বাংলাদেশে হিন্দুয়ানী ফিতনার সাথে সাথে একটি ফিতনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। আর এই ফিতনার নাম হল “ঈসায়ী মুসলিম” বা ইংরেজিতে “Je suis Muslim” নামে পরিচিত। বেশ কয়েক বছর আগে একটি পত্রিকা বিক্রয় কেন্দ্রের এক বিক্রেতা আমাকে জানালো তাদের কাছে কিছু শাদা চামড়ার লোক কিছু ইসলামী কিতাব ফ্রি বিক্রি করার জন্য দিয়ে যায়। কিন্তু তারা পরে দেখতে পায় এই কিতাব গুলো ইসলাম নিয়ে উল্টা পাল্টা লিখা। আমি বিষয়টি আমাদের একজন ভাই কে বলতে তিনি আমাকে জানালেন যে কিছুদিন আগে সিলেটের কোন একটি অঞ্চলে বেশকিছু মসজিদের মাওলানা ধরা পড়ে জারা ঈসায়ী মুসলিম নামে একটি নতুন ধর্ম প্রচার করছিল। কিন্তু বিষয়টি ফাঁশ হয়ে জাওয়ার পরে তারা সটকে পড়ে। আমি ধারণা করেছিলাম বিষয়টি হয়তো বেশিদূর এগুবেনা কিন্তু যখন জানতে পারলাম অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে ৩০-৩৫ জন মাওলানা বাংলাদেশের কোন এক সচিব এর তত্বাবধানে ইন্দোনেশিয়া যায় এবং সেখান থেকে ব্যাপক আর্থিক ভাবে বেনিফিটেড হয়ে তারা বাংলাদেশে ঈসায়ী মুসলিম আক্বীদা প্রচারে সম্মত হয়। তাদের এই বিষয়টি ও ফাঁশ হয়ে পড়ে জখন তারা ঈসায়ী মুসলিম আক্বীদার কিতাব গুলো মাদ্রাসায় পড়াতে যায় ও বিলি করতে যায়। আমার মাথায় তখন চিন্তা আশে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিষ্টানরা বিভিন্ন মিশনারির ও এনজিওর মাধ্যমে তাদের ধর্ম প্রচার করতে করতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা এখন আলাদা রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে বিভোর। অন্যদিকে আমাদের দেশে তাদের এই খ্রিষ্টানিজমকে গিলাতে মুসলমান দের ফ্লেক্সিবল করার জন্য আন্তঃধর্মীয় আলোচনার নামে সর্ব ধর্মের লোকদের একসাথে করে বলছে মানবতার ধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। এই ফিতনা থেকে বাচতে পারছেনা স্বয়ং আমাদের জাতীয় মসজিদের ইমামও। তাই এই ফিতনা থেকে বাচার জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস স্বরূপ “কিতাবুল মোকাদ্দস, ইঞ্জিল শরীফ শরীফ ও ঈসায়ী ধর্ম” নামক কিতাব আপনাদের কাছে তুলে ধরছি। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে সকল প্রকার ফিতনা থেকে বেচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন!
_________________________________________
পূর্বের প্রকাশ:
ঈসায়ী মুসলিম (একটি ফিতনা) থেকে সাবধান মুসলমান! ০১
ঈসায়ী মুসলিম (একটি ফিতনা) থেকে সাবধান মুসলমান! ০২
ঈসায়ী মুসলিম (একটি ফিতনা) থেকে সাবধান মুসলমান! ০৩
ঈসায়ী মুসলিম (একটি ফিতনা) থেকে সাবধান মুসলমান! ০৪
ঈসায়ী মুসলিম (একটি ফিতনা) থেকে সাবধান মুসলমান! ০৫
ঈসায়ী মুসলিম (একটি ফিতনা) থেকে সাবধান মুসলমান! ০৬
_________________________________________
৪. ঈসা মাসীহের ধর্ম ও সাধু পলের ধর্মের মধ্যে তুলনা
৪. ১. শরীয়ত পালন অথবা শরীয়ত লঙ্ঘন
ঈসায়ী ধর্ম ও পলীয় ধর্মের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য শরীয়ত পালন। ঈসা মাসীহ কঠোরভাবে শরীয়ত পালন করতেন, করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং শরীয়ত পালন ছাড়া মুক্তি পাওয়া যাবে না বলে প্রচার করেছেন। পক্ষান্তরে দ্রুত অধিক সংখ্যক অনুসরী যোগাড় করার লক্ষ্যে সাধু পল শরীয়ত বর্জন করতে উৎসাহ দেন এবং শরীয়ত পালনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে সকল পাপাচারের পথ উন্মুক্ত করে দেন। শরীয়তের বিরুদ্ধে তাঁর অনেক ঘৃণ্য বক্তব্য রয়েছে। ইঞ্জিল শরীফ উনার মধ্যে বিদ্যমান প্রেরিত পুস্তকটি এবং পরবর্তী পত্রগুলি পাঠ করলে পাঠক দেখবেন যে, তাঁর এ সকল বক্তব্য হাওয়ারী ও প্রকৃত খৃস্টানদের (Judio Christians) মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ তৈরি করে। তাঁরা তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তিনিও হাওয়ারীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ও অপপ্রচার করতে থাকেন। ফিলিস্তিন ও পার্শবতী এলাকার শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে ভাল ফল না পেয়ে তিনি দ্রুত এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের গ্রীক-রোমান পৌত্তলিকদের মধ্যে তাঁর শরীয়তমুক্ত মারফতী ধর্মের দাওয়াত দিতে থাকেন। হাওয়ারী ও শরীয়ত পালনকারী খৃস্টানদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণের জন্য তিনি অতিভক্তিমূলক অনেক নতুন নতুন আকীদা আবিষ্কার করেন। যেহেতু নতুন আকীদাও তাদের পুরাতন পৌত্তলিক আকীদার মতই এবং নতুন কোনো বিধিবিধান মানতে হবে না, শুধু বিশ্বাসই যথেষ্ট, সেহেতু দলে দলে মুর্খ ও পাপ-প্রেমিক মানুষেরা তার মুরিদ হতে লাগলেন।
‘ব্যবস্থা’ বা ‘শরীয়তের’ বিরুদ্ধে সাধু পলের দার্শনিক ও ‘মারফতী” বক্তব্য অনেক। মন শুদ্ধ হলেই হলো। নামায বা শরীয়ত তো বিশ্বাস ঠিক করার জন্য; বিশ্বাস ঠিক হলে আর কিছুই লাগে না। শরীয়তই পাপ করো না বলে পাপের কথা মনে করিয়ে দেয়; শরীয়ত তুলে দিলে আর পাপ থাকবে না!!! ইত্যাদি। সাধুর কয়েকটি বচন শুনুন:
“শরীয়ত পালনের জন্য আল্লাহ্ মানুষকে ধার্মিক বলে গ্রহণ করেন না, বরং ঈসা মসীহের উপর ঈমানের জন্যই তা করেন। ... শরীয়ত পালন করবার ফলে কাউকেই ধার্মিক বলে গ্রহণ করা হবে না।” (গালাতীয় ২/১৬) “ব্যবস্থার কার্য ব্যতিরেকে বিশ্বাস দ্বারাই মনুষ্য ধার্মিক গণিত হয়” (রোমীয় ৩/২৮। পুনশ্চ রোমীয় ১০/১০)। “ব্যবস্থা খৃস্টের কাছে আনিবার জন্য আমাদের স্কুল মাস্টার (our schoolmaster) যেন আমরা বিশ্বাস হেতু ধার্মিক গণিত হই।” (গালাতীয় ৩/২৪)। “শাস্ত্র সকলই পাপের অধীনতায় রুদ্ধ (the scripture hath concluded all under sin) (গালাতীয় ৩/২২)। “ব্যবস্থার কার্য দ্বারা কোন প্রাণী তাঁহার সাক্ষাতে ধার্মিক গণিত হইবে না; কেননা ব্যবস্থা দ্বারা পাপের জ্ঞান জন্মে” (রোমীয় ৩/২০)। “বাস্তবিক যাহারা ব্যবস্থার (শরীয়তের) ক্রিয়াবলম্বী, তাহারা সকলে শাপের অধীন।” (গালাতীয় ৩/১০-১৩)।
তাহলে শুধু মনের বিশ্বাস ও মুখের স্বীকারোক্তি মুক্তির জন্য যথেষ্ট, শরীয়ত শুধু বিশ্বাস পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। শরীয়ত সকলকে পাপের মধ্যে আবদ্ধ করে, শরীয়তই পাপের উৎস, শরীয়ত পালন করে কেউ ধার্মিক হতে পারে না; বরং পাপী ও অভিশপ্ত হয়। অর্থাৎ ঈসা মাসীহ -সহ সকল নবী ও তাঁদের অনুসারীরা পাপী ও অভিশপ্ত!
তিনি দাবি করেন যে, শরীয়তই সকল শত্রুতা ও হানাহানির কারণ এবং যীশু শরীয়ত বিলোপ করতে এসেছিলেন: “শত্রুতাকে, অর্থাৎ বিধিবদ্ধ আজ্ঞাকলারূপ ব্যবস্থাকে, নিজ মাংসে লুপ্ত করিয়াছেন (abolished in his flesh the enmity, even the law of commandments contained in ordinances)।” (ইফিষীয় ২/১৫)
বিধিবদ্ধ আজ্ঞা বা শরীয়ত কী? শির্ক করিও না, ব্যভিচার করিও না, হত্যা করিও না... । পলীয় খৃস্টধর্মে এগুলি মান্য করা পাপ ও অভিশাপ! তাহলে শির্ক করা, ব্যভিচার করা, হত্যা করা... ইত্যাদিই পাপ ও অভিশাপ থেকে মুক্তির উপায়!
মাসীহের বক্তব্য সাধুর বচনের সাথে সাংঘর্ষিক। শুধু বিশ্বাসে মুক্তি মিলবে তা কখনোই মাসীহ বলেন নি। শত বিশ্বাস থাকলেও সামান্যতম শরীয়ত লঙ্ঘন করলে জান্নাত মিলবে না বলে তিনি প্রচার করেছেন। তিনি বলেন: “মনে করো না আমি তৌরাত কিতাব আর নবীদের কিতাব বাতিল করতে এসেছি। আমি সেগুলো বাতিল করতে আসি নি বরং পূর্ণ করতে এসেছি। ... মূসার শরীয়তের মধ্যে ছোট একটা হুকুমও যে কেউ অমান্য করে এবং লোককে তা অমান্য করতে শিক্ষা দেয় তাকে বেহেশতী রাজ্যে সবচেয়ে ছোট বলা হবে। কিন্তু যে কেউ শরীয়তের হুকুমগুলো পালন করে ও শিক্ষা দেয় তাকে বেহেশতী রাজ্যে বড় বলা হবে। আমি তোমাদের বলছি, আলেম ও ফরীশীদের ধার্মিকতার চেয়ে তোমাদের যদি বেশী কিছু না থাকে তবে তোমরা কোনমতেই বেহেশতী রাজ্যে ঢুকতে পারবে না।” (মথি ৫/১৭-২০)
সাধু পলের দাবি: যীশু শরীয়ত লোপ করতে এসেছিলেন। কিন্তু যীশু বললেন তিনি লোপ করতে নয়, পূর্ণ করতে এসেছিলেন। সাধু পল বললেন, শরীয়ত পালনকারী পাপী ও অভিশপ্ত। আর যীশু বললেন শরীয়তের ক্ষুদ্রতম বিধান লঙ্ঘনকারী পাপী ও অভিশপ্ত। খৃস্টান দের প্রতি সবিনয় প্রশ্ন: আপনি কাকে বিশ্বাস ও মান্য করবেন?
মাসীহ বলেন: “যারা আমাকে ‘প্রভু প্রভু’ বলে তারা প্রত্যেকে যে বেহেশতী রাজ্যে ঢুকতে পারবে তা নয়। কিন্তু আমার বেহেশতী পিতার ইচ্ছা যে পালন করে সে-ই ঢুকতে পারবে। সেই দিন অনেকে আমাকে বলবে, ‘প্রভু প্রভু, তোমার নামে কি আমরা নবী হিসাবে কথা বলি নি? তোমার নামে কি ভূত ছাড়াই নি? তোমার নামে কি অনেক অলৌকিক কাজ করি নি? তখন আমি সোজাসুজিই তাদের বলব ‘আমি তোমাদের চিনি না। দুষ্টের দল! (হে অধর্মচারীরা: ye that work iniquity) আমার কাছ থেকে তোমরা দূর হও।’ (মথি ৭/২১-২৩)।
যারা তাকে ‘হে প্রভু হে প্রভু’ বলেন তারা অবশ্যই তাকে অন্তরে বিশ্বাস করেছেন এবং মুখে এভাবে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। উপরন্তু তার নামে পবিত্রআত্মার প্রেরণা লাভের দাবি করেছেন, ধর্মপ্রচার করেছেন এবং কারামতি দেখিয়েছেন। কিন্তু তারপরও তারা জান্নাত লাভ করবেন না; কারণ শত বিশ্বাস ও অতিভক্তি সত্ত্বেও যদি আল্লাহর শরীয়ত পালন বা “ধর্মাচারণ” না থাকে তাহলে মুক্তি মিলবে না।
ঈসা মাসীহ বারংবার বলেছেন যে, আজ্ঞা, বিধান বা শরীয়ত পালনই জান্নাতের একমাত্র পথ। “যে কেহ আমার এই সকল বাক্য শুনিয়া পালন করে... বুদ্ধিমান..। আর যে কেহ আমার এই সকল বাক্য শুনিয়া পালন না করে.. নির্বোধ (মথি ৭/২৪, ২৬)। “এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাকে বলিল, ... অনন্ত (আখেরী) জীবন পাইবার জন্য আমি কিরূপ সৎকর্ম করিব? তিনি তাহাকে কহিলেন: ... তুমি যদি (আখেরী) জীবনে প্রবেশ করিতে ইচ্ছা কর তবে আজ্ঞা সকল পালন কর (মথি ১৯/১৬-১৭; লূক ১৮/১৮-১৯)
সাধু পল যীশুর এ সকল বক্তব্য প্রচারকারীদেরকে অভিশপ্ত বলে ঘোষণা করেছেন; কারণ তারা তার ইঞ্জিল শরীফ উনার বিপরীত ইঞ্জিল শরীফ প্রচার করেন (গালাতীয় ১/৮-৯)। এরপরও যীশুর অনেক বক্তব্য মানুষদের কাছে পৌঁছাত। এজন্য তিনি ও তাঁর অনুসারীরা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেন। যেমন, তিনি ইয়াহূদীদের ভয়ে বা মানুষে বুঝবে না বলে এগুলি বলেছিলেন। এভাবেই তাঁরা ঈসা মাসীহকে বুঝাতে অক্ষম বা মুনাফিক হিসেবে চিত্রিত করেন (নাউযূ বিল্লাহ)। এমনকি সাধু পল যীশুর শিক্ষাকে প্রাথমিক, আদিম ও পূর্ণতার পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন: “(RSV: let us leave the elementrary doctrine (teachings) of Christ and go on to maturity): অতএব আইস, আমরা খৃস্টের আদিম-প্রাথমিক নীতিমালা (শিক্ষা) পশ্চাতে ফেলিয়া পরিপক্কতার দিকে ধাবিত হই।” (ইব্রীয় ৬/১, বাংলা অনুবাদে কারসাজি বিদ্যমান)
ঈসা মাসীহের শিক্ষা প্রাথমিক ও অপরিপক্ক! তাঁর শিক্ষা প্রাইমারি আর পলের শিক্ষা হাইস্কুল! অবশ্য ত্রিত্ববাদীদের জন্য মাসীহের শিক্ষাকে অপরিপক্ক বলা ছাড়া উপায়ও নেই। তাদের ধর্মের একটি আকীদাও মাসীহের শিক্ষার মধ্যে সুস্পষ্ট নেই। কাজেই তাকে অপূর্ণ এবং সাধু পলকে পূর্ণ বলা ছাড়া তাদের উপায় নেই।
৪.২. একত্ববাদ বনাম ত্রিত্ববাদ
আগেই বলেছি যে, প্রেরিত পুস্তকটি ও পরবর্তী পত্রগুলি থেকে জানা যায় যে, সাধু পলের এ মতবাদ হাওয়ারী এবং শরীয়ত পালনকারী খৃস্টানদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে। আত্মরক্ষার জন্য তিনি অতিভক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেন। এতকাল সকলেই জানত যে বিশ্বাস ও শরীয়ত পালনের মাধ্যমেই মানুষ নাজাত পায়। এখন তিনি বলছেন শরীয়ত পালন মুক্তির পথে প্রতিবন্ধক। এটি প্রমাণের জন্য তিনি বললেন: যীশু তো আর সাধারণ কোনো নবী নন; যে তাকে হত্যা করাতে শুধু হত্যাকারীদের পাপ হয়েছে। বরং তিনি ঈশ্বর; তিনি ক্রুশে মরে সকলের পাপ মোচন করেছেন। কাজেই শরীয়ত পালনের আর প্রয়োজন নেই। তিনি প্রচার করতে থাকেন: “ব্যবস্থা (শরীয়ত) দ্বারা যদি ধার্মিকতা হয়, তাহা হইলে খৃস্ট অকারণে মরিলেন” (গালাতীয় ২/২১)। তিনি বলেন: “খৃস্ট যীশুতে জীবনের আত্মার যে ব্যবস্থা, তাহা আমাদেরকে পাপের ও মৃত্যুর ব্যবস্থা (শরীয়ত) হইতে মুক্ত করিয়াছে (রোমীয় ৮/২) অর্থাৎ শরীয়ত আছে বলেই পাপ এবং পাপ আছে বলেই অনন্ত মৃত্যু বা নরকবাস। যীশুতে বিশ্বাস করলে আর শরীয়ত থাকে না; আর শরীয়ত না থাকলে তো কোনো কিছুই আর পাপ বলে গণ্য হবে না।
