আক্বল খাটান!

আক্বলের সাথে আমল বা পরিশ্রম ও নিষ্ঠা জড়িত হলে সোনার বাংলাদেশ আক্ষরিক অর্থেই সোনা হয়ে উঠতে পারতো। সোনার বাংলার সব কিছুতেই সোনা। অভাব নেই কিছুতেই। বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল থেকে ভোজ্যতেল কোনোটারই অভাব নেই।
ব্রিটিশ থেকে এদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও এখনো মানসিকভাবে ব্রিটিশ পদলেহী মনোভাব বা হীনমন্যতা শুধু বিদ্যমান নেই, বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই সে ব্রিটিশ ধারার প্রক্রিয়াই বিরাজমান। বিদ্যুৎ থেকে ভোজ্যতেল সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। প্রচলিত পন্থায়ই সব প্রক্রিয়া। অথচ অপ্রচলিত অনেক উপাদান থেকেও যে আমাদের জরুরী সব প্রয়োজন মেটানো সম্ভব- সেদিকে যেমন নেই উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি, তেমনি নেই যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সারাদেশে এক লাখ ২০ হাজার পোল্ট্রি খামার রয়েছে। এ খামারগুলোকে বায়োগ্যাসের ব্যবস্থাপনায় এনে পোলট্রি বর্জ্য থেকে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। ৫০ লাখ মানুষ পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে এ শিল্প গ্রামীণ কর্মসংস্থানের দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস। এসব খামারকে বায়োগ্যাস প্লান্টের আওতায় আনা হলে সেখান থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
জনৈক পোল্ট্রি খামারি মুজিবুর রহমান বিবৃত তথ্য থেকে জানা গেছে, পোল্ট্রি খামারের বর্জ্য ব্যবহার করে তিনি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেন। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় রহমান রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি। তিনি বলেন, এ প্লান্ট স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। ৫০ ঘনমিটারের এ বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে বর্তমানে তিন হাজার ৫শ’ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এ বায়োগ্যাস ব্যবস্থাপনা প্লান্ট থেকে তার ব্যক্তিগত চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য আশপাশের আরও ১৫টি বাড়িতে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা চলছে।
উল্লেখ্য, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বহুদূর এগিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, গ্রিস প্রভৃতি দেশ।
এদিকে বর্জ্যরে মধ্যে যেসব ধাতব পদার্থ বিদ্যমান, তা নলকূপের পানির সঙ্গে মিশে ঘটাতে পারে বিষক্রিয়া। তাই দহনক্রিয়ার মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন করছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, ভারতসহ অনেক দেশ। ভারত ও গ্রিস বেশ আগে থেকেই চালু করেছে ডি-কার্বক্সিলেশন বা কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রক্রিয়া। এর ফলে কলকারখানায় উৎপাদিত ক্ষতিকর গ্যাস যেমনÑ সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশে গ্রীন হাউসের ক্ষতিকর প্রভাব তৈরি করতে পারে না। চীন, জাপান ও ভারতে বর্জ্য থেকে গ্যাস তৈরির ক্ষেত্রে বর্জ্য পদার্থগুলোকে পরিণত করা হয় তরলে। এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয় স্মেল্টিং ইবারা ফ্লুইডাইজেশন পদ্ধতি। পরে তা থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি উৎপাদন করা হয় থার্মোসিলেক্ট জেএফই গ্যাসিফিকেশন সিস্টেমে। জানা গেছে, গ্রীসের পেত্রা শহরে পরিত্যক্ত তরল থেকে দৈনিক উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় ২৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ এবং ২৬ কিলোওয়াট তাপশক্তি।
এদিকে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় গাঁজন বা ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায়ও। এতে বর্জ্যরে সেলুলোজ বা অন্যান্য জৈব পদার্থ থেকে উৎপন্ন হয় ইথানল। আর বর্জ্যে চিনি বা ওই জাতীয় পদার্থ থাকলে তা থেকে ইথানল ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়। সাধারণত বায়ুর অনুপস্থিতিতে সম্পন্ন করা হয় ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়া। যেখানে ঘটতে পারে ইথানল ও অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় এস্টার তৈরির প্রক্রিয়া বা এস্টারফিকেশনও। তা থেকে তৈরি হতে পারে বায়োডিজেল। পরে তাপীয় বিয়োজন বা পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব ইথেন বা মিথেন গ্যাস। আর গ্যাস থেকে টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া বেশ পুরনো।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে শুধু ১ লাখ ২০ হাজার পোল্ট্রি বর্জ্যই নয়, গৃহস্থালী বর্জ্যও প্রতিদিন হয় লক্ষ লক্ষ টন। এসব বর্জ্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দ্বারা আমরা বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুটোই পর্যাপ্ত পরিমাণে পেতে পারি। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কট থেকে উত্তরণ লাভ করে কথিত সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারি।
এদিকে দেশে এই প্রথমবারের মতো ধানের পালিশ (গুঁড়া) দিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে কোলেস্টরল মুক্ত খাবার তেল। সম্ভাবনাময় এই শিল্প কারখানাটি স্থাপিত হয়েছে ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের বহরপুর এলাকায়। রশীদ ওয়েল মিল নামের এ কারখানাটি প্রায় ১২ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত।
জানা গেছে, অটো রাইস মিলের পালিশে (গুঁড়া বা কুঁড়া) ২৫-২৬ ভাগ তেল থাকে। তেল বের করার জন্য ‘দ্রাবক নিষ্কাশন পদ্ধতি’ ব্যবহার করে প্রথমে পালিশকে গুটিতে রূপান্তর করা হয়। এরপর গুটি হতে ক্রুড ওয়েল বা অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়। সেই তেল রিফাইনারিতে কয়েকটি ধাপে পরিশোধন করে ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করা হয়।
আবার এই ভোজ্যতেল উৎপাদনের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি লাভজনক উপজাত দ্রব্যও পাওয়া যায়। এসব উপজাত দ্রব্যের মধ্যে প্রধান ডিওয়েল্ড রাইস ব্র্যান্ড; যা পশু ও মাছের খাদ্য তৈরিতে ফিড ফ্যাক্টরিতে বিপুল পরিমাণে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া পাওয়া যায় ক্রুড ওয়েল, গাম (আঠা জাতীয় পদার্থ) ও ফ্যাটি অ্যাসিড, যা সাবান তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আর স্পেন আর্থ (পোড়ামাটি) আগরবাতি ও মশার কয়েল তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এসব উপজাত দ্রব্য হতেও বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জিত হতে পারে।
উল্লেখ্য, বহরপুর এলাকার পর ঢাকার অদূরে ধামরাইয়েও কুঁড়া থেকে ভোজ্যতেলের শিল্প-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন ৫০০ টন চালের কুঁড়া থেকে ১০০ টন অপরিশোধিত তেল এবং ৪০০ টন ক্রুড ওয়েল ও রাইস ব্র্যান্ড উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে বছরে ১৫ হাজার টন ধানের কুঁড়া যাচ্ছে ভারতে। এ কুঁড়া দিয়ে ভারতে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের ভোজ্যতেল, পোল্ট্রি ফিড ও মশার কয়েল। আর বাংলাদেশে বছরে সামগ্রিকভাবে ৪০ লাখ টন কুঁড়া উৎপাদন হয়। ওই কুঁড়া থেকে বছরে ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেল উৎপাদন সম্ভব। যাতে করে বাংলাদেশে আর ভোজ্যতেল আমদানির কোনো প্রয়োজন থাকে না। এতে বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব।
2 টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।
hadi_ul
musafir