ফরয নামাযের পর হাত তুলে মুনাজাত করা সুন্নত মুবারক


ফরজ নামাজের পর ইমাম মুক্তাদি সম্মিলিত ভাবে হাত তুলে দোয়া/মুনাজাত করার স্পষ্ট দলীল সমূহ বিশ্লেষণ :

উপরোক্ত বিষয়টা নিয়ে একশ্রেনীর লোক অনেক ফিৎনা করে। অনেক সময় বিভিন্ন মসজিদে দেখা যায় ইমাম হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাত করছে অথচ এরা হাত শক্ত করে নামিয়ে বসে থাকে অথবা উঠে চলে যায়।
আসুন আমরা এই ফিৎনা রোধের জন্য সংক্ষেপে ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত ভাবে হাত তুলে মুনাজাত করার দলীল নিয়ে পর্যালোচনা করি। এ বিষয়টা পরিস্কার ভাবে বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণ করতে হবে।-

(১) দোয়া/মুনাজাত করা কুরআন শরীফ হাদীস সম্মত কিনা।

(২) ফরজ নামাজের পর দোয়ার গুরুত্ব আছে কিনা।

(৩) ইমাম মুক্তাদি সম্মিলিত মুনাজাতের দলীল আছে কিনা।

(৪) মুনাজাতে উভয় হাত উত্তোলন করার দলীল আছে কিনা।

মোটামুটি এই চারটি বিষয়ের ফয়সালা পেলেই ফিৎনার মূলোৎপাটন করে দেয়া যাবে। আসুন আমরা উক্ত চারটি বিষয়ের সমাধান দেয়ার চেষ্টা করি।

(১) দোয়া/মুনাজাত কুরআন শরীফ হাদীস শরীফ সম্মত কিনা :

এব্যাপারে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন-
ادعوني استجب لكم

অর্থ: তোমরা আমার নিকট দোয়া কর, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করবো।”

[ সূরা মু’মিন ৬০ নং আয়াত শরীফ ]

হাদীস শরীফে এসেছে-

الدعاء مخ العبادة

অর্থ: দোয়া হলো ইবাদতের মূল বা সারবস্তু।”

দলীল-
√ তিরমিযী শরীফ।

√ মিশকাত শরীফ।

আরো ইরশাদ হয়েছে,

اشرف العبادة الدعاء

অর্থ: দোয়া হলো সর্বোত্তম ইবাদত।”

দলীল-
√ সহীহ বুখারী শরীফ।
√ ফতহুল বারী।

উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত দলীল থেকে আমরা বুঝতে পারলাম দোয়া/মুনাজাত করা শুধু শরীয়ত সম্মতই নয়, বরং আল্লাহ পাকের আদেশ এবং অন্যতম একটি ইবাদত।

(২) ফরজ নামাজের পর দোয়া/মুনাজাতের গুরুত্ব আছে কিনা :

ফরজ নামাজের পর দোয়া আল্লাহ পাকে নিকট কবুল হয়ে থাকে। এ বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস শরীফে বর্নিত আছে-

عن ابي امامة رصي الله عنه قال قيل يا رسول الله اي الدعاء اسمع قال جوف لليل الاخر ودبر الصلوت المكوبات

অর্থ: হযরত আবু উমামা রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, প্রশ্ন করা হলো, ইয়া রসূল্লাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! কোন দোয়া অধিক কবুলযোগ্য ? হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, শেষ রাতের দোয়া এবং ফরজ নামাজ সমূহের পরের দোয়া।”

দলীল-
√ তিরমীযি শরীফ।
√ মুছান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক।
√ ফতহুল বারী।
√ মিশকাত শরীফ।

উক্ত হাদীস শরীফ এর ব্যাখ্যায় দেওবন্দী মুরুব্বী শিব্বির আহমদ ওসমানী লিখিত “ইলাউস সুনান” কিতাবে লিখিত আছে-

فيه اثبات الدعاء بعد الصلاة المفروضة

অর্থ: এ হাদীস শরীফের দ্বারা ফরজ নামাজের পর মুনাজাত করা সাব্যস্ত হলো।”

সূতরাং আমরা দেখতে পেলাম ফরজ নামাজের পর দোয়া করাটা একটা বিশেষ সময়। ফরজ নামাজের পর দোয়া করা জন্য হাদীস শরীফেই বলা হয়েছে।

(৩) ইমাম মুক্তাদি সম্মিলিত ভাবে দোয়া / মুনাজাত করার দলীল আছে কিনা :

ফরজ নামাজের পর ইমাম মুক্তাদী সম্মিলিত ভাবে দোয়া করার কথা ছিয়া ছিত্তার হাদীস শরীফেই আছে। যেহেতু ফরজ নামাজের পর দোয়া কবুল হয় সেহেতু ইমাম এবং মুক্তাদী সম্মিলিত ভাবে দোয়া করার হুকুম করা হয়েছে। হাদীস শরীফে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-

عن ثوبان قال قال النبي صلي الله عليه و سلم لا يؤم قوما فيخص نفسه بدعوة دونهم فان فعل فقد خانهم

