কাফির-মুশরিকদের দ্বারা মুসলমানদের অস্তিত্ব ও উপস্থিতিকে অস্বীকার করার প্রবণতা প্রসঙ্গে


লন্ডনের কোনো একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, যার ৯৫ শতাংশ কর্মীই মুসলমান। সেই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ক্রিসমাস উপলক্ষে বন্ধ দেয়া হয়, ইস্টার সানডে উপলক্ষে বন্ধ দেয়া হয়, খ্রিস্টানদের সমস্ত ধর্মীয় উৎসবই তাতে পালন করা হয়। কিন্তু পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ কিংবা পবিত্র দুই ঈদসহ মুসলমানদের কোনো উৎসবেই ঐ ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কোনোপ্রকার বন্ধ দেয়া হয় না।
একপর্যায়ে এক মুসলমান কর্মচারী প্রতিষ্ঠানটির খ্রিস্টান স্বত্বাধিকারীকে বললো, তোমার ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের সব কর্মচারীই তো মুসলমান। সুতরাং তোমার উচিত হবে, মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহ পালনের ব্যবস্থা করে দেয়া।
উত্তরে খ্রিস্টানটি একটি কথাই বললো, ‘দিস ইজ ব্রিটেন’। অর্থাৎ মুসলমান যতো বেশিই হোক; ব্রিটেনে কেবল খ্রিস্টানদের ধর্মীয় উৎসবেই বন্ধ দেয়া যেতে পারে, কেবল খ্রিস্টানদের অস্তিত্বকেই গোনায় ধরা যেতে পারে। নাউযুবিল্লাহ!
লন্ডনের ডিপার্টমেন্টাল স্টোর নিয়ে উপরের ঘটনাটি আমাদের এক পীরভাই উনার নিজস্ব বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আলোচনা করেছিলেন। তবে শুধু লন্ডন নয়, বরং গোটা ইউরোপেই এই একই অবস্থা বিরাজ করছে। জার্মানিতে প্রায় ৪০ শতাংশ মুসলমান রয়েছে। কিন্তু তারপরও সেদেশের চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেছে, জার্মানি পরিচালিত হয় খ্রিস্টান ও ইহুদী মূল্যবোধের দ্বারা। সুতরাং মুসলমানদের জার্মানিতে থাকতে হলে খ্রিস্টান ও ইহুদী মূল্যবোধ মেনেই থাকতে হবে। নাউযুবিল্লাহ!
লেখকের নিজের একটি অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয়। লেখকের পরিচিত এক হিন্দু, তার বাচ্চাকে ডাক্তার দেখিয়েছে। সেই ডাক্তার হিন্দু। আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু তার বাসায় যে ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রী সে ডেকে নিয়ে আসে, সে-ও হিন্দু।
অর্থাৎ ৯৮ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশেও হিন্দুরা তাদের নিজস্ব মুসলিমমুক্ত বলয় তৈরি করে রাখে। এদেশে মুসলিম ডাক্তার, মুসলিম পেশাজীবীর বিপরীতে হিন্দু নেই বললেই চলে। কিন্তু তারপরও হিন্দুরা মুসলমানগণ উনাদের অস্তিত্বকে গোনায় ধরে না, বাংলাদেশে থেকেও কোনো মুসলমান তাদের চোখে পড়ে না। পার্শ্ববর্তী ভারতে এর বৃহত্তর রূপটি আমরা দেখতে পাই, যেখানে বর্তমানে মুসলমানরা জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ হওয়ার পরও চাকরি-শিক্ষাসহ কোনো ক্ষেত্রেই মুসলমানদের কোনো উপস্থিতি নেই। মুসলমানদের জীবিকার অন্যতম একটি উৎস হওয়ার পরও ভারতে এখন গরুর গোশত খাওয়া এমনকি বেচাকেনা করাও নিষিদ্ধ করেছে অত্যাচারী হিন্দুরা।
অর্থাৎ যালিম কাফির-মুশরিকরা তাদের দেশে কিংবা প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের মৌলিক অধিকারও দিতে প্রস্তুত নয়। কাফির-মুশরিকদের মনস্তত্ত্বের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মুসলমানদের অস্তিত্ব বা উপস্থিতিকে অস্বীকার করা, অগ্রাহ্য করা। মুসলমানরা সংখ্যায় যতো বেশিই হোক না কেন, কাফির-মুশরিকরা তা দেখেও না দেখার ভান করে কিংবা এড়িয়ে যায়।
ঠিক এর বিপরীত হচ্ছে মুসলমানরা। আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতায় বহুবার দেখেছি যে, এদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা গ্রুপে ৫০-১০০ জন মুসলমানের বিপরীতে মাত্র ৫-১০ জন হিন্দুর উপস্থিতি থাকলেও তা আমলে নেয়া হয় এবং গোটা প্রতিষ্ঠান কিংবা গ্রুপেই গরুর গোশত নিষিদ্ধ হয়ে যায়। নাউযুবিল্লাহ! এরকম প্রায়ই দেখা যায় যে, ৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে হয়তো ২ জন হিন্দু, এজন্য ক্লাস পিকনিকে গোটা গ্রুপেরই গরুর গোশত খাওয়া বাতিল। নাউযুবিল্লাহ!
