রাজারবাগ শরীফ সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের লক্ষ্যে মু‌ক্তি‌যোদ্ধা ও বাংলাদেশ উলামা পীর মাশায়েখ মহাজোটসহ সমমনা ১৩টি সংগঠনের বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন অনু‌ষ্ঠিত হ‌য়ে‌ছে।


আজ রবিবার সকাল ১০ টা থে‌কে দুপুর ১ টা পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবে মানববন্ধন এবং প্রেসক্লাব থে‌কে বি‌ক্ষোভ মিছিল বের হ‌য়ে শহ‌রের বি‌ভিন্ন স্থা‌নে প্র‌তিবাদ জানা‌নো হয়।

জামাত-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গত ৫০ বছরে নিরলস কাজ করার প্রেক্ষিতে রাজারবাগ শরীফ সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধের দাবিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের লক্ষ্যে বাংলাদেশ উলামা পীর মাশায়েখ মহাজোটসহ সমমনা ১৩টি সংগঠন আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনের আয়োজন করেছে।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, রাজারবাগ শরীফ কখনও বিশৃঙ্খলা তৈরী, জান-মালের ক্ষতি সাধন, কাউকে হত্যা বা কতল করা, একজনের শাস্তি অপরজনের উপর চাপিয়ে দেয়া অথবা হত্যা, বোমাবাজি, সহিংসতা, সন্ত্রাস ইত্যাদির মাধ্যমে দ্বীন ইসলাম কায়েম বা প্রচারে বিশ্বাসী নয়। এমনকি রাজারবাগ শরীফ থেকে হরতাল করাকেও দ্বীন ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম ফতওয়া দেয়া হয়েছে। সুত্র: মাসিক আল বাইয়্যিনাত, ১৬ তম সংখ্যা।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, জঙ্গিরা বোমাবাজি, মানুষ হত্যা, সন্ত্রাস বা সহিংসতার মাধ্যমে কাজ করে, রাজারবাগ শরীফের পক্ষ থেকে মাসিক আল বাইয়্যিনাত ও দৈনিক আল ইহসানে তাদেরকে কাফের ও মুরতাদ ফতওয়া দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, লোন উলফসহ জঙ্গিদের যে কোনো হামলা ও কার্যক্রম সম্পূর্ণ হারাম ও অনৈসলামিক।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, রাজারবাগ দরবার শরীফের সাথে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের আকাশ পাতাল পার্থক্য। জঙ্গিদের কাজের ধরণ হলো- তারা মানুষকে হতাহত করে, ভীত সন্ত্রস্ত করে, অস্ত্র হাতে নিয়ে, হুমকি ধামকি দিয়ে, বোমাবাজি করে, ত্রাস সৃষ্টি করে, অর্থাৎ আইন অমান্য করে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়। কিন্তু রাজারবাগ দরবার শরীফের কাজের পদ্ধতি হলো, রাজারবাগ শরীফ রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, জনমত তৈরী করে, সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিশুদ্ধকরণের মধ্য দিয়ে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের সাথে রাজারবাগ দরবার শরীফের এখানেই মৌলিক পার্থক্য।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, বর্তমানে রাজারবাগ দরবার শরীফের বিরুদ্ধে যে মিডিয়া ক্যু চলছে তাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী মর্মাহত। কারণ রাজারবাগ দরবার শরীফের হযরত পীর সাহেব ১৯৭১ সালে ছাত্র অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে খাদ্য সহায়তা ও আর্থিক সহায়তা করেছেন। উনার আপন ভাই ও ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনরাও মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। হযরত পীর সাহেবের মেজ ভাই হাফিজুর রহমান হারুণ সেক্টর-২ এর অধীনে ক্র্যাক প্ল্যাটুনের একজন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, আজকে কোর্ট থেকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হচ্ছে। অথচ রাজারবাগ শরীফের হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণ শরীয়তের পাবন্দ হওয়ায় উনার কোনো ছবিই নেই। উনার কোনো পাসপোর্টও নেই। উনি নিজের থেকেই দেশত্যাগ করবেন না। একই কারণে উনার নামে কোনো ব্যাংক একাউন্ট নেই। উনার গ্রামের বাড়িতে কিছু কৃষি জমি ছাড়া নিজের নামে কোনো সম্পত্তি নেই। পৈতৃকসুত্রে প্রাপ্ত সম্পদের সিংহভাগ তিনি মুহম্মদীয়া জামিয়া শরীফ মাদ্রাসার নামে দান করেছেন। এমনকি গ্রামের কৃষি জমিতে উৎপাদিত ফসলও ব্যবহৃত হচ্ছে মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্য। অথচ উনার নামেই মিডিয়া ও প্রশাসনে ঢুকে পড়া জামাত-শিবির চক্র এত অপপ্রচারণা চালাচ্ছে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আহ্বান, তিনি যেন জামাত-জঙ্গীবাদবিরোধী হক্ব দরবার শরীফ, রাজারবাগ শরীফের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, জঙ্গিরা কখনও ত্বরীকত, পীর সাহেব, সুন্নতী আমল, সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ, দেশপ্রেম ইত্যাদিতে বিশ্বাস করেনা। কিন্তু রাজারবাগ দরবার শরীফ ত্বরীকত, তাসাউফ, সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ, সুন্নত পালন, দেশের উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে সহযোগীতা ইত্যাদি আদর্শে বিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে জঙ্গিরা অধিকাংশই লা-মাযহাবী, সালাফী ইত্যাদি মতাদর্শে বিশ্বাস করে।

