নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের তারিখ অবশ্যই পবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ; অন্য কোন তারিখ নয়


নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমুল ফীল বা হস্তির বছর পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ১২ই শরীফ তারিখে দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নেন। কিন্তু কিছু মুসলিম নামধারী ও কিছু নাস্তিক প্রমাণ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নেন ৫৭১ খৃ. সনের ৯ই রবীউল আউওয়াল শরীফ। নাঊযুবিল্লাহ! আর তাদের এই অপপ্রয়াসের মূল দলীল হচ্ছে ত্রয়োদশ হিজরী শতকের নাস্তিক মাহমুদ পাশার একটি চরম গাণিতিক ভুল বিশ্লেষণ। এই চরম ভুল বিশ্লেষণকে পুঁজি করেই ৯ই রবীউল আউওয়াল শরীফকে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নেয়ার তারিখ হিসেবে প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। নাঊযুবিল্লাহ!
ভুল বিশ্লেষণটি নি¤œরূপ-
উক্ত বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে যে, ১০ম হিজরী শরীফ উনার পবিত্র শাওওয়াল শরীফ উনার শেষ তারিখে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল আর একই দিনেই ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত আন নূরুর রবি’ আলাইহিস সালাম তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। আর তাই ১০ম হিজরী শরীফ উনার পবিত্র শাওওয়াল শরীফ উনার শেষ তারিখ ৬৩২ খৃ. সালের ৭ নভেম্বরকে সূর্যগ্রহণের তারিখ ধরে সে হিসেব অনুযায়ী গণনা করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নেয়ার তারিখ ৫৭১ খৃ. সনের ১২ই এপ্রিল- পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ প্রমাণিত হয়। নাঊযুবিল্লাহ! আর যেহেতু নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নেয়ার বারটি ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ, এই বিষয়ে সবাই একমত। তাই আমুল ফীল বা হস্তির বছরের ১২ই এপ্রিল ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ পড়তে হলে অন্য কোন আরবী তারিখ (৮ কিংবা ১২ রবীউল আউওয়াল শরীফ) হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই, বরং ৯ রবীউল আউওয়াল শরীফই হয়।
ভুল বিশ্লেষণটি ব্যবচ্ছেদ ও প্রতারণা নির্ণয়ন:
ক) ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত আন নূরুর রবি’ আলাইহিস সালাম উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের ভুল তারিখ গ্রহণ:
ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত আন নূরুর রবি’ আলাইহিস সালাম তিনি ১০ম হিজরী শরীফ উনার পবিত্র শাওওয়াল শরীফ উনার শেষ তারিখে পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন- এই তথ্যটি একটি ডাহা মিথ্যা।
কেননা ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত আন নূরুর রবি’ আলাইহিস সালাম তিনি ৮ম হিজরী সনের পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাসে দুনিয়ার যমীনে আগমন করেন। আর পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী তিনি ১৬ মাস যমীনে অবস্থান মুবারক করেন।
যেমন এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফে এসেছে-
عَنْ حَضْرَتْ اَلْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالـٰى عَنْهُ قَالَ مَاتَ حَضْرَتْ اِبْرَاهِيْمُ ابْنُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ ابْنُ سِتَّةَ عَشَرَ شَهْرًا فَاَمَرَ بِهٖ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنْ يُّدْفَنَ فِى الْبَقِيْعِ وَقَالَ اِنَّ لَهٗ مُرْضِعًا يُّرْضِعُهٗ فِى الْـجَنَّةِ
