ভারতীয় আগ্রাসন থেকে মুক্ত না হলে প্রকৃত বিজয় কখনোই অর্জিত হবে না।


বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করে এ অঞ্চলের স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায়। ব্রিটিশ আমলের ১৯০ বছরের পরাধীনতা সেই বিধর্মীদেরই ষড়যন্ত্রের ফসল। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে আটক যুদ্ধাপরাধীদের বিনা বিচারে ফেরত দিয়েছিল এই ভারতীয়রাই।
সুতরাং ভারতীয় আগ্রাসন থেকে মুক্ত না হলে প্রকৃত বিজয় কখনোই অর্জিত হবে না।
গত ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘সন্ত্রাস নিয়ে পাকিস্তানকে কড়া বার্তা প্রণবের’ এমন শিরোনামে একটি খবর ছাপা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র ব্রাসেলসে ইউরোপের এক ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী পাকিস্তানের সমালোচনা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে বলে যে, কিন্তু ভারতের পক্ষে তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণœ হয় এমন কোনো সমঝোতা করা সম্ভব নয়। আর সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসে মদদ দেয়াও বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। শিমলা চুক্তির পরে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বন্দি ৯১ হাজার পাকী সেনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ভারত।”
প্রণব বলেছে, শিমলা চুক্তির পরে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বন্দি ৯১ হাজার পাকী সেনাকে ছেড়ে দিয়েছিল ভারত। ঐ সময় যদি ৯১ হাজার সৈন্যকে ফেরত দেয়া না হতো, তবে অন্তত সরাসরি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদের মধ্যে চিহ্নিত ১৯৫ জনের বিচার করা যেত এবং বাকিদের আটকে রেখে পাকিস্তানের কাছ থেকে আমাদের পাওনা পূর্ব-পাকিস্তানের ন্যায্য সম্পদ ফেরত পেতে, মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ আদায় করতে এবং আটকে-পড়া অবাঙালি (পাকিস্তানী)দের ফেরত নিতে দর কষাকষি করা যেত।” (তথ্যসূত্র: দৈনিক আল ইহসান শরীফ উনার মধ্যে প্রকাশিত “ভারত বাংলাদেশের ভালো চায়-এই বক্তব্যের সত্যতা কতটুকু” শীর্ষক মন্তব্য কলাম, ২১শে নভেম্বর ২০১৪ খৃ. প্রকাশিত)
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের দিল্লী মিশন প্রধান ও বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক মাসুদুল হক, যেখানে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের কর্মকা-ের কিছু উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিক মাসুদুল হক উক্ত সাক্ষাৎকারটি তার রচিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। বইটির ১৪০ পৃষ্ঠায় সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃত অংশে উল্লেখ করা হয়েছে যে-
“মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্ব আমার (হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী) উপর অর্পিত ছিল। সেই সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর (ইন্দিরা গান্ধী) ব্যক্তিগত স্টাফদের সঙ্গে আমার হৃদিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। প্রধানমন্ত্রীর এক ব্যক্তিগত স্টাফ আমাকে ২৯শে ডিসেম্বর ১৯৭১ এ জানায় যে, আগের দিন অর্থাৎ ২৮শে ডিসেম্বর তিনজন সংখ্যালঘু নেতা যাদের মধ্যে চিত্তরঞ্জন ছুতার ছিল একজন, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে। তারা তার কাছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার প্রস্তাব করে।
পরে আমি বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি অবহিত করি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। আসলে, তারা কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিল বাংলাদেশকে সিকিম ধরনের ভারতীয় অংশ করতে।”
উপরোক্ত বর্ণনাগুলো পড়ে আমরা বুঝতে পারি যে, ভারতীয় সম্প্রদায় কিংবা ভারতীয় হিন্দু রাষ্ট্রযন্ত্র কখনোই বাংলাদেশের ভালো চায়নি। সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে দুর্বল মনে করে, সেদেশে জন্ম নেয়া হিন্দুরাই চেয়েছিল দেশটিকে ফের পরাধীনতার শিকল পরাতে।
উল্লেখ্য, এই ভূখ-ের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস কিন্তু শুধু একাত্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলায় মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে স্বাধীনতা বজায় রাখতে বারবার আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে বাঙালি মুসলমানদের। কারণ বাংলা ছিল ধনসম্পদে পরিপূর্ণ একটি দেশ। এই ধনসম্পদের লোভে সব শাসকই এই দেশকে আক্রমণ করে দখলে নিতে চাইতো। বিপরীতে এই বাংলার স্বাধীনতাকে সবসময় নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্র চালিয়ে গিয়েছে কুচক্রী বাঙালি ভারতীয় সম্প্রদায়।

