অনন্তকালব্যাপী পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালনের লক্ষ্যে সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অনুপম আদর্শ মুবারক আলোচনা ও অনুসরণ:
আজ সুমহান বরকতময় পবিত্র ২২শে জুমাদাল উখরা শরীফ-
খলীফায়ে ছানী, ফারূক্বে আ’যম, আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র খিলাফত মুবারক গ্রহণ দিবস।
এ সুমহান দিবসটির তাৎপর্য অনুধাবন গোটা মুসলিম উম্মাহর জন্য ফরয-ওয়াজিব।
এবং উহার মুবারক আমলের জন্য মুজাদ্দিদে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার মুবারক ছোহবতে আসা ফরয।
সব প্রশংসা মুবারক যিনি খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিইয়ীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অফুরন্ত দুরূদ মুবারক ও সালাম মুবারক।
ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ২২ মার্চ প্রথম ধাপে দেশব্যাপী ৭১২টি ইউপি নির্বাচনের পূর্বাপর সংঘাত, সংঘর্ষ, সহিংসতায় পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির গুলীবর্ষণ এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পৈশাচিক হামলা চালিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ২২ জন মানুষকে হত্যা করেছে। নির্বাচনের দিনসহ আগের দিন ও পরের দিন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় ১২ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় নির্বাচন থেকে আরম্ভ করে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন অথবা ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচন- সর্বত্র ক্ষমতার তীব্র লড়াই। সবাই চরম ক্ষমতালোভী।
কিন্তু গোটা মুসলিম জাহানের খিলাফতের দায়িত্ব যখন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার প্রতি সমর্পণের কথা বলা হলো তখন আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বললেন, “আমি খিলাফত মুবারক উনার দায়িত্ব চাই না। খলীফাতু রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি তখন দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বললেন, আপনি খিলাফত উনার দায়িত্ব না চাইলেও খিলাফত আপনাকে চায়। সুবহানাল্লাহ!
বস্তুতঃ দীর্ঘ ১০ বছর ৬ মাস খিলাফত বেমেছাল যোগ্যতা ও দক্ষতার দ্বারা পরিচালনা করে পবিত্র দ্বীন ইসলামের স্বর্ণযুগ তৈরি করে গোটা পৃথিবীতে খিলাফত বিস্তার করে আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে- উনার সম্পর্কে খলীফাতু রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম উনার মন্তব্য অক্ষরে অক্ষরে সত্য ছিলো। সুবহানাল্লাহ!
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি শাসনব্যবস্থাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যকে ১৪টি প্রদেশে বিভক্ত করেন। যথা: পবিত্র মক্কা শরীফ, পবিত্র মদীনা শরীফ, সিরিয়া, আলজেরিয়া, বসরা, কূফা, মিসর, প্যালেস্টাইন, ফারস, কিরমান, মাকরান, খোরাসান, সিজিস্তান ও আজারবাইজান। শাসনব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের ফলে দূরবর্তী অঞ্চলেও সুষ্ঠুভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থার নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিটি প্রদেশকে জেলা ও মহকুমায় বিভক্ত করা হয়। প্রদেশের শাসনকর্তাকে ওয়ালী বা আমীরে শো’বা এবং জেলার শাসনকর্তাকে আমীন বলা হতো।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি মজলিসে শূরা বা উপদেষ্টা পরিষদের সাথে পরামর্শ করে সর্বোচ্চ ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে প্রদেশের শাসনকর্তা ও জেলার শাসনকর্তা নিয়োগ করতেন। উনারা তাদের কার্যের জন্য আমিরুল মুমিনীন উনার নিকট দায়ী থাকতেন।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী ও সুসংহত করার জন্য ৯টি সামরিক বিভাগ বা জুনদ বা ক্যান্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। যথা- পবিত্র মদীনা শরীফ, কূফা, বসরা, ফুসতাত, মিসর দামেস্ক, হিমস, প্যালেস্টাইন ও মসুল।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি বিচার বিভাগের গঠন এবং উন্নতি বহুলাংশে প্রশাসনিক মেধার জন্য সম্ভবপর করেছিলেন। বিচারব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তিনি প্রত্যেক প্রদেশে একজন প্রধান ক্বাযী (ক্বাযীউল কুযাত বা প্রধান বিচারক) এবং প্রত্যেক জেলায় একজন ক্বাযী নিযুক্ত করেন।
অপরাধমূলক কার্যকলাপ রোধ করে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি সর্বপ্রথম একটি সুগঠিত পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। পুলিশ প্রধানের নাম রেখেছিলেন ছাহেবুল আহদাত।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার শাসনের অন্যতম কৃতিত্ব ছিল কারাগার প্রতিষ্ঠা। কোনোও অপরাধী প্রাপ্যের অতিরিক্ত কষ্ট যাতে পেতে না হয় তার সব ব্যবস্থা রেখেছিলেন।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার শাসন ব্যবস্থাকে সম্মানিত ইসলামী আদর্শযুক্ত, শত্রুমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, সঠিক বিচার-ব্যবস্থার জন্য তিনি গোয়েন্দা বিভাগ প্রবর্তন করেন।
খিলাফতের আয়-ব্যয়ের হিসেব ঠিক রাখার জন্য তিনি ‘দিওয়ান’ নামে একটি রাজস্ব বিভাগ প্রবর্তন করেন। খিলাফতের রাজস^ উৎস ছিল পবিত্র যাকাত, খারাজ, জিজিয়া, ফসলের উশর, আল ফাই, গনিমত ।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি কৃষির উন্নতির জন্য অগ্রিম ঋণ দেয়ার প্রথা প্রবর্তন করেন। তিনি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জন্য অগ্রিম খিলাফতী ঋণ দেয়ার প্রথা প্রবর্তন করেন। তিনি কৃষি কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য আরব ও মিসরের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করেন এবং বাণিজ্য শুল্ক লাঘব করেন।
আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি জাতীয় অর্থের সুষ্ঠু বণ্টনের জন্য সর্বপ্রথম লোকগণনা বা আদমশুমারি ও জরিপের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
জনহিতকর কার্যাবলী ছিল আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার শাসনব্যবস্থার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। উনার শাসনামলে অসংখ্য মসজিদ, ইলম চর্চার কেন্দ্র তথা মাদরাসা-মক্তব, লঙ্গরখানা, হাম্মামখানা, খাল, রাস্তা, সেতু, দুর্গ, হাসপাতাল প্রভৃতি জনকল্যাণমূলক ও প্রশাসনিক ভবন বিভিন্ন জেলায় জেলায় এমনকি মহল্লায় মহল্লায় গড়ে উঠে।
জনগণের কল্যাণে তিনি সর্বদাই নিয়োজিত থাকতেন। জনসাধারণের অবস্থা চাক্ষুস দেখার জন্য তিনি পবিত্র মদীনা শরীফ উনার অলিতে গলিতে রাতের আঁধারে ঘুরে বেড়াতেন এবং অসহায় মানুষের কাছে নিজ হাতে সাহায্য পৌঁছে দিতেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনোও নজির নেই। কিন্তু তারপরেও জনগণের কল্যাণ সাধনে তিনি যেন নিজের উপর নিজে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সবসময়ই তিনি চিন্তা করতেন এর চেয়েও বেশি কি করে মুসলমানদের কল্যাণ করা যায়।
‘তারীখুল খুলাফা’ কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, সাইয়্যিদুনা হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত যুন নূরাইন আলাইহিস সালাম উনাকে ডেকে বলেছেন, লিখুন, “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। এ ওছীয়তনামা সাইয়্যিদুনা হযরত আবূ বকর ইবনে আবূ কুহাফা আলাইহিস সালাম তিনি দুনিয়ার অন্তিম মুহূর্তে এবং পরপারে যাওয়ার প্রাক্কালে লিপিবদ্ধ করেছেন, যখন কাফিরেরা ঈমানদার, দুশ্চরিত্রতা চরিত্রবান এবং মিথ্যাবাদীরা সত্যবাদী হচ্ছে। হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আমি আমার পর ফারূক্বে আ’যম সাইয়্যিদুনা হযরত উমর ইবনুল খত্তাব আলাইহিস সালাম উনাকে আপনাদের জন্য খলীফা মনোনীত করলাম। আপনারা উনার কথা শুনবেন এবং উনার ইতায়াত তথা অনুসরণ-অনুকরণ করবেন।
এ মুবারক স্মরণীয় বরণীয় মহিমান্বিত দিন ও মুহূর্তটি হলো ২২শে জুমাদাল উখরা শরীফ। অর্থাৎ আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি হিজরী ১৩ সালের ২২শে পবিত্র জুমাদাল উখরা শরীফ সম্মানিত খিলাফত উনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, মুসলমান মাত্রই দ্বিতীয় খলীফা আমিরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার মহান খিলাফত উনার সুফলের বহুমাত্রিক বর্ণনা দিয়ে থাকে। অনেক আলোচনা করে থাকে। সেরকমটি চেয়ে থাকে। আবার আশাও করে।
সঙ্গতকারণেই এক্ষেত্রে মুসলমানদের এটাও কর্তব্য যে, মহিমান্বিত ও বরকতপূর্ণ সে দিন ও মুহূর্তটি বিশেষভাবে স্মরণ করা ও মুল্যায়ন করা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, “হে হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি তাদেরকে (উম্মাহকে) আমার বিশেষ বিশেষ দিনগুলো স্মরণ করিয়ে দিন।”
তবে এদিনের স্মরণ তখনই যথাযথ হবে, যখন মুসলমান ও তাদের শাসনকর্তাগণ হযরত ছিদ্দীক্বে আকবর আলাইহিস সালাম ও আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূক্বে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাদের ইতায়াত করবেন তথা খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ উনার পথে চলবেন।
মূলত, এসব অনুভূতি ও দায়িত্ববোধ আসে পবিত্র ঈমান ও পবিত্র দ্বীন ইসলাম উনাদের অনুভূতি ও প্রজ্ঞা থেকে। এই অনুভূতি ও প্রজ্ঞা আসে পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ অনন্তকালব্যাপী পালন করার ইলম ও জজবা থেকে। আর তার জন্য চাই নেক ছোহবত তথা মুবারক ফয়েয-তাওয়াজ্জুহ।
যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, যামানার মুজাদ্দিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম আলাইহিস সালাম উনার নেক ছোহবত মুবারকেই কেবলমাত্র সে মহান ও অমূল্য নিয়ামত হাছিল সম্ভব। আর ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম দিচ্ছেন অনন্তকালব্যাপী পবিত্র সাইয়্যিদুল আ’ইয়াদ শরীফ পালন করার মহামহিম নিয়ামত মুবারক। সুবহানাল্লাহ!
খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাদেরকে তা নছীব করুন। (আমীন)
0 টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।