অর্থ: “হযরত বারা ইবনে আযিব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম উনার দুনিয়াবী জিন্দেগী মুবারক অনুযায়ী বয়স মুবারক যখন ১৬ মাস, তখন তিনি পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলইহিস সালাম উনার রওযা শরীফ জান্নাতুল বাক্বী’ শরীফ উনার মধ্যে স্থাপন করার জন্য নির্দেশ মুবারক প্রদান করেন এবং তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, নিশ্চয়ই উনার জন্য সম্মানিত জান্নাত মুবারক-এ একজন সম্মানিতা দুধপানকারিনী রয়েছেন, যিনি উনাকে দুধ মুবারক পান করাবেন।” সুবহানাল্লাহ! (মুসনাদে আহমদ ৩০/৫২০, মুসনাদে আবী ইয়া’লা ৩/২৫১, আল আহাদ ওয়াল মাছানী ৫/৫৬৪, তারীখুল মদীনা ১/৯৭, আস সুনানুল কুবরা লিল বাইহাক্বী, শরহু মা‘আনিল আছার, মুছান্নাফে আবী শায়বাহ, মা’রিফাতুছ ছাহাবাহ লিআবী নাঈম, মুছান্নাফে আব্দির রাজ্জাক্ব)
উপরোক্ত পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী হিসেবে করে দেখা যায়, ৮ম হিজরী সনের পবিত্র যিলহজ্জ শরীফ মাস থেকে পরবর্তী ১৬ মাস পর উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের মাস হচ্ছেন ১০ম হিজরী সনের পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ। কোন ভাবেই ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাস হয় না।
এমনকি ১৭ বা ১৮ মাস বয়স মুবারক-এ পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন ধরা হলেও কোন ভাবেই পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ পবিত্র শাওওয়াল শরীফ-এ হয় না।
আর তাই ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসের শেষ তারিখ ৬৩২ সালের ৭ নভেম্বরকে সূর্যগ্রহণের তারিখ ধরে সে হিসেব অনুযায়ী গণনা করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ার যমীনে তাশরীফ মুবারক নেয়ার তারিখ পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ প্রমাণ করার অপচেষ্টা একটি প্রতারণা বৈ কিছুই নয়।
আসল কথা হচ্ছে, ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম তিনি ১০ম হিজরী সনের পবিত্র ১০ই রবীউল আউওয়াল শরীফ, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার), প্রায় ১৬ মাস (১৫ মাস ৮ দিন) বয়স মুবারক-এ পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন।
এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে-
ومات يوم الثلاثاء لعشر ليال خلون من شهر ربيع الأول سنة عشر.
অর্থ : “তিনি ১০ম হিজরী সনের পবিত্র ১০ই রবীউল আউওয়াল শরীফ, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেন।” (সুবুলুল হুদা ওয়ার রশাদ ১১/২৪, ওয়াকিদী, মুখতাছার, তারীখে দিমাশক্ব ৪/৪৬৫)
দুনিয়াবী জিন্দেগী মুবারক অনুযায়ী তখন নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত বয়স মুবারক ছিলো ৬১ বছর ১১ মাস ২৮ দিন। সুবহানাল্লাহ!
সুতরাং উপরের আলোচনা হতে প্রমাণিত হলো যে, ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশের তারিখ ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসের শেষ দিন নয়, তাই ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসের শেষ দিনকে খৃ. হিসেবে ৬৩২ সালের ৭ নভেম্বর ধরে সে হিসেব অনুযায়ী গণনা করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের তারিখ পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ প্রমাণ করা কখনোই সম্ভব নয়।
কেননা, পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস হতে পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাস পর্যন্ত প্রায় ৭ মাস ২০ দিনের একটি পার্থক্য রয়েছে। ফলে তখন দুনিয়াবী জিন্দেগী মুবারক অনুযায়ী নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত বয়স মুবারক ছিলো ৬১ বছর ১১ মাস ২৮ দিন হলেও পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসে সম্মানিত বয়স মুবারক ছিলো ৬২ বছর ৭ মাস ১৮ দিন।
