হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষণকারীরা কাফির!


হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সম্পর্কে বিদ্বেষ পোষণকারীরা কাফির!

কোন নবী-রসূল আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস্‌ সালামকে যেমন কোন ব্যাপারে দোষারোপ করা জায়িয নেই তদ্রুপ কোন ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকেও কোন ব্যাপারে দোষারোপ করা জায়িয নেই। এ বিষয়ে আল্লাহ্‌ পাক তাঁর কালামে পাকে ইরশাদ করেন,

وَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى

অর্থঃ “একজনের পাপের বোঝা অপরজন বহন করবেনা।” (সূরা আনয়াম ১৬৪)

এ আয়াত শরীফ দ্বারা বুঝা যায় যে, সন্তানের অপরাধের জন্য পিতাকে এবং পিতার অপরাধের জন্য সন্তানকে দায়ী করা বৈধ নয়। যদি ইয়াযীদের অপরাধের জন্য হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দায়ী বা দোষারোপ করা হয়, তাহলে কাবিলের জন্য হযরত আদম আলাইহিস্‌ সালাম দোষী সাব্যস্ত হয়ে যান। (নাঊযুবিল্লাহ্‌ মিন যালিক) একইভাবে কিনানের জন্য হযরত নূহ আলাইহিস্‌ সালামও দোষী সাব্যস্ত হয়ে যান। (নাঊযুবিল্লাহ্‌ মিন যালিক) মূলতঃ হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন তাঁর ছেলে ইয়াযীদকে খলীফা নিযুক্ত করেন তখন ইয়াযীদ ভাল ছিল। কিন্তু মুনাফিকদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে পরবর্তীতে ইয়াযীদ গুমরাহ্‌ হয়ে যায়।

ঠিক একইভাবে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর খিলাফতের পর তাঁর ছেলে খলীফা নিযুক্ত হওয়ায় যদি তাঁকে “রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা” বলা হয়। তাহলে আল্লাহ্‌ পাক-এর নবী ও রসূল হযরত দাউদ আলাইহিস্‌ সালাম যিনি ছিলেন খলীফাতুল্লাহ্‌ অর্থাৎ আল্লাহ্‌ পাক-এর খলীফা, তাঁর পর তাঁর ছেলে হযরত সুলাইমান আলাইহিস্‌ সালামকে আল্লাহ্‌ পাক সারা পৃথিবীর খলীফা নিযুক্ত করায়, আল্লাহ্‌ পাকই তো রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠাকারী সাব্যস্ত হন। (নাঊযুবিল্লাহ্‌ মিন যালিক) এছাড়া হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পর তাঁর ছেলে হযরত ইমাম হাসান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুও তো খলীফা নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাই বলে কি, হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে রাজতন্ত্র ও রাজবংশ জারী হয়েছে? (নাঊযুবিল্লাহ্‌ মিন যালিক) মূলতঃ আল্লাহ্‌ পাক, হযরত নবী-রসূল আলাইহিছ ছলাতু ওয়াস্‌ সালাম, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, আউলিয়ায়ে কিরাম রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহিম কেউই রাজতন্ত্র ও রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নন। কেউ যদি তা বলে তবে সেটা হবে প্রকাশ্য তোহ্‌মত ও কুফরী।

আরো উল্লেখ্য যে, রাজতন্ত্র বা রাজবংশ ইসলামের অনেক পূর্বকাল থেকেই চলে আসছে। আর তাই আমরা হাদীছ শরীফ-এ দেখতে পাই যে, আখিরী রসূল, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হাবীবুল্লাহ্‌ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোম, পারস্য, আবিসিনিয়া, চীন, মালাবার, গুজরাট ইত্যাদির সম্রাট বা রাজাদের নিকট ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে দূত মারফত পত্র পাঠিয়েছেন।

অতএব, সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু রাজতন্ত্র বা রাজবংশ কোনটিরই প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। এছাড়া হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পরবর্তী খলীফাগণের তালিকায় দেখা যায় ইয়াযীদের সাড়ে তিন বছর খিলাফতের পর ইয়াযীদের ছেলে দ্বিতীয় মুয়াবিয়া শুধুমাত্র তিন মাস খিলাফত পরিচালনা করতঃ ইন্তিকাল করেন। তিনি ইন্তিকালের সময় খিলাফত পরিচালনার ব্যাপারে ওছীহত করেন যে, আপনারা যাকে উপযুক্ত মনে করবেন তাকেই খলীফা নিযুক্ত করবেন। অতঃপর যে খলীফাগণ খিলাফত পরিচালনা করেছেন তাদের কেউই হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর বংশধর ছিলেন না।

সুতরাং বুঝা গেল যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণের কারণেই এরূপ বক্তব্য প্রদান করা হয়। আর আল্লাহ্‌ পাক হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ সম্পর্কে ইরশাদ করেন,

لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ

অর্থঃ “কাফিররাই তাঁদের (হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে।” (সূরা ফাতহ্‌ ২৯)

আর হাদীছ শরীফ-এও ইরশাদ হয়েছে, “যে ব্যক্তি হাবীবুল্লাহ্‌ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে কাফির।” (নাসীমুর রিয়ায)

