সবুজ বাংলা ব্লগ

সবুজ বাংলা ব্লগ

কৃষি

তুলসী এর গুন!

তুলসী এর গুন!
[caption id="" align="aligncenter" width="350"] তুলসী গাছ ও ফুল[/caption]

তুলসী

এটির বাংলায় নামঃ তুলসী

অন্যান্য স্থানীয় নামঃ Common basil, Manjari/Krishna tulsi 

বৈজ্ঞানিক নাম: Ocimum basilicum Linn

পরিবার: Libiatae

ব্যবহার্য অংশ: পাতা ও শিকড়।

তুলসী একটি ঔষধিগাছ। দু ধরণের তুলসী গাছ আছে সবুজ পাত ও লালচে পাতা। তুলসী একটি ঘন শাখা প্রশাখা বিমিষ্ট ২/৩ ফুট উঁচু একটি চিরহরিৎ গুল্ম। এর মূল কান্ড কাষ্ঠল, পাতা ২-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। পাতার কিনারা খাঁজকাটা, শাখাপ্রশাখার অগ্রভাগ হতে ৫ টি পুষ্পদন্ড বের হয় ও প্রতিটি পুষ্পদন্ডের চারদিকে ছাতার আকৃতির মত ১০-২০ টি স্তরে ফুল থাকে। প্রতিটি স্তরে ৬টি করে ছোট ফুল ফোটে। এর পাতা, ফুল ও ফলের একটি ঝাঁঝাল গন্ধ আছে। বাংলাদেশ ভারতের প্রায় সর্বত্র দেখা ভারতে বাণিজ্যক ভাবে চাষ হয়।

উত্তোলণের সময়: সারা বছর এ গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। শীত কালের শেষে গাছে ফুল আসে। বসন্তে ফল পেকে যায়। বসন্তের শেষে বৈশাখে বীজ সংগ্রহ করা যায়।

আবাদী/অনাবাদী/বন জ: আবাদী অনাবাদী ও বনজ সব ধরনের হয়ে থাকে। ২০০০ মিটার উচ্চতাতে ও তুলসী গাছ জন্মে থাকে ।

চাষাবাদের ধরণ: পানি জমেনা এমন উঁচু ভেজা মাটিতে কিছুটা ছায়া যুক্ত যায়গায় এ গাছ ভাল জন্মে। বীজতলা ভাল ভাবে চাষ করে শুকনো বীজ রোপন করতে হয়। কিছুদিনের ভিতর চারা গজিয়ে উঠে।

তুলসী পাতায় ফ্লেভোনয়েডস(flavonoids)পাওয়া যায়।ওরিয়েনটিন এবং ভাইসেনিন এমনই দুটো পানিতে দ্রবনীয় ফ্লেভোনয়েডস যা শ্বেতকণিকার কোষপ্রাচীর রক্ষা করে ক্রোমোজোমকে অক্সিজেনজনিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে ।তুলসী পাতায় কিছু ভোলাটাইল ওয়েল থাকে যার মধ্যে-এষ্ট্রাগল(estragole),লিনালুল(linalool),সিনেওল(sineole),ইউজেনল(ugenol),সাবিনিন(sabinene),মিরসিন(myrsene),এবং লিমোনিন(limonene).এগুলো ব্যাকটেরিয়ার গ্রোথকে কমিয়ে দেয়। ইউজেনল সাক্লোওক্সিনেজ নামক এনজাইমের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।যেটা করে আমাদের এসপিরিন এবং এসিটামাইনোফেন।

ঔষধি গুণাগুণ:- মানসিক চাপ রোধে: এটা মানসিক চাপ নিরোধে খুবই উপকারী, এটা সেরটোনিন মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

তুলসী ও আদা দিয়ে এককাপ চা বানিয়ে পান করলে মাথা ব্যাথা ও জ্বর থেকে পরিত্রান পাওয়া যায়। অথবা জ্বর হলে পানিতের মধ্যে তুলসী পাতা, গোল মরিচ এবং মিশ্রী মিশিয়ে ভাল করে সেদ্ধ করুন ৷ অথবা তিনটে দ্রব্য মিশিয়ে বড়ি তৈরি করুন ৷ দিনের মধ্যে তিন-চার বার ঐ বড়িটা পানিতের সঙ্গে খান ৷ জ্বর খুব তাড়াতাড়ি সেরে যাবে।

অনেক সময় আমাদের হাতে ও পায়ে কালো কালো ছোপ পড়ে। এইসব দাগ থেকে রেহাই পেতে তুলশী পাতার জুড়ি নেই। তুলশী পাতার রসের সাথে দুধ,ময়দা, কাঁচা হলুদ বাটা ও জাফরান একসাথে মিশিয়ে হাত ও পায়ের কালো দাগের উপর লাগান। শুকিয়ে গেলে হালকা করে ঘষে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। কিছুদিন এইভাবে ব্যবহার করলে হাত ও পায়ের কালো ছোপ কমে যাবে।

একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আমাদের সবার মুখের চামড়া কুঁচকে যেতে থাকে। তুলশী পাতার রস ও নারকেলের পানি সমপরিমানে মিশিয়ে মুখে ও শরীরে লাগাতে পারেন নিয়মিত। এতে করে চামড়া টান টান থাকবে।

শিশুদের সর্দি কাশির জন্য এটি একটি মহা ঔষধ হলেও যে কোন বয়সের মানুষই এ থেকে উপকার পেয়ে থাকে । শুধু পুজো-অর্চনাতেই লাগে না ৷ তুলসী পাতার অনেক গুণ রয়েছে ৷

সর্দি কাশিতে: কাশি যদি না কমে সেই ক্ষেত্রে তুলসী পাতা এবং আদা পিষে মধুর সঙ্গে মিশিয়ে খান ৷ এতে উপকার পাবেন ৷ আমাদের দেশে ছেলেমেয়েদের সর্দি-কাশিতে তুলসী পাতার রস ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। এসব ক্ষেত্রে কয়েকটি তাজা তুলসী পাতার রসের সাথে একটু আদার রস ও মধুসহ খাওয়ানো হয়। বাচ্চাদের সর্দি-কাশিতে এটি বিশেষ ফলপ্রদ। তাজা তুলসী পাতার রস মধু, আদা ও পিঁয়াজের রসের সাথে এক সাথে পান করলে সর্দি বের হয়ে যায় এবং হাপানিতে আরাম হয়।

এটি হজমকারক। প্রতিদিন সকালে ১৮০ গ্রাম পরিমান তুলসী পাতার রস খেলে পুরাতন জ্বর, রক্তক্ষয়, আমাশয়, রক্ত অর্শ এবং অজীর্ণ রোগ সেরে যায়।

পেট খারাপ হলে: ঘন ঘন বড় ইস্তেজ্ঞা হলে তুলসীর ১০ টা পাতা সামান্য জিরের সঙ্গে পিষে ৩-৪ বার খান ৷

পেট কামড়ানো, কাশি: তুলসী পাতার রসে মধু মিশিয়ে খাওয়ালে বাচ্চাদের পেট কামড়ানো, কাশি ও লিভার দোষে উপকার পাওয়া যায়।

মুখের দুর্গন্ধে: মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে দিনে ৪-৫ বার তুলসী পাতা চেবান ৷

ঘা কমাতে: ঘা যদি দ্রুত কমাতে চান তাহলে তুলসী পাতা এবং ফিটকিরি একসঙ্গে পিষে ঘা এর স্থানে লাগান, কমে যাবে ৷

পুড়ে যাওয়া ক্ষত: শরীরের কোন অংশ যদি পুড়ে যায় তাহলে তুলসীর রস এবং নারকেলের তেল ফেটিয়ে লাগান, এতে জ্বালা কমবে ৷ পোড়া জায়গাটা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে ৷ সেখানে কোন দাগ থাকবে না ৷

ত্বক এর জত্নে: ত্বকের চমক বাড়ানোর জন্য, এছাড়াও ত্বকের বলীরেখা এবং ব্রোন দূর করার জন্য তুলসী পাতা পিষে মুখে লাগান ৷ ত্বকের সমস্যা দূর করতে তিল তেলের মধ্যে তুলসী পাতা ফেলে হালকা গরম করে ত্বকে লাগান ৷

বুদ্ধি এবং স্মরণশক্তি বাড়ায়: বুদ্ধি এবং স্মরণশক্তি বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন ৫-৭ টা তুলসী পাতা চিবান ৷

ইস্তেঞ্জায় অসুবিধা রোধে: ছোট ইস্তেঞ্জা (প্রস্রাবে) জ্বালা হলে তুলসী পাতার রস ২৫০ গ্রাম দুধ এবং ১৫০ গ্রাম পানিতের মধ্যে মিশিয়ে পান করুন ৷ উপকার পাবেন ৷

ঘামাচি ও চুলকানি: তুলসী পাতা ও দুর্বার ডগা বেটে গায়ে মাখলে ঘামাচি ও চুলকানি ভাল হয়। কান ব্যথায়: পাতার রস ফোঁটা ফোঁটা করে কানে দিলে কানের ব্যথা সেরে যায়।

ম্যালেরিয়া রোধে: পাতা ও শিকড়ের ক্বাথ ম্যালেরিয়া জ্বরের জন্য বেশ উপকারী। ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে প্রতিদিন সকালে গোল মরিচের সাথে তুলসী পাতার রস খেতে দেয়া হয়। যতদিন সম্ভব খাওয়া যায়।

বসন্ত, হাম: বসন্ত, হাম প্রভৃতির পুঁজ ঠিকমত বের না হলে তুলসী পাতার রস খেলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসবে।

ক্রিমি: তুলসী পাতার রসের সাথে লেবুর রস মিশিয়ে খেলে ক্রিমি রোগে বেশ উপকার পাওয়া যায়। শুষ্ক তুলসী পাতার ক্বাথ সর্দি, স্বরভঙ্গ, বক্ষপ্রদাহ, উদারাময় প্রভৃতি রোগ নিরাময় করে থাকে।