সাধু পলের এ উদ্ভাবন সফল হয়েছিল। এ অতিভক্তির আকীদা তাকে ও তাঁর মতবাদকে চিরস্থায়ী করে; নইলে হাওয়ারী ও শরীয়তপন্থীদের প্রতিরোধে তার মতবাদ বিলুপ্ত হয়ে যেত। যেভাবে আমাদের সমাজে শরীয়ত-মুক্ত তরিকত-মারিফত পন্থীগণ সর্বদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ওলীগণের প্রতি অতিভক্তি প্রকাশ করেন এবং শরীয়ত-পন্থীদেরকে বেয়াদব বানিয়ে সাধারণ মানুষদের সমর্থন লাভ করেন ও টিকে থাকেন।
সাধু পলের উদ্ভাবিত ‘অতিভক্তির’ মূল বিষয় ত্রিত্ববাদ। মাসীহ আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস এবং প্রচার করতেন। তিনি হিব্রু ভাষার রীতিতে ইয়াহূদী নবীগণ ও সকল ইয়াহূদীর মতই ‘রব্ব’ অর্থে আল্লাহকে পিতা বলতেন। তিনি সর্বদা বলেছেন, পিতাই একমাত্র ঈশ্বর। পিতার পাশাপাশি পুত্র ও পবিত্র আত্মাও ঈশ্বর-এ কথা ঘুণাক্ষরেও তিনি বলেন নি। পক্ষান্তরে সাধু পলের ধর্মের মূল বিশ্বাস যে, আল্লাহ তিনজন সম্পূর্ণ পৃথক ব্যক্তি। এরূপ জঘন্য কথা ঈসা মাসীহ কখনোই বলেন নি।
মার্ক ১২/২৮-৩৪: “একজন আলেম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তৌরাত শরীফের মধ্যে সবচেয়ে দরকারী হুকুম কোনটা’? জবাবে ঈসা আলাইহি সালাম বললেন, ‘সবচেয়ে দরকারী হুকুম হল, বনি-ইস্রাইলরা, শোন, আমাদের মাবুদ আল্লাহ্ এক। তোমরা প্রত্যেকে তোমাদের সমস্ত দিল, সমস্ত প্রাণ, সমস্ত মন এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমাদের মাবুদ আল্লাহকে মহব্বত করবে। তার পরের দরকারী হুকুম হল এই, ‘তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মত মহব্বত করবে’। এই দু‘টা হুকুমের চেয়ে বড় হুকুম আর কিছুই নেই”। তখন সেই আলেম বললেন, “... আপনি সত্যি কথাই বলেছেন যে, আল্লাহ্ এক এবং তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। আর সমস্ত দিল, সমস্ত বুদ্ধি ও সমস্ত শক্তি দিয়ে তাঁকে মহববত করা এবং প্রতিবেশীকে নিজের মত মহববত করা পশু ও অন্য সব কোরবানীর চেয়ে অনেক বেশী দরকারী”। ঈসা আলাইহি সালাম যখন দেখলেন সেই আলেমটি খুব বুদ্ধিমানের মত জবাব দিয়েছেন তখন তিনি তাঁকে বললেন “আল্লাহর রাজ্য থেকে আপনি বেশী দূরে নন”।
সাধু পলের অনুসারীরা বলেন, আল্লাহকে একমাত্র মাবূদ বলে বিশ্বাস করলেও নাজাত হবে না; বরং ত্রিত্বে, যীশুর ঈশ্বরত্বে ও যীশুর রক্তের মাধ্যমে পাপমোচনে বিশ্বাস করতে হবে। যদি ত্রিত্ববাদী এ আকীদা সঠিক হতো, তবে নিশ্চয়ই ভাববাদীগণের গ্রন্থে প্রথম আজ্ঞা হিসেবে সুস্পষ্টরূপে তা উল্লেখ করা হতো এবং যীশু বলতেন: ‘প্রথম আজ্ঞাটি এই, ‘ঈশ্বর প্রভু এক, যিনি তিনটি প্রকৃত ও সম্পূর্ণ পৃথক সত্তার সমন্বয় এবং আমিই ঈশ্বরের দ্বিতীয় ব্যক্তি ও ঈশ্বরের পুত্র।’ যেহেতু যীশু তা বলেন নি এবং কোনো নবীর পুস্তকে বা ইঞ্জিলেও তা বলা হয় নি, সেহেতু আমরা সুনিশ্চিতরূপে জানতে পারছি যে, সাধু পলের খৃস্টধর্ম একটি ভ্রান্ত মতবাদ।
আরো লক্ষণীয় যে, এ অধ্যাপক ত্রিত্বে বিশ্বাস করতেন না। উপরন্তু কেউ ত্রিত্বের কথা বললে বা যীশু নিজেকে ঈশ্বরের এক অংশ বলে দাবি করলে তাকে নির্দ্বিধায় হত্যা করতেন। অথচ যীশু সুস্পষ্ট উক্ত অধ্যাপককে জান্নাতী বললেন।
সাধু পলের অনুসারীরা বলেন, ইয়াহূদীদের ভয়ে বা মানুষেরা বুঝবে না বলে যীশু মিথ্যা বলেছিলেন! তাঁরা নিজেদের মিথ্যাচার বৈধ করতে তাঁকে অপারগ ও মুনাফিক রূপে চিত্রিত করেন। সত্য বুঝানোর ক্ষমতা ও সাহস পলের ছিল কিন্তু যীশুর ছিল না!