স্বাধীন সুলতানী আমলের বিশ্বাসঘাতক গণেশ:
দিল্লীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাংলায় দুশো বছরের স্বাধীন সুলতানি আমলের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, যা বাংলার ইতিহাসে অন্যতম গৌরবজনক অধ্যায়। ১৩৩৮ খৃ. থেকে ১৫৩৮ খৃ. পর্যন্ত বাংলার মুসলিম শাসকগণ দিল্লীর প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে এই দেশ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু এই ‘স্বাধীন সুলতানী আমল’-এর স্বাধীনতা নস্যাৎ হতে বসেছিল ‘গণেশ’ নামক এক কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতক হিন্দুর দ্বারা।
স্বাধীন সুলতানী আমলের প্রধান রাজপরিবার ইলিয়াস শাহী বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান হযরত গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে শহীদ করেছিল এই ‘গণেশ’, যে ছিল উনার সামান্য এক কর্মচারী। তারপর এই গণেশ এ অঞ্চলের মুসলিম ছূফী ও দরবেশগণ উনাদের উপর নির্যাতন চালানো শুরু করলো এবং উনাদের অনেককে শহীদ করে ফেললো। এমতাবস্থায় চিশতীয়া তরীক্বা উনার একজন বিখ্যাত ছূফী হযরত নূর কুতুবে আলম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উত্তরপ্রদেশের শাসক ইবরাহীম শর্কীকে আহবান করলেন ঘাতক গণেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য।
স্বাধীন মুসলিম সুলতানগণ দিল্লীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাকে স্বাধীন রেখেছিলেন, কিন্তু হিন্দুদের পক্ষে কী তা সম্ভব? তারা তো কাপুরুষ। গণেশ ইবরাহীম শর্কীর আগমনের সংবাদ পেয়েই হযরত নূর কুতুবে আলম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পায়ে পড়ে প্রাণভিক্ষা করলো।
অর্থাৎ বাংলার স্বাধীন মুসলিম সুলতানগণ যেখানে দিল্লীর সামনেও মাথানত করেননি, সেখানে এই ‘গণেশ’ উত্তরপ্রদেশের একজন প্রাদেশিক শাসনকর্তার যুদ্ধ ঘোষণার কথা শুনেই রীতিমতো হাত-পা ধরে ক্ষমা চেয়েছিল। বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলের ইতিহাসে যে ‘চির উন্নত মম শির’-এর গর্ব ছিল, তাকে কলঙ্কিত করেছিল এই গণেশ আর তার সহযোগী হিন্দু কাপুরুষ-কুচক্রীরা। পরবর্তীতে এই লজ্জা থেকে বাঙালি মুসলমান জাতিকে মুক্তি দিয়েছিলেন হযরত নূর কুতুবে আলম রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি গণেশের পুত্র যদু’কে পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনার মধ্যে ধর্মান্তরিত করে। গণেশের পুত্র যদু নাম পাল্টে হয়েছিলেন জালালউদ্দীন মুহম্মদ শাহ, যিনি ছিলেন সুলতানী আমলের শাসকদের অন্যতম। উনার নেতৃত্বেই আরাকানে মুসলিম শাসন জারি হয়েছিল। কাপুরুষ বিশ্বাসঘাতক হিন্দু পিতার সন্তান দ্বীন ইসলাম গ্রহণে হলেন দ্বিগি¦জয়ী বীর।

