সবুজ বাংলা ব্লগ

সবুজ বাংলা ব্লগ

ভারত

হতভাগা।

"অনেক কষ্ট ভোগ করলিরে ব্যাটা সুখ পেলি না" বলে মহব্বত আলীর অন্তরটা কুকড়ে কেদে উঠল। তার চোখে পানি আসছে না। প্রবল বাতাসের ঝাপ্টায় চোখের পানিকে শুকিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি স্থীর দ্রষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ছেলেটির দিকে। ইছচে করছে তার চোখের লোনা পানি দিয়ে ভাসিয়ে দিতে এই রুমটা। কিন্তু শরীরের লোনা জল গুলো লবণ হয়ে বরফের মতো জোমাট বেধে আছে। শত চেষ্টা করে ও গড়াতে পারছেন না এক ফোটা নোনা জল।. ছেলেটা তার চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। আহ! কি মায়াবি চাওনি। তার মনে পড়ে ছেলের জন্মের কথা। পুলক জন্মের পর কেদে উঠে নিই। পাড়ার লোকেরা তা দেখে অবাক হয়ে বলেছিল,"নিশ্চয় ছেলেটা তোমার চোখে বড় কোনো অসুখ নিয়ে জন্মেছে। তা না হলে সব ছেলেপুলেরা জন্মের পর চে চে করে তোমার ছেলেটা করেনি এর কারণটা কি?" মহব্বত আলী লোকের কথায় কান দেননি। ছেলেকে তিনি নিজের মতই দেখেছেন। কিছুটা অবাক হয়েছিলেন যে ছেলেটা তার পাড়ার আট দশটা ছেলের মত জন্মায়নি। তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল পুলকের মা। ডাক্তার কবিরাজ থেকে কোনো কিছুই বাদ যায়নি ছেলের চিকিৎসার জন্য। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে যতটুকু করা যায় তার সবটুকু সে করছে।. সামান্য বিষয় নিয়ে পুলকের মায়ের কান্ড-কারখানা দেখে তার হাসি পেয়েছিল। তিনি তা প্রকাশ করেননি। হাসিটা চেপেই রেখেছিলেন। পরিবারের একটি মাত্র সন্তানের উপর মায়ের মায়া তো একটু বেশি থাকবেই।. সুস্থ সবল হয়ে জন্ম নেয়া ছেলেটা তার বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারেনি। জন্মের সময়ের লোককথা গুলী তার উপর চেপে বসল। দুই বছর বয়সে ছেলেটাকে ঝাঁপটে ধরলো নানা রকম রোগে। প্রকৃতি ছেলেটারও শিশু সুলভ আনন্দকে কেড়ে নিয়েছিল। সাথে কেড়ে নিয়েছিল পুলকের মায়ের। ছেলেটা রোগের যন্ত্রনায় অসহ্য চিতকার করত সারা রাত। পুলকের মা ও জেগে থাকত ছেলেকে নিয়ে। মাঝে মাঝে তাকে ডেকে কিছুক্ষন ঘুমাত, পরক্ষনেই আবার ছেলে টানে ধড় মড় করে জেগে উঠত।. এক মাত্র সন্তানকে যত্ন করার ভাগ্য পুলকের মায়ের বেশিদিন সয়নি। ছেলেকে নিয়ে সে কতো স্বপ্ন দেখত। ছেলেকে লেখা-পড়া করাবে, ডাক্তার বানাবে, মাষ্টার বানাবে আরো কত কিছু। কিন্তু হতভাগার স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যায়। স্বপ্ন পুরন দেখার আগেই শ্বাষ-কষ্ট নামক রোগটা তাকে নিয়ে যায় চিরতরে।. স্ত্রী কে হারিয়ে নিজেকে তার বেশ অসহায় বোধ লেগেছিল। কিন্তু সে অসহায় বোধের চাপটা ছেলের উপর পড়তে দেননি। স্ত্রীর স্বপ্ন অনুযায়ী পুলককে মানষ করে তুলতেছিলেন।. ছেলেটা তার মায়ের স্বপ্ন পুরোনের দিকে এগিয়ে যায়। পড়া-লেখায় ভাল করতে থাকে। অন্যের কাছে পুলকে প্রসংশা শুনে নিজেকে গর্বিত মনে করতেন। ভোলে যেতেন সমস্ত অতীতের কথা। বকের ভেতর লুক্কায়িত ভাবে জমে থাকা সমস্ত দুঃখ গ্লানি বেদনার কথা।. মৃত স্ত্রীর তিলে তিলে জমানো টাকার কেনা রিকশাটা নিয়ে সারাদিন রোদে পুড়ে যখন পুলকের হাসি- মাখা মুখ আর তার দুষ্টুমি দেখতেন। মনে হত তিনি এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছেন।. প্রকৃতি মানুষের জীবন নিয়ে চমৎকার উপহাসের খেলা খেলে। এ খেলা কখনো কষ্টের আবার কখনো সুখের। তার কপালে কষ্টেরটাই ছিল বেশি। সাথে কষ্টের আরেক খেলা খেলতে হয়েছিল পুলককে। দু- বছর বয়সের যন্ত্রণা পর আবার বারো বছর বয়সে ঝাপ্টে ধরে তাকে নতুন রোগে।. তবে এই রোগটা সেই2-বছর বয়সের রোগ ছিল না। রোগের নাম শুনে তিনি আঁৎকে উঠেছিলেন। সেই পুরনো ডাইনি রোগটা যে একদিন পুলকে মাকে কেড়ে নিয়েছিল চিরতরের জন্য।. হতভাগা মায়ের মতো তিনি পুলককে ডাইনি রোগের হাতে ছেড়ে দিতে চাননি। পুলককে তিনি চিকিৎসা করিয়েছিলেন। সম্বলের সবটুকুই খরচ করেছেন ছেলের পেছনে। আজ সকালে উপার্জনের শেষ সম্বল রিকশাটা বিক্রি করে এসেছেন। পুলক বলেছিল তার জিলেপি খেতে মন চায়। তিনি জিলেপি এক কেজি এনেছেন। ছেলেটি তার জিলেপি খেতে পারেনি। শেষ ইচ্ছাটুকু ফেলে রেখে তার অদ্রিশেই চলে যায় পৃথিবীই থেকে চিরতরে। অনেক কষ্টে পৃথিবীই ছেড়েছে ছেলেটা তার। চোখ বুঝার সময়টুকু পায়নি। চোখ বড় বড় করে যন্ত্রণার সহিত তাকে বিদায় নিতে হয়েছে।

0 টি মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।

মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।