সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি বুযুর্গী-সম্মান, কামালত ও কারামত মুবারক


উনার নিজের ভাষায় উনার মর্যাদা-মরতবা:
সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, গাউছুল আ’যম, মুজাদ্দিদুয যামান, ইমামুর রাসিখীন, সুলত্বানুল আরিফীন, মুহিউদ্দীন, আওলাদে রসূল, সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, আমি এমন এক খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার বান্দা; আমার তলোয়ার উন্মুক্ত, আমার কামান লক্ষ্যবস্তুর প্রতি তাক করা আছে। আমার তীর মুবারক যথাস্থানে সুরক্ষিত এবং আমার বর্শা মুবারক সঠিক জায়গায় আঘাত হানে। আমার ঘোড়া মুবারক সুসজ্জিত। আমি মহান আল্লাহ পাক উনার আগুন। আমি লোকদের আধ্যাত্মিক অবস্থাদি ছিনিয়ে নিতে পারি। আমি ইলম ও হিকমতের এমন অথৈ সাগর, যার কোন কূল-কিনারা নেই। আমি নিজের সাথে নিজে অস্বাভাবিক কথা বলি। মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে উনার বিশেষ নজর-করম মুবারক-এ রেখেছেন। সুবহানাল্লাহ!
হে রোযাদারগণ! হে রাত-জাগরণকারীগণ!! হে পাহাড়বাসীগণ!!! তোমাদের ইবাদতখানাগুলো ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে। আমার হুকুম যা খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে প্রদত্ত সেটা কবুল করো। হে বর্তমান যুগের আবদাল ও শিশুগণ! এসো এবং সেই কূল-কিনারাবিহীন মহাসাগর দেখে যাও। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! নেককার ও বদকারকে আমার সামনে পেশ করা হয়। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! লাওহে মাহফুজ আমার চোখ মুবারক উনার সামনে। আমি জ্ঞান সাগরের ডুবুরী, আমার মুশাহিদাই হলো মুহব্বতে ইলাহী। আমি লোকদের জন্য মহান আল্লাহ পাক উনার দলীল। আমি নায়িবে রসূল। আমি এ পৃথিবীতে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার উত্তরসূরী। মানুষ, জিন, এমনকি হযরত ফেরেশতা আলাইহিমুস সালাম উনাদেরও মাশায়িখ আছে। কিন্তু আমি সব মাশায়িখ উনাদের শিরমণি। আমার বিছাল শরীফ আর তোমাদের বিছাল শরীফ উনার মধ্যে আসমান-যমীন পার্থক্য। অন্যদের সাথে আমার তুলনা করো না। হে পূর্ব-পশ্চিমের অধিবাসীগণ! হে আসমান-যমীনের অধিবাসীগণ!! আমাকে মহান আল্লাহ তাআলা তিনি বলেছেন যে, আমি এমন বিষয়সমূহ জানি, যা তোমাদের মধ্যে কেউ জানে না। আমাকে প্রতি দিন সত্তরবার নির্দেশ দেয়া হয় যে, “এ কাজ করুন, এ রকম করুন। হে বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি! আপনার প্রতি আমার কসম! এ জিনিস পান করুন; এ জিনিস আহার করুন। আমি আপনার সাথে কথা বলি এবং আপনাকে নিরাপদে রাখি।”
সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো বলেন, যখন আমি কোন বিষয়ে কথা বলি, তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বীয় জাত পাক মুবারক উনার কসম করে বলেন, কথাটি পুনরায় বলুন। কেননা আপনি সত্য বলেছেন। আমি ঐ সময় পর্যন্ত কোন কথা বলিনা, যতক্ষণ আমাকে নিশ্চিত করা না হয়। আমার কথায় কোন সন্দেহ-সংশয় থাকে না। আমি ঐসব বিষয় বণ্টন করতে থাকি, যেসব বিষয়ে আমাকে ইখতিয়ার দেয়া হয়। যখন আমাকে হুকুম দেয়া হয়, তখন আমি সেটা পালন করি। আমার হুকুমদাতা হলেন খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি স্বয়ং। যদি তোমরা আমাকে অস্বীকার কর, তাহলে এটা তোমাদের জন্য প্রাণনাশক বিষতূল্য হবে। তোমাদের এ নাফরমানী আচরণ তোমাদেরকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিবে। আমি তোমাদের দুনিয়া-আখিরাতকে এক মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখি। মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন। যদি আমার মুখে ইসলামী শরীয়ত উনার লাগাম না থাকতো, তাহলে আমি তোমাদেরকে ঐসব বিষয়েও খবর দিতাম, যা তোমরা খাও, পান কর এবং ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রাখ। মোটকথা মনের সব কথা প্রকাশ করে দিতাম। কিন্তু যেহেতু জ্ঞানী উনার আস্তিনে জ্ঞান আশ্রয় লাভ করে এবং এর গোপন বিষয়সমূহ জ্ঞানী প্রকাশ করেন না। তিনি আরও বলেন, আমি তোমাদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সব বিষয়ে খবর রাখি। আমার দৃষ্টি মুবারক উনার সামনে তোমরা স্বচ্ছ আয়নার মত।
মহান আল্লাহ পাক উনার সকল বান্দাগণ যখন মাক্বামে কদরে (অদৃষ্ট বণ্টনের স্থান) পৌঁছে, তখন তাদের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়। কিন্তু আমার জন্য বিনা বাধায় অনুমতি রয়েছে বরং অদৃষ্ট জগতে আমার জন্য একটি জানালা খুলে দেয়া হয়েছে, সেটা দিয়ে আমাকে ভিতরে প্রবেশ করানো হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুমে আমি তাকদীর এদিক-সেদিক করেছি। ঐ ব্যক্তি কামিল, যিনি তাকদীরের সামনে মাথা নত করে থাকেন না বরং তাকদীর নিয়ে দেন দরবার করেন। তিনি আরও বলেন, যখন হযরত মুনকার নাকীর ফেরেশতা আলাইহিমাস সালাম উনারা কবরে তোমাদের কাছে আমার সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করেন তখন তোমরা উনাদের কাছে জিজ্ঞেস করো আমার অবস্থান কোথায়? সুবহানাল্লাহ! (যুবদাতুল আছার, গাউসূল অরা-৪৯)

উনার দরবার শরীফ-এ মাস ও বছরের উপস্থিতি:
সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছাহিবজাদা শায়েখ হযরত সাইফুদ্দীন আব্দুল ওহাব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেছেন, “এমন কোন মাস ছিলনা, যেটা আমার আব্বাজান উনার খিদমতে হাজির হয়নি। নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার আগেই প্রতিটি মাস হাজির হতো এবং মহান আল্লাহ পাক কর্তৃক নির্ধারিত নিয়তিতে সে মাসে কোন দুর্ঘটনা হওয়ার থাকলে, কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে বা কোন রহমত বা কল্যাণ হওয়ার থাকলে, উনাকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হতো।”
একবার সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে কয়েকজন মাশায়িখে ইযাম বসা ছিলেন। তারিখটা ছিল জুমাদাল উখরা শরীফ উনার শেষ দিন, ৫৬০ হিজরী সন।
হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি আলাপ-আলোচনা করছিলেন। এমন সময় এক সুন্দর চেহারাধারী নওজোয়ান দরবার শরীফ-এ প্রবেশ করলো। সালাম দিয়ে বললো- আমি মাহে রজব। আপনাকে মুবারকবাদ জানাতে এসেছি। আমার এ মাসে সাধারণ লোকের অনেক উপকার, তথা সুখ-শান্তি হবে।
বর্ণিত আছে, সে বছর সম্পূর্ণ রজব মাস প্রত্যেকের জন্য খুবই সুখ ও শান্তির হয়েছিল। সেই পবিত্র রজব মাসের শেষ ইয়াওমুল আহাদি বা রোববারও উনারা উনার খিদমতে বসা ছিলেন। উনারা দেখলেন বিকৃত চেহারাধারী একলোক দরবার শরীফ-এ প্রবেশ করে বললো- আসসালামু আলাইকুম, হে ওলীআল্লাহ! আমি শা’বান মাস। আমার এ মাসে বাগদাদ শরীফ-এ বড় ফিতনা-ফ্যাসাদ বা ধ্বংসযজ্ঞ হবে। হেজাযে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে এবং খোরাসানে তরবারির জিহাদ বা যুদ্ধ সংঘটিত হবে। ঠিকই তা হয়েছিল।
