ছয় উসূলীরা বলে থাকে ইহসলাহ লাভ করার জন্য তিন চিল্লা দিতে হবে।চিল্লা না দিয়ে কেউ ইসলাহ লাভ করতে পারবেনা। এমনকি তারা প্রায়ই বলে থাকে যারা তাবলীগে যায়না তাদের ঈমান-ই থাকতে পারেনা । এ পর্বে ইসলাহ প্রাপ্তি প্রসংগে তাদের বহনকৃত কিতাবে যা বলা হয়েছে তা আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ১৪৪ পৃষ্ঠায় রয়েছে- এরশাদ হইতেছে :
"অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালার নিকট কুরবানীর গোশতও পৌছে না এবং রক্তও পৌছে না; বরং তাহার নিকট পৌছিয়া থাকে তোমাদের পরহেজগারী ও এখলাস ।(সূরা হজ্জ,আয়াত:৩৭)।" উক্ত আয়াত শরিফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফ উনার মধ্যে বলা হয়েছে, আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক ছুরত ও সম্পদ দেখেন না; তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন ।(মিশকাত :মুসলিম) (ফাযায়েলে আমাল” পৃষ্ঠা ৪৩)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে : “অর্থ : যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য নামায পড়ে সে মুশরিক হইয়া যায় , যে লোক দেখানোর জন্য রোযা রাখে সে মুশরিক হইয়া যায়, যে লোক দেখানোর জন্য দান-খয়রাত করে সে মুশরিক হইয়া যায়।”( “ফাযায়েলে আমাল” ৪৪ পৃষ্ঠা)অন্য এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমাইয়াছেন:
“অর্থ: কিযামতের দিন সর্ব প্রথম যে সমস্ত লোকের ফায়সালা শুনানো হইবে, তাহাদের মধ্যে একজন শহীদও হইবে যাহাকে ডাকিয়া আল্লাহ তায়ালা স্বীয় ঐ সমস্ত নেয়ামত স্মরণ করাইবেন যাহা তাহাকে দান করা হইয়াছিল।নেয়ামতসমূহ দেখিয়া সে চিনিতে পারিবে এবং স্বীকার করিবে।তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, এই সকল নেয়ামত দ্বারা তুমি কি করিয়াছ? সে উত্তর করিবে, তোমার সন্তূষ্টি লাভের উদ্দেশ্য জিহাদ করিয়াছি ; এমনকি শহীদ হইয়া গিয়াছি। এরশাদ হইবে তুমি মিথ্যা বলিয়াছ; লোক তোমাকে বীরপুরুষ বলিবে এজন্যই সবকিছু করিয়াছ। সুতরাং তাহা তো বলা হইয়াছে যে উদ্দেশে জিহাদ করা করিয়াছিলে উহা হাসিল হইয়া গিয়াছে। অত:পর তাহাকে হুকুম শুনাইয়া দেওয়া হইবে এবং অধ:মুখী করিয়া জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে। দ্বিতীয় ঐ আলেমও হইবে যে নিজে এলেম শিখিয়াছে, অন্যকে শিখাইয়াছে এবং কুরআন পাক হাসিল করিয়াছে। তাহাকে ডাকিয়া দুনিয়াতে যে সমস্ত নেয়ামত দেওয়া হইয়াছিল স্মরণ করানো হইবে । সে স্বীকার করিবে। অত:পর তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে – এইসব নেয়ামত পাইয়া তুমি কি কাজ করিয়াছ? সে আরজ করিবে তোমাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্য নিজে এলেম শিখিয়াছি , অন্যকে শিখাইয়াছি এবং সন্তুষ্টর জন্য কুরআন পাক হাসিল করিয়াছি। উত্তর হইবে- তুমি মিথ্যা বলিতেছ; বরং রোক তোমাকে আলেম আলেম বলিবে এইজন্য এলেম শিখিয়াছ এবং লোক তোমাকে ক্বারী বলিকবে এইজন্য কোরআন পড়িয়াছ; আর তাহা বলা হইয়াছে( অর্থাৎ শিখা ও শিখানোর যাহা উদ্দেশ্য ছিল তাহা পূর্ণ হইয়া গিয়াছে)। অত:পর তাহাকেও হুকুম শুনাইয়া দেওয়া হইবে এবং অধ:মুখী করিয়া টানিয়া জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হইবে । তৃতীয় ঐ ধনি ব্যক্তিও হইবেন যাহাকে আল্লাহ তায়ালা রিজিকের প্রশস্ততা প্রদা করিয়াছেন সবরকম ধন –সম্পদ দিয়াছেন। তাহাকে ডাকা হইবে এবং নেয়ামত সমূহ স্মরণ করানো হইবে এবং স্বীকারোক্তির পর জিজ্ঞাসা করা হইবে-এই সম্ত ধন-সম্পদ পাইয়া তুমি কি করিয়াছ?এমন কোন উত্তম স্থান নাই যেখানে খরচ করিলে আপনার সন্তুষ্টি লাভ হয় আর আমি খরচ করি নাই ।এরশাদ হইবে তুমি মিথ্যা বলিতেছ; বরং লোক তোমাকে দানশীল বলিবে এইজন্য তুমি এইসব করিয়াছ ।সুতরাং বলা হইয়াছে অত:পর তাহাকেও হুকুম অনুযায়ী জাহান্নামে টানিয়া ফেলিয়া দেওয়া হইবে মিশকাত:মুসলিম) ( “ফাযায়েলে আমাল” ৪০-৪১ পৃষ্ঠা) উপরে বর্ণিত পবিত্র আয়াত শরিফ ও হাদীস শরিফ যা “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে তা থেকে ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে অন্তরে রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব থাকলে অর্থাং এখলাছের সহিত করা না হলে কোন ইবাদতই কবুল হবে না। মূলত মানূষের অন্তরে রিয়া সহ আরও আনেক ব্যধি আছে যেমন:হিংসা, অহংকার, মিথ্যা, গীবত,চোগলখুরী,রাগ,শত্রুতা,দুনিয়ার মহব্বত,মান-সম্মানের মোহ……ইত্যাদি ব্যধি বা বদ গুনাবলী থেকে অন্তরকে মুক্ত করতে না পারলে অর্থাং দিল ইসলাহ না হলে এখলাছ নসীব হবেনা এবং কোন ইবাদতই কবুল হবে না। আর “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের লেখক যে বললেন, মুবাল্লিগ ভাইদের খেদমতে আমার আরজ- তাহারা যেন সর্ব প্রথম নিজেদের জাহেরী ও বাতেনী এসলাহের ফিকির করেন তাহা না হইলে খোদা না করুন এই সমস্ত ভয়াবহ শাস্তির আওতায় পড়িয়া যাইতে হইবে (“ফাযায়েলে আমাল” পৃষ্ঠা ৩৯)। যুগে যুগে অনুসরনীয় আউলিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুসসালাম উনারা কিভাবে দিল ইসলাহ করে এখলাছ অর্জন করেছিলেন ? উনারা কি চিল্লা দেয়ার মাধ্যমে ইসলাহ লাভ করেছিলেন? তাদের এই “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবে এসলাহ প্রাপ্তি প্রসংগে কি বলা হয়েছে? তাহা কি এ ছয় উসূলীদের জানা রয়েছে? এই ছয় উসূলীরা কি দেখাতে পারবে ফাযায়েলে আমাল কিতাবের কোথাও ইসলাহ লাভ করার জন্য চিল্লা দিতে বলা হয়েছে?
জাহের ও বাতেন ইসলাহ করার জন্য প্রয়োজন জাহেরী ও বাতেনী ঊভয় প্রকার এলেম। যেমন: এ প্রসংগে “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৩৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে- “এক হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে , এলেম দুই প্রকার –এক প্রকার যাহা শুধু জবান পর্যন্তই সীমিত থাকে; অন্তরে কোনরূপ আছর করে না, কিয়ামতের দিন এইরূপ এলেম ঐ আলেমের বিরুদ্ধে কঠিন প্রমাণস্বরূপ হইবে।আর দ্বিতীয় প্রকার এলেম যাহা অন্তের আছর করিয়া থাকে এবং ইহাই উপকারী এলেম।
মোটকথা জাহেরী এলেমের সাথে সাথে বাতেনী এলেমও হাসিল করিতে হইবে যাহাতে এলমের গুনে অন্তরও গুনান্বিত হয়।আর যদি এলেম অন্তরে আছর না করে, তবে এই এলেমই কিয়ামতের দিন আলেমের বিরুদ্ধে সাক্ষী ও প্রমাণস্বরূপ হইয়া দাঁড়াইবে এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে যে , তুমি এলেম অনুযায়ী কি আমল করিয়াছ?”
“ফাযায়েলে আমাল” ৩৮৪ পৃষ্ঠায় রয়েছে, “এলেম হইল অন্তরের নূর , চোখের আলো। এলমের কারনেই বান্দা উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিতে পরিনত হয় । দুনিয়া ও আখেরাতের উচ্চ মর্যাদা হাসিল করিয়া লয়।……..নেক লোকদেরকেই এলেমের এলহাম করা হয় ।হতভাগারা উহা হইতে মাহরুম থাকিয়া যায়।”
মূলত, এলহাম-ইলকা দ্বারা প্রাপ্ত এলেমই হচ্ছে বাতেনী এলেম বা ইলমে লাদুন্নী যা অন্তরের নূর । আউলিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম উনারা প্রায় সকলেই এলহাম –ইলকা অর্থাৎ বাতেনী এলেম বা বাতেনী নূর তথা অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী।
“ফাযায়েলে আমাল” ৩৬২-৩৬৩ পৃষ্ঠায় রয়েছে, “আল্লাহ তায়ালা যাহাদেরকে নূর দেখিবার মত চোখ দান করেন তাহারা এই জগতেও উহার চমক দেখিয়া নেয়। আল্লাহর অনেক বান্দা এমন আছেন , যাহারা বুযুর্গদের চেহারার নূর, তাহাদের বাস্সথানের নূর স্বচক্ষে চমকিতে দেখিয়া থাকেন । ……… শায়খ আব্দুল আজিজ দাব্বাগ (রহ: ) কাছাকাছি যুগের এক উম্মি বুযুর্গ ছিলেন। কিন্তু কোরআনের আয়াত, হাদীসে কুদসী, হাদীসে নববী,জাল হাদীস এইসব তিনি ভিন্ন ভিন্ন করিয়া বলিয়া দিতে পারিতেন। তিনি বলিতেন যে বর্ননা কারীর জবান হইতে যখন শব্দ বাহির হয় তখন ঐ শব্দ সমূহকে নূরের দ্বারা বুঝিতে পারি ইহা কাহার কালাম।কেননা আল্লাহর কালাম এবং হুজুরসাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কালামের নূর আলাদা। অন্যদের কালামে এই দুই প্রকার নূর থাকেনা।”
যে প্রসংগে আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে এরশাদ করেন, অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি হাকীকী তাকওয়া এখতিয়ার কর, তবে আল্লাহ পাক তোমাদেরকে ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন, তোমাদের পাপ মোচন করবেন আর তোমাদের ক্ষমা করবেন: আল্লাহ পাক অতিশয় কল্যানময়।( সূরা আনফাল-২৯ )
যিনি বাতেনী নূরের অধিকারী তিনিই পারেন হক-নাহক , সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে, তিনি এলহাম- ইলকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন, তার পক্ষে হকের উপর ইস্তেকামাত থাকা সম্ভব হয়।
আর যিনি বাতেনী নূরের অধিকারী নন এবং এলহাম –ইলকা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নন তিনি হক-নাহক, সত্য-মিথ্যা একাকার করে ফেলেন এবং শয়তানের ধোকায় পতিত হয়ে নাহককে হক ,মিথ্যাকে সত্যরূপে গ্রহণ করে গোমরাহীতে পতিত হন।
এইজন্যই, মালেকী মাযহাবের ইমাম ইমামুল আইম্মা, হযরত ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, -অর্থ:যে ব্যক্তি ইলমে ফিক্বাহ(জাহেরী এলেম) শিক্ষা করলো অথচ ইলমে তাছাউফ( বাতেনী এলেম() শিক্ষা করলো না, সে ব্যক্তি ফাসেক। আর যে ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করলো অথচ ইলমে ফিক্বাহ শিক্ষা করলো না সে যিন্দিক(কাফের)। আর যে ব্যক্তি উভয়টাই অর্জন করলো, সে ব্যক্তি মহাক্কিক।” (“মেরকাত শরীফ )
দিল ইসলাহ বা কলব পরিশুদ্ধ করা ব্যতীত ইলমে তাছাউফ(বাতেনী এলেম) হাসিল করা সম্ভব নয় এবং কোন ইবাদতও এখলাছের সহিত করা সম্ভব নয়; এজন্যই হাদীস শরীফ উনার মধ্যে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য নামায পড়ে সে মুশরিক হইয়া যায় , যে লোক দেখানোর জন্য রোযা রাখে সে মুশরিক হইয়া যায়, যে লোক দেখানোর জন্য দান-খয়রাত করে সে মুশরিক হইয়া যায়।” যে কারনে শহীদ, আলেম ও দানশীল কে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে বলে হাদীস শরীফ উনার বরাতে “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
সেজন্যই লেখক বলেছেন, “মুবাল্লিগ ভাইদের খেদমতে আমার আরজ- তাহারা যেন সর্ব প্রথম নিজেদের জাহেরী ও বাতেনী এসলাহের ফিকির করেন”
এখন দিল ইসলাহ বা বাতেনী এলেম অর্জন ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করার উপায় বা তর্জ –তরীকা সম্পর্কে ফাযায়েলে আমাল কিতাবে যা বলা হয়েছে তা আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
ফাযায়েলে আমাল কিতাবের ৫৫-৫৬ পৃষ্ঠায় রয়েছে,
স্বয়ং আল্লাহ পাক বলেন: অর্থ: হে ঈমানদারগ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।(সূরা তওবা, আয়াত:১১৯)(বয়ানুল কুরআন) মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, সত্যবাদীদের দ্বারা এখানে সূফী মাশায়েখগণকে বুঝানো হইয়াছে। যখন কোন ব্যক্তি তাহাদের খাদেম হইয়া যায় তখন তাহাদের তরবিয়ত ও বুযুর্গীর বদৌলতে সে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছিয়া যায়।শায়খেআকবর (রহ: ) লিখিয়াছেন, যদি তোমার কাজ- কর্ম অপরের ইচ্ছার অধীন না হয়, তবে তুমি সারাজীবন সাধনা করিয়াও মনের খাহেশাত হইতে ফিরিতে পারিবে না। অতএব, যখনই তুমি এমন ব্যক্তি পাইয়া যাও যাহার প্রতি তোমার অন্তরে ভক্তি-শ্রদ্ধা হয়, তখনই তাহার খেদমতে লাগিয়া যাও।তাহার সম্মুখে তুমি মুর্দার মত হইয়া থাক যাহাতে তিনি তোমার ব্যপারে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারেন এবং তোমার ইচ্ছা বলিতে যেন কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। তাহার হুকুম পালনে জলদি কর, তিনি যে জিনিস হইতে নিষেধ করেন উহা হইতে বিরত থাক, তিনি যদি পেশা গ্রহণ করিতে হুকুম করেন তবে গ্রহণ কর কিন্তু ইহা তাহার হুকুমের কারনে গ্রহণ কর; তোমার পছন্দের কারনে নয়, তিনি বসিতে হুকুম করিলে বসিয়া পড়।অতএব ইহা অত্যন্ত জরুরী যে, কামেল শায়েখ তালাশ করিতে তুমি সচেষ্ট হও।তাহা হইলেই তিনি তোমাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছাইয়া দিবেন।”এখানে কি বলা হয়েছে? ( ১ )ইহা অত্যন্ত জরুরী যে, কামেল শায়েখ বা হক্কানী পীর তালাশ করিতে তুমি সচেষ্ট হও। ( ২ ) যখন কোন ব্যক্তি তাহাদের অর্থাৎ কামেল শায়েখ বা হক্কানী ওলীআল্লাহর খাদেম হইয়া যায় তখন তাহাদের তরবিয়ত ও বুযুর্গীর বদৌলতে সে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছিয়া যায়। ( ৩ ) যদি তোমার কাজ- কর্ম অপরের অর্থাৎ কামেল শায়েখ বা হক্কানী ওলীআল্লাহর ইচ্ছার অধীন না হয়, তবে তুমি সারাজীবন সাধনা করিয়াও মনের খাহেশাত হইতে ফিরিতে পারিবে না অর্থাৎ জাহেরী-বাতেনী ইসলাহ লাভ করতে পারবে না । ( ৪ )যখনই তুমি এমন ব্যক্তি(কামেল শায়েখ বা হক্কানী পীর) পাইয়া যাও যাহার প্রতি তোমার অন্তরে ভক্তি-শ্রদ্ধা হয়, তখনই তাহার খেদমতে লাগিয়া যাও।তাহার সম্মুখে তুমি মুর্দার মত হইয়া থাক যাহাতে তিনি তোমার ব্যপারে যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারেন এবং তোমার ইচ্ছা বলিতে যেন কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। তাহার হুকুম পালনে জলদি কর, তিনি যে জিনিস হইতে নিষেধ করেন উহা হইতে বিরত থাক, তিনি যদি পেশা গ্রহণ করিতে হুকুম করেন তবে গ্রহণ কর কিন্তু ইহা তাহার হুকুমের কারনে গ্রহণ কর; তোমার পছন্দের কারনে নয়, তিনি বসিতে হুকুম করিলে বসিয়া পড়। তাহা হইলেই তিনি তোমাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছাইয়া দিবেন।
অর্থাৎ কামেল শায়েখ বা হক্কানী পীরের নিকট বায়াত গ্রহন, উনার ছোহবত এখতিয়ার , উনার খেদমতে সদা মশগুল থেকে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে উনার নির্দেশ মোতাবেক আমল করে উনার ফয়েজে ইত্তেহাদী লাভ করতে পারলেই জাহের-বাতেন ইসলাহ প্রাপ্ত হয়ে আল্লাহ পাক উনার মারেফাত-মহব্বত ও সান্নিধ্য লাভ হবে।
কামেল শায়েখ বা হক্কানী পীর উনার নির্দেশ মোতাবেক আমল করা এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উনাদের দেয়া ছবক অনুযায়ী যিকির করা
এ প্রসঙ্গে “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবে অনেক আলোচনা করা হয়েছে।আমরা সংক্ষিপ্তভাবে কিছু বিষয় আলোচনা করব; পাঠকদের বুঝার জন্য তা-ই যথেষ্ট হবে বলে মনে করি।
যেমন “ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৩০৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে, “অর্থ:তোমরা ভলোভাবে বুঝিয়া লও , আল্লাহ তায়ালার যিকির ( এর মধ্যে এই বৈশিষ্ট আছে যে , ইহার) দ্বারা অন্তর শান্তি লাভ করে।”
এই কিতাবের ৩৩৮ পৃষ্ঠায় রয়েছে, “……আর অন্তর সমূহের ময়লা দূরকারী হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার যিকির । আল্লাহ তায়ালার যিকির অপেক্ষা বড় আর কোন জিনিস আল্লাহর আজাব হইতে রক্ষাকারী নাই।এই হাদীসে যেহেতু দিলের সাফাই বা পরিস্কারের কারন বলা হইয়াছে, ইহা দারাও আল্লাহর যিকির সর্বাপেক্ষা উত্তম প্রমাণিত হয়। এইজন্য প্রত্যেক এবাদত তখনই এবাদত বলিয়া গণ্য হইবে যখন উহা এখলাসের সহিত হইবে। আর এখলাস নির্ভর করে দিল পরিস্কার হওয়ার উপর ।এই কারনেই কোন কোন সূফী বলিয়াছেন,উক্ত হাদীসে যে যিকিরের কথা বলা হইয়াছে উহা দ্বারা “যিকরে ক্বলবী” অর্থাৎ দিলের যিকির উদ্দেশ্য্। জবানের যিকির উদ্দেশ্য নয়। আর দিলের যিকির উহাকে বলে যাহা দ্বারা দিল সবসময়ের জন্য আল্লাহর সহিত জুড়িয়া যায়। আর নি:সন্দেহে এই অবস্থাটি সব এবাদত হইতে উত্তম । যখন কাহারও উহা হাসিল হয়,তখন তাহার কোন এবাদত ছুটিতেই পারে না । কেননা, শরীরের বাহির ও ভিতরের সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিলের অনুগত। দিল যে জিনিসের সহিত জুড়িয়া যায় সমস্ত অঙ্গ – প্রতঙ্গও তাহার সহিত জুড়িয়া যায় ।আল্লাহর আশেকগণের অবস্থা কাহারও অজানা নহে”।
“ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৩৮৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, - “যিকির তাছাউফের মৌলিক বিষয় সমূহের মূল ।ইহা সূফিয়ায়ে কেরামের সকল তরীকায় চলিয়া আসিতেছে ।যিকিরের দরজা যাহার জন্য খুলিয়া গিয়াছে, আল্লাহ পর্যন্ত পৌছিবার দরজাও তাহার জন্য খুলিয়া গিয়াছে আর আল্লাহ পর্যন্ত যে পৌছিয়াছে সে যাহা চায় তাহাই পায় ।কেননা , আল্লাহর দরবারে কোন জিনিসেরই কমি নাই”
এছাড়াও এ কিতাবের ৩৬৬ পৃষ্ঠায় কামেল শায়েখগণ কেন মুরীদকে যিকিরের ছবক দেন তার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,- “…..এইজন্যই সুফিয়াযে কেরাম বেশী বেশী যিকির করাইয়া থাকেন । যাহাতে দিলের মধ্যে তাহার (শয়তানের) কুমন্ত্রনা দেওয়ার সুযোগ না থাকে এবং দিল এমন মজবুত হইয়া যায় যে, শয়তানের মোকাবেলা করিতে পারে । হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গলাভের বরকতে সাহাবায়েকেরামের কলবের শক্তি এত উন্নত ছিল যে, বর্তমান যামানার মত যিকিরের যরব লাগাইবার তাহাদের প্রয়োজন হইত না” ।
“ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৩৮৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,-“(১০) যিকিরের দ্বারা মোরাকাবা নছীব হয় । যাহা যিকিরকারীকে এহছানের স্তরে পৌছাইয়া দেয । এই স্তরে পৌছিতে পারিলে বান্দার এমন এবাদত নছীব হয় যেমন সে আল্লাহকে দেখিতে পাইতেছে ।(এই এহছানের ছেফত অর্জন করাই সূফীগণের জীবনের চরম উদ্দেশ্য।) (১৩)(যিকিরের দ্বারা) আল্লাহর মারেফাতের দরজা খুলিয়া যায়।”
“ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৩৯০ পৃষ্ঠায় রয়েছে- “ (৩৯ )যিকির বিক্ষিপ্তকে একত্র করে একত্রকে বিক্ষিপ্ত করে। দূরবর্তীকে নিকটবর্তী করে এবং নিকটবর্তীকে দুরবর্তী করে । বিক্ষীপ্তকে একত্রিত করার অর্থ হইল , মানুষের বিভিন্ন রকমের যেই আশংকা, চিন্তা –ভাবনা ও পেরেশানী জমিয়া থাকে ,যিকির সেইগুলি দূর করিয়া অন্তরে প্রশান্তি আনিয়া দেয়।
একত্রকে বিক্ষিপ্ত করার অর্থ হইল , মানুষের অন্তরে যে সমস্ত চিন্তা-ফিকির জমা হইয়াছে, যিকির সেইগুলিকে বিক্ষিপ্ত ও ছত্র ভঙ্গ করিয়া দেয়, মানুষের যেই সমস্ত ভুল-চুক ও পাপরাশি একত্র হইয়াছে যিকির সেইগুলিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয় শয়তানের যে সৈন্য বাহিনী মানুষের উপর চাপিয়া বসিয়াছে যিকির উহাকে তাড়িয়া দেয় এবং আখেরাত যাহা দূরে উহাকে নিকটবর্তী করিয়া দেয় আর দুনিয়া যাহা নিকটে উহাকে দূরে সরাইয়া দেয়।”
“ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৩৯১ পৃষ্ঠায় রয়েছে- “যিকিরের দ্বারা আল্লাহ তায়ালার যে সঙ্গ হাসিল হয় উহার তুল্য আর কোন সঙ্গ হইতে পারেনা । উহা না ভাষায় প্রকাশ করা যায় না লিখিয়া প্রকাশ করা যায়। আল্লাহ পাকের সঙ্গ ও সান্নিধ্যের লজ্জত ও স্বাদ সেই ব্যক্তিই বুঝিতে পারে যে উহা লাভ করিয়াছে”।
উক্ত কিতাবের ৩৭৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে, -“……… কাহার জন্য কোন যিকির কখন বেশী উপকারী তাহা অবস্থাভেদে শায়খে কামেল ঠিক করিয়া দিবেন”।
উক্ত কিতাবের ৪১৫-৪১৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, “ সাইয়েদ আলী ইবনে মায়মুন মাগরেবী(রহ: ) এর ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে যে, শায়খ উলওয়ান হামাভী (রহ: ) যিনি একজন বিজ্ঞ আলেম মুফতি ও মুদাররেস ছিলেন ।তিনি যখন সাইয়েদ সাহেবের খেদমতে হাজির হইলেন এবং তাহার প্রতি সাইয়েদ সাহেবের মনোযোগ নিবদ্ধ হইল তখন তিনি তাহার শিক্ষকতা ও ফতওয়া ইত্যাদি সকল কাজ কর্ম বন্ধ করাইয়া তাহাকে সর্বক্ষণের জন্য যিকিরে মশগুল করাইয়া দিলেন ।সাধারণ লোকদের তো কাজই হইল অভিযোগ করা আর গালাগালি দেওয়া । কাজেই লোকেরা খুব হইচই আরম্ভ করিল যে,শায়খের উপকার হইতে দুনিয়fকে বঞ্চিত করিয়া দিয়াছে, শায়খকে ধ্বংস করিয়া দিয়াছে ইত্যাদি ইত্যাদি । কিছুদিন পর সাইয়েদ সাহেব জানিতে পারিলেন শায়খ সাহেব কোন এক সময় কোরআন তেলাওয়াত করেন। সাইয়্যেদ সাহেব ইহাও বন্ধ করিয়া দিলেন । ইহার পর আর বলার অপেক্ষা রাখেনা ; সাইয়্যেদ সাহেবের উপর ধর্মদ্রোহিতা ও ধর্মহীনতার অপবাদ লাগিতে শুরু হইল । কিন্তু অলপ দিনের মধ্যেই শায়খের উপর যিকিরের প্রভাব পড়িল এবং অন্তরে রঙ ধরিয়া গেল । তখন সাইয়্যেদ সাহেব বলিলেন এবার তেলাওয়াত আরম্ভ কর । শায়খ যখন কোরআন পাক খুলিলেন , তখন প্রতিটি শব্দে তিনি এমন এলেম ও মারেফাত দেখতে পাইলেন যাহা বর্ননা করিয়া শেষ করা যায় না” ।
উক্ত কিতাবের ৫৭৫ পৃষ্ঠায় রয়েছে, “হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ: ) আধ্যাত্মিকতার চরম পর্যায়ে পোছার পরও তাহার হাতে তসবীহ দেখিয়া কেহ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন , যে তসবীহের সাহায্যে আমি আল্লাহ পর্যন্ত পোছিয়াছি,উহাকে আমি কি করিয়া ছাড়িতে পারি।
উক্ত কিতাবের ৫৭৬-৫৭৭ পৃষ্ঠায় রয়েছে, মাওলানা আবদুলণ হাই (রহ: ) হইতে উপর পর্যন্ত একের পর এক সকল উস্তাদই তাহার সাগরেদকে একটি করিয়া তসবিহ দান করিয়াছেন এবং উহাতে পড়ার অনুমতি দিয়াছেন । উপরের দিকে এই ধারা হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ: )-এর এক সাগরেদ পর্যন্ত পৌছে । তিনি বলেন আমি আমার উস্তাদ হযরত জুনায়েদ (রহ: )-এর হাতে তসবিহ দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনি এ উচ্চ মর্যাদা লাভের পরও তসবিহ হাতে রাখেন? তিনি বলিলেন আমি আমার উস্তাদ সিররী ছাকতী (রহ: )এর হাতে তসবিহ দেখিয়া এই প্রশ্নই করিয়াছিলাম যাহা তুমি করিলে। তিনি বলিয়াছেন, আমি আমার উস্তাদ মারুফ কারখী (রহ: )-এর হাতে তসবীহ দেখিয়া এই প্রশ্নই করিয়াছিলাম । তিনি বলিলেন, আমি আমার উস্তাদ বিশরে হাফী (রহ: )- এর হাতে তসবীহ দেখিয়া এই প্রশ্নই করিয়াছিলাম।তিনি বলিয়াছিলেন, আমি আমার উস্তাদ (সমস্ত চিশতিয়া মাশায়েখদের সর্দার )হযরত হাসান বসরী (রহ: )-এর হাতে তসবীহ দেখিয়া আরজ করিলাম,আপনি এত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আপনার হাতে তসবীহ রহিয়াছে। তিনি বলিলেন আমি তাছাউফের শুরুতে ইহা দ্বারাই কাজ লইয়াছিলাম এবং ইহা দ্বারাই উন্নতি লাভ করিয়াছিলাম।
“ফাযায়েলে আমাল” কিতাবের ৫৫৮-৫৫৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-
“শায়খ আবু বকর কাত্তানী (রহ: ) বলেন, একবার হজ্জ- মৌসুমে মক্কা মোকাররমায় কিছু সংখক সুফী সাধক সমবেত হইয়াছিলেন।তাহাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সের ছিলেন হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ: )। উক্ত মজলীসে আল্লাহর মহব্বত সম্পর্কে আলোচনা শুরু হইল যে ,আশেক কোন ব্যক্তি?তাহারা বিভিন্ন জনে বিভিন্ন কথা বলিতেছিলেন । হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ: ) চুপ রহিলেন । সকলে তাহাকে বলিলেন, তুমিও কিছু বল।তিনি মাথা নিচু করিয়া কাদিতে কাদিতে বলিলেন , আশেক হইল ঐ ব্যক্তি , যে আমিত্বকে মিটাইয়া দিয়াছে , আল্লাহর যিকিরে আবদ্ধ হইয়া গিয়াছে এবং উহার হক আদায় করে, অন্তর দ্বারা আল্লাহ তায়ালার প্রতি দেখে ।আল্লাহ তায়ালার হায়বতের নূর তাহার অন্তরকে জ্বালাইয়া দিয়াছে।আলাহর যিকির তাহার জন্য সরাবের পেয়ালা স্বরূপ হইয়া যায়্।সে কথা বলিলে তাহা আল্লাহরই কথা হয়; যেন আল্লাহ তায়ালাই তাহার জবান দ্বারা কথা বলেন।নড়া-চড়া করিলে তাহাও আল্লাহরই হুকুমে । শান্তি পাইলে তাহাও আল্লাহরই সঙ্গে। যখন এই অবস্থা হইয়া যায় তখন তাহার খানাপিনা,ঘুম-জাগরণ,কাজ –কর্ম সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হইয়া যায় না দুনিয়ার রসম ও রেওয়াজের প্রতি তাহার কোন লক্ষ্য থাকে, না মানুষের গাল-সন্দ ও ধিক্কারের পরওয়া সে করে।”
উপরের আলোচনা থেকে ইহা অত্যন্ত স্পষ্ট যে,
আল্লাহ তায়ালার যিকির দ্বারা অন্তর শান্তি লাভ করে(৩০৯ পৃষ্ঠা ), অন্তর সমূহের ময়লা দূরকারী হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার যিকির( ৩৩৮ পৃষ্ঠা), দিলের মধ্যে তাহার (শয়তানের) কুমন্ত্রনা দেওয়ার সুযোগ না থাকে এবং দিল এমন মজবুত হইয়া যায় যে, শয়তানের মোকাবেলা করিতে পারে(৩৬৬ পৃষ্ঠা), দিলের যিকির উহাকে বলে যাহা দ্বারা দিল সবসময়ের জন্য আল্লাহর সহিত জুড়িয়া যায়। আর নি:সন্দেহে এই অবস্থাটি সব এবাদত হইতে উত্তম । যখন কাহারও উহা হাসিল হয়,তখন তাহার কোন এবাদত ছুটিতেই পারে না (৩৩৮ পৃষ্ঠা), যিকিরের দরজা যাহার জন্য খুলিয়া গিয়াছে, আল্লাহ পর্যন্ত পৌছিবার দরজাও তাহার জন্য খুলিয়া গিয়াছে আর আল্লাহ পর্যন্ত যে পৌছিয়াছে সে যাহা চায় তাহাই পায় (৩৮৯ পৃষ্ঠা), যিকিরের দ্বারা মোরাকাবা নছীব হয় যাহা যিকিরকারীকে এহছানের স্তরে পৌছাইয়া দেয়- এই স্তরে পৌছিতে পারিলে বান্দার এমন এবাদত নছীব হয় যেমন সে আল্লাহকে দেখিতে পাইতেছে (৩৮৫ পৃষ্ঠা), আল্লাহর মারেফাতের দরজা খুলিয়া যায়(৩৮৫ পৃষ্ঠা), যিকিরের দ্বারা আল্লাহ তায়ালার যে সঙ্গ হাসিল হয় উহার তুল্য আর কোন সঙ্গ হইতে পারেনা । উহা না ভাষায় প্রকাশ করা যায় না লিখিয়া প্রকাশ করা যায়। আল্লাহ পাকের সঙ্গ ও সান্নিধ্যের লজ্জত ও স্বাদ সেই ব্যক্তিই বুঝিতে পারে যে উহা লাভ করিয়াছে (৩৯১ পৃষ্ঠা)। যিকিরের দ্বারাই ইলমে তাছাউফ বা বাতেনী এলেম হাসিল হয় যেমন: তিনি বলিলেন আমি তাছাউফের শুরুতে ইহা( তসবীহ অর্থাৎ যিকির) দ্বারাই কাজ লইয়াছিলাম এবং ইহা দ্বারাই উন্নতি লাভ করিয়াছিলাম(৫৭৭ পৃষ্ঠা)।
অর্থাৎ-যিকির দ্বারা দিল ইসলাহ হয় এবং দিল থেকে রিয়া সহ সমস্ত বদ গুনাবলী দূর হয়,দিলে যিকির জারি হলে শয়তানের সকল প্রকার ওয়াসওয়াসা থেকে বেচে থাকা সম্ভব হয় এবং কাহারও উহা হাসিল হইলে তাহার কোন ইবাদতই ছুটিতে পারেনা;যিকিরের দরজা যাহার খুলিয়া গিয়াছে আল্লাহ পর্যন্ত পৌছিবার দরজাও তাহার জন্য খুলিয়া গিয়াছে, যিকিরের দ্বারা মোরাকাবা নছীব হয় যাহা যিকিরকারীকে এহছানের স্তরে পৌছাইয়া দেয়- এই স্তরে পৌছিতে পারিলে বান্দার এমন এবাদত নছীব হয় যেমন সে আল্লাহকে দেখিতে পাইতেছে এবং ইলমে তাছাউফ বা বাতেনী এলেম হাসি্ল হয় এবং আল্লাহর মারেফাত ও সঙ্গ হাসিল হয় ।
আর যিকির করতে হবে কামেল শায়েখ উনার নির্দেশনা অনুযায়ী যে প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-কাহার জন্য কোন যিকির কখন বেশী উপকারী তাহা অবস্থাভেদে শায়খে কামেল ঠিক করিয়া দিবেন”(৩৭৭ পৃষ্ঠা) ।যেমন : হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রহ: ) বলিলেন, তসবীহের (অর্থ্ৎ যিকিরের) সাহায্যে আমি আল্লাহ পর্যন্ত পোছিয়াছি ।এবং এই যিকির যে তিনি উনার ওস্তাদ বা পীর হযরত সিররী ছাকতী রহমতুল্লাহিআলাইহি উনার নির্দেশনা অনুযায়ী করেছেন তা উপরের লেখাতে অর্থাৎ ফাযায়েলে আমাল কিতাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।আর আল্লাহ পর্যন্ত যদি কেউ পৌছতে পারে তাহলে তাহার কি অবস্থা হয় সে প্রসঙ্গে
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহ বলেন- “আশেক হইল ঐ ব্যক্তি , যে আমিত্বকে মিটাইয়া দিয়াছে , আল্লাহর যিকিরে আবদ্ধ হইয়া গিয়াছে এবং উহার হক আদায় করে, অন্তর দ্বারা আল্লাহ তায়ালার প্রতি দেখে ।আল্লাহ তায়ালার হায়বতের নূর তাহার অন্তরকে জ্বালাইয়া দিয়াছে।আলাহর যিকির তাহার জন্য সরাবের পেয়ালা স্বরূপ হইয়া যায়্।সে কথা বলিলে তাহা আল্লাহরই কথা হয়; যেন আল্লাহ তায়ালাই তাহার জবান দ্বারা কথা বলেন।নড়া-চড়া করিলে তাহাও আল্লাহরই হুকুমে । শান্তি পাইলে তাহাও আল্লাহরই সঙ্গে। যখন এই অবস্থা হইয়া যায় তখন তাহার খানাপিনা,ঘুম-জাগরণ,কাজ –কর্ম সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হইয়া যায়। না দুনিয়ার রসম ও রেওয়াজের প্রতি তাহার কোন লক্ষ্য থাকে, না মানুষের গাল-মন্দ ও ধিক্কারের পরওয়া সে করে।” (“ফাযায়েলে আমাল ৫৫৮-৫৫৯ পৃ: )
সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে আমরা সহজেই পারি যে, ইসলাহ লাভ করতে হলে প্রথমত: জাহেরী ও বাতেনী উভয় প্রকার এলেম হাসিল করা অর্থাৎ জাহেরী তথা শরীয়তের এলেম যেমন ফরজ,ওয়াজিব,সুন্নতে মোয়াক্কাদা,সুন্নতে যায়েদা,হারাম-হালাল,শিরক,বিদাত,কুফরী ইত্যাদি বিষয়গুলোর এলেম এবং বাতেনী এলেম বা ইলমে তাছাউফ হাসিল করা ।দ্বিতীয়ত:কামেল শায়েখ তালাশ করা,বায়াত গ্রহণ,ছোহবত এখতিয়ার,খেদমত করা ও শায়খের সমস্ত আদেশ-নির্দেশ মেনে চলা। তৃতীয়ত: কামেল শায়েখ উনার দেয়া ছবক অনুযায়ী যিকির করা ।
এ প্রসঙ্গে ৫৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে- “যদি তোমার কাজ- কর্ম অপরের ইচ্ছার অধীন না হয়, তবে তুমি সারাজীবন সাধনা করিয়াও মনের খাহেশাত হইতে ফিরিতে পারিবে না।” অর্থাৎ কামেল শায়খের ইচ্ছার অধীন হতে না পারলে সারাজীবন সাধনা করিয়াও ইসলাহ লাভ করা যাবেনা।যার দৃষ্টান্ত তাদের ফাযায়েলে আমাল কিতাবেই রয়েছে-যেমন: শায়খ উলওয়ান হামাভী (রহ: ) তিনি সাইয়েদ আলী ইবনে মায়মুন মাগরেবী(রহ: ) এর নিকট বায়াত গ্রহন করে উনার নির্দেশ মোতাবেক যিকির করে ইসলাহ লাভ করেই আল্লাহর মারেফাত মহব্বত হাসিল করেছেন(৪১৫-৪১৬ পৃষ্ঠা)।, মাওলানা আবদুলণ হাই (রহ: ) হইতে (সমস্ত চিশতিয়া মাশায়েখদের সর্দার )হযরত হাসান বসরী (রহ: ) পর্যন্ত সকল আউলিয়ায়ে কেরাম রহমতুল্লাহ উনারা সকলেই কামেল শায়েখের নিকট বায়াত হয়ে উনাদের আদেশ-নির্দেশ মোতাবেক আমল ও যিকির করে ইসলাহ লাভ করেই ইলমে তাছাউফ বা বাতেনী এলেম হাসিল করেছিলেন এবং আল্লাহ পর্যন্ত পৌছেছিলেন এবং আল্লাহ পর্যন্ত যে পৌছেছে তার সম্পর্কে হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহ বলেন-“সে কথা বলিলে তাহা আল্লাহরই কথা হয়; যেন আল্লাহ তায়ালাই তাহার জবান দ্বারা কথা বলেন।নড়া-চড়া করিলে তাহাও আল্লাহরই হুকুমে । শান্তি পাইলে তাহাও আল্লাহরই সঙ্গে। যখন এই অবস্থা হইয়া যায় তখন তাহার খানাপিনা,ঘুম-জাগরণ,কাজ –কর্ম সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হইয়া যায়। না দুনিয়ার রসম ও রেওয়াজের প্রতি তাহার কোন লক্ষ্য থাকে, না মানুষের গাল-মন্দ ও ধিক্কারের পরওয়া সে করে।”
আল্লাহ পর্যন্ত পৌছার পর আর কি বাকি থাকে?
আউলিয়ায়ে কেরাম রহমতুল্লাহ আলাইহিমগণ উনারা সকলেই কামেল শায়েখের মাধ্যম দিয়েই আল্লাহ পর্যন্ত পৌছেছেন।
এছলাহ লাভ করার জন্য অনুসরনীয় আউলিয়ায়ে কেরাম রহমতুল্লাহ আলাইহিম উনাদের পথই অনুসরন করতে হবে সে প্রসঙ্গে ছয় উসূলীদের গুরু ইলিয়াস সাহেব নিজেই বলেন-“আমাদের এই তবলীগের সিলসিলার উছুল হইল এই যে, স্বাধীনভাবে ও নিজের মনমত না চলা ।বরং নিজেকে ঐসমস্ত বুজুর্গের পরামর্শ অনুযায়ী চালু করা যাহাদের উপর আমাদের পূর্ববর্তী বুজুর্গরা বিশ্বাস ও আস্থা জ্ঞাপন করিয়া গিয়াছেন এবং যাহাদের আল্লাহর সাথে খাছ সম্পর্ক রহিয়াছে।”
আল্লাহপাক উনার সাথে খাছ সম্পর্ক রহিয়াছে এমন বুজুর্গ যেমন হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমতুল্লাহ, হযরত হাসান বসরী রহমতুল্লাহ,হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমতুল্লাহ,হযরত সিররী ছাকতী রহমতুল্লাহ, হযরত মারুফ কারখী রহমতুল্লাহ, বিশরে হাফী রহমতুল্লাহ,ইমাম গাজ্জালি রহমতুল্লাহ,ইমাম জাওযী রহমতুল্লাহ,মুজাদ্দিদে আলফেসানী রহমতুল্লাহ,বায়েজিদ বোস্তমি রহমতূল্লহ সহ আরও অনেক ওলীআল্লাহ যাদের আলোচনা তাদের ফাযায়েলে আমাল কিতাবে করা হয়েছে উনারা কিভাবে ইসলাহ হাসিল করেছিলেন,কিভাবে আল্লাহর সহিত খাছ সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন? উনারা কি চিল্লা দেয়ার মাধ্যম ইসলাহ লাভ করেছিলেন এবং চিল্লা দিয়ে ইসলাহ লাভ করতে বলেছেন? মূলত উনারা সকলেই কামেল শায়েখের নিকট বায়াত হয়ে ছোহবত এখতিয়ার করত উনাদের খেদমতে মশগুল থেকে উনাদের নির্দেশ মোতাবেক যিকির ও অন্যান্য আমল করেই ইসলাহ হাসিল করে আল্লাহর মারেফাত-মহব্বত ও নৈকট্য-সন্তুষ্টি হাসিল তথা ওলীআল্লাহ হয়েছিলেন এবং পরবর্তীদেরকেও একই পথ অবলম্বন করে আল্লাহ পাক উনার মারেফাত-মহব্বত অর্জন করার জন্য নিজেদের কিতাবে বলেছেন।
তাহলে বলতে হয় - ছয় উসূলীদের ফাযায়েলে আমাল কিতাবে ইসলাহ লাভ করার যে উপায় বলা হয়েছে সে সম্পর্কে তাদের কোন এলেম নেই এবং সেই মোতাবেক তাদের কোন আমলও নেই।
তাই তাদের কিতাবের ভাষায় বলতে হয়-
“অর্থাৎ হে আরাবী!আমার ভয় হয় তুমি কাবা শরীফে পৌছিতে পারিবে না। কেননা, তুমি যে পথ ধরিয়াছ উহা তুর্কিস্তানের পথ।”( ফাযায়েলে আমাল ৬৩৫ পৃষ্ঠা)
মূলত: এই ছয় উসূলীরা ইসলাহের পথ নয় , গোমরাহীর পথেই চলছে, এ পথে যত চলবে গোমরাহী ততই বৃদ্ধি পাবে।
ইনশাআল্লাহ চলবে…………………..
ডাঃ মারুফ
dr.mubashshir12