গতকয়েক দিন যাবত মিডিয়ায় ‘পরকীয়ার কারণে মৃত্যু’ বাক্যটি বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। খবরে এসেছে-


“পরকীয়ার কারণে তৈরী হচ্ছে নানান সামাজিক অপরাধ। এর পরিণতিতে খুন-খারাবি হচ্ছে নিয়মিত। কয়েকদিন আগে রাজধানী ঢাকার বাড্ডায় জামিল শেখ নয় বছরের মেয়েসহ খুন হয়েছেন স্ত্রীর পরকীয়ার বলি হয়ে। ২১ অক্টোবর চট্টগ্রামের মিরসরাই এ ফারুককে হত্যা করেছে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার। ১২ অক্টোবর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে রাকিব হোসেনকে খুন করে তার স্ত্রী ও ছোট ভাই। ৯ অক্টোবর বনশ্রীতে জান্নাতুল বুশরাকে হত্যা করেছে তার স্বামী।এভাবে প্রায় প্রতিদিনই পরকীয়ার বলি হচ্ছে মানুষ। এছাড়াও পারিবারিক কলহ বাড়ছে। পারিবারিক নির্যাতন বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদও।” (http://bit.ly/2iZHOtx
আমার জানা মতে ইসলাম ধর্মে ‘পরকীয়া’ খুব নিকৃষ্ট অপরাধ বলে গণ্য হয়। অবিবাহিত নারী-পুরুষ অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হলে তাদের এক ধরনের শাস্তি দেয়া হয়, কিন্তু বিবাহিত নারী-পুরুষ পরকীয়ায় লিপ্ত হলে তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তারমানে এই ‘পরকীয়া’ নামক বিষয়টি বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের সংস্কৃতি থেকে পায়নি, পেয়েছে অন্য কোথা থেকে ?
আজকাল বাংলাদেশের মানুষ যে ভারতীয় সিরিয়ালে আসক্ত, সেই ভারতীয় সিরিয়ালে ব্যাপক হারে দেখানো হয় পরকীয়া। এছাড়া ভারতের মুভিতে প্রেম-ভালোবাসার একটি বিরাট অংশ দখল করে আছে পরকীয়া। স্বামী ব্যতিত অন্যপুরুষের সাথে সম্পর্ক না দেখালে বোধ হয় গল্পই জমে না। কলকাতার মুভি, শর্ট মুভির মূল উপজীব্য হচ্ছে এই পরকীয়া। খোলা আকাশ সংস্কৃতির যুগে যার প্রভাব বাংলাদেশের উপর পড়ছে এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অর্থাৎ পরকীয়া নামক বিষয়টি ভারত তথা হিন্দু সমাজ থেকে বাংলাদেশের মুসলমানদের ভেতরে ইনফিলট্রেশন করেছে।
এখন কথা হলো ভারতীয় বা হিন্দু সমাজে কিভাবে ‘পরকীয়া’ উৎপত্তি হলো –
পরকীয়া শব্দ ভাঙ্গলে পর + ক্রিয়া = পরকীয়া। অর্থাৎ পরের স্ত্রী বা স্বামীর সাথে যে ক্রিয়া বা প্রেম সেটাই পরকীয়া। হিন্দুদের গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের মূলকথা – শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র ঈশ্বর ও আরাধ্য, তিনি প্রেমময়, তাঁকে লাভ করতে হলে তিনি যে ঈশ্বর সে কথা ভুলে গিয়ে তাঁকে ভালোবাসতে হবে; এই ভালোবাসার প্রাথমিক স্তর ভক্তি, পরবর্তী স্তর দাস্যপ্রেম, তারপর সখ্যপ্রেম; এরচেয়ে উৎকৃষ্ট হচ্ছে বাৎসল্য প্রেম এবং সর্বোৎকৃষ্ট হচ্ছে কান্তাপ্রেম; কান্তাপ্রেমের মধ্যে আবার স্বকীয় প্রেমের তুলনায় পরকীয়া প্রেম শ্রেষ্ঠ; পরকীয়া প্রেমে যে তীব্রতা ও চিরনবীনতা আছে, স্বকীয় প্রেমে তা নেই।
কৃষ্ণ প্রেমিকারা দুইভাগে বিভক্ত। স্বকীয়া আর পরকীয়া।
স্বকীয়া : রূক্মিনী, সত্যভামা, জাম্ববতী, কালিন্দী, শৈব্যা, কৌশলা ও মাদ্রী। এরা সবাই কৃষ্ণের বিবাহিতা নারী।
