মানুষ-জাতি-ধর্ম (People-Race-Religion)

পৃথিবীটা অনেক বিশাল হলেও, মহাবিশ্বের তুলনায় খুবই ছোট। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক বিন্দুমাত্র।আর এই পৃথিবীর কেবল পৃষ্ঠদেশেই বৈচিত্র্যময় জ্ঞানের অধিকারী মানুষের বসবাস।এমন বিচিত্র পৃথিবীর দ্বিতীয়টি মানুষ আজো খুঁজে পায়নি।কবে থেকে এখানে মানুষের বসবাস তার সঠিক হিসাব এখনো মিলেনি।তবে বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় কোটি বছর আগে এ পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব ঘটে।
মানুষ কোমলে-কঠিনে, জ্ঞানে-বুদ্ধিতে এক বিচিত্র প্রাণী।পৃথিবীর বহুমুখী অ নানা প্রাকৃতিক শক্তির এক বৈচিত্র্যময় প্রতিকূল পরিবেশে মানুষের অস্তিত্ব।নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তি আর প্রচণ্ড প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সাথে সংগ্রাম করে মানব সভ্যতা টিকে আছে প্রায় কোটি বছর ধরে।উত্তরোত্তর এগিয়ে চলছে সভ্যতার স্বর্ণশিখরের দিকে।
প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি আর তার ভয়াবহ লীলা দেখে মানুষ প্রথম থেকেই অবাক হয়েছে, ভয় পেয়েছে এবং ভেবেছে অনেক কথা।মানুষের এ চিন্তার স্রোত ২টি ধারায় প্রবাহিত হয়েছে।একটি বস্তুগত ধারা, অন্যটি অবস্তুগত।একটি দৃশ্যমান, অন্যটি অদৃশ্যমান।একদিকে সূক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ,অন্যদিকে স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ।তারা উভয়ই অসহায়।এ অসহায়ত্বের কারণেই মানুষ আশ্রয় নেয় কোন মহাশক্তির কাছে।বিশেষ কোন শক্তির প্রতি মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও বিশ্বাস কেন্দ্রীভুত হতে থাকে।এমনি চিন্তা ও বিশ্বাস থেকেই স্থূলবুদ্ধির মানুষ ভাবতে থাকে অগ্নি,বায়ু, সূর্য,সাগর ইত্যাদি ই হচ্ছে প্রচণ্ড সেই শক্তি, যার কাছে তারা অসহায়।তাই তারা এসব শক্তির অশুভ প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য এবং এদের বর পেয়ে সূখে-শান্তিতে জীবনযাপনের প্রত্যাশায় এদের ভক্তি ও পূজা করতে শুরু করে।অন্যদিকে সূক্ষ্মচিন্তার মানুষগুলি ভাবতে থাকে,এসব প্রাকৃতিক শক্তি নিচয় ও এদের মধ্যে সংঘটিত ঘটানাসমূহের নিশ্চয়ই কোন পরিচালক আছেন, যিনি এ বিশ্বের স্রষ্টা, যিনি লোকচক্ষুর অধিগম্য নন।এ বিশ্বাস থেকেই তারা এক অদৃশ্য মহাশক্তির উপাসনা করতে থাকে তার করুণা ও সাহায্য পাওয়ার আশায়।এভাবে জাতির প্রথম (যারা এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী তাদের ধর্মীয় মতানুসারে পৃথিবীর ১ম মানুষটি ই ছিল স্রষ্টার একত্বে বিশ্বাসী।তাঁর বংশধরদের কেউ পরবর্তীতে প্রকৃতি পূজারী, বস্তুবাদী ইত্যাদি হয়ে উঠে।) থেকেই ২টি ভিন্ন ধারার ধর্মাবলম্বী মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়।১দল হল প্রকৃতি পূজারী,অন্যদল প্রকৃতি স্রষ্টার পূজারী।