কোথায় চলেছি

আমাদের সন্তানেরা বুদ্ধিমান হবে, আধূনিক হবে, বিশ্বের সব দেশের ছেলেমেয়েদের সাথে পাল্লা দিতে পারবে-আমরা অবশ্যই তা চাই। তারা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলুক, জ্ঞানে বিজ্ঞানে উন্নতির শিখরে উঠে যাক মা বাবারতো এটা খুবই ন্যায্য চাওয়া। সন্তানদের আমরা সাধ্যমত ভাল স্কুলে পড়াব, ভাল পরিবেশে রাখব, তাদেরকে ইন্টারনেট সুবিধা সহ কম্পিউটার দেব, যোগাযোগের জন্য সেলুলার মোবাইল ফোন দেব, ফেসবুক ব্যবহার করতে দেব, কোন সমস্যা নেই। আমরা এসবই তাদের দেব নিজেকে বিকশিত করার জন্য, যাতে তারা ভবিষ্যতে দেশের যোগ্য নাগরিক এবং বিশ্বের উপযুক্ত সদস্য হতে পারে। অবশ্য এটাতো নিশ্চয়ই কেউ চাইনা ওরা মা বাবাকে ভুলে যাক, দেশকে আর তার ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে ভুলে যাক। আধূনিক প্রযুক্তির সুবিধাকে ফান করার কাজে ব্যস্ত রেখে নিমজ্জিত হয়ে থাকলে দেশের প্রতি দায়ি্ত্ব পালন কখনোই পূরনাংগ হবেনা। আমাদের সোনার বাংলাদেশের সাথে বিশ্বের আর কোন দেশের মিল আছে বলতে পারেন? আর কি কোন দেশ আছে যে ভাষার জন্য, স্বাধীনতার জন্য নদির পানির মত বইয়ে দিয়েছে বুকের তাজা রক্ত? নেই। তাই এর সন্তানের এর নাগরিকের দায় অনেক বেশি।
নগর জীবনের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার পরবটি এখন বহুলাংশে কোচিং নির্ভর। স্যারের বা ম্যাডামের কাছে না পড়লে ভাল করা যাবেনা, তাই নিচু ক্লাশগুলোতেও কোচিং এর ব্যাপক বিস্তার। নির্দিষ্ট সময় ক্লাশের পর বাড়তি সময় এর পেছনে ছোটাছুটি।সাপ্তাহিক ছুটি এবং বিভিন্ন উপলক্ষে নানান ছুটিতে স্কুল বন্ধ থাকলেও কোচিং সদা চালু। স্যারেরা সমাজ সেবায় ব্যস্ত থাকলেও তাদের বা সমাজের ক্ষতি বৃদ্ধি নেই। বরং তিনি ও তার পরিবার শনৈ শনৈ আর্থিক উন্নতির পথে অগ্রসরমান। নগরবাসী মা বাবার ব্যয়ের একটা প্রধান খাতই হচ্ছে টিউশনীর অর্থ যোগান দেয়া। ছেলে সন্তান সহ পরিবার গুলো শেখার চেয়ে ভাল গ্রেড অর্জনের দিকে অতিরিক্ত মাত্রায় ধাবমান। আমাদের অসহায় সন্তানেরা তাদের মস্তিষ্কে স্ববিকাশের ধারা চালু করার সুযোগ পাচ্ছেনা। ছোট একটা দেশে গিজ গিজ করা লোকের বসবাস। প্রকৃতি ছোট হয়ে আসছে আর ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি ও স্বাচ্ছন্দ প্রয়াসের কোমল থাবার নিচে। খেলাধূলা নেই, হাডুডু, দারিয়াবাধা আর কানামাছির কথা তো বাদই, ক্রিকেট, ফুটবল, ভলীবলইবা খেলা হচ্ছে কই? খেলাযে হবে তার মাঠ কই? সামাজিক বা ব্যক্তি পরযায়ে খেলার জন্য জায়গা খালি রেখে দেয়ার মত সিংহ হ্রৃদয় মানুষ এই সমাজে অবশিষ্ট নেই বোধকরি। এক কাঠা জমির দামই রাজধানীতে কোটি কোটি টাকা। হ্রৃদয়এর আর দোষ কি! আমাদের সন্তানেরা কত হতভাগা, পুকুর জলাশয়ে দাপাদাপি সাঁতরে বেড়ানোর স্বাদ পেলইনা। মুক্তাংগনে হাটার, বৃষ্টিতে ভিজে হই হুল্লোর, মাঠে জমে যাওয়া পানিতে বল খেলার কাহিনী তাদের কাছে অলীক গল্প। বাংলা মায়ের দামাল ছেলে হওয়ার একান্ত আপন আদি জীবনাচারের সংস্কৃতি থেকে সন্তানদের বঞ্চিত করল কে? আমরাই না?
