কারামতে ও শানে উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম ৬ষ্ঠ পর্ব


যিনি কঠিন অবস্থাতেও মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মুহব্বতে গরক্ব

ঘটনাটি ইয়াওমুল ইছনাইনিল আ’যীম শরীফ, ১৪৪০হিজরী ১৪ই রমাদ্বান শরীফ উনার। সেদিন তালিমী মজলিসে আলোচনাকালে অন্য দিনের তুলনায় সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার স্বর মুবারক ছিলো খুবই আস্তে। এরই মাঝে তিনি আমাকে বললেন, একজন খাদেমা আপাকে বলতে ভিতরের বড় রুম মুবারক প্রস্তুত করার জন্য। মজলিস শেষে তিনি সেই রুম মুবারকে তাশরীফ মুবারক রাখেন। শরীর মুবারক মারিদ্বী শান মুবারকে থাকায় তিনি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন এবং দরূদ শরীফ পড়তে থাকেন। এবং ডাক্তার আপাকে ফোন করে ডাকতে বলেন। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে প্রেসার মেপে দেখেন ১৫০/১২০! সাথে সাথেই উনাকে প্রেসারের ঔষধ খাওয়ানো হয়। কিন্তু একঘন্টার মধ্যে তিনবার প্রেসার চেক করে একই পাওয়া যায়। এক ঘন্টা পর প্রেসার কিছুটা কমে আসে। বাম চোখ মুবারক ছোট এবং সামান্য লাল দেখাচ্ছিলেন। ডান হাত মুবারক, মাথা মুবারক এবং বাম পা মুবারকে প্রচ- ব্যথা অনুভব করছিলেন। দু’হাত মুবারক অসাড় হয়ে এসেছিলেন। যখন উনার সামনে আজওয়া খেজুর এগিয়ে দেয়া হয়, তখন তিনি নিজে ধরে খেতে না পারায় উনাকে তা বিচি ছাড়িয়ে মুখে তুলে দেয়া হয়। এ অবস্থায় তিনি আজওয়া খেজুরও চিবাতে পারছিলেন না এমনকি পানি পান করতে গিয়েও তা গলা মুবারকে আটকে যাচ্ছিলো! মুখ মুবারক উনার দুই পাশ দিয়ে চাপ আসতেছিলো। কিছু পান করার সময় বা খাওয়ার সময় তিনি বলছিলেন, উনার গলা মুবারক উনার ভিতর মনে হচ্ছে ছিলে গিয়েছে এবং কোনকিছু খেলে উনার মনে হচ্ছিলো ভিতরটা খুব জ্বলছে। অবশেষে সেই খেজুর মুবারক উনার কিছু অংশ পানি দিয়ে গিলে খেতে হয়েছিলো। সেদিন শুধু পানি, দুধ, ডিমের কুসুম খেয়েছিলেন। এ সময় শরীর মুবারক খুবই দূর্বল ছিল। এরই মধ্যে উনার মাথা মুবারকে বরফ পানি আর কপাল মুবারকে আইস ব্যাগ দেয়া হয়েছিলো। মাথা মুবারকে পানি দেয়ার সময় দেখা গেলো বাম পাশের সম্মুখভাগে সামান্য ফোলা। এ ব্যাপারে উনাকে জানানো হলে তিনি বলেন, “আমার ঐ জায়গাটাতেই ব্যথা লাগছে। পানি ঢালার সাথে সাথে আস্তে আস্তে এখানেই চাপ দিতে থাক”। দেখা গেলো, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে কপাল মুবারকে দেয়া আইস ব্যাগগুলো নরমাল হয়ে যাচ্ছিলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত কঠিন সময়েও তিনি আমাদেরকে দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন! আর বলছিলেন, ফিজিওথেরাপিষ্ট মাহযুবাকে খবর দাও। ও ব্যায়াম করলে হাতে কিছটা শক্তি পাবো। দ’হাত ও দ’পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে চাপ দিতে থাকো, এতে নার্ভ সচল থাকে”।

