সমরাস্ত্রের দূর্লভ খনিজ সম্পদ পাচার করার গোপন বৈঠক অস্ট্রেলিয়ায়


দেশের সম্পদ লুটে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ক্ষমতাবানরা উন্মুখ হয়ে থাকে। এ সম্পর্কিত শত শত উদাহরণ দেওয়া যাবে। তবে নিকট সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ হলো বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল ও দ্বীপে ভারি বেশ কিছু মহামূল্যবান মিনারল বা খনিজ পাওয়া গেছে। এসব খনিজ দিয়ে পারমাণবিক বোমের জ্বালানি, প্লেনের খোলসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব খনিজ বালু ও বিভিন্ন ধরনের খনিজ এখন সিঙ্গাপুর ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি প্রিমিয়ার মিনারেলস লিমিটেড (পিএলএমএস) ইজারা নিতে চায়। এরপর এই মহামূল্যবান খনিজ সম্পদ তারা বিদেশে রপ্তানি করবে। আর বিনিময়ে ২০ বছরে বাংলাদেশকে দিবে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার।

পৃথিবীর সব চেয়ে বড় মজুদ বাংলাদেশে:
খনিজ বালু থেকে মূল্যবান খনিজ আহরণকারি দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা অন্যতম। তবে এ ধরনের মূল্যবান খনিজ বালুর সব থেকে বড় মজুদ বাংলাদেশে রয়েছে। ১৫টি খনিজ এ বালু থেকে বের করা সম্ভব বলে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। তবে এখনি অন্তত ৮টি খনিজ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
সমুদ্র ও দ্বীপ ছাড়াও দেশের নদী অঞ্চলে ভারি খনিজ বালুর অনুসন্ধান মিলেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কার্বন মাইনিং বাংলাদেশ লিমিটেড (সিএমবিএল) কুড়িগ্রামের চিলমারী ও উলিপুরে ব্রক্ষ্মপুত্র নদী এলাকায় ইলমেনাইট, জিরকন ও গারনেট পেয়েছে।সিলেটে সর্বোচ্চ মানের ইউরেনিয়াম পাওয়া গেছে সরকার মূল্যবান খনিজ বালু অনুসন্ধানে একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছে। ২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি ২০১৭ সালে শেষ হবে।

এ খনিজ বালু থেকে মূল্যবান খনিজ আহরণের জন্য পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে কক্সবাজারের কলাতলিতে রয়েছে একটি পাইলট প্লান্ট। ১৯৯২ সালের আগস্টে তৎকালীন জ্বালানি মন্ত্রী ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে আহবায়ক করে ৮ সদস্যের একটি সমীক্ষা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে তখন এর মওজুদ নির্ধারণ করা হয় ২ দশমিক ৫ কোটি টন। এর মধ্যে ভারী খনিজ বালুর পরিমান ৪৩ দশমিক ৫ লাখ টন। যার মধ্যে মূল্যবান খনিজ রয়েছে ১৭ দশমিক ৬ লাখ টন। ১৭টি স্থানের মধ্যে কক্সবাজার-টেকনাফ উপকূল ৬টি, মহেশখালী দ্বীপে ৭টি, কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ি এলাকায় একটি করে বাকি দুটি স্থান হলো নিঝুমদ্বীপ ও কুয়াকাটা। ওই সমীক্ষা দলের প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছিলো বাংলাদেশের মালিকানায় খনিজ বালু আহরনের। তবে কমিটির সে প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখিনি দেড় যুগেও।

