রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থার মধ্যেই দেশের প্রধান রফতানি আয়ের খাত গার্মেন্টস শিল্পে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

সব প্রশংসা মুবারক খালিক্ব মালিক রব মহান আল্লাহ পাক উনার জন্য। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি অফুরন্ত দুরূদ শরীফ ও সালাম মুবারক।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় সরকার বরাবরই তৈরী পোশাক শিল্পের মালিকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি হালকা করে দেখে। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই এ খাতের মালিকদের সরকার আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এসেছে। আর এ কারণেই একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও মালিকরা পার পেয়ে যায়। কিন্তু ক্ষতি হয় শ্রমিকের তথা গোটা অর্থনীতির। সুযোগ নেয় দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা।
সাভারের ভবন ধসের খবর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে বিদেশী গণমাধ্যমগুলো। বিদেশী প্রধান গণমাধ্যমগুলো নিয়মিত খবরের পাশাপাশি বিশেষ প্রতিবেদনও প্রকাশ করছে। বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের ভূমিকার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে, ‘ভবন ধসের পর অন্ধকারে বাংলাদেশের অর্থনীতি’। নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, ‘বাংলাদেশের কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করছে বিদেশী ব্র্যান্ডগুলো’।
মার্কিন গণমাধ্যম হাফিংটন পোস্টের দুই দিন ধরে প্রধান প্রতিবেদন ছিলো বাংলাদেশের ভবন ধস নিতে। প্রতি ঘণ্টায় নতুন নতুন প্রতিবেদন প্রচার করা করেছে হাফিংটন।
ওয়াশিংটন পোস্ট মালিক গ্রেফতার ও উদ্ধার তৎপরতার খবরের পাশাপাশি অপর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে, ‘বাংলাদেশ ইকোনমি আউটলুক ডার্কনেস আফটার বিল্ডিং কলাপস’। বলা হয়, রানা প্লাজা ধসে পড়ার আগে থেকেই বাংলাদেশের ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরী পোশাক শিল্প চাপের মুখে রয়েছে। এর প্রধান কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি অবস্থান। হরতাল, বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সহিংসতায় বাংলাদেশ কার্যত অচল। এর পরও পশ্চিমা বিভিন্ন খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের পোশাক সরবরাহকারী কারখানাগুলো উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল। তবে সড়ক, সমুদ্রবন্দরসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় এবং শুল্ক অফিসসহ সরকারি দফতরগুলো বন্ধ থাকায় কাঁচামাল আমদানি ও সঠিক সময়ে পণ্যের জাহাজিকরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে পশ্চিমা ক্রেতাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটতে শুরু করেছে। বিজিএমইএ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে অস্থিরতার কারণে তারা ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্ডার হারিয়েছে এবং বিদ্যমান ৫০ কোটি ডলারের অর্ডার প্রতিবেশী ভারতে চলে যাচ্ছে। এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা এবং রানা প্লাজা ট্রাজেডির ঘটনায় ওয়াল-মার্টের মতো ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে। এইচঅ্যান্ডএম, জারা, ওয়াল-মার্ট এসপ্রিটের জন্য পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হকের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ৩৬ লাখ শ্রমিকের কথা বিবেচনায় নিয়েই হয়তো পশ্চিমা ক্রেতারা রাতারাতি বাংলাদেশকে ছুড়ে ফেলবে না। তবে ব্যাপক ইমেজ সঙ্কট হবে। মন্তব্য করা হয়, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস ও নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজে বার্তা সংস্থা এপি’র বরাতে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তায় নেয়া ব্যবস্থাগুলো অপ্রতুল হওয়ায় প্রত্যাখ্যান করেছে বিদেশী নামি ব্র্যান্ডগুলো। অবশ্য তারা বিভিন্নভাবে উন্নয়নকল্পে তাদের কর্মসূচি বহাল রাখবে। ‘বাংলাদেশে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় চাপ অনুভব করছে পশ্চিমা ফার্মগুলো’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনও প্রচার করেছে টাইমস। মার্কিন ওয়াল স্টিট জার্নালে আলাদা সেকশন করে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশের খবরগুলো। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে কারখানায় ধস : আমাদের এত সস্তা পোশাকের মূল্য আসলে কারা দিচ্ছে? বলা হয়, পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে অল্প সময়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে শত শত কারখানা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারখানা তৈরির নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না। ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রমিকদের এই নির্মম পরিস্থিতির প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমের বেশির ভাগ পোশাক কোম্পানি এশিয়ার সরবরাহকারীদের চাপ দিয়ে কম দামে পোশাক আমদানি করছে। এতে তারা কারখানার নিরাপত্তার বিষয়টিতে নজর দিচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশে বারবার বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটছে।
এমতাবস্থায় দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে- এ প্রশ্ন এখন সবমহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থার মধ্যেই দেশের প্রধান রফতানি আয়ের খাত গার্মেন্টস শিল্পে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
শ্রমিক অসন্তোষের নামে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরির মাধ্যমে অর্থনীতিকে দাবিয়ে রাখতেই যেন তৎপর হয়ে উঠছে কোনো কোনো সংঘবদ্ধ গ্রুপ। ভাঙচুর করা হয়েছে ব্যাংকের এটিএম বুথ, রাস্তাঘাটে গাড়ি, খাবারের দোকানসহ অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। গার্মেন্টস শিল্পের বাইরের এসব শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে বিশেষজ্ঞ মহলকে। এটি কি কারো ষড়যন্ত্র? দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য নেপথ্যে কারো ইন্ধন কিনা- সেটিও এখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, মালিকরা শুধু গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। কোনো কোনো শ্রমিক সংগঠনও গার্মেন্টস ধর্মঘট কর্মসূচি পালনের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে সাভার-আশুলিয়াসহ ঢাকার আশপাশের আরো কিছু এলাকার কোনো শিল্প কারখানাই চালু করতে দেয়া হয়নি। এই ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে তলানিতে নিয়ে ঠেকানোই কি কারো নীলনকশার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে?
গত এক বছরের তথ্যে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। এর কারণ ছিল গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সঙ্কট। দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সঙ্কটে থাকা শিল্পকারখানাগুলো মোকাবেলা করছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এরইমধ্যে ভবন ধসের ঘটনা এবং চলতি অস্থিরতা।
বিজিএমইএ’র একটি সূত্র জানায়, দেশে গার্মেন্টস শিল্প এখন অর্ডার বাস্তবায়ন নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু সাভারের ট্রাজেডির কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি রফতানি আদেশ বাতিলের জন্য যথেষ্ট। সঠিক সময়ে উৎপাদন না হলে সময়মত জাহাজিকরণও সম্ভব হবে না। তাতে বাংলাদেশের ইমেজ ক্ষুণœ হবে এবং রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র মতে, কোনো কোনো মহল বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বাজার নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এর আগেও কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানায় দুর্ঘটনা কিংবা শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে এই ধরনের গার্মেন্টস কারখানা কাদের হাতে চলে গেছে- সেটি খোঁজ নিলেই স্পষ্ট হবে যে, মহলবিশেষ বাংলাদেশে গার্মেন্টসের প্রসার চাচ্ছে না। প্রধান রফতানি আয়ের এই খাতের যদি এমন দশা হয়, তবে অর্থনীতিতে এর অভিঘাত কতোটা হবে- সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রে সরকারকেই কৌশলী ও সক্রিয় হয়ে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
1 টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।
দিগ্বিজয়ী