সমাবেশ
সমাবেশে বক্তারা বলেন, রাজারবাগ শরীফ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বিশেষ সক্রিয় বলেই খোদ রাজারবাগ শরীফই জঙ্গিদের হামলার লক্ষ্যস্থল। যে জন্য জঙ্গীদের হামলা থেকে রাজারবাগ শরীফের নিরাপত্তার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে ৩০ শে আগষ্ট ২০১৬ সালের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক আল বাইয়্যিনাত এবং রাজারবাগ দরবার শরীফ জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও জামাতের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার অবস্থানে। স্মারক নং-৪৪.০০.০০০০.০৭৫.০৬.০১১.১৬-৬৪৭। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে ২১ শে জুলাই ২০১০ সালের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে- আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত/উলামা আনজুমানে আল বাইয়্যিনাত, বাংলাদেশ নামীয় সংস্থাটি সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য নেই। স্মারক নং-স্বম(রাজ-২)/গোপ্র-ধউস/৪-১/২০০৯-২৪। মতিঝিল থানার ওসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- তদন্তকালে দেখা যায়, রাজারবাগের পীর সাহেব তিনি নালিসী সম্পত্তিতে মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। তাছাড়া সাড়া দেশে তাহার অসংখ্য মুরিদান রহিয়াছে। তিনি বা তাহার মুরিদগণ জঙ্গি তৎপরতায় লিপ্ত এই ধরণের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায় নাই। স্মারক নং-৩৩৫ ডিসি মতিঝিল, তারিখ-১৪-০৮-০৯।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, রাজারবাগ দরবার শরীফের পক্ষ থেকে যদি এ দেশে কোন ইসলামী আইনের প্রয়োজন অনুভব করা হয়, তখন প্রয়োজনের কথা রাজারবাগ শরীফের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদফতর বা কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়। তারপরও যদি কাজ না হয়, তখন মিডিয়ার মাধ্যমে জনমত তৈরী, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয় যেন সরকার বুঝতে সক্ষম হয়, জনগণের আইনটি প্রয়োজন। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকার যখন আইন তৈরীর কাজ শুরু করে, তখন সেই খসড়া আইন নিয়ে কোন কথা থাকলে রাজারবাগ শরীফ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠায়, আইন বিয়োজন-সংযোজনের জন্য পরামর্শ দেয়। এরপরও আইনটি নিয়ে যদি রাজারবাগ দরবার শরীফের কোন কথা থাকে, তবে আদালতের মধ্যস্থতায় আইনের ব্যাপারে আপত্তি সরকারকে জানানো হয়। অর্থাৎ রাজারবাগ শরীফ সংবিধান অনুযায়ী আইনটির পরিবর্তন বা পরিশোধন চায়। পাশাপাশি কেউ ধর্মবিরোধী কোন অপরাধ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাজারবাগ শরীফ তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, আখেরী নবী হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক শানে কটূক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুদ- বিধান রেখে আইন পাশ করার জন্য রাজারবাগ শরীফ আইন মন্ত্রনালয়ের কাছে চিঠি দেয়। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা না নেয়ায় রাজারবাগ শরীফ পত্রিকায় লেখনীর মাধ্যমে জনমত তৈরী করে, যেন জনগণ সরকারের প্রতি এ আইন প্রণয়নের ব্যাপারে দাবী তুলতে পারে। পাশাপাশি, অনলাইনে আখেরী নবী হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুবারক শানে কটূক্তি অব্যাহত থাকায় রাজারবাগ শরীফ কটূক্তি বন্ধে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে। এতে বিটিআরসি সচেতন হয়ে অনেক ধর্মবিদ্বেষী ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়। রিট নম্বর- ৯৬৬০/২০১৫।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, ২০১৩ সালে নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো শাপলা চত্বরে ভাংচুর ও সহিংস কার্যক্রম চালালেও রাজারবাগ দরবার শরীফ তা থেকে বিরত থাকে। এর বদলে যে সকল নাস্তিক এসব অপকর্মের সাথে যুক্ত, তাদের দলিলভিত্তিক তালিকা তৈরী করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে জমা দেয়। সেই তালিকা নিয়েই পরবর্তীতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মিটিং করে এবং সেই সূত্র ধরে ধর্মবিদ্বেষী নাস্তিকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা পীরজাদা আলহাজ্জ্ব মাওলানা মুহম্মদ আখতার হোসেন বুখারী।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]