বনছাগল বা সেরাও (Serow) ছাগল বা অ্যান্টিলোপজাতীয় প্রাণী। এরা পাহাড়ি ছাগল নামেও পরিচিত। নিকটাত্মীয় গরালের (Goral) চেয়ে এরা আকারে বড়। বর্তমানে বিশ্বে ছয় প্রজাতির সেরাও দেখা যায়। এ দেশে এরা Mainland Serow, Asiatic Serow বা Burmese Goat-Antelope নামে পরিচিত। সেরাওয়ের বৈজ্ঞানিক নাম Capricornis sumatraensis.
বনছাগল দেখতে গৃহপালিত রামছাগলের মতো, তবে আকারে বেশ লম্বা। এদের মাথা বড়, মুখ লম্বাটে ও ঘাড় মোটা। কান খাড়া ও ছুচালো দেখতে অনেকটা গাধার কানের মতো। শিং কালো ও পেছনের দিকে বাঁকানো। শিংয়ের ডগা তীক্ষ-সুচালো, ডগাছাড়া বাকি অংশে রিংয়ের মতো দাগ থাকে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের শিং একই রকম ২৩-২৫ সেন্টিমিটার লম্বা হতে পারে। পাগুলো বেশ শক্তপোক্ত। স্ত্রী-পুরুষ বনছাগল দেখতে প্রায় একই রকম। এরা লম্বায় ১.০-১.১ মিটার হয়ে থাকে। ওজনে পুরুষগুলো ৭০-৭৫ ও স্ত্রীগুলো ৫০-৫৫ কেজি হতে পারে। এদের পুরো দেহের পশম রুক্ষ ও মোটামুটিভাবে লম্বা। তবে চুট থেকে ঘাড় পর্যন্ত পশমগুলো তুলনামূলক বেশি লম্বা। গায়ের রং লালচে বাদামি। লেজ দেশি ছাগলের মতোই ছোট, তবে রোমশ। চোখের চারদিকে ও খুরের ওপরের কিছু অংশের পশম সাদাটে। খুরের রং কালো।
বনছাগল অদ্ভুতভাবে পা দুটো ফাঁক করে মাথা নুইয়ে দাঁড়ায়। ভাবখানা এই-যেন এখনই তেড়ে আসবে। সামান্য ভয় পেলেও এভাবে দাঁড়াবে। মাঝে মাঝে সামনের দুই পা তুলে জোরে তা ছুড়ে মারবে মাটিতে এবং নাক ও গলায় কিছুটা হুইসেলের মতো শব্দ তুলে পালিয়ে যাবে। কখনো আবার অক্রমণও করতে পারে। এদের চোখের নিচে এক ধরনের গন্ধগ্রন্থি থাকে, যার মাধ্যমে নিজেদের বিচরণ সীমানা নির্ধারণ করে থাকে।
এরা ঘন ঘাস-লতাপাতাপূর্ণ খাড়া পাথুরে পাহাড়ে বসবাস করে। ভূপৃষ্ঠের ২৭০০ মিটার উঁচুতেও বাস করতে পারে। পাহাড়ের খাড়া ঢালে একাকী ঘুরে বেড়াতে ও খাবার খুঁজতে অভ্যস্ত। সাধারণত, একাকী বিচরণ করলেও অনেক সময় ছোট দলেও থাকতে পারে। সফিকুর রহমান জানিয়েছেন, একবার একটি দলে তিনি সাতটি বনছাগল দেখেছিলেন। এদের চলাচলের পথ এতটাই সরু যে, সেখানে সরীসৃপ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষে চলাচল করা বেশ কষ্টসাধ্য। এ দেশে এরা মূলত চট্টগ্রাম, কাপ্তাই, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা ও নেত্রকোনার গাড়ো পাহাড়ের গহিন অরণ্যে লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করে।
ছাগলের মতো বনছাগলও রোমন্থক প্রাণী। কাজেই এরা অন্যান্য রোমন্থক প্রাণীর মতোই তৃণভোজী। সাধারণত, ঘাস, বাঁশের কচিপাতা ও পাথরের গায়ে জন্মানো শেওলা খেয়ে জীবণ ধারণ করে। সাধরণত, সন্ধ্যা ও ভোররাতে খাদ্যের জন্য বিচরণ করে। আর দিনের বেলা জাবর কাটে ও পাহাড়ের চূড়ার কোনো বড় পাথরের আড়ালে বা গুহায় বিশ্রাম নেয়। এরা কোনো কোনো সময় পাহাড়ের চূড়ার এমন জায়গায় বসে থাকে, যেখান থেকে সীমানার চতুর্দিকে চোখ রেখে বিপদ আঁচ করা যায়।
সাধারণত, অক্টোবর-নভেম্তর এদের প্রজননকাল। বনছাগল আট-নয় মাস গর্ভধারণের পর সাধারণত, একটি বাচ্চা প্রসব করে। পাহাড়ের গুহায়, ঘন ঘাসবনে বা পাথরের ফাঁকে ফাঁকে নিজে লুকায় ও বাচ্চা লুকিয়ে রাখে। এরা ঠিক কত বছর বাঁচে সে সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এরা অত্যন্ত বিপন্ন প্রাণী। বনছাগল পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞ সফিকুর রহমানের মতে, এ দেশে বর্তমানে ৫০-৬০টির মতো সেরাও বেঁচে থাকতে পারে। কাজেই এই অতি বিপন্ন প্রাণীটিকে রক্ষার জন্য এখনই সরকারিভাবে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় অচিরেই হয়তো এরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আ ন ম আমিনুর রহমান | তারিখ: ২৩-০৫-২০১১
বাংলা ব্লগ
শাহীন মুহম্মদ আব্দুল্লাহ
ছন্নছাড়া পথিক
ছন্নছাড়া পথিক