নগরীর মোড়ে মোড়ে ফাস্ট ফুডের দোকান আর চাইনীজ রেস্তোরা। সবই ফিট ফাট সাজানো গোছানো তকতকে ঝকঝকে। আভিজাত্যের বাহার যেন গলে গলে পড়ছে।কটা আভিজাত বাংলা রেস্তোরা আছে ঢাকায়, যেখানে মানুষ শখ করে খেতে যায়? আমাদের পছন্দের তালিকায় মাছ মাংসের দেশী ঐতিহ্যবাহী আইটেম গুলো নেই।আমরা পশ্চিমা ফাস্টফুড, চাইনীজ ফুড, ইন্ডিয়ান ফুডের প্রেমে মত্ত। দেখুন না বসুন্ধরা সিটিতে। ফুড কোর্টের সুদর্শন মনোহর খাবার দোকানগুলোতে আতি পাতি খুঁজেও দেশী খাবার মেলানো ভার।সন্তানদের নিয়ে আমরা এগুলোতে যাই। ঘরে বাইরে কোথাও পিঠা পুলির এন্তেজাম নেই। এগুলোর স্বাদ আর আকর্ষন আমাদের অন্তর থেকে বিদায় নিয়েছে। ঘরে এসব তৈরীর সুবিধাও নেই, ইচ্ছেও নেই। মাঝে সাজে বিশেষ করে শীতকালে এক শ্রেনীর দরিদ্র মহিলা পুরুষ ফুটপাতে পিঠা বানানোর জন্য বসে। ক্ষুদ্র হলেও এদেরকে আমাদের ঐতিহ্যের ধারক বলতেই হবে।
টিভিতে চ্যানেলের ছড়াছড়ি। কোনটা রেখে কোনটা দেখি দশা। সবার পছন্দ ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেল গুলো। ছেলে মেয়ে মা বাবা সবাই মিলে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। অদ্ভূত সব কাহিনী আমাদেরকে সাথে সাথে আমাদের সন্তান দেরকেও আলোড়িত করে। বিজাতীয় সংস্কৃতি ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করে নিতে থাকে। একই সাথে দেশি সংস্কৃতি আর শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হ্রাস পেতে থাকে।আমরা যেন বাংগালিত্ব হারাতে থাকি ক্রমশঃ।
ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা বিলুপ্ত প্রায়। গ্রামে গঞ্জে পাড়ায় বাড়ির উঠানে পালাগান কি আর চোখে পড়ে এখন? পুঁথি পড়ার আসরতো বিদায় নিয়েছে বহু আগে। পাড়ায় মহল্লায় এলাকার ক্লাবে মঞ্চ নাটক অনুষ্ঠানের যে চল ছিল তা আর নেই। মঞ্চায়ন তো একদিন, বহুদিন ধরে রিহারসেলের কি মজা তা কি আমাদের সন্তানেরা বুঝবে কোনদিন? নগরীর নাটক পাড়াও জৌলুস হারিয়ে ধুকছে।
আমরা নাকি অদূর ভবিষ্যতে মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হতে চলেছি। তা হোকনা, এতো ভাল খবর। কিন্তু যদি নববরষে একবার পান্তা খেয়ে বাংগালীত্ব বজায় রাখার ধারা অব্যাহত রাখি, পরিচয়হীনতার দেওলিয়াত্ব একদিন আমাদের গ্রাস করবে, তাই যদি হয় মহাকাল আর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবেনা।
1 টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।
লেখক
আপনার মতের পক্ষে বেশ কিছু উদাহরণ উদগীরণ করেছেন। কিন্তু আবার লিখেছেন- “ক্রিকেট, ফুটবল, ভলীবলইবা খেলা হচ্ছে কই?”
তাহলে উক্ত খেলাগুলো কি দেশীয়?
আপনার নিক (Waset Shahin) দেখে বুঝা যাচ্ছে আপনি মুসলমান!! তাই আপনার নিকট প্রশ্ন বর্তমান যুগের সন্তানরা পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠার জন্য এত কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করছে, তার মৃত্যু পরবর্তী জীবনের পাথেয় সংগ্রহের জ্ঞান কি আহরণ করছে? যদি করে থাকে তবে সে জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করছে? এ পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য যেভাবে অন্যের সাথে তীব্র প্রতিযোগীতায় মেতে উঠছে, পরকালের জীবনের পাথেয় সংগ্রহের ব্যাপারেও কি একই রকম প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হচ্ছে?
আপনার জানা আবশ্যক যে, ইসলামী শরীয়ত মুতাবিক পুরুষ-মহিলা সকলের জন্য সর্বপ্রকার খেলাধুলাই হারাম। কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে স্পষ্টই ইরশাদ মুবারক হয়েছে যে- “সর্বপ্রকার খেলাধুলাই হারাম।” যেমন- পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার বিখ্যাত কিতাব “মুস্তাদরিক লিল হাকিম”-এ উল্লেখ আছে,
عن ابى هريرة رضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كل لعب حرام الا ثلاثة قوسه وفرسه وملاعية الرجل.
অর্থঃ- “হযরত আবু হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে যে, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেন, “সর্বপ্রকার খেলাধুলা হারাম বা নিষিদ্ধ। তবে তিনটি বিষয় যেমন- (১) তীর ধনুক চালনা করা, (২) অশ্বকে প্রশিক্ষণ দান করা, (৩) নিজ স্ত্রীর সাথে শরীয়তসম্মত হাসি-খুশি করা হারাম বা নিষিদ্ধ নয়।” (কারণ এগুলো খেলাধুলার অন্তর্ভুক্ত নয়)
অনুরূপ “আবূ দাঊদ শরীফ, তিরমিযী শরীফ, নাসায়ী শরীফ, ইবনে মাজাহ শরীফ” ইত্যাদি পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার কিতাবেও হযরত ওকবা ইবনে আমির রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত রয়েছে। তবে শব্দের কিছু তারতম্য রয়েছে।
আপনি লিখেছেন- “ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা বিলুপ্ত প্রায়। গ্রামে গঞ্জে পাড়ায় বাড়ির উঠানে পালাগান কি আর চোখে পড়ে এখন?”
এ বিষয়ে আপনার জ্ঞানের পরিধিকে বৃদ্ধি করতে নিচের লিঙ্কগুলো পড়ুন-
শরীয়তের দৃষ্টিতে গান-বাজনা সম্পূর্ণ হারাম
হামদ-নাত ও ক্বাছিদা শরীফ-এর পরিবর্তে ‘গান-বাজনা’ এবং যুদ্ধবিদ্যা চর্চার পরিবর্তে ‘খেলা-ধূলা’ উলামায়ে ‘ছূ’দের প্ররোচনায় মুসলমানদের মধ্যে প্রবেশ করে; যা ইহুদী-খ্রিস্টানদের গভীর ষড়যন্ত্র
গান-বাজনা হারাম আর ক্বাছিদা সুন্নত
অভিনেত্রী, গায়িকা, নর্তকীদের উপার্জন কুকুরের বিক্রয়মূল্যের সমতুল্য
নববর্ষ বিষয়ে নিচের লিঙ্কগুলো পড়ুন-
পহেলা বৈশাখের সোজাসাপ্টা ইতিহাস…..(প্রিয়তে রাখুন)
পহেলা বৈশাখ তথা ফসলী সনের প্রথম দিন,যা মূলত: মুসলমানদের জন্য নয়
মুসলমানদের “পহেলা বৈশাখের” ঐতিহাসিক ইতিহাস জেনে সঠিক পথে অগ্রসর হতে হবে
পহেলা বৈশাখ মূলত বাংলা কোন সন নয়, বরং এটা হচ্ছে “ফসলী সন”। যা বাদশা আকবর প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাশাপাশি শরীয়তে “নববর্ষ” বা নতুন বৎসর পালন করা হারাম। তাই বিশ্বের সকল মুসলমানদের উচিত পহেলা বৈশাখ পালন করা থেকে বিরত থাকা
আশা করি নববর্ষে গান্ধা পান্তা খেয়ে পরিচয়হীনতা ও দেওলিয়াত্বের পরিচয় দিবেন না। আর নিজের সমস্ত কুফরী আস্ফালন ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিজের মুসলমানিত্ব নিয়ে মুসলমান হিসেবে সগৌরবে বেঁচে থাকুন।