একবার সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি পবিত্র রমাদ্বান শরীফ মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা উনার মজলিসে বসা ছিলাম। সেই মজলিসে শায়েখ আলী বিন হায়তী বিন আবু ইউসুফ আব্দুল কাদের সরওয়ার্দী তিনিও উনার কাছে বসা ছিলেন। আরও কয়েকজন মাশায়িখে ইযাম সেই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। আমরা দেখতে পেলাম যে, একজন উজ্জ্বল আকৃতি ও গম্ভীর প্রকৃতির নওজোয়ান এসে বললো-
হে মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী! আসসালামু আলাইকুম। আমি মাহে রমাদ্বান শরীফ। আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য হাজির হয়েছি। এ মাসে আমি আপনাকে বিদায় জানাচ্ছি। আর ঠিকই ওই বছরই পরবর্তী রমাদ্বান শরীফ মাস আসার আগেই তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার দীদারে গমন করেন।
হযরত শায়েখ আবুল কাসেম ওমর বিন মাসউদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং হযরত শায়েখ আবু হাফস ওমর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনারা বর্ণনা করেন, একবার সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, কুতুবে রব্বানী, হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সমবেত লোকদের মাথার উপর মেঘমালায় পরিভ্রমণরত ছিলেন। তিনি বললেন, সূর্য যতক্ষণ আমাকে সালাম না দেয়, ততক্ষণ উদিত হয়না। প্রতিটি নতুন বছর শুরুর আগে আমার কাছে আসে এবং ঘটমান গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করে। অনুরূপ মাস ও সপ্তাহ আমার কাছে এসে সালাম করে এবং স্বীয় কালে ঘটমান ঘটনাবলী সম্পর্কে আমাকে অবহিত করে। (যুবদাতুল আছার)

কারামত বা অলৌকিক ঘটনা:
كرامة (কারামত) শব্দের অর্থ: সম্মান, মর্যাদা, মহত্ত্ব, অলৌকিক ঘটনা। সাধারণ স্বভাবের বিপরীত যে সকল ঘটনা হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের দ্বারা প্রকাশিত হয় তাকেই কারামত বা অলৌকিক ঘটনা বলে। কারামত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট আওলিয়ায়ে কিরাম উনার মর্যাদা, মর্তবার বহিঃপ্রকাশ। কাফির, মুশরিক, ফাসিক-ফুজ্জারদের দ্বারাও স্বভাববিরোধী বা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেতে পারে। আবার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের দ্বারাও এরূপ ঘটনা প্রকাশ পেতে পারে। তবে তাকে কারামত বলা যাবে না। তাকে বলা হয়, ইস্তিদরাজ বা ভেল্কিবাজি। আর অপ্রাপ্তদের দ্বারা প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনাকে আওন বলা হয়।
হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কারামত সত্য। এর প্রতি বিশ্বাস করা ফরয। আক্বাঈদের কিতাবে বর্ণিত আছে-
كرامات الاولياء حق
অর্থ : “হযরত আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কারামত সত্য।” (শরহে আক্বাঈদে নাসাফী) তার সততাকে বিশ্বাস করা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত উনার অন্যতম আক্বাঈদ বা বিশ্বাস। বাতিল ফিরক্বা মুতাযিলা; তারা কারামত বিশ্বাস করেনা। তাদের মতাদর্শের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে জামাতী, ওহাবী, খারিজী, লা-মাযহাবীরাও। তারাও কারামতকে অস্বীকার করে। যা তাদের গোমরাহী বা পথ ভ্রষ্টতারই প্রমাণ।