চাকরিসূত্রে আমাকে একবার কয়েক মাসের একটি ট্রেনিংয়ে যোগদান করতে হয়েছিল। উক্ত ট্রেনিং গ্রুপে ১০০ জনের মধ্যে ১০ জনের মতো হিন্দু ছিল। ঐ ট্রেনিংটি ঢাকার বাইরে টানা কয়েক মাস ধরে চলেছিল। ঐ টানা কয়েক মাস গ্রুপের বাকি ৯০ জন মুসলমানকে গরুর গোশত খাওয়া বন্ধ রাখতে হয়েছিল মাত্র ১০ জন হিন্দুর উপস্থিতির কারণে। নাউযুবিল্লাহ!
হিন্দুরা যে এখানে সরাসরি মুসলমানদের গরুর গোশত খাওয়া বন্ধ করেছিল তা নয়, বরং হিন্দুদের হয়ে গ্রুপের কিছু মুসলমান নামধারী মুনাফিকের সৃষ্ট ফিতনার কারণেই ট্রেনিংয়ের খাবারের মেন্যুতে গরুর গোশত প্রবেশ করতে পারেনি।
আমাদের সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা এরকম বহু মুনাফিক রয়েছে, যারা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো হিন্দুরা কিছু বলার আগেই তাদের ধর্মীয় অনুভূতির রক্ষাকর্তা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এসব মুনাফিকের সাহায্য নিয়েই মুসলমানদের গায়ের উপর দিয়ে হিন্দুদের অনুষ্ঠানগুলো ৯৮ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে পালন করা হয়।
৯৮ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত এদেশে স্কুল-কলেজে পূজা করার সাহস হিন্দুদের কখনোই হতো না, যদি এসব মুনাফিকেরা তাদের সাহায্য না করতো। পিকনিক কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানসমূহে এসব মুনাফিকেরাই গুটিকয়েক হিন্দুর মন জয় করতে ফিতনার সৃষ্টি করে এবং সিংহভাগ মুসলমানদের গরুর গোশত খাওয়া বন্ধ করে।
এসব মুনাফিকেরা কিন্তু আমাদেরই ভাই, বন্ধু কিংবা কলিগ হয়ে আমাদের মাঝে মিশে থাকে। ফলে সাধারণ মুসলমানরাও সামাজিকতার খাতিরে এদের কোনো প্রতিবাদ করে না, বরং মুনাফিকদের হিন্দুতোষণকে এদেশে বর্তমানে ধরে নেয়া হচ্ছে কথিত ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ হিসেবে। নাউযুবিল্লাহ!
কিন্তু মুসলমানদের বুঝতে হবে, এভাবে বিশ্বে দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অপরের মনোরঞ্জন করতে নিজের অস্তিত্ব ও স্বকীয়তাকে বিসর্জন দেয়াটা উদারতা নয়। যখন এই উপমহাদেশে পৌত্তলিকতার আখড়া ছিল, তখন আরব-ইরান থেকে আগত ছূফী-দরবেশগণ উনারা সংখ্যায় মাত্র দু-একজন হয়েও ভারতবর্ষের যালিম হিন্দু শাসক ও উগ্র হিন্দু জনগোষ্ঠীকে কোনোপ্রকার গোনায় ধরতেন না এবং কোনোপ্রকার ইতস্তত ব্যতীত উগ্র গোঁড়া হিন্দুদের চোখের সামনেই গরু কুরবানী করতেন। গরু কুরবানীতে কোনোপ্রকার বাধার সৃষ্টি করলেই উনারা যালিম উগ্র হিন্দুদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতেও পিছপা হতেন না।
পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করা হয়েছে, “কাফিররা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট”। (পবিত্র সূরা আনফাল শরীফ, পবিত্র আয়াত শরীফ ২২)
একটা পশুর চাওয়া-পাওয়ার যেখানে কোনো মূল্য নেই, সেখানে কাফিরদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কী মূল্য থাকতে পারে?
মুসলমানগণ যে তখন সংখ্যায় অতি অল্প হয়েও ভারতবর্ষের কোটি কোটি যালিম হিন্দুকে পায়ের তলায় রাখতে পেরেছিলেন, গোটা বিশ্ব শাসন করতে পেরেছিলেন; এর মূল কারণ হচ্ছে তৎকালীন মুসলমানগণ যালিম কাফির-মুশরিকদের অস্তিত্বকে কোনোপ্রকার গুরুত্ব দিতেন না, গোনায় ধরতেন না।
বিপরীতে বর্তমান বিশ্বে মুসলমানরা সংখ্যায় অনেক বেশি, কিন্তু তাদের অস্তিত্বের কোনোপ্রকার গুরুত্ব নেই। কারণ বর্তমান মুসলমানরা নিজেদের তুলনায় কাফিরদের অস্তিত্ব ও চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্বকেই গুরুত্বহীন করে ফেলেছে। নাউযুবিল্লাহ!
মুসলমানরা যেহেতু নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্বকে গুরুত্বহীন করে ফেলেছে, সেহেতু বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের শহীদ করা হলেও তা খুব স্বাভাবিকভাবেই দেখা হয়। নাউযুবিল্লাহ!

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]