জ্বালানী মন্ত্রীর সঙ্গে প্রিমিয়ার মিনারেলসের গোপন বৈঠক:
গত ৯ মার্চ ২০১৫ রাতে অস্ট্রেলিয়ার এডিলির একটি রেস্টুরেন্টে প্রিমিয়ার মিনারেলসের চেয়ারম্যান বব মিলারের সাথে গোপন বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এই বৈঠকে প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীও উপস্থিত ছিল। ওই বৈঠকে প্রিমিয়ার মিনারেলসকে দেশের খনিজ বালু ইজারা দেওয়ার বিষয়ে গোপন রফা হয়।
এর আগে গত ৫ মার্চ একটি বড় প্রতিনিধি দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। এ সফরের যাবতীয় খরচ পাওয়ারসেল দিলেও মন্ত্রী ও মন্ত্রীর স্ত্রী, মন্ত্রীর এপিএস ও পিএ এর অর্থ দেয় মন্ত্রী নিজে। এমন কী অস্ট্রেলিয়া সফরকালে দুটি খেলা দেখেছেন তারা, সে অর্থও মন্ত্রী দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই অর্থ মন্ত্রী কোথা থেকে পেয়েছেন? প্রিমিয়ার মিনারেলস এসবের পুরো অর্থই বহন করেছে।
৯ মার্চ রাতে ডিনার পার্টিতে প্রতিমন্ত্রী ওয়াদা করে প্রিমিয়ার মিনারেলসের চেয়ারম্যানের কাছে যে তাদেরকে খনিজ বালু ইজারা দিবে। শুধু ইজারাই দিবে তা নয়, বিদেশে এই মহামূল্যবান খনিজ বালু রপ্তানিরও অনুমতি দিবে।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর যে সফরসূচী তাতে প্রিমিয়ার মিনারেলসের চেয়ারম্যান বব মিলারের সাথে বৈঠকের কোন সূচী ছিলো না। তার মানে হলো এটা কোন সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিক কোন বৈঠক নয়। এমন কী তার সফরসঙ্গীরা এ বিষয়ে জানেও না। অথচ বাংলাদেশ থেকে যখন অস্ট্রেলিয়ায় সফরের সূচী করা হয় তখন মনোশ বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তোসের খনি পরিদর্শন থেকে শুরু করে কোথায় কোথায় তারা যাবে তার সব কিছু আছে।
আরও অবাক হাওয়ার মত বিষয় হচ্ছে, সবাই যখন ১৭ মার্চ অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরেছে তখন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সিঙ্গাপুর গেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। ফিরেছে ২০ মার্চ। সিঙ্গাপুরেও প্রিমিয়ার মিনারেলসের কর্তাব্যাক্তির সাথে কথা বলেছে বলে জানা গেছে।

খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের বালি কড়া ভাষায় প্রিমিয়ার মিনারেলসের চিঠি:
পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানিসহ মূল্যবান বহুখাতে ব্যবহার হয় এমন খনিজসহ অন্তত ৮টি খনিজ পেতে চায় সিঙ্গাপুর ভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়ার মিনারেলস লিমিটেড (পিএলএমএস)। প্রতিষ্ঠানটি এই ভারি খনিজ বালুর অন্তত ৮টি খনিজ বিদেশে রপ্তানি করবে। পৃথিবীর সব থেকে বড় মওজুদের দেশের এই ভারী খনিজ বালু থেকে খনিজ উন্নয়নের অনুমতি ও একটি পরীক্ষামূলক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পিএলএমএস সরকারকে চিঠি দিয়েছে। যদি তাদের এই ভারি খনিজ বালু থেকে খনিজ আহরণের অনুমতি দেওয়া হয় তাহলে এর বিনিময়ে তারা বাংলাদেশকে কর্পোরেট ট্যাক্স হিসেবে ২০ বছরে দুই বিলিয়ন ডলার দিবে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ খনিজ বালু কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে রয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন অনুসন্ধান করে জেনেছি যে, এখানকার খনিজ বালুর মওজুদ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ। বালু থেকে এই খনিজ আহরণ করা সম্ভব। এই বালু থেকে রুটাইল ও জিরকনের পৃথিবীব্যাপী চাহিদা রয়েছে। বছরের পর বছর এই বালু থেকে খনিজ আহরণ করা সম্ভব। এটা করতে গিয়ে পরিবেশেরও কোন ক্ষতি হবে না।
চিঠিতে বলা হয়, যদি সরকার খনিজ বালু থেকে খনিজ আহরণের অনুমতি দেয় তাহলে এ থেকে প্রাপ্ত জিরকন, রুটাইল ও গারনেট এর আর্ন্তজাতিক বাজারে বাংলাদেশ সেরা নেতৃত্ব দিতে পারবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সম্মান বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
খনিজ বালু উত্তোলনের অনুমতি দিলে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার মিনারেলস থেকে কী পাবে সে বিষয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০ বছর মেয়াদী এ প্রকল্পে প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন করে মোট ২ বিলিয়ন করপোরেট ট্যাক্স পাবে বাংলাদেশ। প্রত্যক্ষ কাজের সুযোগ তৈরী হবে ১৫ হাজার মানুষের আর যার প্রত্যক্ষ সুবিধা পাবে ৩ লাখ মানুষ। বালু থেকে এ খনিজ আহরণ করা গেলে বাংলাদেশে নতুন ধরনের শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে রয়েছে টাইটোনিয়াম, বিভিন্ন সারঞ্জম তৈরীর কারখানা, স্টিল শিল্পের ব্যপক প্রসার ঘটবে।
খনিজ বালু আহরনে প্রিমিয়ার মিনারেলস সরকারের কাছে কয়েকটি বিষয়ে নিশ্চয়তা চেয়েছে। এগুলো হলো, পরিবেশের যাতে বড় ধরনের ক্ষতি না হয় সে জন্য আমাদের চাহিদা অনুযায়ী খনিজ বালু এলাকাতে একটি পরীক্ষামূলক বালু আহরণের প্লান্ট করতে দিতে হবে। ভবিষ্যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ বালু থেকে প্রাপ্ত খনিজ যাতে বিক্রি করা যায় এ জন্য সরকারকে এই পরীক্ষামূলক প্লান্ট থেকে আহরিত খনিজ বিদেশে রপ্তানির নিশ্চয়তা দিতে হবে। পিএলএমএস এর দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে তেজস্ক্রিয় বালি থাকায় সেখানে সাধারণ মানুষ যে চলাচল করছে তাতে তাদের শরীরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ছে। অতি দ্রুত এই বালি উত্তোলন করে তেজস্ক্রিয়তা এলাকায় নির্মূল করার জন্য তাদেরকে সেখানে ছোট আকারে একটি পরীক্ষামূলক প্লান্ট নির্মাণেরও অনুমতি দিতে হবে।