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ্‌ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদরের দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মর্মান্তিক শাহাদাত-এ মুসলিম উম্মাহ্‌র অন্তর ব্যাথাতুর হবে তা চরম সত্য কথা এবং এটা ঈমান মজবুতীর আলামতও বটে। কিন্তু এজন্য আল্লাহ্‌ পাক-এর হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জলীলুল ক্বদর ছাহাবী হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করা কস্মিনকালেও শরীয়তসম্মত হতে পারে না। যারা হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দোষারোপ করে তারা মূলতঃ তাঁর মহান মর্যাদা সম্পর্কে নিতান্তাই অজ্ঞ।

স্মরণযোগ্য যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ছাহাবীগণের (রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম) মধ্যে একজন বিশেষ শ্রেণীর ছাহাবী যাঁকে উলুল আ’যম বা জলীলুল ক্বদর ছাহাবী বলা হয়। তিনি ছিলেন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন, কাতিবীনে ওহীর সদস্য, হাদীছ শরীফ-এর রাবী, ফক্বীহ ইত্যাদি মর্যাদার অধিকারী। তাঁর ইল্‌মের পূর্ণতা, হিদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা, তাঁর দ্বারা লোকদের হিদায়েত লাভ, কিতাব শিক্ষাদান এবং জাহান্নাম থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্‌ পাক-এর নিকট দু’য়া করেছেন। এ প্রসঙ্গে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,“আমার উম্মতের প্রথম যে দল সমুদ্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তাঁদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব।” (বুখারী শরীফ)

হযরত ইমাম তারাবী রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ২৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম সমুদ্র যুদ্ধের মাধ্যমে কাবরাসের উপর আক্রমণ করেন এবং কাবরাস তিনিই বিজয় করেন।” (তাবারী)

হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মর্যাদা-মর্তবার মধ্যে অন্যতম মর্যাদা হলো, তিনি ছিলেন একজন আদিল বা ইন্‌সাফগার খলীফা। তাঁর ন্যায় বিচার ও ইন্‌সাফ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় যে, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “আমার দৃষ্টিতে হযরত উছমান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, এরপর হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর চেয়ে অধিক ন্যায় বিচারক কেউ নেই।” (বিদায়া)

এক ব্যক্তি মুয়াফা ইবনে ইমরানকে বললো, ন্যায় বিচারের দিক দিয়ে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহি-এর মধ্যে কি সম্পর্ক রয়েছে? একথা শুনে তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, “হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের প্রতি কোন প্রকার ক্বিয়াস করা যাবে না। হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ছাহাবী, বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়, কাতিবে ওহী ও আল্লাহ্‌ পাক-এর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমীন (আমানতদার)।” (নাসীমুর রিয়ায)

হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর ফযীলত সম্পর্কে আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীছ হযরত আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মুবারক রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শ্রেষ্ঠ? না হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহি শ্রেষ্ঠ? তিনি বললেন, আল্লাহ্‌ পাক-এর কসম! হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে ঘোড়ায় চড়ে জিহাদে যেতেন, তখন ঘোড়ার নাকে যে ধুলাবালিগুলো প্রবেশ করতো সে ধুলাবালিগুলোও হযরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহি হতে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ।” (ফতওয়ায়ে হাদীছিয়াহ্‌)

সুতরাং এত সকল মর্যাদা-মর্তবার পরও যারা হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তাদের জন্য ইমাম শিহাবুদ্দীন খাফ্‌ফাযী রহ্‌মতুল্লাহি আলাইহি-এর কথাই অধিক প্রযোজ্য। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, গালি দেয়, নাকিস বলে, সমালোচনা করে, সে হাবিয়া দোযখের কুকুরসমূহের মধ্য হতে একটি কুকুর।” (নাসীমুর রিয়ায)

অতএব স্পষ্ট প্রমাণিত হলো যে, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু শুধু ছাহাবীই ছিলেন না, বরং মর্যাদাপূর্ণ, জলীলুল ক্বদর, ন্যায়পরায়ণ একজন খলীফাও ছিলেন। আর আল্লাহ্‌ পাক হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুসহ সকল ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম-এর প্রতি সন্তুষ্ট। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ পাক ইরশাদ করেন,

رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ

অর্থঃ “আল্লাহ পাক তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট।” (সূরা মায়েদা ১১৯, সূরা তওবা ১০০, সূরা বাইয়্যিনাহ ৮)

কাজেই আশূরার দিনে সংঘটিত নবী-রসূল আলাইহিমুস্‌ সালামগণ-এর বরকতময় ঘটনা ও হযরত হুসাইন রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত-এর ঘটনা থেকে আমাদেরকে ইবরত-নছীহত গ্রহণের পাশাপাশি, এই বিষয়ে আমাদের আক্বীদাকেও শুদ্ধ করে নিতে হবে। আর তথাকথিত আলিমদের বদ সংশ্রব থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ্‌ পাক আমাদের সকলকে আক্বীদা শুদ্ধ করার এবং তথাকথিত আলিমদের বদ সংশ্রব থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। (আমিন)

শেয়ার করুন
TwitterFacebookGoogle+

Leave a Reply

[fbls]