মূর্তি আর ভাস্কর্য নিয়ে বিভ্রান্ত সৃষ্টিকারী ও দ্বীন ইসলাম বিকৃতকারীদের অপপ্রচারের দলীলভিত্তিক জবাব


সম্প্রতি একটি গোষ্ঠী মূর্তিকে ‘ভাস্কর্য’ আখ্যা দিয়ে নানারকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে ও মনগড়া রেফারেন্স দিয়ে দাবি করতে চায়- ‘ইসলামে নাকি মূর্তি বৈধ!’। নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ!
এরা অত্যন্ত ঠা-া মাথায় দ্বীন ইসলাম উনাকে বিকৃত করে অপব্যাখ্যা করে যাচ্ছে। এরা বিভিন্ন ভ্রান্ত দলিল ও যুক্তি দিয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ উনার আইনসমূহকে ভুল ও মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। নাউযুবিল্লাহ!
এসব মূর্তিপ্রেমীরাই আবার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ‘ওয়ার্ল্ড মুসলিম কংগ্রেস’-এর উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য, মুসলিমস রিফর্ম মুভমেন্ট ও আমেরিকান ইসলামিক লিডারশিপ কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বলেও দাবি করে আসছে। এদের এসব বিভ্রান্তিকর যুক্তি ও মূর্খতাসূচক দাবির খন্ডন করবো। ইনশাআল্লাহ।
তারা আরেকটি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে থাকে, “তখন কা’বার দেয়ালে ৩৬০টি মূর্তি (বুখারি ৩য় খ–৬৫৮) ও অনেক ছবির সঙ্গে ছিল হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত মরিয়ম আলাইহাস সালাম উনার ছবিও। উদ্ধৃতি দিচ্ছি, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম উনাদের ছবি বাদে বাকি সব ছবি মুছিয়া ফেলিতে নির্দেশ দিলেন।’ (সিরাত ইবনে হিশাম/ইবনে ইসহাক-এর পৃষ্ঠা ৫৫২)”।
মিথ্যাচারের দলিলভিত্তিক জবাব:
(১) “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের পর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন পবিত্র বায়তুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে বিভিন্ন প্রতিকৃতি/ছবি দেখলেন, তখন তা মুছে ফেলার নির্দেশ মুবারক দিলেন। প্রতিকৃতিগুলো মুছে ফেলার আগ পর্যন্ত তিনি তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেননি।” (পবিত্র বুখারী শরীফ/ ৩৩৫২)
(২) হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, “পবিত্র মক্কা শরীফ বিজয়ের দিন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে নির্দেশ মুবারক দিলেন- যেন তিনি পবিত্র কা’বা শরীফ উনার ভিতরের সব ছবি/মূর্তি নষ্ট করে দেন। অতঃপর ছবি/মূতি নষ্ট করার আগে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি পবিত্র কা’বা শরীফ উনার ভিতর তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেননি। (পবিত্র আবু দাউদ শরীফ, পবিত্র বায়হাকী শরীফ )
(৩) নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি যখন পবিত্র কা’বা শরীফ উনার কাছে আসলেন, তখন মূর্তি থাকায় উহার ভিতরে তিনি তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করেননি। এরপর তিনি নির্দেশ মুবারক দিলেন সেগুলো অপসারণ করার জন্য; এবং ত-ই করা হলো। সেখানে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসমাইল যাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনাদের প্রতিকৃতিও ছিল ছিল, উনাদের হাতে ভাগ্য নির্ধারণী তীর ছিল। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি তা দেখে ইরশাদ মুবারক করলেন, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদেরকে (যারা এগুলো বানিয়েছে তাদেরকে) ধ্বংস করুন। তারা কি জানতো না যে, হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসমাইল যাবীহুল্লাহ আলাইহিস সালাম উনারা কখনো এসব ভাগ্য নির্ধারণী তীর ব্যবহার করেননি? এরপর তিনি পবিত্র কা’বা শরীফ উনার মধ্যে তাশরীফ মুবারক গ্রহণ করলেন এবং চতুর্দিকে তাকবীর ধ্বনি দেয়া হলো, তবে কোনো নামায পড়লেন না। (পবিত্র বুখারী শরীফ ১:২১৮, পবিত্র আবু দাউদ শরীফ :১:২৭৭, রশীদিয়া লাইব্রেরী, দিল্লী)
এভাবে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য কিতাবেও এসেছেন।
(৪) হযরত উসামা বিন যায়দ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, আমি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে পবিত্র কা’বা শরীফ উনার মধ্যে প্রবেশ করলাম। তিনি তাতে কিছু ছবি দেখতে পেলেন। তখন তিনি এক বালতি পানি আনতে আদেশ মুবারক করলেন। আমি পানি আনার পর তিনি তা দিয়ে সেগুলো মুছে দিলেন এবং ইরশাদ মুবারক করলেন- ‘মহান আল্লাহ পাক তিনি ঐ সম্প্রদায়কে ধ্বংস করুন, যারা এমন জিনিসের আকৃতি দেয় যা তারা সৃষ্টি করতে পারবে না”। (পবিত্র আবু দাউদ শরীফ)
এসব পবিত্র হাদীছ শরীফ অনুযায়ী নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি স্পষ্টতই সব ছবি/মূর্তি নষ্ট করেন এবং এতে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এবং হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম উনাদের প্রতিকৃতি অক্ষুণœ থাকার কেনো প্রমাণ নেই। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও হযরত মারইয়াম আলাইহাস সালাম উনার ছবি নষ্ট করতে নিষেধ করেন, তা কেউ বর্ণনা করেননি। এটি সম্পূর্ণই বানোয়াট।
ইবনে ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি জীবনী গ্রন্থের দুই ধারক হযরত ইমাম তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ও হযরত ইবনে হিশাম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা কেউই এ বর্ণনাটি উল্লেখ করেননি। এ দুটো জীবনী গ্রন্থ ছাড়াও কোনো জীবনী গ্রন্থেই এর উল্লেখ নেই। তাহলে প্রশ্ন, তা পেল কোথা থেকে? তারা যে রেফারেন্স থেকে এই কথা উল্লেখ করেছে তাহলো ‘আলফ্রেড গিয়োম’ নামক এক বিধর্মীর লিখা বই থেকে। ১৯৫৫ সালে সে হযরত ইমাম তাবারী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ও হযরত ইবনে হিশাম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের লিখিত কিতাব থেকে কেবল হযরত ইবনে ইসহাক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বর্ণনাগুলো সঙ্কলন করে ‘দি লাইফ অব মোহাম্মদ’ গ্রন্থটি রচনা করে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে তা ২০০৩ ও ২০০৬ এ পুনঃমুদ্রিত হয়। আলফ্রেড গিয়োম সঙ্কলিত ‘দি লাইফ অব মুহাম্মদ’ গ্রন্থটি খ্রিস্টান লোকদের নবীবিদ্বেষী মনোভাবের নিকৃষ্ট উদাহরণ বৈ কিছুই নয়। সে এখানে অনেক কিছু বিকৃত করে, যার মধ্যে এই মিথ্যাচার জঘন্যতম। অতএব, পবিত্র দ্বীন ইসলাম বিকৃতকারী এই নাস্তিক মাহমুদ সে যে রেফারেন্স দিয়ে মূর্তি বৈধ করতে চেয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে জঘন্য মিথ্যাচারিতা বৈ কিছুই নয়।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]