পরকীয়া : পরকীয়া প্রেমিকারা হলো রাধাসহ ব্রজগোপীবৃন্দ ( সংখ্যা ১৬শ’)। এদের মধ্যে বিবাহিতাসহ কুমারী নারীও আছে। রাধা, চন্দ্রাবলী, ললিতা, বিশাখা হলো পরকীয়াদের মধ্যে অন্যতম। এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠা হলো রাধা ও চন্দ্রবলী। তবে এই দুইজনের মধ্যে রাধা আবার শ্রেষ্ঠ। লৌকিক মতে রাধা আয়ান ঘোষের বিবাহিত স্ত্রী। এই বিচারে রাধার প্রেম পরকীয়া।
“অতএব মধুর রস কহি তার নাম।
স্বকীয়া-পরকীয়া-ভাবে দ্বিবিধ সংস্থান ॥
পরকীয়া-ভাবে অতি রসের উল্লাস ।
ব্ৰজ বিনা ইহার অন্যত্র নাহি বাস ॥
ব্ৰজবধুগণের এই ভাব নিরবধি ।
তার মধ্যে ঐরাধার ভাবের অবধি ॥”
( বৈষ্ণব পদাবলী, श्रांब्रि 8र्थ )
১৯৬০ সালের দিকে বৈষ্ণব সমাজে “গুরুপ্রসাদী” নামক রীতি দেখা যায়, যেখানে নববধূ কে অন্তত একরাতের জন্য গুরুদেবের অঙ্কশায়িনী হতে হতো। এখনও যে তা দেখা যায় না, তা নয়। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে গনজাগরন মঞ্চের কর্মী সমকাল সাংবাদিক শামীমা মিতু নিজ চোখে দেখা ঘটনা নিয়ে এ বিষয়ে একটি স্ট্যাটাস দেয়। (http://bit.ly/2ybEy1B) অর্থাৎ প্রভুর সাথে পরকীয়া দিয়েই জীবন শুরু করা শুভ হিসেবে ধরা হয়।
পরকীয়া প্রেম যে স্বকীয় প্রেম অর্থাৎ পরিণীতা স্ত্রীর সহিত বৈধ প্রেম অপেক্ষা আধ্যাত্মিক হিসেবে অনেক শ্রেষ্ঠ এটি বাংলায় বৈষ্ণরেব শাখা সমাজেও গৃহিত হয়েছিলো। পরকীয়া ঈশ্বর লাভ বা সিদ্ধি অর্জনের অন্যতম শর্ত হসেবে গণ্য করে সহজিয়া বৈষ্ণব সমাজে। (http://bit.ly/2iZ4aeQ)
অর্থাৎ পরকীয়া হিন্দু ধর্মের ধর্মীয় অংশ। যার কারণে হিন্দুদের মধ্যে অনেকেই পরকীয়াকে পাপ বলে গণ্য করে না। এ সম্পর্কে কয়েকদিন আগে ‘গ্লোবাল ডেটিং ওয়েবসাইড অ্যাসলে মেডিসন’ নামক একটি সংস্থা ভারতে একটি জরিপ করে। জরিপে নিয়ে খবর-
“৭৬ শতাংশ ভারতীয় নারী এবং ৬১ শতাংশ ভারতীয় পুরুষ মনে করেন পরকীয়া কোনো পাপ বা অনৈতিক কাজ নয়। জরিপে অংশগ্রহনকারীদের সকলেই বিবাহিত কিংবা কারো সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত। ভারতে দশটি শহরের ৭৫ হাজার ৩২১ জনের মতামত যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ বিবাহিত।
জরিপে অংশগ্রহনকারী ৮১ শতাংশ পুরুষ এবং ৬৮ শতাংশ নারী মনে করেন পরকীয়া বিবাহিত সম্পর্ককে পুর্ণগঠনে সহায়তা করে। বিবাহিত জীবনে পরকীয়ার প্রভাব ইতিবাচক বলেই জানায় তারা।
মজার বিষয় হলো, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮০ ভাগই অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ করেছে। জরিপে অংশগ্রহনকারী পুরুষদের বয়স গড়ে ৪৫ বছর এবং নারীদের ৩১ বছর।” (http://bit.ly/2A6AU9h)
তারমানে ভারতীয় বা হিন্দু সমাজে পরকীয়ার অস্তিত্ব আছে এবং সেটাকে পাপ নয় বরং পূণ্য হিসেবেই দেখা যায়। একারণে ভারতীয় মিডিয়ায় পরকীয়ার ব্যাপক ছড়াছড়ি। এবং সেই কালচারটা মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলিম সমাজে ইনফিলট্রেশন করছে। তাই বর্তমানে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাকে যদি ‘পরকীয়া’ নামক বোমা থেকে বাচাতে চান, তবে ভারতীয় টিভি চ্যানেল নিষিদ্ধ করা ছাড়া কোন উপায় দেখছি না।

Collected……….

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]