আল্লাহর কাছে মুনাজাতে যীশু বলেন: “আর ইহাই অনন্ত জীবন যে, তাহারা তোমাকে, একমাত্র সত্যময় ঈশ্বরকে এবং তুমি যাঁহাকে পাঠাইয়াছ, তাঁহাকে, যীশু খ্রীষ্টকে, জানিতে পায়। (And this is life eternal, that they might know thee the only true God, and Jesus Christ, whom thou hast sent.)” (যোহন ১৭/৩)
এ কথাটি তিনি একান্তে আল্লাহর সাথে বলেছেন; কাজেই ইয়াহূদীদের ভয়ে বা কেউ বুঝবে না বলে দাবি করার সুযোগ নেই। এখানেও তিনি বলছেন যে, জান্নাত লাভ করতে বিশ্বাস করতে হবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই এবং ঈসা মাসীহ তাঁর প্রেরিত অর্থাৎ রাসূল। ঈশ্বরের ত্রিত্বে বিশ্বাস করা, আদি পাপ বা পাপ মোচনে বিশ্বাস করা ... ইত্যাদি কিছুই জান্নাত লাভের শর্ত নয়। একটিবারের জন্য গোপন মুনাজাতেও তিনি বললেন না যে, ‘ইহাই অনন্ত জীবন যে, তাহারা জানিবে তোমার সত্ত্বা তিনটি সম্পূর্ণ পৃথক সত্ত্বার সমন্বয় এবং ঈসা মাসীহ মনুষ্য ও ঈশ্বর বা মাংসে প্রকাশিত ঈশ্বর।’ পক্ষান্তরে পলীয় ধর্মের বিশ্বাস হলো কেউ যদি যীশুর উপরের কথাটি সর্বান্তকরণে ও আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস করার কথা এক কোটি বার ঘোষণা করে, কিন্তু স্পষ্টভাবে ত্রিত্ববাদের ঘোষণা না দেয় তবে কাফির (heretic)। তাকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা (Inquisition) খৃস্টধর্মের সুপরিচিত বিধান।
৪. ৩. ঈসা মাসীহ আল্লাহর রাসূল অথবা আল্লাহর অবতার
উপরের বক্তব্যে ঈসা মাসীহ বললেন যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত, অর্থাৎ রাসূল। অন্যত্র তিনি বলেন: “আর পৃথিবীতে কাহাকেও ‘পিতা’ বলিয়া সম্বোধন করিও না, কারণ তোমাদের পিতা এক জন, তিনি সেই স্বর্গীয়। তোমরা ‘আচার্য’ বলিয়া সম্ভাষিত হইও না, কারণ তোমাদের আচার্য এক জন, তিনি খ্রীষ্ট।” (মথি ২৩/৯-১০)
এ কথারও একই অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই এবং ঈসা তাঁর রাসূল, যাকে একমাত্র আচার্য বা শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অথচ পলীয় ধর্মে তাঁকে আচার্য, উস্তাদ বা রাসূল মানলে নাজাত তো দূরের কথা অনন্ত জাহান্নাম ছাড়া কিছুই মিলবে না। নাজাত লাভ করতে তাঁকে ঈশ্বরের অবতার ও মানবদেহধারী ঈশ্বর বলে বিশ্বাস করতে হবে (যোহন ১/১, ১৪: ১ তিমথীয় ৩/১৬)।
উল্লেখ্য যে, প্রচলিত ইঞ্জিল শরীফ উনার মধ্যে ঈসা মাসীহ বারংবার নিজেকে আল্লাহর নবী (prophet) বলে ঘোষণা করেছেন। (মার্ক ৬/৩-৬; লূক ১৩/৩৩)
৪. ৪. আল্লাহই একমাত্র পিতা? না সাধু পল একমাত্র পিতা?
ঈসা মাসীহ উপরের বক্তব্যে বলেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া কাউকে পিতা বলা যাবে না। কিন্তু সাধু পল বলেন, তিনিই উম্মাতের একমাত্র পিতা: “মসীহের বিষয়ে শিক্ষা দিবার লোক হয়ত তোমাদের অনেক হইতে পারে, কিন্তু পিতা তোমাদের অনেক নাই; আমিই সুখবরের মধ্য দিয়া মাসীহী জীবনে তোমাদের পিতা হইয়াছি। (have ye not many fathers: for in Christ Jesus I have begotten you through the gospel) (১-করিন্থীয় ৪/১৫)
৪. ৫. যীশু আল্লাহর বান্দা পুত্র? না ঈশ্বরত্বে আল্লাহর সমকক্ষ পুত্র?
আল্লাহকে পিতা বলা এবং বান্দাকে ‘ইবনুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর পুত্র’ বলা হিব্রু ভাষার রীতি। পিতা অর্থ জগৎপিতা বা প্রতিপালক। আর ‘ইবন’ বা পুত্র (son) অর্থ বান্দা। এজন্য কিতাবুল মোকাদ্দসে সকল আদম-সন্তানকে ‘ইবনুল্লাহ’ বা “আল্লাহর পুত্র” বলা হয়েছে। (আদিপুস্তক ৬/২-৪; ইয়োব ৩৮/৭; গীতসংহিতা ৬৮/৫)। আবার অনেক স্থানে বিশেষ বান্দা হিসেবে সকল ইস্রায়েল-সন্তানকে “আল্লাহর পুত্র” বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। (দ্বিতীয় বিবরণ ১৪/১, ৩২/১৯; যিশাইয় ১/২, ৩০/১, ৬৩/৮; হোশেয় ১/১০)। বিশেষ করে আল্লাহর অনুগত বান্দাদেরকে ‘ইবনুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর পুত্র’ বলা হয়েছে: “যত লোক ঈশ্বরের আজ্ঞা দ্বারা চালিত হয়, তাহারাই ঈশ্বরের পুত্র।” (রোমীয় ৮/১৪)। বিপরীতে পাপী লোকদেরকে শয়তানের পুত্র বলা হয়েছে। (মথি ৫/৯, ৪৪, ৪৫; যোহন ৩/৮-১০, ৮/৪১-৪৪)। আবার খাস বান্দা হিসেবে ইয়াকূব আলাইহি সালাম এবং তাঁর পৌত্র ইফ্রিমিয়কে আল্লাহর প্রথমজাত পুত্র বা বড় ছেলে বলা হয়েছে। (যাত্রাপুস্তক ৪/২২ এবং যিরমিয় ৩১/৯)। দায়ূদ আলাইহি সালাম-কে আল্লাহর পুত্র, প্রথমজাত পুত্র ও ‘জন্ম-দেওয়া’ বা ‘ঔরসজাত’ পুত্র বলা হয়েছে (গীতসংহিতা ২/৭)।
হিব্রুভাষী ইয়াহূদীগণ জানতেন যে, ইবনুল্লাহ: ‘আল্লাহর পুত্র’ অর্থ আল্লাহর বান্দা এবং যে যত বেশি আল্লাহর অনুগত তাকে তত প্রিয় বান্দা হিসেবে একমাত্র পুত্র, ঔরসজাত পুত্র ইত্যাদি বলা হয়েছে। এজন্যই তারা দাঊদ আলাইহি সালাম-কে ‘ইবনুল্লাহ’, আল্লাহ পুত্র, মাসীহুল্লাহ: আল্লাহর মাসীহ ও জন্মদেওয়া পুত্র বলার কারণে তাকে অলৌকিক সত্তা বলে দাবি করেন নি। বরং তাকে ‘আল্লাহর বান্দা দায়ূদ (Servant David) বলেই আখ্যায়িত করেছেন (২-শ্যমুয়েল ৩/১৮, ৭/৫, ৭/৮, ৭/২৬, ১-রাজাবলি ৩/৬, ৮/২৪, ৮/২৫, ৮/২৬, ১১/৩২, ১৪/৮, ২-রাজাবলি ১৯/৩৪, ২০/৬, ১-বংশাবলি ১৭/৭, ২-বংশাবলি ৬/১৫, ৬/১৬, ৬/১৭; গীতসংহিতা ১৩২/১০; যিশাইয় ৩৭/৩৫; যিহিষ্কেল ৩৪/২৩, ৩৪/২৪, ৩৭/২৫; লূক ১/৬৯; প্রেরিত ৪/২৫)।
ইয়াহূদীদের সাথে কথোপকথনে যীশু বলেন: “তোমাদের পিতার কার্য তোমরা করিতেছ। তাহারা তাঁহাকে কহিল, আমরা ব্যভিচারজাত নহি; আমাদের একমাত্র পিতা আছেন, তিনি ঈশ্বর। যীশু তাহাদিগকে কহিলেন, ঈশ্বর যদি তোমাদের পিতা হইতেন, তবে তোমরা আমাকে প্রেম করিতে ... তোমরা তোমাদের পিতা দিয়াবলের, এবং তোমাদের পিতার অভিলাষ সকল পালন করাই তোমাদের ইচ্ছা; ... কেননা সে মিথ্যাবাদী ও তাহার (মিথ্যাবাদীর) পিতা।” (যোহন ৮/৪১-৪২)
প্রচলিত ইঞ্জিলে ঈসা মাসীহ ঠিক এ অর্থেই নিজেকে আল্লাহর পুত্র এবং আল্লাহকে পিতা বলতেন। পাশাপাশি প্রচলিত চারটি ইঞ্জিল শরীফ উনার মধ্যে শতশতবার তিনি নিজেকে মনুষ্যপুত্র (son of man) বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিতাবুল মোকাদ্দসে মনুষ্যপুত্র বলতে ‘মরণশীল মানুষ’ ও ‘আল্লাহর বান্দা’ বুঝানো হয়েছে। নবীগণকে বিশেষভাবে মানুষের পুত্র বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে যেন কেউ অলৌকিক কার্যাদি দেখে তাদেরকে ঈশ্বরের সাথে সম্পৃক্ত মনে না করে। বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর কখনোই মনুষ্যপুত্র নন, মনুষ্যপুত্র কখনো ঈশ্বর হতে পারে না এবং কোনো মনুষ্যপুত্রের কোনো ক্ষমতা নেই; সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। (গণনাপুস্তক ২৩/১৯; ইয়োব ২৫/৬; গীতসংহিতা ১৪৬/২-৫; যিশাইয় ৫১/১২-১৩)।
বাইবেলের বর্ণনানুসারে কবর থেকে বেরিয়ে মগ্দলীনী মরিয়মকে মাসীহ বলেন: “তুমি আমার ভ্রাতৃগণের কাছে গিয়া তাহাদিগকে বল, যিনি আমার পিতা ও তোমাদের পিতা এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বর, তাঁহার নিকটে আমি ঊর্ধ্বে যাইতেছি (I ascend unto my Father, and your Father; and to my God, and your God)।” (যোহন ২০/১৭) তাহলে শিষ্যগণ যে অর্থে ইবনুল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র যীশুও ঠিক সে অর্থেই ইবনুল্লাহ বা আল্লাহর পুত্র। আবার আল্লাহ যে অর্থে অন্য সকল মানুষের মাবুদ, অবিকল সে অর্থেই তিনি ঈসা মাসীহেরও মাবুদ। এ তাঁর জীবনের শেষ শিক্ষা। কুরআন জানায় যে, ঈসা মাসীহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু (আল-ইমরান ৫১), “তোমরা আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু আল্লাহর ইবাদত কর... (মায়িদা ৭২ ও ১১৭), “নিশ্চয় আল্লাহ আমার প্রভু ও তোমাদের প্রভু, অতএব তোমরা তার ইবাদত কর” (মরিয়ম ৩৬ এবং যুখরুফ ৬৪)। এভাবেই কুরআন প্রকৃত ইঞ্জিল শরীফ সংরক্ষণ করেছে।
আমরা দেখেছি যে, তিনি নিজেকে একজন রাসূল ও শিক্ষক হিসেবে প্রচার করেছেন। ঈশ্বরত্বে আল্লাহর সমকক্ষ বলে নিজেকে দাবি করা তো দূরের কথা কোনো ঐশ্বরিক ক্ষমতা-ই তাঁর নেই বলে তিনি প্রচার করেছেন। কিয়ামত বিষয়ে তিনি বলেন: “কিন্তু সেই দিনের বা সেই দণ্ডের তত্ত্ব কেহই জানে না; স্বর্গস্থ দূতগণও জানেন না, পুত্রও জানেন না, কেবল পিতা জানেন।” (মার্ক ১৩/৩২) অর্থাৎ অলৌকিক ঐশ্বরিক ক্ষমতা তো দূরের কথা, অলৌকিক জ্ঞানও তার নেই।
পিতার সমকক্ষ ঈশ্বরত্ব দাবি করা তো দূরের কথা নিজেকে ভালো বলতেও তিনি রাজি হন নি। এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করে, “হে সৎ গুরু (Good Master), অনন্ত জীবন পাইবার জন্য আমি কিরূপ সৎকর্ম করিব? তিনি তাহাকে কহিলেন, (Why callest thou me good? there is none good but one, that is, God: KJV/AV) আমাকে কেন সৎ (good) কহিতেছ? একজন ব্যতীত আর কেউই সৎ নন, তিনি ঈশ্বর।” (মথি ১৯/১৬-১৭: বাংলা বাইবেলের অনুবাদ অস্পষ্ট)
মাসীহের শিষ্যগণও আল্লাহর পুত্র বা ‘জাত (begotten জন্মদেওয়া) পুত্র’ বলতে আল্লাহর নেককার বান্দা বুঝিয়েছেন। যোহন বলেন: “যে কেহ বিশ্বাস করে যে, যীশুই সেই খ্রীষ্ট, সে ঈশ্বর হইতে জাত (born of God); এবং যে কেহ জন্মদাতাকে প্রেম করে; সে তাঁহা হইতে জাত ব্যক্তিকেও প্রেম করে (every one that loveth him that begat loveth him also that is begotten of him) ইহাতে আমরা জানিতে পারি যে, ঈশ্বরের সন্তানগণকে প্রেম করি, যখন ঈশ্বরকে প্রেম করি ও তাঁহার আজ্ঞা সকল পালন করি। ... আমরা জানি, যে কেহ ঈশ্বর হইতে জাত, সে পাপ করে না; কিন্তু যে ঈশ্বর হইতে জাত সে নিজেকে (আপনাকে) রক্ষা করে (he that is begotten of God keepeth himself) এবং সেই পাপাত্মা (শয়তান) তাহাকে স্পর্শ করে না।” (১- যোহন ৫/১-২ ও ১৮)
এ অর্থেই তাঁরা মাসীহকে আল্লাহর পুত্র বলেছেন। মার্ক ১৫/৩৯: “সত্যই এ মানুষটি ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন (this man was the Son of God)” এবং লূক ২৩/৪৭: সত্য, এই ব্যক্তি ধার্মিক ছিলেন (this was a righteous man)।”
যে অর্থে তাঁরা তাঁকে আল্লাহর পুত্র বলেছেন, সে অর্থেই তাঁরা তাঁকে আল্লাহর বান্দা বলেছেন। পিতর বলেন: “অব্রাহামের, ইসহাকের ও যাকোবের ঈশ্বর, আমাদের পিতৃপুরুষদের ঈশ্বর আপনার বান্দা যীশুকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন (glorified his servant Jesus)।” (প্রেরিত ৩/১৩)
অন্যত্র শিষ্যগণ আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় বলেন: “তুমি তোমার দাস (thy servant David) আমাদের পিতা দায়ূদের মুখ দিয়া... কেননা সত্যই তোমার পবিত্র দাস যীশু (thy servant Jesus)..।” (প্রেরিত ৪/২৪-২৭)।
এর বিপরীতে সাধু পল ‘আল্লাহর পুত্র’ কথাকে গ্রীক-রোমান পৌত্তলিকদের পরিভাষায় ব্যবহার করে আক্ষরিক অর্থে তাঁকে “আল্লাহর পুত্র” বলে দাবি করেন। তিনি ও তাঁর অনুসারীরা যীশুকে আক্ষরিক অর্থে আল্লাহর একজাত বা একমাত্র ঔরসজাত পুত্র (only begotten Son), পিতা আল্লাহর মতই পরিপূর্ণ আল্লাহ, আল্লাহর অবতার বা মানবরূপী আল্লাহ (God incarnate/ God in flesh) এবং আল্লাহর যাতের অংশ (of the same substance) বলে প্রচার করে। (যোহন ১/১, ১৪, ১৮ ৩/১৬, ৩/১৮; ইব্রীয় ১১/১৭, কলসীয় ১/১৬, ২/৯; ফিলিপীয় ২/৬, ১-তিমথীয় ৩/১৬)।