খ) আমুল ফীল বা হস্তির বছর কখনোই ৫৭১ খৃ. নয় বরং ৫৭০ খৃ. :
সম্মানিত বয়স মুবারক উনার হিসাব আরবী (চন্দ্র) মাসের হিসাব অনুযায়ী। কিন্তু এই বয়স মুবারককে প্রমাণ ধরে খৃ. হিসেবে গণনা করা হলে প্রতি ৩৩ বছরে এক বছরের পার্থক্য হয় এবং ঘটেছেও তাই। কেননা, আরবী (চন্দ্র) মাস গণনা করা হয় চাঁদের হিসেব ধরে ২৯ বা ৩০ দিনে আর সৌরসন অর্থাৎ খৃ. মাস গণনা করা হয় ৩০ বা ৩১ দিনে। এজন্য সৌর বছর হয় ৩৬৫ দিনে (অধিবর্ষে ৩৬৬ দিন) আর চন্দ্র বর্ষ হয় ৩৫৪/৩৫৫ দিনে। এছাড়াও আরবী মাস শুরু হয় সূর্যাস্তের সাথে সাথে আর সৌর সন শুরু হয় রাত ১২টার পর থেকে। ফলে প্রত্যেক বছরে খৃ. সনের সাথে আরবী বা চন্দ্রবছরের ১০/১১ দিনের পার্থক্য তৈরী হয়, যা ৩৩ বছরে ১ বছরের পার্থক্যে রূপ নেয়।
আর তাই ৬৩২ সালের ৭ নভেম্বর থেকে আমুল ফীল বা হস্তির বছর পর্যন্ত গণনা করে আমুল ফীল বা হস্তির বছরকে ৫৭১ খৃ. হিসেবে পাওয়া গিয়েছে। অথচ আমুল ফীল বা হস্তির বছর ৫৭১ খৃ. নয় বরং ৫৭০ খৃ.।
কেননা, শাসক নাওশেরাওয়ার ৫৩১ খৃ. সালের ১লা সেপ্টেম্বর ক্ষমতা গ্রহণ করে আর ৫৭০ খৃ. সাল হচ্ছে তার শাসনকালের ৪০তম বছর।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
وُلِدَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الْفِيْلِ لِاِثْنَتَـىْ عَشْرَةَ لَيْلَةٍ خَلَتْ مِنْ رَبِيْعِ الْاَوَّلِ لِاَرْبَعِيْنَ سَنَةً مّنْ مُلْكِ كِسْرٰى انَوْشِيْرْوَان
অর্থ : “নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ, আমুল ফীল বা হস্তী বাহিনীর বছর রাতে দুনিয়ায় তাশরীফ মুবারক নেন। তখন ছিলো শাসক নাওশেরাওয়ার শাসনকালের ৪০তম বছর।” (তারীখে ইবনে খালদুন ২য় খ- ৩৯৪ পৃষ্ঠা)
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, আমুল ফীল বা হস্তির বছর কখনোই ৫৭১ খৃ. নয় বরং ৫৭০ খৃ.। তাই ৫৭১ খৃ. সালের পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ কখনোই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূয়র পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের তারিখ নয়।
গ) ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের দিন যে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল তা প্রকৃত অর্থে সূর্যগ্রহণ নয় বরং সূর্যের শোক প্রকাশ :
এছাড়া, যদিও ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম উনার বিছালী শান মুবারক প্রকাশের দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল কিন্তু প্রকৃত অর্থে সেদিনে সূর্যগ্রহণ হওয়ার কথা নয়। কেননা কোন আরবী (চন্দ্র) মাসের ২য় সপ্তাহে কখনো সূর্যগ্রহণ হয় না। সাধারণভাবে আরবী মাসের শেষের দিকে যখন অমাবস্যা সংঘটিত হয় তখন সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বস্তুত এই সূর্যগ্রহণ নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি মুজিযা শরীফ ছিলো। ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম উনার একটি মুজিযা শরীফ ছিলো। যার কারণে এই সূর্যগ্রহণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম উনার অপরিসীম মর্যাদা মুবারক উনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। তাই এই সূর্যগ্রহণের বিষয়টিকে সমস্ত ইমাম মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা এক বাক্যে মেনে নিয়েছেন যে, এটি ছিল সূর্যের শোক প্রকাশ। সুবহানাল্লাহ! এই মতের বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে অনেক ইমাম মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা শক্ত জবাবও দিয়েছেন।