জ্বালানী মন্ত্রীর কাছে লেখা প্রিমিয়ার মিনারেলস এর সেই চিঠি –
কী আছে আমাদের বালুতে?
বাংলাদেশে পাওয়া ১৫টি খনিজের মধ্যে যে ৮টি খনিজ বালু থেকে এই মূহুর্তে আহরণ করা সম্ভব সেগুলো হলো রুটাইল, ইলমেনাইট, গ্যারনেট, মোনাজাইট, ম্যাগনেটাইট, জিরকন, কায়ানাইট ও লিউকক্সিন। এর মধ্যে ইলমেনাইট এরোপ্লেনের যন্ত্রাংশ তৈরি, গাড়ির বিশেষ কিছু যন্ত্রাংশ, কেমিক্যাল প্লান্টের যন্ত্রাংশ, সার্জিক্যাল ইন্সট্রমেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। রুটাইল রঞ্জক পদার্থের কাঁচামাল, ওয়েল্ডিং রডের বহিরাবরণ এবং টাইটেনিয়াম মেটাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্যারনেট লোহা, এলুমিনিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাংগানিজ এবং সিলিকা রয়েছে। মোনাজাইট হচ্ছে তেজষ্ক্রিয় থোরিয়ামের একটা ফসফেক্ট যৌগ যার মধ্যে কিছু সিরিয়াম, ল্যানথালাম ও ইত্রিয়াম থাকে। পারমাণবিক চুল্লিতে এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া পরমাণু বোমার কাঁচামাল হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া মোনাজাইট কালার টেলিভিশন ও গ্যাস প্লান্টে ব্যবহৃত হয়। ম্যাগানেটাইট পরমাণু চুল্লিতে, এক্স-রে মেশিন হতে বের হওয়া তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ ঠেকাতে ঢাল হিসেবে কনা হয়ে থাকে। জিরকন স্টিল কাস্টিং, ইস্পাত কারখানায় তাপসহনীয় ব্রিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জিরকন দিয়ে সিনথেটিক ডায়মন্ডও তৈরী করা হচ্ছে। যার ১০০ গ্রামের মূল্য ২০০ ডলার।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]