কারামতকে আমভাবে অস্বীকার করা কুফরী। আর ব্যক্তি বিশেষ কারামতকে অস্বীকার করা কুফরী না হলেও গোমরাহী থেকে খালি নয়। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষ কুফরীও হতে পারে।
কারামতকে অস্বীকার করা সংশ্লিষ্ট আওলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনার প্রতি বিদ্বেষভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। আর আওলিয়ায়ে কিরাম উনাদের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হওয়া হালাকী বা ধ্বংসের কারণ। পবিত্র হাদীছে কুদসী শরীফ উনার মধ্যে বর্ণিত রয়েছে-
من عاد لى وليا فقد اذنته بالحرب
অর্থ : “মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আমার ওলী উনার সাথে বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়, তার সাথে আমি যুদ্ধের অনুমতি দেই তথা যুদ্ধ ঘোষণা করি।” (বুখারী শরীফ)
কেননা সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী, গাউছুল আ’যম হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কারামতকে অস্বীকার করার কারণে কত লোক যে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হয়েছে তার বর্ণনা দিলে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থ রচিত হবে। সঙ্গতকারণে এখানে তার বর্ণনা দেয়া যাচ্ছে না।
ওলীআল্লাহ হওয়ার জন্য কারামত প্রকাশ পাওয়া শর্ত নয়। তবে প্রত্যেক ওলীআল্লাহ উনার কিছু না কিছু কারামত প্রকাশিত হয়ই। সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবুবে সুবহানী হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অসংখ্য- অগণিত কারামত মুবারক প্রকাশিত হয়েছে। এখানে উদাহরণস্বরূপ একখানা কারামত মুবারক উল্লেখ করা হলো।
দার্শনিকের জ্ঞান বিলুপ্তিকরণ:
হযরত শায়েখ আবুল মুজাফফর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন, আমি একদিন সাইয়্যিদুল আওলিয়া, মাহবূবে সুবহানী হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মজলিসে হাজির হলাম। আমার হাতে গ্রীক দর্শন ও আত্মা বিষয়ক একটি বই ছিল। মজলিসে উপস্থিত এক ব্যক্তি আমাকে বললো, গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি এ বই সম্পর্কে আপনাকে কিছু বললে আপনি কি বলবেন? কাজেই, সেটা ঘরে রেখে আসেন। তখন আমি সেটা ঘরের এক কিনারে রেখে আসার মনস্থ করলাম, যাতে শায়েখ অসন্তুষ্ট না হন। কিন্তু আমি দর্শন শাস্ত্রের প্রতি এতোই আকৃষ্ট ছিলাম যে, বইটি হাতছাড়া করতে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। বইটির অনেক বিষয় আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। তবুও গাউছে পাক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সম্মানার্থে আমি যে মাত্র বইটি রেখে আসতে উঠতে গেলাম, আমি উঠতে পারলাম না। আমার অবস্থা এমন হয়ে গেল যেন আমি হাত-পা আবদ্ধ একজন কয়েদী। তিনি আমাকে বললেন, তোমার বইটি আমাকে দাও। উনাকে হস্তান্তর করার আগে একটু খুলে দেখি, সব কাগজ সাদা হয়ে গেছে। সব বর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যাক, আমি বইটি উনাকে দিয়ে দিলাম। তিনি এক এক পৃষ্ঠা উল্টায়ে দেখলেন এবং বললেন- এটাতো মুহম্মদ বিন জরিস লিখিত ‘ফাজায়েলে কুরআন’। আমি আশ্চর্য হয়ে বইটি হাতে নিয়ে দেখলাম, ঠিকই বইটি কুরআনের ফযীলতের উপর খুবই সুন্দরভাবে লিখিত। ইতোপূর্বে আমি দর্শন শাস্ত্রের যে সব বিষয় জ্ঞাত ছিলাম, সব ভুলে গেলাম এবং এমনভাবে ভুলে গেলাম যে আজ পর্যন্ত একটি বিষয়ও আমার স্মৃতিতে আসেনি। সুবহানাল্লাহ!

