রবীন্দ্রকে কেন্দ্র করে মুসলিম জাতিসত্তার অবমাননা, আইনি নোটিশ


রবীন্দ্রকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তিকর প্রবন্ধ রচনা করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যা. সিরাজুল ইসলামকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক আল বাইয়্যিনাত উনার সম্পাদক মুহম্মদ মাহবুব আলম।
নোটিশে বলা হয়, ঢাবির ওই অধ্যাপক গত ৭ আগস্ট ২০২০ তারিখে দৈনিক যুগান্তর-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে
“বাঙালির জাতীয় সত্তার বিকাশ”-এ রবীন্দ্রের কথিত “ভূমিকা তুলনাবিহীন” হওয়ার দাবি করে, যা একেবারেই অসত্য ও হাস্যকর। নোটিশে নানা ঐতিহাসিক তথ্য ও আলোচনা টেনে এনে ঢাবি অধ্যাপকের দাবিকৃত রবীন্দ্রের তথাকথিত “ভূমিকা তুলনাবিহীন” হওয়ার কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা নেই বলে মত পেশ করা হয়।
নোটিশে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে বাঙালির “জাতীয় পরিচয় সুসংহত” হয়েছে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকে রবীন্দ্র ছিলো বাঙালি জাতির অতি ক্ষুদ্র সংখ্যক একটি শ্রেণির কাছে পরিচিত এবং নগন্য সংখ্যক সাংস্কৃতিক এলিটের কাছে পূজনীয়। একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদানকারী ও বীরত্বের সাথে লড়াইকারী বাংলার সিংহভাগ কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুরদের রবীন্দ্রের নাম-নিশানাও পরিচিত ছিল না। বাংলার এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুররাই বাঙালির “জাতীয় পরিচয় সুসংহতকরণ”-এর ক্ষেত্রে তুলনাবিহীন ভূমিকা রেখেছেন। বাংলার এই কৃষক-শ্রমিক-দিনমজুরদের কাছে অচেনা রবীন্দ্রের প্রভাব আছে কেবলই কিছু জনবিচ্ছিন্ন রোমান্টিক “বুদ্ধিজীবী” সার্কেলে।
নোটিশে রবীন্দ্র যে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদের পক্ষপাতি ছিলো সে বিষয়টি উপস্থাপন করে বলা হয়, ব্রিটিশদের অধীন থেকে ভারতের স্বাধীনতা চেয়ে রবীন্দ্র তার সমগ্র জীবনে একটি বাক্যও লেখেনি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার চোখে ছিল “আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলির রাজনৈতিক উপসর্গ”। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনকে রবীন্দ্র “চরকা-সংস্কৃতি” বলে বিদ্রূপ করে কঠোর ভাষায় তার বিরোধিতা করেছিলো। উন্নত, আধুনিক ভারতবর্ষ বিনির্মাণে ইংরেজ ভূমিকা নেবে- দীর্ঘদিন এমন বিশ্বাস রবীন্দ্র লালন করেছে। তার একাধিক প্রবন্ধে তা প্রকাশ পেয়েছে। পেয়েছে ইংরেজের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্বন্ধে তার বিশ্বাস। রবীন্দ্রের ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ (১৯০৮) প্রবন্ধটি যেন তার ভারতবর্ষ-বিষয়ক ইতিহাস-ভাবনার প্রতিফলন। এখানে রবীন্দ্র পূর্ব ও পশ্চিমের মিলনে প্রত্যাশী। “পশ্চিম” বলতে এখানে সে ইংরেজকেই বুঝিয়েছে। রবীন্দ্র বলেছে, “ইংরেজের সঙ্গে আমাদের মিলন সার্থক করিতে হইবে। মহাভারতবর্ষ গঠনের ব্যাপারে এই ভার আজ আমাদের উপর পড়িয়াছে। ইংরেজের যাহা কিছু শ্রেষ্ঠ, ইংরেজ তাহা যে সম্পূর্ণভাবে ভারতবর্ষে প্রকাশ করিতে পারিতেছে না, সেজন্য আমরা দায়ী আছি।”
নোটিশে রবীন্দ্র যে মুসলমান জাতিসত্তার বিরোধী ছিলো সে বিষয়ে বলা হয়, বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রবীন্দ্র কখনোই প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি, বরং বহুক্ষেত্রে সে মুসলিম জাতিসত্তার অবমাননা করেছে। তার সাহিত্যে মুসলিমদের ম্লেচ্ছ, যবন ইত্যাদি বলা হয়েছে। যেমন, “রীতিমত নভেল” গল্পে রবীন্দ্র লিখেছে, “আল্লা হো আকবর শব্দে রণভূমি প্রতিধ্বণিত হইয়া উঠিয়াছে। একদিকে ৩ লাখ যবন সেনা, অন্যদিকে সহস্র আর্য সৈন্য। …..তিনলক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের ‘আল্লা হো আকবর’ ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল?” (নাউযুবিল্লাহ!)
এহেন অবস্থায় নোটিশে প্রশ্ন তোলা হয়, মুসলিমগণ যেখানে রবীন্দর ভাষায় “যবন”, “ম্লেচ্ছ” অর্থাৎ অসভ্য/বর্বর, তাহলে বাঙালি মুসলিম কেন রবীন্দ্রকে নিয়ে গর্ব করবে? কেনই বা তার পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দেবে?
নোটিশে উক্ত প্রবন্ধ রচনাকে অসত্য, বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে উল্লেখ্য করে এই নোটিশ পাওয়ার ৭ দিনের মধ্যে রবীন্দ্রকে কেন্দ্র করে সকল বক্তব্য প্রত্যাহারের আহবান জানানো হয়েছে। না হলে শক্ত আইনি ব্যবস্থার হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে নোটিশে।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]