এভাবে সাধু পল ও তাঁর অনুসারিগণ ঈসা মাসীহের তাওহীদী দীনকে ত্রিত্ববাদী শির্কী ধর্মে পরিণত করে। এ কথা মুসলিমদের বানানো কথা নয়। যে কোনো এনসাইক্লোপিডিয়া বা ইন্টারনেটে খৃস্টান গবেষকদের লেখা পড়লেই আপনি এ সত্য জানতে পারবেন। মাইক্রোসফট এনকার্টা (Microsoft ® Encarta ® 2008, article (God)) থেকে একটি মাত্র উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
Christianity began as a Jewish sect and thus took over the Hebrew God, the Jewish Scriptures eventually becoming, for Christians, the Old Testament. During his ministry, Jesus Christ was probably understood as a prophet of God, but by the end of the 1st century Christians had come to view him as a divine being in his own right, and this created tension with the monotheistic tradition of Judaism. The solution of the problem was the development of the doctrine of the triune God, or Trinity, which, although it is suggested in the New Testament, was not fully formulated until the 4th century.
“খৃস্টধর্ম ইয়াহূদী ধর্মের একটি ফির্কা হিসেবেই যাত্রা শুরু করে। কাজেই ঈশ্বর বা আল্লাহর বিষয়ে ইয়াহূদীদের বিশ্বাস নিয়েই তার শুরু। ক্রমান্বয়ে ইয়াহূদীদের ধর্মগ্রন্থ খৃস্টানদের নিকট ‘পুরাতন নিয়ম’ বলে গণ্য হয়। যীশু খৃস্ট তার জীবদ্দশাতে আল্লাহর একজন নবী বলেই স্বীকৃত বা গৃহীত হয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু প্রথম শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসে খৃস্টানগণ তাঁর বিষয়ে মনে করতে লাগলেন যে, তিনি নিজেই একজন ঐশ্বরিক সত্ত্বা। এ ধারণা ইয়াহূদী ধর্মের একত্ববাদ-এর সাথে সংঘাত সৃষ্টি করে। এ সমস্যার সমাধানের জন্য ত্রিত্ববাদ বা তিন ব্যক্তির ঈশ্বর মতবাদের উৎপত্তি ঘটে। যদিও নতুন নিয়মের মধ্যে এ মতের কিছু ধারণা আছে, তবে ত্রিত্ববাদ মতটি ৪র্থ খৃস্টীয় শতকের আগে পূর্ণরূপ লাভ করে নি।”
এভাবে ঈসা মাসীহের একত্ববাদী ধর্ম একশত বৎসরের মাথায় ত্রিত্ববাদী শির্কী ধর্মে পরিণত হলো, শুধু ঈসা মাসীহের “ঐশ্বরিক ব্যক্তিত্ব” কল্পনা করার কারণে। আর এ কল্পনার মূল কারণ ছিল হিব্রু ভাষার সম্মানসূচক “ঈশ্বরের পুত্র” পরিভাষাটির অর্থ গ্রীক ভাষায় ‘আক্ষরিক’ অর্থে ব্যবহার করা।
এ মহা ধ্বংসের জন্য দায়ী ছিলেন সাধু পল ও তাঁর অনুসারীরা। যীশু বলেছেন যে, তিনি শুধু ইস্রায়েল বংশের নবী হিসেবে প্রেরিত। তাদের জন্য “ঈশ্বরের পুত্র” পরিভাষাটির ব্যবহারে কোনো অসুবিধা ছিল না। এজন্য তিনি অ-ইস্রায়েলীদের কাছে তাঁর ধর্ম প্রচার করতে কঠিনভাবে নিষেধ করেন। (মথি ৭/৬, ১০/৫-৮; ১৫/২২-২৮) কিন্তু সাধু পল ও তাঁর অনুসারীরা নিজেরা গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যীশুর ঈশ্বরত্ব দাবি করতে থাকেন এবং এ ধর্মকে এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের রোমান অঞ্চলে প্রচার করেন। এ সকল এলাকার মানুষেরা ঈশ্বরের পুত্র পরিভাষাকে আক্ষরিক অর্থেই বুঝতো এবং তাদের দেবদেবীদেরকে ঈশ্বরের পুত্র বা কন্যা হিসেবেই পূজা করত। তারা ঈসা মাসীহকেও এ অর্থেই বুঝে। এভাবে ১০০ বৎসরের মধ্যে ঈসা মাসীহের ধর্ম নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য বিশ্বধর্ম ইসলামে “আল্লাহর প্রিয়পাত্র” হিসেবেও কাউকে ‘ইবনুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর পুত্র’ বলতে নিষেধ করা হয়েছে। (৫-মায়িদা ১৮ আয়াত)।(চলবে:)
0 টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।