আফগান আমলের বিশ্বাসঘাতক শ্রীহরি:
হিন্দুদের ষড়যন্ত্রে মুঘলদের বিরুদ্ধে আফগানদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ধুলিসাৎ হয়েছিল। স্বাধীন সুলতানী আমলের পর বাংলাকে কেন্দ্র করে মুঘল আধিপত্য প্রতিহত করে স্বাধীন রাজ্য গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল বাংলায় বসতি স্থাপনকারী আফগান সুলতানগণ। কিন্তু তারা যেসব হিন্দুদেরকে রাজকীয় পদে নিয়োগ দিয়েছিল, তারাই বিশ্বাসঘাতকতা করে মুঘলদের সাথে হাত মিলিয়ে বাংলার পরাধীনতাকে ত্বরান্বিত করেছিল।
বাংলায় শেষ আফগান নৃপতি দাউদ খান কররানীর অধীনস্থ কর্মচারী ছিল শ্রীহরি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আবদুল করিমের রচিত “বাংলার ইতিহাস: মুঘল আমল” গ্রন্থের ৪৮ পৃষ্ঠায় রয়েছে যে, “এই শ্রীহরি গোপন দলিলপত্র দিয়ে মুঘলদের সঙ্গে আঁতাত করেছিল। এই গোপন দলিলপত্রগুলো কি এখন দেখা যাক। শ্রীহরির চাচাতো ভাই বসন্ত রায়ও দাউদ কররানীর অধীনে উচ্চপদে নিযুক্ত ছিল। শ্রীহরি ছিল মন্ত্রী এবং বসন্ত রায় ছিল খালিসা বিভাগের কর্মকর্তা বা রাজস্ব সচিব। আবার বসন্ত রায়ের পিতৃব্য শিবানন্দ ছিলো প্রধান কানুনগো। সুতরাং জমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত সমস্ত দলীলপত্র তাদের হাতে গচ্ছিত ছিল।”
অর্থাৎ বাংলার মুসলমানরা স্বাধীনতা চেয়েছিল, কিন্তু শত্রু চেনেনি বলে তাদের সেই চাওয়া আলোর মুখ দেখতে পায়নি। শ্রীহরি ও তার পুত্র প্রতাপাদিত্য এই বিশ্বাসঘাতকতার পুরস্কার হিসেবে মুঘলদের নিকট থেকে যশোরের জমিদারি লাভ করেছিল।

ব্রিটিশআমলের পরাধীনতা- হিন্দুদের ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত রূপ:
বারবার গুলি করতে করতে একটিসময় আন্দাজ এসে যায়, তখন আর লক্ষ্য বিফল হয় না। বাঙালি হিন্দুরা বারবার ষড়যন্ত্র করেছিল এবং মুসলমানরাও উদারতাস্বরূপ বারবার সবকিছু ভুলে তাদেরকে প্রশ্রয় দিচ্ছিল। ফলশ্রুতিতে বারবার ষড়যন্ত্র করতে করতে হিন্দুরা একটিসময়ে এসে পারদর্শী হয়ে উঠলো এবং ব্রিটিশদের সহযোগিতায় তারা চূড়ান্তভাবে মুসলমানদের উপর আঘাত হানতে সক্ষম হলো। ব্রিটিশআমলে তারা শুধু বাংলার মুসলমানদের নয়, বরং গোটা ভারতবর্ষের মুসলমানদেরকে পরাধীন করে ছাড়লো। এবার এ অঞ্চলের মুসলমানরা ব্রিটিশ-হিন্দু যাঁতাকলে পড়ে একেবারে পিষ্ট হয়ে গেলো।
ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলের ধনসম্পদ ব্রিটেনে পাচারে যাবতীয় সাহায্য করেছিল বাঙালি ভারতীয় সম্প্রদায় এবং এর ফলেই বাংলাদেশ ও পাক-ভারত উপমহাদেশ বর্তমানে বিশ্বের বুকে গরিব দেশ হিসেবে চিত্রিত। বাঙালি হিন্দুরা কতোটা দালালি করেছিল ব্রিটিশদের, কতোটা বিরোধিতা করেছিল এই বাংলার স্বাধীনতার, তা অল্প কথায় পুরোটা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিল-
‘ভারতের প্রিয়পুত্র হিন্দু সমুদয়
মুক্তমুখে সবে বলো ব্রিটিশের জয়!’
এখন সামান্য বুদ্ধি থাকলে এই কবিতা থেকেই যে কেউ হিন্দুদের দালালি আঁচ করতে পারবে।
শত শত বছর ধরে দুধকলা দিয়ে হিন্দুত্ববাদী কালসাপ পুষে তাকে রীতিমতো দানবে পরিণত হওয়ার অবকাশ দেয়াতেই হয়েছিল এই পরিণতি। যদি অঙ্কুরেই এই হিন্দুত্ববাদী বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলা হতো, তাহলে গোটা বিশ্বের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতে পারতো।
সুতরাং বিধর্মী ভারতীয়রা কোনো অবস্থাতেই এই ভূখ-ের স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হতে পারে না। বরং তারা হাজার বছর ধরে এই ভূখ-ের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত। এখানে যে ইতিহাস আলোচনা করা হলো, তা অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানই জানে না। আর জানে না বলেই এদেশে ‘ভারত বাংলাদেশের ভালো চায়’ বলে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কুচক্রী বিধর্মী ভারতীয় সম্প্রদায়ের হাজার বছরের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসকে ধামাচাপা দিয়ে তাদেরকে বানানো হচ্ছে ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি’। নাউযুবিল্লাহ!

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে