তাক্বদীরের হাক্বীক্বত না বুঝার কারণে উম্মতে মুহম্মদীর মধ্যে কয়েকটি ফেরকার উদ্ভব ঘটেছে। যারা আহ্লে নাযীর অন্তর্ভূক্ত নয় বরং আহ্লে নারের অন্তর্ভূক্ত।
হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ্র রাসূল, হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ستفرق امتى على ئلاث وسبعين فرقة كلهم فى النار الاملة واحدة قيل من هى رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ما انا عليه واصحابى. অর্থঃ- “অতিশীঘ্রই আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, তন্মধ্যে একটি দল ব্যতীত ৭২টি দলই জাহান্নামে যাবে। তখন হযরত সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণ জিজ্ঞাসা করলেন, কোন দল নাযাত প্রাপ্ত ইয়া রাসূলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! তিনি বলেন, যারা আমি এবং আমার সাহাবা-ই-কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুগণের মত ও পথের উপর কায়েম, তারা নাযাত প্রাপ্ত দল।” (তিরমিযী, আবূ দাউদ, আহ্মদ শরীফ)
অর্থাৎ উম্মতের মুহম্মদীর মধ্যে ৭৩ দল হবে। একদল হবে নাযাত প্রাপ্ত, আর বাকী ৭২ দল হবে জাহান্নামী। তার মধ্যে বিশেষ দু’টি দল হচ্ছে- (১) ক্বদরীয়া, (২) জাবারীয়া।
ক্বদরীয়া সম্প্রদায়ের মূল আক্বীদা হচ্ছে- তাক্বদীরের মধ্যে আল্লাহ্ পাক-এর কোন হাত নেই। অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক-এর কোন ক্ষমতাই খাটেনা তাক্বদীরের মধ্যে। তাক্বদীরের নিয়ন্ত্রণকারী হচ্ছে মানুষ স্বযং। অর্থাৎ তাক্বদীর মানুষের এখতিয়ারে। এ আক্বীদার জন্য তারা জাহান্নামী।
আর জাবারীয়া সম্প্রদায়ের মূল আক্বীদা হচ্ছে- তাক্বদীর সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ্ পাক-এর নিয়ন্ত্রণে। এতে মানুষের কোন এখতিয়ার নেই। অর্থাৎ ভাল-মন্দ, নেক কাজ, বদ্ কাজ, জীনা করা, শরাব পান করা, সুদ খাওয়া, জুয়া খেলা, ঘুষ খাওয়া, চুরি করা, মিথ্যা বলা ইত্যাদি সর্ব প্রকার পাপ কার মানুষ আল্লাহ্ পাক-এর হুকুমে করে থাকে। এ আক্বীদার জন্যই তারা জাহান্নামী।
উল্লেখ্য যে, একদিন জাবারীয়া আক্বীদাভূক্ত জনৈক ব্যক্তি এক মুসলমানের আঙ্গুর ফলের বাগানে গিয়ে চুরি করার নিয়তে ফল ছেড়া শুরু করলো। তখন বাগানের মালিক এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কে? সে জাবারীয়া উত্তর দিল, আমি আল্লাহ্র বান্দা। তুমি এখানে কি করতেছ? সে জাবারীয়া উত্তর দিল, আল্লাহ্ পাক-এর ওয়াস্তে চুরি করতেছি। তখন বাগানের মালিক চিন্তা করলো যে, এখন আমি কি করবো। কারণ, সে তো আল্লাহ্ পাক-এর ওয়াস্তে চুরি করতেছে। হঠাৎ মালিকের মাথায় বুদ্ধি আসলো, তখন সে একটা লাঠি নিয়ে সেই জাবারীয়াকে মারা শুরু করলো। তখন জাবারীয়া বললো, তুমি কে? মালিক বললো انا عبدالله
অর্থাৎ আমি আল্লাহ্র বান্দা। তখন জাবারীয়া বললো, আহা! তুমি কি করতেছ? মালিক বললো,
অর্থাৎ আমি আল্লাহ্র ওয়াস্তে মারতেছি। তখন জাবারীয়া বেদম প্রহার সহ্য করতে না পেরে বলতে লাগলো,
از جباريه توبه كردم- اختيارست- اختيارست اختيارست. অর্থঃ- “জাবারীয়া আক্বীদা থেকে তওবা করলাম। মানুষের (আমলের) এখতিয়ার রয়েছে, এখতিয়ার রয়েছে, এখতিয়ার রয়েছে।” অর্থাৎ ভাল-মন্দ করার এখতিয়ার বান্দার রয়েছে।
তাক্বদীর প্রসঙ্গে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজ হাহু আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, ক্বদরীয়া সম্প্রদায় বলে, তাক্বদীরের নিয়ন্ত্রণকারী মানুষ। এতে আল্লাহ্ পাক-এর কোন এখতিয়ার নেই। আর জাবারীয়া সম্প্রদায় বলে, তাক্বদীরের নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহ্ পাক। এতে মানুষের কোন এখতিয়ার নেই। কোনটি সঠিক?
তখন হযরত রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু প্রশ্নকারীকে বললেন, “দাঁড়াও।” তখন সে এক পা উঠালো, পুনঃরায় তিনি তাকে বললেন, “দ্বিতীয় পা উঠাও।” সে জবাব দিল হুজুর! দ্বিতীয় পা উঠাতে পারিনা। তখন হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, “তাক্বদীরের মধ্যে বান্দার এতটুকু এখতিয়ার আর আল্লাহ্ পাক-এর এতটুকু এখতিয়ার। অর্থাৎ পা উঠানোর ব্যাপারে বান্দা যেমন একসাথে দু’পা তুলতে পারেনা, তদ্রুপ তাক্বদীরের মধ্যে বান্দার পূর্ণ ক্ষমতা বা এখতিয়ার নেই। আর এক পা বান্দা নিজ ক্ষমতায় বা এখতিয়ারে তুলতে পারে, যা আল্লাহ্ পাক পূর্ব থেকেই বান্দাকে দিয়েছেন। তদ্রুপ তাক্বদীরের মধ্যে বান্দার ক্ষমতা বা এখতিয়ার রয়েছে।
আর আল্লাহ্ পাক যদি এখতিয়ার বা ক্ষমতা দেন, তাহলে বান্দা দু’পা এক সাথেও তুলতে পারবে।” অর্থাৎ নেক কাজ বান্দা ইচ্ছে করলেই করতে পারবেনা। আল্লাহ্ পাক-এর রহ্মত ও এখতিয়ার ছাড়া।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
وما اصابك من حسنة فمن الله. অর্থঃ- “তোমাদের প্রতি যে কল্যান বা হাসানাহ্ পৌঁছে ( তোমরা যে নেক কাজ করে থাক), তা আল্লাহ্ পাক-এর তরফ থেকে (আল্লাহ্ পাক-এর রহমতে)।” অর্থাৎ বান্দার নেক কাজ করা আল্লাহ্ পাক-এর রহমতের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
আর বদ্ কাজ বান্দা নিজ থেকে করে থাকে, যার সাথে বান্দার নফ্সের সম্পর্ক রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক বলেন,
وما اصابك من سيئة فمن نفسك. অর্থঃ- “তোমাদের প্রতি যে মন্দ পৌঁছে বা উপস্থিত হয় (তোমরা যে
মন্দ কাজ করে থাক), তা তোমাদের নিজ থেকে (নফ্সের তাড়নায়)।”
অতএব, 'তাক্বদীর' সম্পর্কে আমাদের ভালোভাবে বুঝা উচিত । এবং যা এখতিয়ারের মধ্যে আছে সে বিষয় খেয়াল করে সজাগ হওয়া উচিত। আল্লাহ্ পাক ২টা পথ দিয়েছেন ভাল এবং মন্দ এবং মানুষকে ইলম দিয়েছেন । আক্বল - সমঝ দান করেছেন । যাতে সবাই বিভিন্ন বিষয়ে ইলম অর্জন করে, আক্বল- সমঝ দিয়ে ভালো , মন্দের , হারাম , হালালের পার্থক্য করতে পারে । সুবহানাল্লাহ ।
আল্লাহ্ পাকের এই পরম নিয়ামতের শুকরিয়া করা আমাদের প্রত্যেকের জন্য দায়িত্ব - কর্তব্য।
তাক্বদীর---২

0 টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।