সবুজ বাংলা ব্লগ

সবুজ বাংলা ব্লগ

আন্তর্জাতিক

গনতন্ত্র ১২

একটা মজার ঘটনা দিয়ে শুরু করি- অনেকদিন অাগের কথা, তখন আমি ছোট ছিলাম। আমার এক জ্যেঠাত ভাই ও আর এক ফুফাতো ভাই দুজনের ছিল গলায় গলায় ভাব। দুজন সারাদিন এক সাথে হইচই করে পাড়া গ্রাম মাতিয়ে বেড়াতো, আর টাকায় বিশটা মার্বেল কিনে সাড়াদিন গুলতি নিয়ে গ্রামের রাস্তাঘাট, জঙ্গল-ঝাড়, খাল-বিল দাপিয়ে একাকার করত। পাড়ার নীরিহ কুকুর গুলোরো নিস্তার ছিলনা তাদের হাত থেকে। এক বিকালে ফুফু তার ছেলেকে বললেন, ন্যাড়া চাচার বাড়ি থেকে গরুর দুধ নিয়ে অাসতে। কথা মত্র কাজ দুজনে প্লাস্টিকের জগটা নিয়ে ধেই ধেই করে কার্যউদ্ধারে বেড়িয়ে পড়ল। রাস্তায় একটা সাঁকো আছে, দুধ নিয়ে আসার পথে দুজনে সাঁকোর দুই দিকে বসে পড়ল। ক্ষন কিছু পরে ইঁচড়ে পাকা জ্যেঠাত ভাইটার মাথায় দুষ্টামি ভর করল। সে সাঁকোর এই দিকে দাঁড়িয়ে ঐ দিকে দুধের জগ রেখে একটা মার্বেল আমার মাথা মোটা ফুফাত ভাইয়ের হাতে দিয়ে বলল, গুলতি দিয়ে ছুঁড়ে লাগা দেখি তোর হাত কেমন সই। আর অমনি "এই দেখ বলে" সে মাথা মোঠাটা মার্বেল হাতে গুলতি দিয়ে ছুড়ে দিল দুধের জগের দিকে। ব্যাস জগ ফেটে দুধের দফারফা। ঘটনাটা আমি নিজ চোখে দেখিনি কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি চিতকার চেঁচামেচি হট্টোগোল, বেড়িয়ে গিয়ে দেখি মাথা মোটা টাকে আচ্চা মত ধোলাই দিচ্ছে, এর পর চাচাতো ভাইয়ের কাছে বিস্তারিত শুনলাম যা লিখেছি তা উপস্থাপন ভঙ্গি মাত্র। এক ফাঁকে দুজনে দিল ভোঁ-দৌড়, গম ক্ষেত- সড়িষা ক্ষেত সব একাকার করে দিয়ে। ক্ষেত গুলোর অবস্থা এখনো মনে হলে ভাবি, কেউ যদি দেখত তো মনে করত, এই মাত্র কোন এফ-7 ইন্টারসেপ্টর বা মিগ-29 সুপার হর্নেট ঐ ক্ষেতের উপর ল্যান্ডিংয়ে ব্যার্থ চেষ্টা করে ছিল বৈকি। তো এ গল্পের নায়ক আমার মাথা মোটা "ফুফাত ভাই" মূল অালোচ্য উপাত্ত। "অামার ভোট আমি দেব,দেখে শুনে বুঝে দেব" গত পর্বে প্রথম অংশ আলোচনার পর, এ পর্বে শেষ অংশটুকু অালোচনা করা হবে: অর্থাৎ "ভোট- দেখে শুনে বুঝে দেওয়া "। সবাই হয়ত বলবেন, গনতন্ত্রের যদি একটাও ভাল দিক বা বিষয়ও থেকে থাকে তবে এটি একটি। আমার আপত্তিটা সেখানে। আর সেটা বুঝার জন্য নিশ্চই আপনাকে প্রবন্ধটির শেষ পর্যন্ত যেতে হবে। এইতো গতকাল ৩০ ডিষেম্বর শেষ হল পৌরসভা নির্বাচন। অবশ্য এনিয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই। তবে দু একটা কথা না বললেই নয়। আমার মাথাব্যথা এখানে যে, আমি ১ নম্বর জিনিষ বিক্রয় করলে ১ নম্বর বলেই বিক্রয় করব আর ২ নম্বরটা ২নম্বর বলে। ২নম্বর জিনিষ ১নম্বর বলে নয়। তো গনতন্ত্রের মত ২নম্বর জিনিষ ১নম্বর দেখিয়ে কেন প্রতারনা করা হয়। ভোটের মাধ্যমে জনগন তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। আর সেই প্রতিনিধি যেন জনবান্ধব হয় সে জন্যই, দেখে শুনে বুঝে ভোট দিতে হয়। তো আসলেই কি তাই? বাস্তবতার অালোকে: কোন দেশের বৃহত্তর দু- তিনটি দল( ক,খ বা গ) প্রথমে তাদের দলের থেকে একজন প্রার্থী কে কোন এলাকার জন্য মনোনয়ন দেয়, সে নির্বাচন কমিশনে তার প্রার্থীতা দাখিল করে ও তা অনুমুদিত বা বাতিল হয়। যখন কেউ অনুমুদিত হয় তখন সে অন্য দলের প্রর্থীর সাথে জনমত জড়িপে অংশ গ্রহন করে। এর পর জনগন ঐ ক,খ,গ দলিয় প্রার্থী দের ভোট দেয়। অতপরঃ একজনকে নির্বাচিত করে। কিছু বিষয়: ১) জনগন যে দল কে ভাল মনে করে, তার প্রার্থীকেই ভোট দেয়, তথা দলই মুখ্য প্রার্থী নয়। ২) কোন দল যদি সর্বদিক দিয়ে অযোগ্য কাউকেও মনোনয়ন দেয় তবে তাকেও ঐ দলের সমর্থকরা ভোট দেয়। ৩) নির্বাচন কমিশন তার নির্ধারিত নীতি অনুযায়ী প্রার্থীর অনুমোদন দেয় বা বাতিল করে। ৪) জনগন, জনপ্রতিনিধি নয়, মূলত কোন দলকে যাচাই করার কাজ টুকু করে মাত্র। তো বাস্তবতা যদি এটাই হয় তবে, কেন জনগনকে দেখে শুনে বুঝে ভোট দিতে বলা হয়। কিন্তু প্রর্থীর মনোনয়ন দেয়ার ক্ষমতা তো দলগুলোর গুলোর হাতেই। আর মনোনয়ন বাতিলের ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে। তাহলে যদি প্রার্থী নির্বাচন ও বাতিলের এ ক্ষমতা দলগুলো ও ইসির থাকে, তবে কেন জনগনকে আলাদা ভাবে দেখে শুনে বুঝে ভোট দিতে বলা হয়!! নাকি দায় সড়াবার বাহানা!!! দল গুলো কি- নির্বোধের, অশিক্ষিতেরর, বিবেকহীনদের, অবিবেচকদের, অথর্বদের, অযাচিতদের, যাদের ভাল-মন্দ, ঠিক-বেঠিক, সত্য-মিথ্যা,দোষ- গুন যাচাইয়ের মত ক্ষমতা নেই, নাকি তারা সাধের-পাগল। প্রার্থী মনোনয়নের এ ক্ষমতা যদি তাদেরই হাতে থাকে তবে তারা কি দেখে শুনে বুঝে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারে না।আর কোন দলের হাতেই যখন এরুপ ক্ষমতা থাকে তো, নতুন করে ইসির মনোনয়ন বাতিলের ক্ষমতা থাকার যথার্থতা কতটুকু। আবার ইসি থাকতে যদি জনগনকে দেখে, শুনে, বুঝে ভোট দেবার কথা বলা হয় তাহলে- তার ভুমিকা কি? তার কাজ কি? তার দ্বায়িত্ব কি? তার কর্তব্যের আওতা কতটুকু? তার ক্ষমতায় এত সীমাবদ্ধতা কেন ? তবে কি তার প্রয়োজনীয়তা আছে? জনগন কি এগুলো বুঝেনা,অনুভব করে, নাকি দেখেও দেখে না!! তো যই হোক-- দেখে, শুনে, বুঝে বলার অর্থ দ্বাড়ায়, ইসিকে- সন্দেহ করা, কোন দলের সহযোগী ভাবা, কোন দলের বিরোধী ভাবা, প্রার্থীর প্রচারনায় অংশগ্রহনকারী ভাবা হয়, কারন তারা প্রত্যেকে ইসির সার্টিফাইট। অথচ তা ইলেকট্রনিক্স,প্রেস মিডিয়ায়, মোবাইল ফোনের এস এম এসএ, পোস্টারে, স্টিকারে অহঃরহ। এমন কি কখন কখন স্বয়ং ইসিই এর প্রচারকারী। এরুপ কান্ডজ্ঞানহীন, নির্বোধ,নিজের অথর্বতার নিজেই প্রচারকারী এরা অথচ এরাই নাকি রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের নানা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ববাহী। তখন অজান্তেই প্রশ্ন জাগে, কি শক্তি থাকতে পারে এদের শাষন করার, কি মূল্য থাকতে পারে জাতির প্রতিনীধিত্ব করার, কি যুক্তি থাকে এদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের রক্ষাকারী হওয়ার। ঐ সমর্থন! তথা জনসমর্থনের কথা বলবেন! তবে সেই জনগনের কথা ভাবুন। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে তাদের অজ্ঞতা দেখুন। কোন দলের মনোনীত, ইসির অনুমুদিত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে তারা ভাবে যে তারাই তাদের প্রতিনীধিত্বকারী নির্বাচন করে। এ সব প্রতিনিধি কি করে জনপ্রতিনিধি হয় বা জনসমর্থিত, জনগনের অাশা-অাকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনকারী হয়। এসব প্রতিনিধি তো শুধুই দল গুলোর জন্য, আর দলই এদের সব কিছু । এখন ভাবছেন -নির্বাচন তাহলে কি? সহজ ভাষায়-ইলেকশন ইজ এ প্রসেস টু ইলেক্ট এ পার্টি বাই ইলেক্ট এ পার্সন হু ইজ সিলেক্টেড বাই দা পার্টি। -নির্বাচন হল একজন ব্যাক্তি মনোনয়নের মাধ্যমে একটি দলকে মনোনীত করা অধিকন্তু ঐ ব্যাক্তিটিও তার দল কর্তৃক নির্ধারিত। উফ! গনতন্ত্রের কি শ্রী!!! ১০০% খাঁটি জনগনের শাষন। জনগন আমার ফুফাতো ভাই বৈকি। কেউ এটা সেটা বলে যা বুঝাবে, তাই তৎক্ষনাত করা শুরু করবে। দেশের মানুষের তো বোধদয় হওয়া উচিত। অনেকে বলতে পারেন, তাহলে সার্থক ভাবে জনপ্রতিনিধি কিভাবে নির্বাচন করা যায়? উত্তর:- ধরুন এদেশে ৫০০ টি থানা আছে। প্রতি থানায় ১০ টি করে ইউনিয়ন আছে। তো ইসি বলবে যারা ভোটার তারা তাদের ইউনিয়নের একজন সৎ, শিক্ষিত, চরিত্রবান মানুষের নাম লিখে বাক্সে জমা দেবেন, এরপর যার পক্ষে সমর্থন বেশি হবে সে হবে ঐ ইউনিয়নের জনপ্রতিনীধি।এবং কতগুলো দল থাকবে, যে দল গুলোর মধ্যে সদস্য থাকবে দেশের সেরা, শ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী- গুনীরা। এরপর ঐ ৫০০০ জনপ্রতিনিধি জাতীয় ফোরামে ঐক্যমত বা মতামতের মাধ্যমে একটি দলকে সিলেকশন করবে। পরে দলটি তার মধ্যে থাকা বিভিন্ন জনকে থানা, জেলা,বিভাগ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়োগ করে দেশ চালাবে। যখন, যে মুহুর্তে জনপ্রতিনিধিগন চাইবেন দলটি ক্ষমতা ছেড়ে দেবে ও নতুন কোন দল অনুমোদন পাবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ইউনিয়ন প্রতিনীধিদের জনপ্রিয়তা যাচাই ও প্রয়োজন মাত্রই শুন্যস্থান পুরন হবে, সাথে সাথে পুনঃ জাতীয় ফোরামের মাধ্যমে একটি দল বা পুনরায় ঐ দলটি দেশ চালাবে। তো উপরের কাল্পনিক সিস্টেমটি দিয়েই ১০০ ভাগ সঠিক জনপ্রতিনিধি ও জনগনের শাষন সম্ভব, আর এরুপ সিস্টেম শুধু কাল্পনিকই নয় তা অসম্ভব ও শত সীমাবদ্ধতা, সমস্যা যুক্ত। আর বর্তমান গনতান্ত্রিত সিস্টেম ১০ ভাগও জনগনের শাষন নয় তা প্রমানিত। তা কোন দল কর্তৃক নির্ধারিত ব্যাক্তি দ্বাড়া আদায় করা সমর্থন মাত্র। আসলে মূল কথা হল- "জনপ্রতিনিধি" নির্বাচন করার কোন বিষয় নয়, প্রতিনীধিত্ব হল- একটি যোগ্যতা, একটি স্বতঃস্ফূর্ত সাহস, একটি নৈতিকতাবোধ, একটি স্বাধীনচেতা মনন, একটি বিরত্বের মুকুট, একটি নিষ্পাপ মনবসত্তা, একটি অাত্মপ্রত্যয়, একটি গতি, এবং তিনি হবেন একজন মহামান্য। তিনি কোন সমর্থনের মুখাপেক্ষী নন, নন কোন জনমতের আকাংঙ্খি, নন কোন শক্তির কাছে মাথা নতকারী। তিনি-যিনি থাকবেন, তার জাতি বা সম্প্রদায়ের সুখে-দুঃখে, বিপদে- নির্ভয়ে, অাশা- অাকাঙ্ক্ষায়, সুদিনে-দুর্দিনে। প্রতিনিধি কে সমর্থন নয়, তার কাছে সমর্পিত হতে হয়। তাকে নির্বাচিত নয় অনুভতির কেন্দ্রস্থলে নিতে হয়, তার রং দ্বাড়া রঞ্জিত হতে হয়। যেদিন এ জাতি সত্যিকার #প্রতিনীধিত্ব #বুঝবে,প্রতিনিধি কে চিনবে, সমবেত হবে শান্তির পাকা তলে, সেদিন তারা অবশ্যই এক অনন্য জািত সত্তায় পরিনত হবে। তবে আমার ফুফাত ভাইয়ের মত নয় যে, নিজের শক্তি, ক্ষমতা,বড়ত্ব, অধিকার দেখাতে গিয়ে নিজেই নিজের সর্বনাশ করে বসবে। দেখে, শুনে, বুঝে ভোট নয়, দেখে, শুনে,বুঝে এমন ভাবে চলতে হবে যেন আমার স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব,অধিকার,সত্তায় কোন অাঘাত না আসে। আমার জাতি, জাতীয় স্বার্থ ও অস্তিত্বে কোন আঘাত না অাসে। আর এতে গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র অবশ্যই ব্যার্থ ও যথেষ্ট নয়। এবং খুজতে হবে স্বার্থকতাকে! প্রতিনীধিত্ব কারীকে! একজন সত্যিকার মুসলমানের মত! আমরা মুসলমান নই কি?

1 টি মন্তব্য

  • দূর্গম গিরি

    জ্যামে বসে ভাবছিলাম,

    এদেশে যদি গনতন্ত্র কলাপস হয় তবে নতুন শাষকদের দেশ চালাতে বেশি একটা বেগ পেতে হবে না।

    ২লাখ গনতন্ত্রীর বিপরীতে ২ কোটি শান্ত, নীরিহ, অসহায় জনগন।

    কোন রাগ, ক্ষোভ,অভিমান কিছুই নেই তাদের চোখে মুখে, শিশু বাচ্চার মত অসহায় হয়ে এদিক ওদিক দেখছে।

    তবে আমার কাছে মনে হল তারা তাদের হারিয়ে যাওয়া অভিভাবককে খুঁজছে।

    আল্লাহ পাক, তাদেরকে তাদের সত্যিকার অভিভাবকের বা প্রতিনধীর সন্ধান দান করুন! অামিন।

মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।