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, ইবনু রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাইয়্যিদুনা হযরত রাবি’ আলাইহিস সালাম তিনি ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসে শেষ তারিখে পবিত্র বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেননি বরং তিনি ১০ম হিজরী সনের পবিত্র ১০ই রবীউল আউওয়াল শরীফ বিছালী শান মুবারক প্রকাশ করেছেন। তাই ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসের শেষ তারিখে সূর্যগ্রহণের তারিখ ধরে সে হিসেব অনুযায়ী গণনা করে নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়ার যমীনে আগমনের তারিখ পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ৯ তারিখ প্রমাণ করার অপচেষ্টা একটি প্রতারণা বৈ কিছুই নয়।
ঘ) আমুল ফীল বা হস্তির বছরের পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস শুরু হওয়ার তারিখ চাঁদ খালি চোখে দেখার ভিত্তিতে নয় বরং অনুমান করে নির্ধারণ করা হয়েছে :
আরেকটি ভুল হচ্ছে- ১০ম হিজরী সনের পবিত্র শাওওয়াল শরীফ মাসের শেষ তারিখে সূর্যগ্রহণের তারিখ ধরে সে হিসেব অনুযায়ী গণনা করে আমুল ফীল বা হস্তির বছর পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ১লা তারিখ ধরা হয়েছে ৫৭১ খৃ. সনের ১২ই এপ্রিল। কিন্তু সে বছর পবিত্র মক্কা শরীফ উনার আকাশে ১১ই এপ্রিলই যে খালি চোখে পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ উনার চাঁদ দেখা গিয়েছিল তার প্রমাণ নাস্তিক মাহমুদ পাশা দিতে পারেনি। কখনোই পারবেও না। কেননা আরবী মাস শুরু করার বিষয়টি খালি চোখে চাঁদ দেখা যাওয়ার সাথে সম্পর্কিত, অনুমানের মাধ্যমে নয়। সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে অনুমানের কোন স্থান নেই। তাহলে একটি অগ্রহণযোগ্য ও অনুমান ভিত্তিক বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আমুল ফীল বা হস্তির বছর পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ১লা তারিখ ১২ই এপ্রিল ধরা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
জাহেলী যুগে নাসী বা মাস আগে-পিছে করার বিষয়টি ধর্তব্যে আনা হয়নি :
নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের মুবারক তারিখ নির্ণয় করতে গিয়ে খৃ. তারিখকে হিজরী তারিখে রূপান্তর করে পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ উনার ৯ তারিখ প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন প্রতি বছরে ১০/১১ দিনের পার্থক্য রয়েছে, যার ফলে প্রতি ৩৩ বছরে ১ বছরের পার্থক্য তৈরী হয়েছে। অন্যদিকে তৎকালীন আরবে যে নাসী (মাস আগে-পিছে) করা হতো তা ধর্তব্যেই আনা হয়নি। আরবের কাফির-মুশরিকরা তাদের নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কখনো কখনো ১৭ মাসে বছর গণনা করতো আবার কখনো ১০ মাসেও বছর গণনা করতো। কোন সময়ে এই অতিরিক্ত মাসগুলো সংযোজন করতো বা মাসগুলো বিয়োজন করতো তার কোন দলীল-প্রমাণ নেই। এমনকি যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য পবিত্র ছফর শরীফ মাসকে পবিত্র মুহররমুল হারাম শরীফ মাসের আগে গণনা করতো। এমন পরিস্থিতিতে ক্যালকুলেশন বা গণনা পদ্ধতি অবলম্বন করে হিসাব মিলানো কখনোই সম্ভব নয়। আর তাই নাস্তিক মাহমুদের হিসাব অনুযায়ী আমুল ফীল বা হস্তির বছর ৫৭১ খৃ. হচ্ছে। অথচ বছরটি হচ্ছে ৫৭০ খৃ.। অর্থাৎ ১ বছরের একটি তারতম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
তাহলে যেখানে খৃ. সন হিসেবে ১ বছরের একটি তারতম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে সেখানে এটা কি করে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যে, আমুল ফীল বা হস্তির বছর পবিত্র রবীউল আউওয়াল শরীফ মাস উনার ১২ তারিখ ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) ছিল না। নাঊযুবিল্লাহ!