উনার মুরিদানগণের মর্যাদা:
শায়খ আবু মুহম্মদ আব্দুল লতিফ বিন শায়েখ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন- আমার আব্বাজান রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন- শায়েখ হাম্মাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে প্রতি রাত্রে মধু মক্ষিকার শব্দের মত এক প্রকার গুঞ্জন শুনা যেত। সায়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সেই সময় উনার কাছে মুবারক ছোহবতে আসা-যাওয়া করতেন। লোকেরা উনার কাছে আরয করলেন, তিনি যেন শায়েখ হামাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে সেই শব্দ মুবারক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি সে সম্পর্কে হযরত হাম্মাদ দাব্বাস রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বলেন- আমার বার হাজার মুরিদ আছে। আমি খুবই দ্রুততার সাথে তাদের নাম ধরে ডাকি এবং তাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু আছে কিনা জিজ্ঞেস করি, যেন আমি মহান আল্লাহ পাক উনার কাছ থেকে মনজুর করায়ে নিতে পারি। আমার কোন মুরিদ ততক্ষণ মৃত্যুবরন করে না, যতক্ষণ তার তওবা কবুল না হয় বা এক মাসের মধ্যে উনার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয় না। এভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার রহমত এসব মুরিদদের উপর পড়ে থাকে, যারা শায়েখ হামাদ দাব্বাসর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে বাইয়াত হন। এ কথা শুনে গাউসুল আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি শায়েখ হাম্মাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে বললেন- যদি মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে এ মরতবা দান করেন, তাহলে আমি মহান আল্লাহ তায়ালা উনার পক্ষ থেকে এ প্রতিশ্রুতি নিয়ে নেব, যেন কিয়ামত পর্যন্ত আমার কোন মুরিদ ততক্ষণ ইন্তেকাল না করে যতক্ষণ তার তওবা কবুল করা না হবে । আমি এ প্রতিশ্রুতির জিম্মাদার হবো।
শায়খ আবুল কাসেম ওমর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বর্ণনা করেন- সাইয়্যিদুনা হযরত বড়পীর ছাহিব রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- যদি কোন ব্যক্তি আপনাকে মুহব্বতের সাথে স্মরণ করে, কিন্তু আপনার মুরিদ হওয়ার সৌভাগ্য না হয় কিংবা আপনার থেকে খিলাফতের খেরকা (জামা) না পায়, সে কি আপনার সহানুভূতি তথা ফায়েজ-তাওয়াজ্জুহ লাভকারী লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে? তিনি বলেন- যে ব্যক্তি কেবল নাম মুবারক উনার সাথে সম্পর্ক রাখবে বা অন্তরে আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করবে, মহান আল্লাহ তায়ালা তার তওবা কবুল করবেন, যদিওবা সে আমার থেকে অনেক দূরে থাকে। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম, মহান আল্লাহ পাক তিনি আমার সাথে ওয়াদা করেছেন যে, তিনি আমার মুরীদ-মু’তাকিদ, মুহ্বিীন, আশিকীন, আমার নাম জপকারী ও আমার প্রতি ভাল ধারণা পোষণকারীদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তিনি আরও বলেছেন- যদি আমার নাম মুবারক স্মরণকারী কারো দোষত্রুটি বা গুনাহ পশ্চিমপ্রান্তে প্রকাশ পায় এবং আমি পূর্ব প্রান্তে থাকি, তখনও আমি তার হিফাজতের জিম্মাদার হবো এবং তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবো। আমাকে এক চোখের পলক এক দীর্ঘ আমল নামা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে আমার মুরিদগণের নাম লিখা আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগমণকারী মুহ্বতকারীদের নাম উল্লেখ আছে। আমাকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে এসব লোকদেরকে আমার খাতিরে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। আমি হযরত মালিক ফেরেশতা আলাইহিস সালাম উনাকে (দোযখের দাররক্ষী) জিজ্ঞেস করেছি, আপনার কাছে আমার মুরীদ-মু’তাকিদ, মুহিব্বীনদের কেউ আছে কি? তিনি বললেন না। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! আমার হাত আমার মুরিদগণের উপর ঐ রকম প্রসারিত, যেভাবে যমীনের উপর আসমানের ছায়া। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহ পাক উনার জালালিয়াত ও ইজ্জতের কসম, আমি ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করবো না, যতক্ষণ আমি আমার সমস্ত মুরিদগণকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে না পারবো।

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]