গণনা শুরু করেন। যার ফলে চান্দ্রমাসের এই পঞ্জিকাকে বলা হয় ‘হিজরী সন’। (ফাতহুল বারী ৭/৩১৪-৩১৬)
হিজরতের ঘটনা আবশ্যিকভাবে মুসলমানদের মাঝে অনেক নির্দেশনা ও নছীহত প্রদান করে। প্রসঙ্গতঃ মুসলমান যে ভূ-খ-ে বা দেশে বাস করবেন, সেখানে পরিপূর্ণ সম্মানিত ইসলামী আবহ থাকতে হবে। মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় অতিক্রম করলে অকল্পনীয় গায়েবী মদদ লাভ হয়। এক মুসলমান অপর মুসলমান পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার রাহে অকল্পনীয় ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ হবেন। মুসলমান উনার সমাজ জীবনে পূর্ণ সম্মানিত ইসলামী আদর্শের প্রতিফলন পাবেন।
পবিত্র মক্কা শরীফ থেকে যে মহান ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা ঘর-বাড়ি ত্যাগ করে পবিত্র মদিনা শরীফ উনার মধ্যে হিজরত মুবারক করেছিলেন, উনাদের সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে একদম রিক্ত হস্তেই আসতে হয়েছিল। সুবহানাল্লাহ! পবিত্র মসজিদে নববী শরীফ নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হলে একদিন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত আনসার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি এবং হযরত মুহাজির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের ভিতর থেকে একজন হযরত মুহাজির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে ডেকে বললেন, ‘আজ থেকে আপনারা পরস্পর ভাই।’ এভাবে সকল হযরত মুহাজির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে তিনি হযরত আনসার রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাদের ভাই বানিয়ে দিলেন। এরপর উনারা শুধু ভাই-ই নয় বেশি, পরস্পরে আপন ভাইয়ের চেয়েও কোটিগুণ ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কে উপনীত হলেন। সুবহানাল্লাহ! কিন্তু হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ উনাদের মাঝে সে ভ্রাতৃত্ববোধের ছিটেফোটাও বর্তমান মুসলিম বিশ্বের কোথাও দেখা যায় কী?
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বসের করা এক তালিকা অনুযায়ী কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্র। ম্যাগাজিনটি বলছে, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সুবাদে ১৭ লাখ জনসংখ্যার দেশটি মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে ধনী দেশ।
কাতারের মাথাপিছু বার্ষিক জিডিপি এক লাখ ডলার। অন্য দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ৪৭ হাজার ৫০০ ডলার জিডিপি নিয়ে ষষ্ঠ এবং কুয়েত ছিল ১৫তম অবস্থানে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক এবং ২০২০ সালের অলিম্পিক গেমস আয়োজনের প্রতিযোগিতাকারী কাতার ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হয়েছে।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, হারাম খেলাধুলায় কাতারসহ আরব দেশগুলো দুই হাতে খরচ করে কিন্তু রোহিঙ্গা, সোমালিয়ার মুসলিম ভাইয়েরা না খেয়ে অকাতরে মারা যাচ্ছে সেদিকে আদৌ দৃষ্টি নেই। অপরদিকে শুধু কাতারই নয় ধনী মুসলিম দেশ আছে আরো বহু এবং তাদের সংগঠনও আছে। প্রসঙ্গত উন্নয়নশীল-৮ বা ডি-৮ এর সদস্য দেশগুলো হলো- বাংলাদেশ, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্ক। এসবগুলোই উল্লেখযোগ্য মুসলিম দেশ। কিন্তু এরাও কেউই রোহিঙ্গা, সোমালিয়াসহ দারিদ্রপীড়িত মুসলিম দেশের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি এবং ভারত, কাশ্মির, জেরুজালেম, ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্যাতিত, নিপীড়িত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ায়নি এবং এখনও দাঁড়াচ্ছে না।
মুসলিম জনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ উন্নয়নশীল আটটি দেশের অর্থনৈতিক জোট ডি-৮-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে আন্তঃবাণিজ্যের পরিমাণ ১শ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৮ সালের মধ্যে এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে ৩শ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা হবে।
জানা গেছে, মুসলিম অধ্যুষিত আটটি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত ডি-৮-এর আওতায় বিশাল মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। সম্মিলিত উদ্যোগে এ সম্পদ কাজে লাগিয়ে ডি-৮ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। পারে গোটা কাফির বিশ্বকে তছনছ করে দিতে। মুসলিম সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে।
লেখার অপেক্ষা রাখে না, পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার ভ্রাতৃত্বের অভাবের কারণেই এরূপটি হচ্ছে না। অথচ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে- “সমস্ত মুসলিম বিশ্ব মিলে একটি দেহস্বরূপ।” দেশের এক অংশে আঘাত পেলে যেমন তা সর্বাংশে সঞ্চালিত হয়, তেমনি মুসলিম বিশ্বের একটি অংশ দুর্দশাগ্রস্ত হলে তাও সর্বত্র বিস্তার লাভ করবে। তাই মুসলমান হিসেবে এ ভ্রাতৃত্ববোধের জাগরণ দরকার। বিশেষত আজ পহেলা রবীউল আউওয়াল শরীফ তথা পবিত্র হিযরত শরীফ দিবসের নসীহত আমাদের সেই চেতনায়ই উজ্জিবীত করে।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]