তাই এই বিষয়ে একমাত্র সমাধান হচ্ছে পবিত্র হাদীছ শরীফ ও হযরত ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ইজমা। পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্ট বর্ণনা করা হয়েছে যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের সম্মানিত তারিখ হচ্ছেন পবিত্র ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ, সেদিনটি ছিল- ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
عَنْ حَضْرَتْ عَفَّانَ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ عَنْ حَضْرَتْ سَلِيْمِ بْنِ حَيَّانَ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ عَنْ حَضْرَتْ سَعِيْدِ بْنِ مِينَا رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ عَنْ حَضْرَتْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ الْأَنْصَارِىّ وَحَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰى عَنْهُ قَالَ وُلِدَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الْفِيلِ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ الثَّانِـىْ عَشَرَ مِنْ شَهْرِ رَبِيْعٍ الْاَوَّلِ.
অর্থ : “হযরত আফফান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণিত। তিনি হযরত সালিম বিন হাইয়ান রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে তিনি হযরত সাঈদ ইবনে মীনা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে বর্ণনা করেছেন যে, হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনছারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনারা বলেন, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ হস্তি বাহিনী বর্ষের মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ হয়েছিল।” সুবহানাল্লাহ! (বুলুগুল আমানী শরহিল ফাতহির রব্বানী, আছ ছিহ্হাহ্ ওয়াল মাশাহীর ১ম খ- ২৬৭ পৃষ্ঠা)
এ ছহীহ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনার উপরই হযরত ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (সীরাত-ই-হালবিয়াহ শরীফ, যুরক্বানী আলাল মাওয়াহিব শরীফ, মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ শরীফ ইত্যাদি)
সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র হাদীছ শরীফ ও হযরত ইমাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশ দিবস হচ্ছেন মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ। কিন্তু এর বিপরীতে নাস্তিক মাহমুদ পাশার বর্ণনাকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা পবিত্র হাদীছ শরীফ অবজ্ঞা করার কারণে কাট্টা কুফরী।
যেহেতু নাস্তিক মাহমুদ পাশা (১৮১৫-১৮৮৫ খৃ.) তথাকথিত মিশরীয় রেনেসাঁ যাকে আরবীতে ‘আন-নাহদা’ বলে অভিহিত করা হয়, তার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি। এই তথাকথিত মিশরীয় রেনেসাঁ সংশ্লিষ্টরা ছিল ফ্রান্সপন্থী। যারা ফ্রান্সের বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করে মুসলিম মূল্যবোধ মুছে দিয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি চালু করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। এছাড়াও তথাকথিত মিশরীয় রেনেসাঁপন্থীরা ছিল প্রাচীন মিশরের ফেরাউনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। মিশরীয় তথাকথিত রেনেসাঁপন্থীদের এক ভাস্কর্যশিল্পী মাহমূদ মোখতার বানিয়েছিল ‘মিশরের নবজাগরণ’ নামক এক মূর্তি, যা ছিল ফেরাউন ও স্ফিংসের জোড়া ভাস্কর্য। অর্থাৎ মিশরীয় তথাকথিত রেনেসাঁ ছিল ফেরাউনের যুগে ফিরে যাওয়ার চেতনাধারী।
তাহলে ফেরাউনীয় চেতনায় উজ্জীবিত এই রেনেসাঁপন্থীকে কি করে মুসলমানরা অনুসরণ করতে পারে। যেখানে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِ‌ينَ وَالْمُنَافِقِينَ
অর্থ : “তোমরা কাফির ও মুনাফিক্বদের অনুসরণ-অনুকরণ করোনা।” (পবিত্র সূরা আহযাব শরীফ : পবিত্র আয়াত শরীফ ১ ও ৪৮)
সুতরাং মুসলমানদের জন্য ফেরাউনীয় চেতনায় উজ্জীবিত নাস্তিক মাহমুদ পাশাকে অনুসরণ তো দূরে কথা তার কোন বর্ণনাই গ্রহণযোগ্য নয়। আর তাই, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম উনার পবিত্র বিলাদতী শান মুবারক প্রকাশের তারিখ মহাসম্মানিত ১২ই রবীউল আউওয়াল শরীফ ছাড়া কোন তারিখের বর্ণনাই শুদ্ধ নয়।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]