বাত ব্যথা: বাত ব্যথায় আক্রান্ত স্থানে তুলসী পাতার রসে ন্যাকড়া ভিজিয়ে পট্টি দিলে ব্যথা সেরে যায়। কীট-পতঙ্গ কামড়ালে: বোলতা, ভীমরুল, বিছা প্রভৃতি বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ কামড়ালে ঐ স্থানে তুলসী পাতার রস গরম করে লাগালে জ্বালা-যন্ত্রণা কম হয়।

তুলসী মূল শুক্র গাঢ়কারক এবং বাজীকারক। তুলসী পাতার ক্বাথ, এলাচ গুঁড়া এবং এক তোলা পরিমাণ মিছরী পান করলে ধাতুপুষ্টি সাধিত হয় যতদিন সম্ভব খাওয়া যায়। এটি অত্যন্ত ইন্দ্রিয় উত্তেজক। প্রতিদিন এক ইঞ্চি পরিমাণ তুলসী গাছের শিকড় পানের সাথে খেলে যৌনদূর্বলতা রোগ সেরে যায়।

কোন কারনে রক্ত দূষিত হলে কাল তুলসিপাতার রস কিছুদিন খেলে উপকার পাওয়া যায়। শ্লেষ্মার জন্য নাক বন্ধ হয়ে কোনো গন্ধ পাওয়া না গেলে সে সময় শুষ্ক পাতা চূর্ণের নস্যি নিলে সেরে যায়। পাতাচূর্ণ দুই আঙ্গুলের চিমটি দিয়ে ধরে নাক দিয়ে টানতে হয়, সেটাই নস্যি। তুলসী পাতা দিয়ে চায়ের মত করে খেলে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায়। তুলসী চা হিসাবে এটি বেশ জনপ্রিয়। তুলসিপাতার রসে লবন মিশিয়ে দাদে লাগালে উপশম হয়।

প্রস্রাবজনিত জ্বালা: তুলসীর বীজ পানিতে ভিজালে পিচ্ছিল হয়। এই পানিতে চিনি মিশিয়ে শরবতের মত করে খেলে প্রস্রাবজনিত জ্বালা যন্ত্রনায় বিশেষ উপকার হয়।

6 টি মন্তব্য

  • বাংলা ব্লগ

    দাঁতের সুরক্ষায় তুলসীপাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে দাঁত মাজলে দাঁত ভালো থাকে। এ ছাড়া সরিষার তেলের সাথে তুলসীপাতার গুঁড়া মিশিয়ে পেস্ট বানিয়ে দাঁত মাজলেও দাঁত শক্ত থাকে।
  • বাংলা ব্লগ

    এ ছাড়া গনোরিয়া ও গাউট রোগেও তুলসীপাতার রস উপকারী। তুলসীপাতার ব্যবহার ছাড়া তুলসী বীজও ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

    হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় তুলসী থেকে তৈরি ওষুধটির নাম ওসিমাস স্যাঙ্কটাম, অ্যাজমা, ঠাণ্ডা লাগা, কাশি হওয়া, জ্বর প্রভৃতিতে এর প্রধান ব্যবহার, মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় এর চমৎকার ব্যবহার রয়েছে। গলাব্যথা, বুকে ব্যথা, মাথাব্যথা, চোখ ব্যথা, কান ব্যথার লক্ষণেও এটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মুখের ক্ষত, মুখের দুর্গন্ধ, পেট ফাঁপা, ক্ষুধামান্দ্য, লিভারে ব্যথা প্রভৃতিতে এর ব্যবহার রয়েছে। ইনফ্লুয়েঞ্জার জন্য হোমিওপ্যাথিতে এর ব্যবহার রয়েছে। টাইফয়েড জ্বরেও এর নিয়মিত ব্যবহার রয়েছে। হোমিওপ্যাথিতে ডায়রিয়া, আমাশয়, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া এবং বারবার প্রস্রাবের চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
  • বাংলা ব্লগ

    পোকা দম কারী: সরিষা ও সবজির জাব পোকা, মশা, মাছি, বিছা পোকা, আলুর সূতলী পোকার মথ, লাল ক্ষুদ্র মাকড়, ধানের বাদামি গাছ ফড়িং ইত্যাদি।
  • rose_3

    সুবহানাল্লাহ!অনেক অনেক গুন তুলসী পাতার মধ্যে আসলে এই পোস্ট গুলি না পড়লে হয়ত জানা যেতনা,কষ্ট করে প্রত্যেকদিন এই পোষ্ট গুলি দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ :rose:
  • বাংলা ব্লগ

    গ্রিক "রাজা" শব্দ থেকে βασιλεύς - basileus থেকে ইংরেজী Basil শব্দের উৎপত্তি।
  • বাংলা ব্লগ

    শুকরিয়া!!!!

মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।