বাংলাদেশে দারিদ্রতা ও আয় বৈষম্য বিপদসীমার কাছাকাছি। মধ্যবিত্তরা দিন দিন দরিদ্র হচ্ছে এবং দরিদ্ররা আরো অতি দরিদ্রে পরিণত হচ্ছে। বিপরীতে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। সরকারের উচিত- আয় বৈষম্যের নির্মূলীকরণ করে জনসাধারণের সর্বোচ্চ উন্নয়ন করা।


সমস্ত প্রশংসা মুবারক খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য; যিনি সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নবী আলাইহিমুস সালাম উনাদের নবী, রসূল আলাইহিমুস সালাম উনাদের রসূল, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অফুরন্ত দুরূদ শরীফ ও সালাম মুবারক।
দারিদ্র বিমোচন তখনই হয় যখন আয় বৈষম্য বিলুপ্ত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে সব সরকারই দারিদ্র বিমোচনের বুলি আওড়িয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং দেশে আয় বৈষম্য প্রকট। বৈষম্য বাড়ার একটা পরিমাপ আছে সেটার মাত্রা অতিক্রম করে এখন বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। আবার এর মধ্যেই প্রচার করা হচ্ছে, উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে দেশ। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রচারিত উন্নয়ন নিয়ে মহা বিতর্ক আছে। কারণ দেশের মুষ্টিমেয় মানুষের উন্নতি আসল উন্নয়ন নয় এবং এর ফল কখনো ভালো হয় না। ‘উন্নয়ন’ মানে দেশের সর্বস্তরের জনগণের ‘উন্নয়ন’। ঢাকার অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী বিত্তশালী কিছু মানুষ, যারা বিদেশে যায়, বিদেশে বাড়ি কেনে, বিদেশে ছেলেমেয়েদের পড়ায়। সেটা তাদের উন্নতি, দেশের উন্নয়ন নয়। শুধু মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ যদি ভালো থাকে, তার ফল ভবিষ্যতে মোটেই ভালো হবে না।
উল্লেখ্য, সরকার থেকে বলা হচ্ছে, ‘দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে’। বাংলাদেশে ৩০ কোটি জনগণ বাস করে। কিন্তু ৩০ কোটি লোক উন্নয়নের মহাসড়কে নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশে শুধু কিছু লোকের দ্রুত উন্নতি ঘটেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু এর পেছনে যে কৃষকের অবদান, দেশের খাদ্যচাহিদা পূরণ হয় যে কৃষি থেকে- সেই কৃষির নিয়ামক ১ কোটি ৮০ লাখ কৃষক আজো দরিদ্র ও নিপীড়িতই রয়ে গেছে। শত ত্যাগ স্বীকার করে যে কৃষকরা দেশের খাদ্যচাহিদা পূরণ করে তা বিদেশে রফতানীর সুযোগ করে দিচ্ছে, সেই কৃষকরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। ফড়িয়া ও দালালদের খপ্পড়ে পড়ে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছে তারা। এমনো অনেক কৃষক রয়েছে, যাদের পরিবার ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে অনাহারে থাকছে। সেইসাথে মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ। কিন্তু দেশের জেলে সম্প্রদায় নানা অবহেলার শিকার হচ্ছে। মহাজন দালালদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে। এক হিসেবে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবি সমাজ দিন দিন বঞ্চনার শিকার হচ্ছে।
এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে সুষম উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢাকা শহরে বর্তমানে ৬০ লাখ বস্তিবাসী রয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত দারিদ্র্য, অনাহার, অবহেলা এবং বঞ্চিত। সরকার থেকে এর আগে কয়েকবার বস্তিবাসীদের উন্নয়নে ভাষানটেকে ফ্ল্যাট দেয়া, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ইত্যাদির পদক্ষেপ নিয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে, তাদের জন্য যে ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছিলো, সেগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালী ও বিত্তশালীরা সেসব ফ্ল্যাট দখল করে নিয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখ্য, ঢাকা শহরে প্রায় ২৫ লাখ পথশিশু রয়েছে। তাদের বিভিন্ন উন্নয়নের কথা বললেও দিন দিন পশশিশু বেড়েই চলেছে। যারা দিন দিন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ের সূচনা করে সামাজিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলছে। সবচেয়ে বৈষম্যের চিত্র হলো, দেশে এখনো ২ কোটি লোক একবেলা না খেয়ে থাকে।