মারিদ্বী শান মুবারক প্রকাশের শুরু থেকেই তিনি পাছ-আনফাসের মত ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ অনবরত পাঠ করতে ছিলেন। ‘ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ দরূদ শরীফ পাঠ সম্পর্কে তিনি বলেন, “ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ দরূদ শরীফ তো পাঠ করা সহজ এবং অগণিতবার পড়া যায়। আবার তিনি কতক্ষণ পরপর বলতেন, ‘আল্লাহ পাক মাফ করে দিন। বলা তো যায় না, কখন কি হয়। মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির আর দরূদ শরীফ পাঠ করতে করতেই যেন মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে যেতে পারি। তারপর তিনি বললেন, “আজকে কি বার? আমি বলি, ‘ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ’। তিনি বললেন, “আজকে যদি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকটে যেতে পারতাম!” এ কথা মুবারক শুনে আমরা উপস্থিত সকলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। পরের দিন, ১৫ তারিখ।

তিনি মারিদ্বী (অসুস্থ) শান মুবারক অবস্থায় ফালইয়াফরাহু শরীফ মজলিসে সময়মতই তাশরীফ মুবারক রাখলেন। গত দিনের তুলনায় উনার মারিদ্বী শান মুবারক তীব্রভাবে প্রকাশ পাচ্ছিলো। নছীহত মুবারক যখন প্রায় ২৩ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডের পথে ঠিক তখনই উনার কথা মুবারক জড়িয়ে আসতে লাগলো। এত মারিদ্বী শান মুবারক প্রকাশ করা সত্ত্বেও নছীহত মুবারক অব্যাহত রাখলেন! উনার এই শান মুবারক দেখে আমাদের চোখে পানি চলে আসলো। সেদিন আম্মাজী তিনি নছীহত মুবারক ও মুনাজাত শরীফ উনার মাধ্যমে প্রায় ৫৪ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে মজলিস শেষ করেন। উল্লেখ্য, মারিদ্বী শান মুবারক অবস্থায় উনার মাথা মুবারকে দিন-রাত মিলিয়ে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা করে বেশ কয়েকবার বরফ মিশ্রিত পানি দেয়া হতো। তখন। তিনি বলতেন, “জানো, আমার না পানি থেকে মাথা তুলতেই ইচ্ছে করে না! ইচ্ছা করে মাথাটা সারাক্ষণ পানিতে ডুবিয়ে রাখি। তোমরা আমার কাছ থেকে শিখে রাখো, যদি তোমাদের কারো এমন হয় তখন তোমরা মাথায় পানি দিবে। আমার তো খাদেমা আছে; তোমাদের যদি এরকম মানুষ না থাকে তাহলে তোমরা নিজেরাই কল ছেড়ে পানির নিচে মাথা দিয়ে রাখবে”। পানি দেয়ার সময় তিনি কখনো ঘুমিয়ে পড়তেন আবার কখনো সজাগ থাকলে বলতেন, “মাথা কি ঠান্ডা হয়েছে? তখন ধরে দেখতাম, মাথা মুবারক উনার মাঝখানে ও দ’পাশে কিংবা পিছন থেকে গরম বের হচ্ছে। তাই আমরা উনার মাথা মুবারকে অনবরত পানি দিতে থাকতাম। এত দীর্ঘ সময় ধরে পানি দেয়া সত্ত্বেও কখনও কোন প্রকার ক্লান্তি বা অবসাদ কোনো কিছুই আমরা অনুভব করতাম না। সুবহানাল্লাহ!

তখন আমাদের এমন একটা পরিস্থিতি হয়েছিল যে, নিজের সংসার, স্বামী-সন্তান কারো কথাই মনে হত না। শুধুই মনে হত সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম তিনি কখন সুস্থ হবেন। জীবনে আমি অনেক অসুস্থ ব্যক্তি দেখেছি। কিন্তু উনার মত আর কাউকে দেখিনি। তিনি সর্বাবস্থায়ই মহান আল্লাহ পাক এবং উনার হাবীব নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের মুহাব্বতে গরক্ব থাকেন। এমনকি কঠিন অসুস্থতার সময়ও নিজেই নিজের চিকিৎসা করেন। যা আসলেই অসাধারণ চিন্তাশক্তির বহিঃপ্রকাশ। সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার মারিদ্বী শান মুবারক অবস্থায় আমরা কয়েকজন পালাক্রমে উনার খিদমত মুবারকে থাকতাম। সেই অবস্থায় তিনি বেশিরভাগ সময় চক্ষু মুবারক বন্ধ করে থাকতেন এবং এমন কিছু বিষ্ময়কর কথা বলতেন যা শুনে আমরা হতবাক হতাম! কথাগুলো শ্রবণে আমরা কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তারও উত্তর দিতেন।

যেমন:- একবার তিনি বললেন, “একজন লোক ল্যান্ড করা হেলিকপ্টারের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, আমিও উনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। একজন জানতে চাইলেন, দেখতে কেমন? তিনি বললেন, বিশাল দেহের অধিকারী, দেহের তুলনায় মাথা দেখতে সামান্য ছোট, সুন্নতি পোশাক ও টুপি পরা। পুনরায় জানতে চাওয়া হল, তিনি কে? আম্মাজী তিনি বললেন, “মনে হয় মালাকুল মউত আলাইহিস সালাম”। আরেকদিন তিনি বলছিলেন, “সূর্যটা (প্রায় আড়াই হাত দূরে) দেয়ালের কাছে চলে এসেছে। অন্যান্যদের কাছে সরাসরি তাকানোটা কষ্টকর মনে হলেও আমার কাছে তাকিয়ে থাকতে কোনো কষ্টকর মনে হচ্ছেনা”। ছিহহাতী শান মুবারক প্রকাশ করার পর এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, “সূর্য দেখা মানে তাওয়াল্লুক-নিসবত হাছিল করা”।

বেশ কিছুদিন পর এর হাক্বীকত সম্পর্কে তিনি বলেন, বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি বিছালী শান মুবারক প্রকাশের পূর্বে পবিত্র রমাদ্বান উনার চাঁদ শেষবারের মত উনার সাথে দেখা করতে এসেছিলো অনুরূপ সূর্যও আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো। মারিদ্বী শান মুবারক অবস্থায় আরেকবার তিনি বলেন, “একটি বউ কান্না করছে”। উপস্থিত একজন জিজ্ঞাসা করলেন, কেন কান্না করছে? উত্তরে বললেন, “বউটিকে সাজানো হচ্ছে!” তখন প্রায়ই তিনি এরকম বিভিন্ন বিষয় বলতেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এমন কঠিন অসুস্থতার মধ্যে প্রেসারের ওষুধ খেয়ে যেখানে ঘুমিয়ে থাকার কথা সেখানে তিনি প্রতি বেলায় খাদিমা আপাদের কাছে খবর নিতেন হুযুর কিবলা আলাইহিস সালাম তিনি এসেছেন কিনা, খাবার দেয়া হয়েছে কিনা, সন্ধায় চা-নাস্তা দেয়া হয়েছে কিনা, রাতে দুধ দেয়া হয়েছে কিনা?
অসুস্থতার দ্বিতীয় দিন খাদিমা আপারা উনার কাছে থাকার কারণে কেউ রান্না করার সুযোগ পাননি, যার কারণে হযরত শাহযাদা কিবলা আলাইহিস সালাম উনাকে পরপর দুই বেলা বিরিয়ানী দেয়া হয়েছিল। এটা শুনে তিনি বলেন, “নতুন করে কিছু রান্না করে দাও”। শুধু কি তাই? এ অবস্থায় শাহনাওয়াসী ও শাহনাওয়াসা আলাইহিমুস সালাম উনারা আসলে কত যে খুশি হতেন! হাত মুবারকে ব্যথা থাকার পরও উনাদেরকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করতেন! আহলু বাইত শরীফ উনারা সবাই যখন আসতেন উনাদেরকে দেখলে মনে হতো তিনি এক ঝলকেই সুস্থ হয়ে গেছেন। সুবহানাল্লাহ! কতইনা মহিয়সী, মমতাময়ী মা তিনি! কতই না মহান, শ্রেষ্ঠা ও অনন্যা তিনি! যিনি সর্বাবস্থায় সকল পরিস্থিতিতে হক্কুল্লাহ এবং হক্কুল ইবাদ যথাযথভাবে, সুচারুরূপে পালন করে থাকেন। সুবহানাল্লাহ! মারিদ্বী শান মুবারকের কোন পরিবর্তন না দেখে উনার জন্য জানের ছদকা (গরু,খাসি) করা হয়। যদিও মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম তিনি শুরুতেই ছদকা করেছেন, যা আমরা পরে শুনতে পেয়েছি। অনেক পীরভাই ও বোনেরা স্বতস্ফূর্তভাবে ছদক্বায় অংশগ্রহণ করেন।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]