অর্থ: হযরত ছাওবান রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত। হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেন, কোন ইমাম সাহেব মুক্তাদীগনকে বাদ দিয়ে শুধু নিজের জন্য দোয়া করবে না। যদি সে তা করে, তবে সে মুক্তাদীগনের প্রতি খেয়ানতকারী হবে।”

দলীল-
√ তিরমিযী শরীফ ২য় খন্ড ৪৭ পৃষ্ঠা।

দেখন উক্ত হাদীস শরীফে ইমামদের উদ্দেশ্য বলা হয়েছে তারা যেন মুক্তাদীদের বাদ দিয়ে একা একা দোয়া না করে। যেহেতু ফরজ নামাজের পর দোয়া কবুল হয় সেহেতু ইমামের প্রতি আদেশ মুক্তাদীদের নিয়ে সম্মিলিত ভাবে দোয়া/মুনাজাত করবে। আর ইমাম মুক্তাদীর সম্মেলন যেহেতু ফরজ নামাজের সময় হয় সেহেতু ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত দোয়া করাটা উক্ত হাদীস শরীফ থেকে প্রমাণিত হলো।

(৪) দোয়া/ মুনাজাতে উভয় হাত উঠানোর দলীল আছে কিনা :

মুনাজাত বিরোধীদের মূল আপত্তি হাত উঠানোর ব্যাপারে। আসুন আমরা হাদীস শরীফ থেকে দেখি সকল দোয়াতেই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র দুই হাত মুবারক তুলেই দোয়া করেছেন। আর এ কারনে হাত তুলে দোয়া করাটাই হচ্ছে সুন্নত।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-

وعن ساءب بن يزيد عن ابيه ان النبي صلي الله عليه و سلم كان اذا دعا فرفع يديه مسح وجهه بيديه

অর্থ: হযরত সায়িব ইবনে ইয়াজিদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্নিত, নিশ্চয়ই হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন দোয়া করতেন, তখন উভয় হাত মুবারক উঠাতেন। অতঃপর (মুনাজাত শেষে) উভয় হাত মুবারক দ্বারা নিজ মুখমন্ডল মাসেহ করতেন।”

দলীল-
√ মিশকাত শরীফ ১৯৬ পৃষ্ঠা।

√ বায়হাক্বী শরীফ।

উক্ত হাদীস শরীফ থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পেলাম যখনই নবী পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করতেন তখন দুই হাত মুবারক তুলে দোয়া করতেন এবং মুখমন্ডল মুবারক মাসেহ করতেন। সকল দোয়াতে হাত তুলে দোয়া করা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নত এটা উপরোক্ত হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমানিত হলো।

উপরোক্ত চারটি বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা গেলো, –
– দোয়া করা একটি ইবাদত।
– ফরজ নামাজের পর দোয়া কবুলের খাছ সময়।
– ইমাম মুক্তাদী সম্মিলিত দোয়া করাটা নবীজী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদেশ।
– হাত তুলে দোয়া করাটা সুন্নত।

সূতরাং প্রমানিত হলো, ফরজ নামাজের পর ইমাম মুক্তাদী সম্মিলিত হয়ে হাত তুলে মুনাজাত করা সুন্নত। সুবহানাল্লাহ্ !!
আর সুন্নতকে বিদয়াত বলা কুফরী।

এবার আসুন দেখি সম্মিলিত মুনাজাত বিরোধী মৌলবীদের মুরুব্বীদের কিতাব থেকে সম্মিলিত মুনাজাতের দলীল-

امام جس وقت نماز سے فارغ هو مع مقتديون كے سب اكهطے دعا مانگين

অর্থ: ইমাম সাহেব যখন নামাজ শেষ করবেন, তখন মোক্তাদীগনকে নিয়ে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করবেন।”

দলীল-
√ ফতওয়ায়ে দেওবন্দ ৪র্থ খন্ড ১৩০ পৃষ্ঠা।

মুনাজাত বিরোধীদের মুরুব্বীদের কিতাবে কি আছে দেখুন –

فتحصل من هذا كله ان الدعاء دبر الصلوة مسنون ومشروع في المذاهب الاربعة لم ينكره الاناهق مجنون قد ضل في سبيل هواه و وسوس له الشيطان واغواه

অর্থ: উপরোক্ত দলীল ভিত্তিক আলোচনা দ্বারা এটাই সাবস্ত্য হয় যে, চার মাযহাবের প্রত্যেকের মত অনুসারে নামাজের পর মুনাজাত করা অবশ্যই সুন্নত ও শরীয়তসম্মত। যে ব্যক্তি এটা অস্বীকার করবে, সে নিশ্চিত পাগল ও নফসের তাড়নায় পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সে শয়তানী ওয়াসওয়াসায় ও ধোঁকায় পড়েছে।”

দলীল-
√ ইস্তেহবাবুদ দাওয়াত আক্বিবুছ ছালাওয়াত ৩য় খন্ড ৮০২ পৃষ্ঠা।

সূতরাং দেখা যাচ্ছে, মুনাজাত বিরোধীরা তাদের মুরুব্বীরদের ফতোয়া অনুযায়ী পাগল, পথভ্রষ্ট এবং শয়তানের অনুসারী। তাই আসুন সুন্নতের বিরোধিতা না করে সুন্নত অনুযায়ী আমল করি।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]