অর্থাৎ, বর্তমানে দেশে আয় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। এটা বাড়তে থাকায় দেশের ধন সম্পদ ৫% লোকের হাতে আটকা পড়েছে। তারাই দেশকে পরিচালিত করছে। ফলে দেশের উন্নয়ন সুফল থেকে বাকি ৯৫% মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। সেইসাথে দেশে আয় বৈষম্যও প্রকট। ঢাকার মোট আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি মাত্র সাড়ে ছয় শতাংশ মানুষের হাতে। এ ধনিক শ্রেণীর মাসিক গড় আয় প্রায় দুই লাখ টাকা। ঢাকার বাইরে ২০ শতাংশের বেশি মানুষের হাতে মোট আয়ের ৫১ শতাংশ অর্থ।
সেইসাথে বাংলাদেশে এস. আলম গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, আড়ং, আনন্দ গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, কনকর্ড গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপসহ প্রায় কয়েকশত কর্পোরেট হাউজ সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে লাখ কোটি টাকার ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করে যাচ্ছে। এমনকি এদের মধ্যে অনেকে ১০/২০ হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণও মাফ করিয়ে নিচ্ছে। সেইসাথে গ্রামীণফোন, এয়ারটেল, ইউনিলিভার, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো, রেকিট, এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকসহ বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। কিন্তু এগুলোর বিপরীতে দেশের সিংহভাগ জনগণের উন্নয়ন হচ্ছে না। ধনীরা শুধু ধনীই হয়ে যাচ্ছে আর দরিদ্ররা অতি দরিদ্রতে পরিণত হচ্ছে।
বলাবাহুল্য, সংবিধানের (১৫) অনুচ্ছেদে রয়েছে- ‘সরকার জনগণের মৌলিকা চাহিদা পূরণের কাজ করবে’। সেইসাথে সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে আরো বলা হয়েছে- ‘কেবল, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না’। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার নিজেদের রাষ্ট্রের সেবক এবং সংবিধানের বাস্তবায়নকারী হিসেবে দাবি করে থাকে। কিন্তু উপরিক্ত বর্ণিত নানা শোষণের চিত্র সরকারের সেই দাবি মøান করে দেয়। একদিকে, পিকে হালদারের মতো দুর্নীতিবাজরা ১০ হাজার কোটি লোপাট করে বিদেশে আরাম-আয়েশ করে। অন্যদিকে সালমান এফ রহমানের মতো কতিপয় ব্যক্তিরা ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা আর পরিশোধ করেনি। সেইসাথে এই ঋণ নিয়ে কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি। যার কারণে সেই কালো টাকা সে সাদা করে নিয়েছে। দেশের ৫৭ টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৬ টি ব্যাংকের পরিচালকরা মিলে ৯০ হাজার কোটি টাকা মিলেমিশে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ আর ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারী, বেসিক ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক কেলেঙ্কারীর টাকা ফেরতের কোনো চিহ্ন আজো দেখা যায়নি। লাখো কোটি টাকা খেলাপী ঋণ ফিরে পাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু দেশের সাধারণ থেকে মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী তথা জনগণ ব্যাংক ঋণসহ নানা সরকারি সহায়তা তো পাচ্ছেই না, উল্টো বিবিধ শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে। এমনকি অনেকেই দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে।

সঙ্গতকারণেই আমরা বলতে চাই, যদি দেশের সাধারণ জনগণের উন্নয়ন না করা হয় এবং তাদেরকে উপযুক্ত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে অবিলম্বে দেশে সামাজিক শৃঙ্খলা ধ্বংস হয়ে যাবে। সত্যিকার অর্থে দেশের উন্নয়ন তো হবেই না, উল্টো দেশ পরিণত হবে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’। তাই সরকারের উচিত- জনউন্নয়ন সাধিত করা। জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ ও সমুন্নত করা।

ছাহিবু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ, ছাহিবে নেয়ামত, আল ওয়াসীলাতু ইলাল্লাহ, আল ওয়াসীলাতু ইলা রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আল জাব্বারিউল আউওয়াল, আল ক্বউইউল আউওয়াল, সুলত্বানুন নাছীর, মুত্বহ্হার, মুত্বহ্হির, আছ ছমাদ, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ক্বায়িম মাক্বামে হাবীবুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা ইমাম খলীফাতুল্লাহ হযরত আস সাফফাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নেক ছোহবত মুবারকেই কেবলমাত্র সে মহান ও অমূল্য নিয়ামত হাছিল সম্ভব।
খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে তা নছীব করুন। (আমীন)

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে