শত্রুর প্রতি বিদ্বেষ-ই আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে। এজন্য শত্রুরা চায়- মুসলমানরা যেন তাদের বন্ধুত্বের ফাঁদে পা দেয়।


একাত্তরে বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল। এই বিজয় অর্জন সম্ভব হতো না, যদি না বাঙালি মুসলমানরা পশ্চিম পাকিস্তানী যালিম শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করতো। এ প্রসঙ্গে একাত্তরে ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানের পাঠক এমআর আখতার মুকুলের রচিত ‘গয়রহ’ নামক গ্রন্থের ১৫১-১৫২ পৃষ্ঠায় স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন-
“নিপুণের (আখতার মুকুলের পুত্র) হাতে মেজর কাইয়ুম-এর গুলি ভর্তি রিভলবার। এবার মেজর আদর করে নিপুণকে বললো-
“কেয়া করেগা ইয়ে রিভলবার লেকে?”
জবাব এলো, “পাঞ্জাবী মারুম।”
আমি আর মেজর কাইয়ুম দু’জনে এধরনের জবাবে হতভম্ব হয়ে রইলাম। রিভলবারটা ফেরত নিয়ে কাইয়ুম নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো, এই-ই যখন বঙ্গাল মুল্লুকের অবস্থা, তখন তোমরা যে আলাদা হয়ে যাবেই একথাটা এখনি বলা যায়।”
একাত্তরে যেভাবে আমরা পাঞ্জাবীদের প্রতি ঘৃণাবোধের কারণে নিজেদের স্বাধীকার আদায় করতে পেরেছিলাম, ঠিক সেভাবেই সাতচল্লিশে হিন্দুদের ঘৃণা করার কারণে আমরা হিন্দুত্ববাদের সর্বগ্রাসী থাবা এড়িয়ে নিজেদের জন্য আলাদা ভূ-খ- পেয়েছিলাম। অর্থাৎ শত্রুকে চেনা এবং শত্রুর প্রতি ঘৃণা, এই দুটি বিষয় না থাকলে আমরা স্বাধীন সত্তা অর্জন করতে পারতাম না।
এ কারণেই কোনো জাতিকে কব্জা করতে হলে সে জাতির মনমানসে শত্রুর প্রতি ভালোবাসা এবং সহানুভূতি সৃষ্টি করার পথ বেছে নেয়া হয়, আর সে উদ্দেশ্যে বেছে নেয়া হয় উক্ত জাতির মনমানসে শত্রু জাতির সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টির কৌশল বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের আগে সেখানকার মুসলমানদের মধ্যে খ্রিস্টানদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব গড়ে তোলা হয়েছিল, খ্রিস্টান মেয়ে বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল মুসলিম যুবসমাজকে। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের পতন হয়েছিল হিন্দুদেরকে বন্ধু মনে করার কারণে।
তবে শুধু মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রেই যে এই কুটকৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তা নয়। সিকিম দখলের আগে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে সেদেশের জনগণের মনে ভারতের প্রতি ভালোবাসা ও নতজানু মনোভাব সৃষ্টি করা হয়েছিল।
শত্রুকে বন্ধু মনে করার কারণেই বর্র্তমানে মুসলিম উম্মাহ লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছে। যেই বাঙালি মুসলমান পাকিস্তানী বুলেটের সামনে মাথানত করেনি, তারা আজ হিন্দি সিরিয়াল ও গানের আফিমে বুঁদ হয়ে রয়েছে বিধায় ভারতীয় বিএসএফ সীমান্তে একের পর এক হত্যাকা- চালিয়ে গেলেও তারা কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। কারণ প্রতিরোধের পূর্বশর্ত যে শত্রুর প্রতি ঘৃণা, সেই ঘৃণা করতেই আজ মুসলমানরা ভুলে গিয়েছে।
শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]