এই প্রকৃতি পূজারীদের থেকেই বেড়িয়ে এসেছে আজকের ধর্মহীন বস্তুবাদী গোষ্ঠী, যাদের আমরা সমাজতন্ত্রী,ভিন্নার্থে সাম্যবাদী হিসেবে জানি।এরা মূলতঃ তাদের কিছুটা পরিবর্তিত ও পরিশোধিত সংস্করন মাত্র।তফাৎ শুধু এই যে, একদল প্রাকৃতিক শক্তি তথা বস্তুনিচয়ের পূজা করে,অন্যদল করে না।এরা বস্তুর উপর কোন অলৌকিক শক্তির আরপ করে না।আবার বস্তুর কোন স্রষ্টার কথাও ভাবে না।তারা স্রেফ বস্তুবাদী।যাই হউক,কালক্রমে এ ২টি ধারাও নানা ধারা-উপধারায় বিভক্ত হয়ে জায়।আর তারই ফলশ্রুতিতে আজ আমরা বহু ধর্মের অস্তিত্ব ও বিকাশ দেখতে পাই।
উপসনার আলোচ্য ২টি ধারাই ধর্ম বলে পরিচিতি লাভ করেছে।এ ধর্মই হয়ে উঠে মানবের সকল কর্মকাণ্ডের আঁধার।বিশেষ-বিশেষ ধর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে বিশেষ-বিশেষ জীবন ব্যবস্থা।প্রতিটি ধর্ম-নির্দেশিত আলাদা জীবন ব্যবস্থা রয়েছে।ধর্মবিশ্বাসী হওয়া মানবের সহজাত প্রবৃত্তি।এই বিশ্বাস মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির কারণে জন্ম নেয়।আবার জাগতিক নানা প্রতিকুলতার কারণে যেমন তা সৃষ্টি হয়,তেমনি ছোটবেলা থেকে স্বজনদের ধর্মচর্চা দেখেও হয়।
সৃষ্টির ১ম থেকেই মানুষ নানা গোত্রে,নানা ভাষায় আর নানা ধর্মে বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর নানা ভূখণ্ডে বসবাস করছে।স্বদেশপ্রেম ভৌগলিক সীমারেখায় বন্দী,কিন্তু ধর্মভক্তি সেরূপ নয়।এর কোন ভৌগলিক সীমা নেই।ধর্মের স্থান মনে,জন্মভূমি দেহে আর দেহের জন্মভূমি ভূখণ্ড।একজন হিন্দুর জন্ম খৃস্টান দেশ ফ্রান্সে হলে সেটাই তার জন্মভূমি,কিন্তু খৃস্টান ধর্ম তার ধর্ম নয়।ইংরেজ,জার্মান জাতিগত ও দেশগত প্রিচয় হলেও তাদের বড় পরিচয় তারা খৃস্টান।ধর্ম হল আত্মিক এবং বংশগত আর স্বদেশপ্রেম ভূখণ্ডগত।মানুষের জন্য ধর্ম-পরিচিতি ও ভূখণ্ড-পরিচিতি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
একজন ধর্মাবলম্বী মানুষের একটি ধর্মভিত্তিক জাতি-পরিচিতি থাকে যেমন ইহুদী জাতি,হিন্দু জাতি ইত্যাদি।একটি দেশে বহু ধর্মের জনগোষ্ঠীর অবস্থান ঘটলে,তাদের ভূখণ্ডগত পরিচিতি এক হবার কারণে ধর্মীয় পরিচিতি এক হয়ে যায় না,ধর্ম-পরিচিতি আলাদাই থাকে।তাই ধর্ম পরিচিতি মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচিতি।এ স্বাতন্ত্র্য মানুষ সর্বাবস্থায় বজায় রাখে।সৃষ্টির ১ম থেকে ধর্মভিত্তিক জনগোষ্ঠী আলাদা হয়ে বসবাস করতে থাকে।ধর্মের সেই প্রভাব অথবা ধর্মভিত্তিক জনগোষ্ঠীর একাত্মতা কোনকালেই হ্রাস পায়নি।বর্তমানে তা অত্যন্ত শক্তিশালী।আবার আলাদা হয়ে বাস না করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মগোষ্ঠী অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করে সকল সময়।
2 টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।
দিগ্বিজয়ী
তরিক্বতমনা